ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

প্রশ্নটি শুনে তাজ্জব বনে যেতে পারেন৷ ধরে নিতে পারেন আমি উল্টো প্রশ্ন করছি৷ এতদিন শুনে এসেছি মানুষ খোঁজার চেষ্টা করে কোন মানুষের অপরাধে জড়িত হওয়ার কারণ কি? কিন্তু আমি প্রশ্ন করছি, মানুষের অপরাধে জড়িত না হওয়ার কারণ নিয়ে৷ আমার এই নিবন্ধটি শেষ পর্যন্ত পড়লে আপনি এর শিরোনামের স্বার্থকতা খুঁজে পাবেন৷ বুঝতে পারবেন, আপতত বেখাপ্পা ঠেকলেও এমন প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর নয়৷ বিশেষ করে যারা অপরাধ নিয়ে কাজ করেন, মানুষের সাধারণ চরিত্রকে একটু অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন, কিংবা অপরাধ-কারণ-তত্ত্ব সম্পর্কে উত্সাাহী তারা স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন৷

তাহলে কি আমরা ধরে নিব সমাজের প্রত্যেক মানুষই অপরাধী? সুযোগ পেলেই তারা সমাজের প্রচলিত নীতির বিপরীত আচরণ শুরু করে থাকে? হ্যাঁ, বিষয়টি আসলে সেরকমই৷ মানুষ আসলে অপরাধপ্রবণ৷ মনোবিজ্ঞানী বা সমাজ বিজ্ঞানীদের মধ্যে কেউ কেউ এমন কথা বলেন তা নয়, এমন কথা বলে থাকে অনেক ধর্মগ্রন্থও৷ এ ক্ষেত্রে আমরা পবিত্র কোরানের উদাহরণও দিতে পারি ৷ মনোদার্শনিক ফ্রয়োডের মনোসমীক্ষণ তত্ত্বানুসারে মানুষের মনের তিনটি সত্মর তথা, অচেতন, অবচেতন ও চেতন মনের বিপরীতে মানুষের চরিত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনটি উপাদান রয়েছে৷ এগুলো হল ইদ, ইগো ও সুপার ইগো৷ এই তিন উপাদানের মধ্যে ইড হল সুখান্বেষী অবুঝ শিশুর মতো৷ দুঃখকে সচেতনে এড়িয়ে চলে সুখান্বেষণ করাই ইডের কাজ ৷ ধীরে ধীরে মানুষের মনে অহংবোধের জন্ম হয়৷ তার পরে জন্ম হয় সুপার ইগো বা বিবেকের৷ এই অংহবোধ ও বিবেকবোধ ইডকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে ও যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষের মনে অপরাধ প্রবণতা ঠিক সেই ভাবে বা সেই মাত্রায় প্রস্ফুটিত হবে৷ অর্থাত্‍ মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে তার অহংবোধ ও বিবেকবোধ টেনে ধরে থাকে বলেই মানুষ অপরাধ করে না৷ যে মানুষের ভিতর অহংবোধ জাগ্রত হয়নি কিংবা যাদের মধ্যে বিবেকের সুষম বিকাশ ঘটেনি, তারাই হল অপরাধী৷ মানুষ অপরাধ করে না কেন? কারণ মানুষের ইডকে তার সুপার ইগো অপরাধ করতে নিষেধ করে কিংবা টেনে ধরে থাকে৷

ফ্রয়োডের মনোসমীক্ষণ ব্যাখ্যার সাথে অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ হল অপরাধ বিজ্ঞানী ট্রাভি হার্সির সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব৷ তবে ফ্রয়েডের মনুষ্য মনের নিয়ন্ত্রক হল সুপার ইগো যা মানুষের মধ্যেই অবস্থান করে৷ কিন্তু হার্সির মানুষের মনের নিয়ন্ত্রক মননিরপেক্ষ সমাজ৷ সমাজের নিয়ন্ত্রণই মূলত মানুষকে অপরাধমূলক কর্মকা- থেকে দূরে সরিয়ে রাখে৷

ফ্রয়োডের মতো ট্রাভি হার্সি মানুষকে ঠিক ততো বেশি সুখপাগল বা স্বার্থ সিদ্ধির কারিগর বলে মনে করেন না৷ তবে তিনি ধরে নেন মানুষ সুযোগ পেলেই অপরাধ করে বসতে পারে৷ জীবনের প্রাপ্যগুলোর জন্য তার মনে ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব সীমীত৷ তাই প্রত্যেকটি মানুষই অপরাধপ্রবণ৷ কিন্তু মানুষ অনেক বিচার বিবেচনা আর বন্ধনের টানকে অস্বীকার করে অপরাধ করতে পারে না৷ উদাহরণ হিসেবে হার্সি দেখান যে, যে সব যুবকের পারিবারিক বন্ধন কম দৃঢ, যাদের অন্যান্য বিষয়ে পিছুটান নেই, তারা অপেৰাকৃত বেশিমাত্রায় অপরাধকর্মে জড়িত হয়৷ পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আসক্তি ও প্রতিশ্রুতি মানুষকে অপরাধ কর্ম থেকে বিরত রাখে৷ হার্সির সামাজিক বন্ধনে নিম্নলিখিত চারটি উপাদান রয়েছে:
১. পিতামাতা, বন্ধুবান্ধব শিক্ষিা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সংযুক্তি(attachment)
২.প্রচলিত কর্মধারার প্রতি প্রতিশ্রুতি (commitment),
৩.প্রচলিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা (Involvement) ও
৪.সাধারণ মূল্যবোধের উপর আস্থা বা বিশ্বাস ((belief)৷

হার্সির মতে, মানুষ তার পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যথাযথভাবে সংযুক্ত থাকে৷ সংযুক্তি অন্যের অনুভূতির প্রতি কোন ব্যক্তির স্পর্শকাতরতা৷ অন্যের ভাল লাগা, ভালবাসা, পছন্দ-অপছন্দ এবং প্রাপ্তি প্রত্যাশা ইত্যাদির প্রতি কোন মানুষ উদাসীন হলে তার ভিতর সমাজের মূল্যবোধ বা নীতিসমূহ শেকড় গড়তে পারে না৷ সে তখন নিজেকে সমাজের অন্যতম কেউ বলে ভাবতে পারে না৷ আর এজাতীয় ব্যক্তির পক্ষে যে কোন ধরনের অপধাকর্ম সম্পাদন করা সম্ভব৷ মূলত সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্তিই মানুষের মনে বিবেকবোধ জাগ্রত করে৷ এই সব প্রতিষ্ঠান মানুষকে প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে যেতে বাধা দেয়৷ প্রত্যেক মানুষই তার আশেপাশের পরিবেশের প্রতি সচেতন৷ আশেপাশের মানুষ যা চায় না, যা তারা পছন্দ করে না, মানুষ তা করা থেকে বিরত থাকে৷ তাই সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যে ব্যক্তির সংযুক্তি যত নিবিড় হবে, সে ব্যক্তি ততো বেশি আইনমান্যকারী মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে৷

মানুষের অপরাধে জড়িত না হওয়ার পিছনে দ্বিতীয় নিয়ন্ত্রণটি হল প্রতিশ্রুতি৷ সমাজের প্রত্যেকটি মানুষই সমাজের বিশেষ কিছু কাজ বা অর্জনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ৷ এসব অর্জন সমাজের সদস্য হওয়ার জন্যই মানুষ অন্তরে ধারণ করে৷ মানুষ তাদের সহায়, সম্পদ, শক্তি, সময়, আবেগ সব কিছুই বিশেষ কিছু অর্জনের জন্য নিয়োজিত করে৷ এসব অর্জন হতে পারে উচ্চ শিক্ষা, অর্থনৈতিক বা সাংগটনিক প্রতিষ্ঠা, বিশেষ পেশায় বুৎপত্তি অর্জন ইত্যাদি ৷ এই সব অর্জন তাকে সমাজে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করায়, প্রতিষ্ঠালাভে সহায়তা করে৷ এই সব অর্জনের বিপরীতে কোন মানুষ যখন অপরাধকর্মে লিপ্ত হওয়ার মানসিক ইচ্ছা পোষণ করে, তখন তিনি উপরিউক্ত অর্জনকে ধূলিস্যাৎ হবার ঝুঁকির মধ্যে পড়েন৷ কিন্তু সমাজের কোন বুদ্ধিমান মানুষই চায় না অপরাধে জড়িত হয়ে তিনি তার ইতোমধ্যে অর্জনকৃত প্রতিষ্ঠা, সম্মান বা সামাজিক অবস্থান হারাবেন৷ প্রকৃতপক্ষে, সামাজিক অবস্থান অর্জন ও তার প্রতি প্রতিশ্রুতি মানুষের জীবনের বীমা স্বরূপ ৷ মানুষ অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে তাদের সামাজিক বীমার প্রিমিয়ামটুকু নষ্ট করতে চায় না৷ তাই প্রবল লোভ বা তাড়ণা থাকলেও মানুষ অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকেন,নিজেকে সংবরণ করেন৷

মানুষের অপরাধে জড়িত না হওয়ার পিছনে তৃতীয় কারণটি হল সম্পৃক্ততা৷ এটা হল সমাজের সাথে মানুষের বন্ধন দৃঢ় করার অন্যতম সুযোগ৷ সমাজ ও ব্যক্তি জীবনের প্রচলিত কর্মকাণ্ড মানুষকে অপরাধকর্ম থেকে বিরত রাখে৷ যদি বৈধ কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত জড়িত থাকা যায়, মানুষের নিজস্ব সম্ভাবনাগুলোকে যদি সমাজ প্রত্যাশিত পথে পরিচালিত করা যায়, তাহলে কোন মানুষ অপরাধ করতে চায় না৷ অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা৷ তাই সমাজের কোন মানুষ যদি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক বা বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকে এবং এর মাধ্যমে যদি সমাজের প্রতিষ্ঠা, অর্জন, প্রতিশ্রুতি সংযুক্তি রক্ষা করার যায়, তাহলে কোন মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার চিন্তা করবে না৷

মানুষের অপরাধে জড়িয়ে না পড়ার পিছনে সর্বশেষ কারণটি হল বিশ্বাস৷ সমাজের মানুষ তাদের প্রচলিত মূল্যবোধের প্রতি আস্থা রাখে৷ মানুষ মনে করে, তাদের জীবনের একটা উন্নততর লক্ষ্য আছে৷ সেই লৰ্য প্রচলিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ দিয়েই অর্জন করা সম্ভব৷ সমাজে বসবাসকারী মানুষ সেই সমাজের আদর্শগুলো অন্তরে লালন করে৷ এটা বাইরে থেকে সমাজের সদস্যদের উপর কেউ চাপিয়ে দেয় না৷ এই মূল্যবোধ সমাজের সদস্যরা নিজেরাই গ্রহণ করে৷ কোন সমাজই তার সদস্যদের মূল্যবোধের বাইরে যেতে বলে না৷ সমাজের সদস্যরাও তা পারতপক্ষে করা না৷ বিশ্বাস মানুষকে সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতি ও মূল্যবোধগুলোর প্রতি অবিচল রাখার প্রেরণা যোগায়৷ যে মানুষ যত বেশি মাত্রায় বিশ্বাস করে যে সমাজের রীতিনীতিগুলো তার মেনে চলা উচিত্‍, তিনি ততো কম মাত্রায় সেই নিয়ম বা রীতি ভঙ্গ করবেন৷ অন্যদিকে সমাজের মূল্যবোধ বা রীতিনীতির প্রতি অবিশ্বাসী মানুষ যে কোন সময় সেগুলো ভঙ্গ করতে পারেন এবং অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়তে পারেন৷

উল্লেখ্য, মানুষের অপরাধ না করার পিছনের চারটি ক্রিয়াশীল কারণ যথা- সংযুক্তি, প্রতিশ্রুতি, সম্পৃক্ততা ও বিশ্বাস পরষ্পরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত৷ কোন মানুষের মাঝে একটির উপস্থিতি অন্যগুলোর উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়৷ একইভাবে একটির অনুপস্থিতি অন্যগুলোর অনুপস্থিতির সূচনা করতে পারে৷ কোন মানুষ যদি পিতা-মাতা, পরিবার ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি প্রবলভাবে সংযুক্ত থাকে, তাহলে তার ভিতর সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধগুলোর প্রতি বিশ্বাস কাঙ্খিতমাত্রায় জন্ম নিবে৷ একই ভাবে কোন ব্যক্তির সমাজের প্রতি প্রতিশ্রুতি সামাজিক কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততার মাত্রা বাড়িয়ে দিবে৷

কোন মানুষ কেন অপরাধ করে তার কারণ একক কোন সূত্র বা তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়৷ তবে ট্রাভি হার্সি ১৯৬৯ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের কন্ট্রা কোস্টা কাউন্টির ৪ হাজারেরও বেশি জুনিয়র ও সিনিয়র স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর উপর জরিপ চালিয়ে এর সত্যতা পেয়েছেন৷ অধিকন্তু আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে৷ পরিবারের স্নেহ-ভালবাসাবঞ্চিত শিশুদের অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বেশি বলে বস্তি এলাকায় অপরাধ প্রবণতাও বেশি৷ পারিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে অপেক্ষাকৃত কম বন্ধন বা সম্পর্কযুক্ত মানুষ বেশি অপরাধ প্রবণ বলেও আমরা বিশ্বাস করি৷ অন্যদিকে যারা প্রচলিত সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সংকুচিত করে রাখেন কিংবা সমাজের রীতিনীতিকে থোড়াই কেয়ার করেন, যারা সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে ব্যর্থ হন, তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণাতাও বেশি বলে সাধারণভাবেই অনুমান করা যায়৷ (১৫/০৪/২০১৪)