ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

রংপুর শহরের পশ্চিম দিক দিয়ে ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের বাইপাসের দর্শনা মোড়ে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ক্রমশঃ এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে যেতে থাকে। কিন্তু ইতোপূর্বে দুর্ঘটনায় নিহতদের সবই ছিল দূরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা যারা বিভিন্ন কাজে শহরে যাতায়াতের পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল। কিন্তু গত বছর দর্শনা মোড়ে স্থানীয় একটি স্কুল ছাত্রকে একটি মালবাহী ট্রাক চাপা দেয়। এতে রিকসা আরোহী স্কুল ছাত্র, তার বাবা ও রিকসাওয়ালা তিন জনই তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। দুর্ঘটনার নৃশংসতা ও পুলিশের নিষ্ক্রীয়তায় এলাকার মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে প্রায় ৩/৪ ঘন্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে। বেশ কিছু গাড়ি ও দোকানপাট লুট করে। পুলিশ জনতার দাবীর মুখে পলাতক ট্রাক ড্রাইভারকে আটক করতে সক্ষম হয়। তারা সামান্য বল প্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও অবরোধ সরাতে অনেক সময় নেয়। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ে কাছের ও দূরের যাত্রীগণ। প্রায় অর্ধেক দিন বন্ধ থাকে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

রাস্তার প্রতিবন্ধকতা সরানোর শর্ত হিসেব স্থানীয় জনগণ পুলিশের কাছে একটি দীর্ঘ দাবীনামা পেশ করে। তাদের অনেক দাবীর মধ্যে প্রধানতম হল, দর্শনা মোড়ে সার্বক্ষণিক একজন ট্রাফিক কনস্টেবল মোতায়েন রাখতে হবে। দিবারাত্র চব্বিশ ঘন্টা না হলেও অন্ততপক্ষে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অবশ্যই ট্রাফিক পুলিশ রাখতে হবে দুর্ঘটনাপ্রবণ দর্শনা মোড়ে। স্থানীয় পুলিশ আপাতত তাদের দাবী মেনে নেয়। পরদিন থেকে পালাক্রমে দুইজন পুলিশ কনস্টেবল দর্শনা মোড়ে গিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। ০৬.০০-১৪.০০ ঘটিকা পর্যন্ত একজন ও ১৪.০০-২২.০০ ঘটিকা পর্যন্ত অন্য একজন দায়িত্ব পালন করতে থাকল। তৃতীয় দিনে একজন কনস্টেবল ছুটিতে গেলে বাড়তি একজনকে মোতায়েন করা হল। তার দুইদিন পর অন্য একজন কনস্টেবল মামলার সাক্ষ্য দিতে গেলে চতুর্থ একজন মোতায়েন করা হল। তারও কয়েক দিন পর একজন অসুস্থ্য হয়ে পড়লে পঞ্চম একজনকে নিয়োগ দেয়া হল। এভাবে ছুটি, অসুস্থ্যতা, সাক্ষ্য প্রদান, চাকুরী অবসান, বদলী ইত্যাদি কারণে যেখানে স্বাভাবিক চোখে দুইজন মাত্র কনস্টেবলের নিযুক্তি স্থানীয় পুলিশ দেখেছিল এখন সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দুইজন নয়, প্রায় ১০ জনের মতো কনস্টেবলকে তালিকায় রাখতে হল।

মাত্র দুইজন লোকের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বাসত্মবে ১০ জন পুলিশ সদস্যকে তালিকায় রাখার বিষয়টি স্থানীয় সেভাবে পরীক্ষা করে দেখেনি। কিন্তু জনশক্তি ব্যবস্থাপনার ব্যবহারিক পাঠে এসে স্থানীয় পুলিশ কমান্ডার পড়লেন বিপদে। তিনি দেখলেন বিষয়টি বেশ ব্যয়বহুল ও শ্রমঘন। সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি শুধু একটি পয়েন্টেই সীমাবদ্ধ নয়। এমন কয়েক ডজন স্থান দুর্ঘটনা প্রবণ। ক্রমে দেখা গেল দর্শনা মোড়ের জনগণকে সারাক্ষণ শান্ত রাখার চেয়েও অনেক বেশি জরুরী কাজে অধিক সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের প্রয়োজন রয়েছে। জনগণের অসন্তোষও এত দিনে স্তিমিত হয়ে এসেছে। তাই একদিন একজন কনস্টেবলকে উঠিয়ে নেয়া হল। তার কিছু দিন পর অন্য কনস্টেবলকেও উঠিয়ে নেয়া হল।

কিন্তু কনস্টেবল উঠিয়ে নেওয়ার কয়েকদিন পর আবার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটল। পূর্বের পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হল। স্থানীয় পুলিশ সুপার ঐ মোড়ে আবার কনস্টেবল নিয়োগ করলেন। একই ব্যবস্থা অন্যান্য মোড়ের জনগণের নজরে এলো। তারাও তাদের এলাকার ক্রসিং বা যানজটযুক্ত এলাকায় পুলিশ নিয়োগের জন্য আবেদন জানালেন।

পুলিশ কর্তারা পড়লেন বিপদে! জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণে তারা বড়ই অসহায় বোধ করতে লাগলেন। কারণ তারা বুঝতে পারলেন, সকল ক্ষেত্রেই পুলিশ যদি বিচ্ছিন্নভাবে সাড়া দেয় এবং পুলিশ মোতায়েনের মাধ্যমে যদি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে অর্থ বল, জনবল আর মেধা বল সব কিছু প্রয়োগ/বিনিয়োগ করেও তারা পেরে উঠবেন না। অধিকন্তু স্থানীয় পুলিশ দেখল, তারা আসলে সমস্যা সমাধান করছে না। তারা সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন মাত্র। ঘটনা সংঘটনের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল যাবতীয় কারণ অক্ষুন্ন রেখে শুধু ঘটনাটিকে মোকাবেলা করাই মূলত ঘটনা নিয়ন্ত্রণ। বিষয়টি বহতা নদী থেকে দু চার ঘড়া পানি তুলে নদীর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার মতোই হাস্যকর।

স্থানীয় পুলিশ আরো লক্ষ্য করল, তাদের সাড়া ঘটনাপূর্ব নয়, ঘটনা-তড়িত। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, স্থানীয় জনগণ তীব্র প্রতিক্রিয়া করে একটা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, পুলিশ তখনি কেবল তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তাছাড়া পুলিশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় জনগণের কোন অংশগ্রহণ বা দায় দায়িত্ব নেই। বরং জনগণ রাস্তার যানজট সমস্যার সমাধানের দাবীতে নিজেরাই রাস্তা অবরোধ করে যানজট বাড়িয়ে দেয় । স্থানীয় পুলিশ তাই ঘটনাগুলো একটু ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার চেষ্টা করে। আসুন আমরা দেখি স্থানীয় পুলিশ এই দর্শনা মোড়ের সড়ক দুর্ঘটনা সমস্যাটিকে কিভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে।

দর্শনা মোড়সহ গোটা জেলার সড়ক দুর্ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে বা আলাদা আলাদা করে না দেখে স্থানীয় পুলিশ এগুলোকে এখন একটা সামগ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখতে শরু করল। তারা ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণে বসল। পর্যালোচনা শুরু করল। তারা দেখল, ইতোপূর্বে সম জাতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে একই জাতীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ঘটনার গভীরে কেউ যায়নি। তাই বর্তমান পুলিশ প্রশাসন ঘটনার গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।

প্রথমেই স্থানীয় পুলিশ ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি মিটিং ডাকল। সেই মিটিংএ পুলিশ কনস্টেবল থেকে শুরু করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারগণ উপস্থিত হলেন। তারা সবাই ঘটনার বিশ্লেষণ করলেন। তবে ঘটনাকে সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করতে পারলেন ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা। এক্ষেত্রে শুধু ট্রাফিক ইন্সপেক্টরই নন, একজন ট্রাফিক কনস্টেবলও তাদের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে ঘটনার মূলে হাত দেয়ার সুপারিস করলেন। ঘটনা বিশ্লেষণে এরপরই পারদর্শিতা দেখালেন স্থানীয় অপরাধ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের অফিসার ও কর্মচারীগণ।

প্রথমেই তারা খুঁজে বের করলেন রাস্তার ত্রম্নটি। তারা বললেন, এই বাইপাসটির দর্শনা মোড়ের পয়েন্টটি সবচেয়ে বাঁকা। তাই রাস্তায় গাড়ির চালকগণ তার সামনে প্রয়োজনীয় দূরত্বের পথচারী কিংবা বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলো ঠিকমতো দেখতে পারেন না। অধিকন্তু রাস্তাটি বাঁকা হওয়ায় এর দুই কিনারে যে রকম প্রকৌশলগত নির্মাণ দরকার ছিল তা করা হয়নি। যার ফলে একটি গতিশীল গাড়ি মোড় নেওয়ার সময় তার কেন্দ্রাতিগ বলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। গাড়ি রাস্তার পাশে সিটকে যেতে চায়। চালক গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মাঠ পর্যায়ের অফিসারগণ মত প্রকাশ করলেন যে, এই মোড়ে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হলে প্রথমেই রাস্তার নির্মাণ ত্রম্নটি দূর করতে হবে। তারা রাস্তাটিকে সোজা করার পরামর্শ দেন। তবে এই কাজটি পুলিশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই তারা সড়ক ও জনপথ বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণের পরামর্শ দেন।

ট্রাফিক বিভাগের এক সার্জেন্ট বললেন, বাইপাসের রাস্তাটি যখন তৈরি করা হয়, তখন অত্র অঞ্চলে বাড়িঘর ছিল না বললেই চলে। কিন্তু ধীরে ধীরে এখানে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়েছে। সড়ক ও জনপথের মালিকানাধীন রাস্তার উভয় পার্শ্বে পর্যাপ্ত পরিমাণ সরকারি সম্পত্তিও রয়েছে। কিন্তু এগুলোর সবই এখন হয় ইজারা দেয়া হয়েছে, নয়তো অবৈধ দখলে চলে গেছে। বাইপাস সড়ককে অতিক্রম করে যে সরু রাস্তাটি চলে গেছে, তার উভয় পার্শ্বেই উঁচু উঁচু ভবন ও দোকানপাট উঠেছে। রাস্তা পারাপার হওয়ার সময় পথচারীগণ তাই উচ্চ গতিতে ধেয়ে আসা গাড়িগুলোকে সময় মতো দেখতেই পায়না। তাই রাস্তা পার হওয়ার সময় তারা চলন্ত গাড়ির নীচে চাপা পড়ে। তিনি পরামর্শ দিলেন, এই বাইপাসের দুই ধারে সরকারি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠা স্থাপনাগুলো সরাতে হবে। সরকার যদি কোন স্থান লিজ দিয়ে থাকে, তবে তার লিজ বাতিল করে রাস্তার দুই পাশের প্রয়োজনীয় জমি উদ্ধার করে রাস্তাকে অবৈধ স্থাপনা মুক্ত করতে হবে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে কাজটি সহজ হবে না। এর জন্য সড়ক ও জনপথ, পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট ও জেলা প্রশাসনের সহায়তা লাগবে। তাছাড়া অবৈধ রাস্তা বা জমি দখলকারীগণ বেশ প্রভাবশালী। তাই তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনমত তৈরি করতে হবে। তিনি প্রস্তাব করলেন, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় পরিষদের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে জড়িত মালিক-শ্রমিক, পেশাজীবী সম্প্রদায়, সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংগঠন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সর্বোপরি প্রচার মাধ্যমের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

স্থানীয় প্রচার মাধ্যম তথা সাংবাদিকগণ পুলিশের তৈরি করা বিশ্লেষণ ও দুর্ঘটনার কারণগুলো নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। তারা অবৈধ স্থাপনাগুলোর প্রতি স্থানীয় মানুষের সমর্থন প্রত্যাহারের আহব্বান জানাবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ অন্যান্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে স্থানীয় পুলিশ একাধিক পথসভা, অপরাধ নিবারণ সভার আয়োজন করে। এতে সাধারণ মানুষ দর্শনা মোড়ে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, তা দূর করার উপায় ইত্যাদি নিয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করে।

প্রথমেই রাস্তার ক্রটিগুলো দূরা হল। রাস্তার পর্যাপ্ত রোডসাইন স্থাপন করা হল। রাস্তার উভয় পাশ থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হল। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হল। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা এখনো ঘটতেই থাকল। স্থানীয় পুলিশ ঘটনার আরো গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করল। তারা দেখল শুধু রাস্তার গঠনের কারণেই নয়, বরং সড়কগুলো অনিরাপদ হওয়ার পিছনে চালকদের অসতর্কতা ও অদক্ষতাও দায়ী। এবার তারা চালকদের উপর জরিপ চালিয়ে দেখলেন, অধিকাংশ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ভূয়া। তারা কোন ড্রাইভিং স্কুলে প্রশিক্ষণ না নিয়েই কোনভাবে একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করেছে। এই কাজে এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ বিআরটিএ কর্মচারী সহায়তা করেছে। তাছাড়া জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির কারখানাও রয়েছে শহরের আশে পাশে কোথাও। স্থানীয় পুলিশ অনুসন্ধান করে জানতে পারল, গাড়ির মালিকগণ স্বল্প বেতনের ড্রাইভার নিয়োগ দিতে গিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের সত্যাসত্য নিয়ে মাথা ঘামান না। বিষয়টি সর্ম্পকে বিস্তারিত অনুসন্ধানসহ এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরির জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের আহব্বান জানানো হয়।

সংবাদপত্রগুলো এ সর্ম্পকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে যা পুলিশের কাজে দারুণভাবে সহায়তা করে। এবার পুলিশ গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষণ দেবার চিন্তা করতে থাকে। কিন্তু ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটি পুলিশের নয়। তাই তারা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের সাথে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। বিআরটিএ এর স্থানীয় প্রতিনিধির সাথে বৈঠক করে পুলিশ সিদ্ধান্ত নিল যে, ইতোমধ্যে যে সব ড্রাইভার কোন না কোন ভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করেছে তাদের পূনরায় সংক্ষিপ্ত আকারে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পুলিশ জরীপ চালিয়ে দেখল যে রাস্তায় গাড়ি চালনারত ড্রাইভারগণ কৌশলগতভাবে মন্দ না। কিন্তু তাদের তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। কেন না, প্রকৃত মটিভেশন না থাকায় তারা মানুষের জান ও মোটরযানের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য করতে পারেন না। একটি গাড়ি বাঁচাতে গিয়ে বা গাড়ির কয়েক লিটার জ্বালানী বাঁচাতে গিয়ে তারা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করতে কার্পণ্য করেন না।

কিন্তু বাধ সাধল খোদ ড্রাইভার ও তাদের মালিকগণ। ড্রাইভারগণ যুক্তি দিলেন, যদি কাজ স্থগিত রেখে তারা প্রশিক্ষণে যান তাহলে তাদের দৈনিক মজুরি কর্তন করা হবে। রোজগার না হলে তারা সংসার চালাবেন কি করে? তাছাড়া তাদের মালিকগণ তাদের ছাড়বে কেন? বিষয়টি সুরাহা করার জন্য স্থানীয় পুলিশ মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতির নেতাদের সাথে বসলেন। সিদ্ধান্ত হল, ড্রাইভারদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তাদের অবশ্যই ঝালাই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শ্রমিক নেতারা একমত হলেন যে, পালাক্রমে তারা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণে পাঠাবেন। গাডির মালিকগণ প্রশিক্ষণ গ্রহণের দিন ড্রাইভারদের ছুটি মঞ্জুর করলেন এবং বেতন কর্তন করলেন না।

বিআরটিএ তাদের প্রশিক্ষকদের দিয়ে ড্রাইভারদের আবার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। বিআরটিএর প্রশিক্ষকদের পাশাপাশি পুলিশ অফিসারগণও প্রশিক্ষণ পরিচালনায় থাকলেন। যন্ত্র চালনার চেয়েও ট্রাফিক আইন, রেড সাইন, সিগন্যাল বাতি ও মটিভেশনমূলক প্রশিক্ষণই চলল ক্লাসে। একটি স্থানীয় এনজিও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। তারা প্রশিক্ষণকালীন ড্রাইভারদের আপ্যায়নের খরচ বহন করল। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কিছুটা যাতায়াত ভাতার ব্যবস্থাও করা হল।

এভাবে অদক্ষ চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হল। তাদের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য অধিকতর সতর্ক ও সহানুভূতিশীল করে তোলা হল। প্রশিক্ষণকালীন চালকগণ অভিযোগ করলেন যে, তারা যেসব গাড়ি চালান তাদের অধিকাশংই মেয়াদোত্তীর্ণ। অনেক গাড়ির সঠিক ফিটনেস নেই। তাই নিজেরা দক্ষ হলেও যানবাহনের ক্রটির জন্য সড়ক দর্ঘটনা ঘটে। অধিকন্তু যারা পথচারী বা রাস্তা ব্যবহারকারী তারা নিজেরাই সচেতন নন। তারা রাস্তার সিগন্যালও চিনেন না, গাড়ির ইন্ডিকেটরও বোঝেন না। তারা রাস্তা ব্যবহারের সময় এমন সব আচরণ করেন, যাতে গাড়ির চালকের আর কিছু করার থাকে না। তাই তারা রাস্তার পথচারীদের আচরণ পরিবর্তনের জন্য কিছু করার পরামর্শ দিলেন।

এবার পুলিশ কর্তৃপক্ষ তখন সর্বশেষ বিষয়টির দিকে নজর দিলেন। তারা গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষণ, রাস্তার ক্রটি দূর করার বাইরে এখন রাস্তা ব্যবহারকারীদের নিয়ে কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চাইল। তারা অপরাধ নিবারণ সভা, কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের বৈঠক, ট্রাফিক আইন কানুন ও রাস্তা ব্যবহারের সতর্কতা নিয়ে গণশিক্ষা বিস্তারের চিন্তাভাবনা শুরু করল। এজন্য তারা প্রতি বছর পালনকৃত ট্রাফিক সপ্তাহকে শুধু একটি সপ্তাহের আনুষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ না রেখে তা সারা বছরের কর্মকা- হিসেবে গ্রহণ করল। তারা স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ট্রাফিক আইন নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করল।

কিন্তু এই ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় কোন বিশেষ ফল লাভ হল না। তাই স্থানীয় পুলিশ বিআরটিএ যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ট্রাফিক বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চাইল। তারা ট্রাফিক সপ্তাহের একটি প্রোগ্রামের স্থানীয় ১০০ ব্যক্তিকে ট্রাফিক আইন-কানুন ও রাস্তা পারাপার সর্ম্পকে সাধারণ মানুষ ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে প্রশিক্ষণ দিতে চাইল। এইসব ট্রেইনার কমিউনিটি সদস্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তুলবে। কিন্তু কাজটি ছিল বেশ বড় ও ব্যয়বহুল এবং একই সাথে সময় সাপেক্ষ। তাই এই বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব কামনা করা হল। একটি স্থানীয় বেসরকারি সংগঠন আর্থিক সহায়তার জন্য এগিয়ে এলো। পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম থেকেও কিছু তহবিল পাওয়া গেল। বিআরটিএ তাদের সচেতনতামূলক প্রোগ্রামের জন্য প্রাপ্ত বাজেটের কিছু অংশ এই খাতে ব্যয় করতে সম্মত হল।

এবার একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল তৈরি করা হল। এই ম্যানুয়েল অনুসারে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হল। সাথে সাথে তৈরি করা হল কিছু লিফলেট ও প্রচার পত্র। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পক্ষ থেকে একটি প্রশিক্ষণ সচেতনতা মূলক সিডিও তৈরি করা হল। চলল প্রশিক্ষণ ও প্রচার। স্থানীয় প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুলিশের তৈরি করা প্রশিক্ষকগণ তাদের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিলেন। ক্রমশ একটি ট্রাফিক আইনে সচেতন কমিউনিটি তৈরি হল।

সড়ক দুর্ঘটনা শুধু দর্শনা মোড়েই নয়, জেলার সকল স্থানেই শূন্যের কাছাকাছি নেমে এল। রংপুর জেলার এই সমস্যার সমাধানমূলক পুলিশিং ব্যবস্থা অন্যান্য জেলার জন্য মডেল হয়ে থাকল। পুলিশ ও সরকারের নজর পড়ল রংপুরের সমস্যা সমাধানমূলক পুলিশিং মডেলে। সারাদেশেই একই প্রকারের কাজ চলতে থাকল। বাংলাদেশ একটি সড়ক দুর্ঘটনাবিহীন নিরাপদ আবাসে পরিণত হল।