ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত তার একটি জরিপরে মুখোমুখি আমরা প্রতি বছরই হই। বিশ্বব্যাপী এই জরিপটি পরিচালনা করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বেসরকারি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিচার বিভাগের সাথে সম্পর্কীত সংস্থাগুলো জরিপে প্রথম দিকের অবস্থান দখল করে। তবে বাংলাদেশে বরাবরই প্রথম স্থানটি দখল করে পুলিশ। বর্তমান বছরে টিআইবি এর জন-উপলব্ধি জরিপেও পুলিশকে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। করা হয়েছে বললে ভুল হবে। কারণ, এটা একটা জরিপ। তাই জরিপ পরিচালনাকারিদের ডাটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনের বাইরে তেমন কিছু করার থাকে না। আসল নাটের গুরু হলআসলে জনগণ যারা উপলব্ধি করেন, যে বাংলাদেশের সকল সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে পুলিশই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত।

টিআইবি এর এই জনউপলব্ধি প্রতিবেদন নিয়ে দেশে প্রতিবছরই হইচই শুরু হয়। যে প্রতিষ্ঠান শীর্ষ স্থান অধিকার করে তার তো মাথা খারাপ হয়ে যায়। চলতি বছরের পূর্বের বছর প্রথম স্থানটি অধিকার করেছিল বিচার বিভাগ। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর তখন বিচার বিভাগেরও মাথায় বাই চড়েছিল। হাইকোর্ট তলব করেছিল টিআইবি এর কর্তা ব্যক্তিদের। শেষ পর্যন্ত নানা ছলাকলা কিংবা তথ্য প্রমাণ, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আদালতের হাতে তুলে দিয়ে টিআইবি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। এরও পূর্বে প্রথম দিকের স্থান অধিকার করে বসেছিল শিক্ষা বিভাগ। তখন এই প্রতিবেদন নিয়ে খোদ সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী অবস্থান লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এক দফতরের মন্ত্রী টিআইবি এর খোসা ছড়ানোর অবস্থা করলেও অন্য দফতরের মন্ত্রী তাকে সাধুবাদ জানিয়েছিল।

বাংলাদেশ পুলিশও কম যায়না। প্রথম দিকের প্রতিবেদনগুলোতে পুলিশ তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতো না।কারণ, সেই সময়ের পুলিশ নেতারা এটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাত না। আর সাধারণ পুলিশ সদস্যরা মনে করত, মানুষ যদি এটা উপলব্ধি করে তাহলে আমরা নিবারণ করব কিভাবে? কিন্তু পরে পুলিশ নেতৃত্ব মনে করল, তারাও মানুষ, তাদেরও একটা উপলব্ধি আছে। আর এই উপলব্ধি সাধারণ মানুষের উপলব্ধির অনুরূপ হলেও কিছুটা পৃথক। কারণ, পুলিশ জানে পুলিশ নিজেরা কি।আর সেই সাথে পুলিশ জানে অন্যরা কি।

পুলিশ জানে নিতান্তই ভাল মানুষের কেতা দূরস্ত পোশাকের অন্তরালে কার ভিতরে কি রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বস্তির ভিক্ষুকটি সম্পর্কে পুলিশ জানে। পুলিশ দেশের সর্বোচ্চ আমলাটি থেকে শুরু করে ভূমি অফিসের কেরানিটিকে পর্যন্ত চিনে। যারা প্রতিনিয়ত পুলিশের মুণ্ডুপাত করে পুলিশকে আইন-কানুন আর বিধি-বিধানের চোখ রাঙানি দেন, তাদের সাথেও থাকে পুলিশের এক কনস্টেবল। সরকারি পদের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অতি নিকটেই থাকে পুলিশ। প্রকৃতিতে এমন কোন সময় নেই, এমন কোন স্থান নেই যেখানে মানুষ আছে, আর পুলিশ নেই। পাহারাদার পুলিশ চতুষ্পদ নয়, তারা দুই পা-ধারী মানুষ। তাই এরা সবই জানে। তাই পাবলিক যা জানে, পুলিশ তার চেয়ে অনেক বেশি জানে।

এমতাবস্থায়, টিআইবিএর জন উপলব্ধি প্রতিবেদন সম্পর্কে পুলিশের বক্তব্য থাকা অতি স্বাভাবিক। টিআইবি যে জনউপলব্ধি জরিপ পরিচালনা করে তাতে গাধা-ঘোড়ার দাম একই পড়ে। গাধায় অভ্যস্ত ব্যক্তিরা ঘোড়ার কদর বোঝার কথা না। একজন কাঠুরের উপলব্ধিতে সবচেয়ে দামী বস্তু কুঠার। আর একজন লেখকের কাছে সবচেয়ে দামী বস্তু হল কলম। কিন্তু টিআইবি একজন কাঠুরিয়ার আর একজন লেখকের উপলব্ধিকে সমান দরে বাজারজাত করে।

জনউপলব্ধির সবচেয়ে বড় পরিমাপক হওয়ার কথা সেই জনগণের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার যোগাযোগ বা লেনদেন। যে সরকারি অফিসে যতবেশি মানুষ যাবে কিংবা যে সরকারি অফিসে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে যেতে হবে সেই সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের চোখে ততো বেশি নজরদারিতে থাকবে। কিন্তু যে সব অফিসে সাধারণ জনগণকে যেতে হয় না, সেই সব অফিস সম্পর্কে জনগণের জনউপলব্ধি কি হবে? এই ক্ষেত্রে জনগণকে বাংলাদেশ আর চাঁদের দেশের মধ্যে তুলনা করতে বলা হবে। যদি বলা হয়, চাঁদের দেশ আর বাংলাদেশের মধ্যে কোনটি বেশি সুন্দর। দুঃখ-কষ্টের যাতাকলে পৃষ্ঠ বাঙালিরা যদি বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে চাঁদের দেশকেই উত্তম বলে বিবেচনা করে, তাহলে টিআইবির জরিপকারিদের কিছুই বলার থাকবে না।

এমতাবস্থায় যদি কোন ব্রক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে সর্বাধিক দুর্নীতিগস্ত কোনটি? তখন জনগণের উপলব্ধি তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করতে পারে না। কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে পিছনের সারিতে থাকার পরও জনগণের উপলব্ধিতে প্রথম সারিতে উঠে আসতে পারে যদি সেই প্রতিষ্ঠানের সাথে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বা লেনদেন সর্বাধিক হয়ে থাকে। অন্য দিকে যে প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ কোন দিনই যায না কিংবা যেখানে তাদের কালেভদ্রে যেতে হয়,সেই প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েও জনউপলব্ধির তালিকায় স্থান নাও পেতে পারে।

টিআইবি এর ২০১২ সালের জরিপের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, পুলিশের কাছ থেকে সেবা নিয়ে ৭২ শতাংশ মানুষকে ঘুষ দিতে হয়েছে। এ ছাড়া বিচারিক সেবা নিয়ে ৬৩ এবং ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিয়ে ৪৪ শতাংশ নাগরিককে ঘুষ দিতে হয়েছে। পুলিশ স্পর্শ করে না এমন খাত পৃথিবীতে নেই। পুলিশের অধীক্ষেত্রহীন কোন ভূখণ্ড নেই। পুলিশের দ্বরস্থ হয় না এমন কোন নাগরিক নেই। তাই পুলিশ

এই ক্ষেত্রে আমরা একজন দুর্নীতির গবেষক হান্ট এর পেরুর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করব। — সালে পেরুর দুর্নীতি নিয়ে গবেষণাকালীন হান্ট লক্ষ্য করেন যে পেরুর মানুষ পুলিশকেই সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত বলে মনে করে।

If people are asked to estimate the levels of corruption in public agencies, their answers are affected by their own experience. A public service may be reported to be highly corrupt simply because people have more contracts with that agency than with an even more corrupt agency that they seldom encounter. Detailed data from Peru permit Hunt to correct for this bias, She calculate the ratio of total bribes paid to usage rated and finds that the judiciary is the most corrupt institution, followed by the police. Forty-two percent of reported bribe revenues were paid to the judiciary, even though it represented only 2 percent of citizen interactions. The source of the problem appears to be the extensive delays in the court system due, in part, to the poor training of judges.
টেবিল
ক্রমিক সরকারি খাত ঘটনার সংখ্যা/হার(%) ঘুষের মূল্যমাণ(%) মিথস্ক্রিয়ার হার(২) দুর্নীতির সূচক(অনুপাত)
১ বিচার বিভাগ ১২ ৪২ ২ ২৬.৩
২ পুলিশ ৩৫ ২৭ ২ ১২.৭
৩ স্থানীয় সরকার ২১ ১১ ১০ ১.১