ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কোন সার্বভৌম দেশের আদালত হল ন্যায় বিচারের প্রতীক ৷ রাষ্ট্রের তিনটি আবশ্যিক অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ একটি ৷ আদালত হল, বিচার বিভাগের  দৃশ্যমান রূপ ৷ সংসদ আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগ সে আইনের বলে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। বিচার বিভাগ সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনে ব্যাখ্যা দেন এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিচার করে আইনে প্রদত্ত ধরন ও পরিমাণের সাজা দিয়ে থাকে ৷ আদালতের বা বিচার বিভাগের আর একটি কাজ হল, আইনের প্রয়োগকালীন ত্রুটি-বিচ্যূতি বা অস্পষ্টতার স্পষ্টতাদান তথা ব্যাখ্যা করা ৷ এক নাগরিকের হাতে অন্য নাগরিক, এক গোষ্ঠীর হাত থেকে অন্য গোষ্ঠী, এমনকি এক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানের বেআইনী হয়রানি থেকে রক্ষার জন্য আদালতই নাগরিকদের শেষ ভরসাস্থল ৷

 

পুলিশ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের অংশ এবং নির্বাহী বিভাগের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ৷ নির্বাহী বিভাগ থেকে তাই পুলিশকে তাত্ত্বিকভাবে আলাদা করা কঠিন ৷ কিন্তু তারপরও জনগণের চোখে পুলিশের একটি স্বকীয় অস্তিত্ব রয়েছে ৷ কারণ, নির্বাহী বিভাগের অধীনে হয়েও পুলিশ বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৷ আদালত যে আইনের আওতায় আইনভঙ্গকারী নাগরিকদের বিচার করে, পুলিশ সেই আইন প্রয়োগ করে ৷ এক কথায় বলতে গেলে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পুলিশ গোটা বিচার ব্যবস্থার কর্মভারকেই প্রভাবিত করতে পারে।

 

বস্তুত, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার প্রায় সমগ্র বিষয়টিই পুলিশের দায়িত্ব, কর্তব্য ও কর্তৃত্বের মধ্যে পড়ে৷ আইন প্রয়োগ ও শৃঙ্খলা রক্ষার সাথে বিধি নিষেধ সম্পর্ক রয়েছে ৷ মানুষের স্বভাবে আত্মকেন্দ্রীকতা প্রবল ৷ মানুষের সাধারণ প্রবণতা হল, স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে নিজের খেয়াল খুশি মত চলা ৷ মানুষ চেতনে-অবচেতনে আইন ভঙ্গ করতে চায় ৷ তাই মনুষ্য আচরণকে আইনের বিধি-নিষেধের মধ্য দিয়ে সমাজের প্রত্যাশিত ধারায় পরিচালনার চেষ্টা করা হয় ৷ মনুষ স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় বলেই পুলিশকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রায়শই বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিতে হয় ৷ তবে, এ বল প্রয়োগও আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত ও নিয়ন্ত্রিত হতে হবে ৷

 

পুলিশের উদ্ধার, গ্রেফতার, তল্লাসি এবং নাগরিকদের নির্দেশ দানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সমাজের শৃঙ্খলা বজার রাখার জন্যই৷ কিন্তু ক্ষমতা এমন একটি জিনিস যার অপব্যবহার বা অতিরিক্ত ব্যবহার ক্ষমতার সাথেই নিহিত থাকে ৷ তাই পুলিশকে শুধু ক্ষমতাই দেওয়া হয়নি;  প্রদত্ত ক্ষমতার যাতে অপপ্রয়োগ বা অতিরিক্ত প্রয়োগ করা না হয়, তার জন্যও নির্দেশনা বা আইনি রক্ষাকবজ রয়েছে ৷

 

পুলিশের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের নিজস্ব চেইন-অব-কমাণ্ড রয়েছে ৷ যে আইন পুলিশ প্রয়োগ করে, সে আইনের মধ্যেও পুলিশের আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বেআইনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার গাইড লাইন রয়েছে ৷ অধিকন্তু, আদালত আইনপ্রয়োগ সংক্রান্ত পুলিশের প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডই পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ৷ আইনের নির্দেশনা বাস্তবায়িত বা অনুসৃত না হলে আদালত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশের কর্তৃপক্ষকে কিংবা সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে ৷

 

সর্বোপরি আদালত আইন বলেই সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি দিতে পারে ৷ পুলিশের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের উপর নজরদারির ক্ষেত্রে আদালতের অন্য একটি ক্ষমতা হল, পুলিশ বা সরকার পক্ষ থেকে আনীত কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং তত্সংশ্লিষ্ট পুলিশি কর্মকাণ্ড যেমন, তদন্ত, তল্লাসি, জব্দকরণ, উদ্ধার ইত্যাদি আইনে প্রচলিত পদ্ধতি বা নির্দেশনা অনুসারে করা না হলে আদালত সে সব কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারে কিংবা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণকে অপ্রাসংগিক বা অগ্রহণযোগ্য বলে  সর্ম্পর্ণ বা আংশিকভাবে বাদ দিতে পারে ৷ যেমন, কোন অপরাধীর কাছ থেকে জোরপূর্বক দোষ স্বীকারোক্তি আদায় করা হলে আদালত তা গ্রহণ করবে না ৷ যে সব ক্ষেত্রে তল্লাসি চালানোর পূর্বে আদালতের অনুমতি বা তল্লাসি পরোয়ানা থাকা বাধ্যতামূলক সেসব ক্ষেত্রে বিনা পরোয়ানায় তল্লাসি চালিয়ে কোন আলামত উদ্ধার করা হলে কিংবা উদ্ধারের পর আলামতের জব্দ তালিকায় সঠিক পদ্ধতিতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া না হয়, আদালত সে জব্দ বস্তু ও জব্দ তালিকাকে সাক্ষ্য হিসেবে আমলে নাও নিতে পারেন।

 

আদালতের এই যে ক্ষমতা, অনেক পুলিশ অফিসার, এমনকি পুলিশ নন কিন্তু যারা পুলিশকে সব সময় অপরাধী ও আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কার্যক্রমে সফল দেখতে চান, তাদের কাছে বাহুল্য মনে হতে পারে ৷ অনেক পুলিশ অফিসার এতে বিরক্ত হতে পারেন, ভাবতে পারেন, আদালতের এই এখতিয়ার পুলিশের দক্ষতা প্রদর্শনের পথে অন্তরায় ৷ এতে পুলিশের দায়িত্ব পালন তথা সেবাদানকর্ম কঠিনতর হয়ে পড়েছে ৷

 

শতভাগ আইন মান্য করে পুলিশের শতভাগ সফল হওয়া, না হওয়া নিয়ে সারা বিশ্বে কত কিছুই যে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই ৷ পাশ্চাত্যের পুলিশিং জগতে ‘নোংরা হ্যারি সমস্যা’ নামে একটি পুলিশি কূটাভাসেরও জন্ম হয়েছে ৷ একটি ফিচার ফিল্মে দেখানো হয়েছে, সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর হ্যারি ক্রমাগতভাবে পরাস্ত হয়েছেন। অথচ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী  প্রদর্শন করে অপরাধী বারবার পার পেয়ে গেছে ৷ তাই ইন্সপেক্টর হ্যারি যখন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে আইন প্রয়োগ করতে গিয়েছেন, তখনই সফল হয়েছেন ৷ বাহবা পেয়েছেন সাধারণ মানুষে ৷ তাই অনেকে মনে করেন, নোংরা হ্যারিই আসল পুলিশ ৷ কিন্তু আমরা যদি সভ্য সমাজের বাসিন্দা বলে নিজেদের পরিচয় দিতে চাই, তাহলে আমাদের আইনের সঠিক পদ্ধতির প্রতি আস্থা রাখতে হবে৷

 

আমরা জাতি হিসেবে স্বৈরতন্ত্র বা অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে একটি সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উন্নীত হওয়ার পথে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছি৷ জনগণের মধ্যে তাই একটি পরিবর্তন স্পষ্টরূপেই দেখা যাচ্ছে৷ ঔপনিবেশিক আইনে পরিচালিত হলেও, পুলিশের ঔপনিবেশিক আচরণ আমাদের স্বাধীনচেতা মানুষ আর সহ্য করতে চায় না৷ তারা প্রতিবাদ করতে শিখেছে৷ সরকারি-বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনসমূহ, সকল ধরনের প্রচার মাধ্যম, সুশীল সমাজ, এমনকি একক ব্যক্তিদের কেউই এখন আর পুলিশের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করতে চায় না৷

 

একইভাবে আমাদের আদালতগুলো ক্রমশঃ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষার ক্ষেত্রে আরো বেশি দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে ৷ প্রতিনিয়ত আদালত থেকে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা, রুলণ্ডনিশি বা অন্যান্য আদেশ আসছে ৷ শুধু পুলিশ নয়, আইন প্রয়োগের দায়িত্বে নিয়োজিত কোন বিভাগই এখন আর আদালতের নজরদারির বাইরে নয় ৷ ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দখল হয়ে যাওয়া কিনারা উদ্ধারে নির্দেশনা প্রদান থেকে শুরু করে র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমনের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা বা আদেশ আমাদের দেশবাসিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এই দেশে মানবাধিকার বা সংবিধানে বর্ণিত ব্যক্তি অধিকার ক্ষুন্ন করার বিষয়টি আদালত নমনীয়ভাবে দেখবেন না৷

 

পুলিশের বেআইনী কর্মকাণ্ড বা ক্ষমতার বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নজির পাশ্চাত্য দেশে প্রচুর ৷ সেখানে পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি বা স্বাধীনভাবে মানুষ অহরহ দেওয়ানি আদালতের স্মরণাপন্ন হয়৷ আদালত এই দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য শাস্তির আদেশ দিয়ে থাকেন৷

 

২০০৪ সাল থেকে শুরু করে ২০১১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর পুলিশ বিভাগ পুলিশের হয়রানি, দুর্ব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য আদালতে রুজুকৃত দেওয়ানি মামলাগুলো পরিচালনা ও আদালতের রায়ে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ প্রায় ১৬.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে৷ এগুলোর মধ্যে ১৯৯৭ সালে জেফ্রি আলসটন নামক এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের ফলে সে পঙ্গুত্ব বরণ করলে আদালত এই জন্য বাল্টিমোর পুলিশ বিভাগকে জেফ্রিকে প্রায় ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দান করে৷ তবে বাদীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাল্টিমোর পুলিশকে শেষ পর্যন্ত ৬ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল।

 

বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ রুজুর নজির থাকলেও দেওয়ানি মামলা রুজুর নজির খুবই কম৷ কিন্তু, ইদানীং পুলিশের অসাদাচরণের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ অনেক বেশি সোচ্চার হয়ে উঠেছে৷ একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতির জন্য এটা অবশ্যই আনন্দের বিষয়৷ কিন্তু, ঔপনিবেশিক ভাবধারায় লালিত-পালিত-প্রশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত একটি পুলিশ বিভাগের কর্মচারীদের জন্য নাগরিক সমাজের এই সচেতনতাি একই সাথে উদ্বেগ ও সন্তুষ্টির কারণ৷  উদ্বেগ এ কারণে যে, নাগরিক সমাজের পরিবর্তিত মানসিকতার সাথে সঙ্গতি রেখে আইন প্রয়োগের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ এখনও নিজেদের যথাযথভাবে প্রস্তত হতে পারেনি। তাই, হটাৎ করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা রুজুর ফলে তারা তাদের স্বাভাবিক দায়িত্বটুকু পালন করতেও দ্বিধাগ্রস্তবোধ করতে পারে৷  সন্তুষ্টির কারণ এ যে নাগরিক সমাজের সচেতনতা পুলিশকে দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করবে।  অবশ্য নাগরিক সমাজের প্রত্যাশার সাথে তাল মিলিয়ে পুলিশ সংগঠনের বিদ্যমান সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার দায়িত্ব সরকার তথা সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষকেই বহন করতে হবে৷

 

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের ছাত্র আব্দুল কাদের নগরীর খিলগাঁও থানা পুলিশের হাতে নির্যাতিত হলে বিষয়টি মহামান্য হাইকোর্টের নজরে আনা হয় ৷ আদালতের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয়, ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা রুজু করা হয় ৷ আদালতের আদেশে দায়েরকৃত মামলায় ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের শাস্তি হয়েছে ৷ অধিকন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মামলা ইতোপূর্বেই নিষ্পত্তি হয়েছে৷ এ ধরনের আরো অনেক ঘটনাই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায় যেগুলোতে আদালত পুলিশের অপেশাদার আচরণকে স্বপ্রণোদিতভাবে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়েছে।

 

এভাবে আদালতের নির্দেশনায় আইন যেমন সচল হয়, তেমনি আইন প্রয়োগকারী পুলিশও সচেতন হয়৷ ফৌজদারি বিচার শৃঙ্খলের অন্যতম আংটা হওয়ার ফলে আদালত পুলিশের দায়িত্ব পালনের ধরন, ক্ষমতার বাড়াবাড়ি কিংবা আইনকে ভেঙ্গেচুরে বেআইনীভাবে প্রয়োগ করে বিভাগীয় দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টি বরদাস্ত করতে পারে না৷ তাই এ ব্যাপারে আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত ভূমিকা অবশ্যই কাম্য৷ কেননা, আদালতের ভূমিকা পুলিশকে অধিকতর পেশাদার হতে শুধু বাধ্যই করবে না, প্রেরণাও যোগাবে৷