ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বেগম রোকেয়ার জন্ম হয়েছিল ১৮৮০ সালে। তিনি মারা গেছেন ১৯৩২ সালে। জন্ম ও মৃত্যুর তারিখটি ছিল একই, ৯ ডিসেম্বর। জন্ম গ্রহণ করেছিলেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার এক জমিদার পরিবারে। আমার জন্মস্থানও মিঠাপুকুরে। তাই, বেগম রোকেয়াকে নিয়ে আমার মধ্যে একটি বিশেষ ধরণের গর্ববোধ রয়েছে। আর এই গর্ববোধ থেকেই রোকেয়ার উপর আমার কিছু পড়াশোনা রয়েছে। তার রচনাগুলোর প্রায় সবই পড়েছি। সেই সাথে পড়েছি সুফি মোতাহার হোসেন রচিত বেগম রোকেয়ার পূর্ণাঙ্গ জীবনীও।

begum-rokea1

আমার মনে হয়, বেগম রোকেয়া তার কর্ম ও লেখনিতে সেই সময়ের তুলনায় তো বটেই, বরং বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক, অনেক বেশি বৈপ্লবিক। তিনি নারীদের শুধু শিক্ষাই দেননি, নারীদের শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখতে। তার রচিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বইটি (ইংরেজি ও বাংলায়) বাংলা ভাষায় রচিত এখন পর্যন্ত এক মাত্র ইউটোপিয়া। বেগম রোকেয়া ভিন্ন অন্য কোন বাঙালি লেখক ইউটোপিয়াধর্মী কোন বই লিখেছেন বলেও শুনিনি। এ ক্ষেত্রে টমাস মুরের সাথে রোকেয়াকে তুলনা করা যায়। আমার মনে হয় না, স্বশিক্ষিত বেগম রোকেয়া যখন তার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ লিখেছিলেন তখন টমাস মুরের ইউটোপিয়া পড়েছিলেন। তাই এটি ছিল তার সম্পূর্ণ মৌলিক গ্রন্থ।

বেগম রোকেয়ার লেখনিতে যে নারী বিপ্লবের সুর রয়েছে, তাতে সেই সময় তিনি যেমন বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার রেশ আজও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। যেভাবেও যে গতিতে দেশে মৌলবাদ ও মোল্লা সমাজের বিকাশ ঘটছে, তাতে আমার ভয় হচ্ছে, বেগম রোকেয়াকে শীঘ্রই মোল্লারা হয়তো ময়না তদন্তের টেবিলে নিয়ে যাবেন। রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ যদি ‘হেফাজতওয়ালারা’ কখনো ভুলক্রমে পড়ে ফেলেন, তাহলে নাউজুবিল্লাহ পড়তে পড়তে আমাদের জাতীয় আর্কাইভটি পর্যন্ত ছাইভস্ম করে দিবেন।

আমার ভয়টার একটি যৌক্তিক উদাহরণ রয়েছে। ড. হুমায়ূন আজাদের বহুল পঠিত ‘নারী’ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০ এর দশকে। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই বইয়ের হাজার হাজার কপি বিক্রয় হয়ে গেছে।একের পর এক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এই বইটির। বাংলাদেশের শুধু নারীবাদীদের ঘরে ঘরে নয়, যে কোন বিদগ্ধ পাঠকের বুক সেল্ফে সাজানো থাকত বইটি। এক যুগেও বইটিতে আপত্তিকর কোন কিছু কেউ খুঁজে পাননি। কিন্তু ২০০২ সালে হঠাৎ করে সরকারকে কেউ বললেন, এটাতে আপত্তিকর কিছু রয়েছে। আর অমনি বইটি সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। বাজেয়াপ্ত বলে ঘোষণা করা হল এর সকল কপি। বাজার থেকে বইটি জব্দ করা শুরু হল।

কিন্ত মজার বিষয় হল, যে সরকারি কর্মকর্তাগণ এ বইটি বাজেয়াপ্ত বা নিষিদ্ধের সরকারি নির্দেশনা লিখেছেন বা জারি করেছেন, এমনও হতে পারে, তাদের নিজস্ব লাইব্রেরিতেও এ বইয়ের অন্তত একটি করে কপি ছিল।  হাস্যকার বিষয় হল, বাজারে কেনাবেচার প্রতি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাঠকদের ড্রয়ই রুম থেকে বইটি বাজেয়াপ্ত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। কিংবা দেশের হাজার হাজার গ্রন্থাগারে, এমনকি সরকারি গ্রন্থাগারেও যে বইটির হাজার হাজার কপি রয়েছে, সরকার হয়তো তা জানতই না। আমি জানি না হুমায়ুন আজাদের সেই বহুল পঠিত ‘নারী’ বইটি বাংলাদেশে এখনও নিষিদ্ধ কি না। তবে এটুকু বলতে পারি, সরকারের বাজেয়াপ্তের ঘোষণার পরে হুমায়ুন আজাদের বহুল পঠিত ‘নারী’ বইটির কাটতি আরো একবার বেড়ে গিয়েছিল।

আমার ভয় হয়, সন্দেহ হয়, হয়তো অল্প দিনের মধ্যেই মোল্লারা বেগম রোকেয়ার লেখনিসমূহ নিষিদ্ধের দাবী তুলবেন। কারণ, বেগম রোকেয়া এখনও এদেশে এমন কি এই বিশ্বেও প্রাসঙ্গিকভাবে মৌলবাদ বিরোধী; মোল্লাতন্ত্রের শত্রু।