ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

2011-10-16-17-50-55-Lalon_tm

একদিন ইউটিউব ঘাটতে গিয়ে অরুন্ধতী হোম চৌধুরির গাওয়া একটি লালনগীতি আবিস্কার করলাম। অরুন্ধতীর কণ্ঠ এমনিতেই সুরেলা। তার উপরে আবার লালনের সুর। সব কিছু মিলে এই গানটি আমাকে এক প্রকার মাতাল করে তুলল। অফিসের কম্পিউটারে সারাদিন বাজালাম গানটি। কখনো আস্তে আস্তে, কখনো আবার বেশ জোরে জোরে। এরপরও চলছে মাঝে মাঝে মোবাইল, ট্যাবে গানটি শোনার পালা। নিজে শুনছি, অন্যদের শোনাচ্ছি। লালন সম্পর্কে আমার এই বাড়াবাড়ি রকমের রসবোধ অনেকের কাছে বেখাপ্পা ঠেকবে। কিন্তু আমি মনে করি এটা স্বাভাবিক। কারণ মানুষ চিরায়তভাবেই সঙ্গীতপ্রিয়, সাহিত্যপ্রেমি সংস্কৃতি মাতাল। আমি এর ব্যতিক্রম নই-সহগামী। গানটি ছিল, প্রেম জান না প্রেমের হাটের বুলবুলা।

আমার কাছে বিস্ময় লাগে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের পাশাপাশি অন্তত সঙ্গীতাঙ্গনে লালন ও হাছন রাজা এখনও আধুনিক, এখনো আবেদনময়, এখনও বহুল পঠিত ও বাহুল্য রকমের শ্রুত। ভাগ্যগুণে ও আগ্রহের জন্য আমার এই চারজন কবির লীলাক্ষেত্রে যাবার সুযোগ হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের অন্যতম কর্ম সাহিত্য সাধনাস্থল সাহজাদপুর, শিলাইদহ; লালনের কুষ্টিয়া ও হাছনের সুনামগঞ্জে আমি গিয়েছি। আর নজরুলের জন্য তো ঢাকার বাইরে যাবার দরকার নেই। নজরুল আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে চর্চিত হয়। কিন্তু লালন ও হাছন চর্চিত হয় সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে মানুষের ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে।

বিষয়টি খেলো হলেও বলব, যদি সরকারিভাবে নজরুল আর রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা না হতো এবং তার স্থলে শুধু লালন ও হাছন থাকত, তাহলে কি লালন হাছন রবীন্দ্র নজরুলের উপরে উঠতেন? হয়তো উঠতেন, হয়তো উঠতেন না। তবে উঠতেন এই জন্যে যে এক সময় সুকান্তকে নিয়ে আমাদের বাম রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থক সংস্কৃতিক কর্মীরা অনেক বেশি চর্চা করতেন, অনেক বাড়াবাড়িও করতেন। শুনেছি, বাঙালি কবিদের মধ্যে সুকান্তের কবিতাই নাকি সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুদূতি হয়েছে। একসময় রবীন্দ্র, নজরুল আর সুকান্তকে পাশাপাশি রেখে সংস্কৃতির চর্চা চলত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের একাসন থেকে সুকান্ত উৎখাত হয়েছেন।

এটা ঘটেছে এই জন্যই যে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের তুলনায় সুকান্ত আসলে অনেক ছোট, তার সাহিত্য ভাণ্ডারের আয়তন নিতান্তই ক্ষুদ্র। হয়তো ২১ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ না করলে সুকান্ত নজরুল কিংবা রবীন্দ্রকে বা উভয়কেই ছাড়িয়েও যেতে পারতেন। কিন্তু সৃষ্টির ক্ষেত্রে যা হয়নি তা নিয়ে আফসোস করা চলে, পূজো করা চলে না। এখানে সম্ভাবনা নয়, প্রকৃত সৃষ্টিকেই স্রষ্টার বিশালত্বের প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাতে হয়।

যদিও লালনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইদানীং ভাল রকমের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু হাছনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ একেবারেই চোখে পড়ে না।। লালনের আখড়ায় সরকারি খরচে ভবন তৈরি করা হয়েছে। প্রতি বছর সেখানে বার্ষিক সমাবেশে সরকারি অনুষ্ঠান চলে। এখানে দেশ বিদেশ থেকে লালন ভক্তরা আসেন। তাদের পাশাপাশি আসেন আমাদের মতো নিছক লালনপ্রেমী কৌতূহলীরা। কিন্তু সুনামগঞ্জ বা সিলেটের কোথাও আমি হাছনের জন্য বিশেষ মেলা বা সম্মেলন দেখিনি। হয়তো লালনের চেয়ে হাছনের ভক্ত কম ছিল তাই। হাছনের বাড়িটি এখনও বেসরকারি সম্পত্তি। এখানে যে যাদুঘর বা হাছন চর্চা কেন্দ্র তৈরি হয়েছে তাও হাছন পরিবারের ব্যক্তিগত। অথচ সরকার চাইলে এটাকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র ও হাছন ভক্তদের বার্ষিক মিলন মেলায় পরিণত করতে পারত।

যাহোক, আমি বলছিলাম, লালন ও হাছনের আধুনিক যুগের প্রাসঙ্গিগতা নিয়ে। হাছন ও লালন উভয়েই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অনেকটা সমসাময়িক। আর লালন তো অনেকটাই রবীন্দ্রনাথের পূর্বসূরী। লালনের আখড়া থেকে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। রবীন্দ্রনাথের কোন লেখায় লালনের সাথে তার দেখা হবার বিষয়টি উল্লেখ নেই। তবে রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখায় বাউলের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই বাউল লালনই। একজন অখ্যাত কুলশীল বাউলকে রবীন্দ্রনাথের মতো একজন স্বনামধন্য কবি ও জমিদার যে অতি সহজেই তার পাশে স্থান দিবেন না, তা জোর করে না বললেও অনুমান করা সম্ভব। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ লান্ডনের এক সাহিত্য সভায় বাংলার মরমী সাহিত্য-সঙ্গীত চর্চার সুদিন উল্লেখ করতে উত্তর-পূর্ব বাংলার হাছনের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

সাহিত্যকর্মের প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্রে এর ভাষার আধুনিকতা অনেকাংশেই নির্ভর করে। পুঁথি সাহিত্য, মহাকাব্য ইত্যাদির সাথে উপন্যাস বা খণ্ড কবিতার মিল অমিলে ক্ষেত্রে ভাষার গঠন ও সমসাময়িকতা বিশষভাবে নির্ভরশীল। সাহিত্য ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে ভাষাকে আধুনিক করা যায়। আবার পুরাতন ভাষার পুনরুজ্জীবনও ঘটানো যায়। রবীন্দ্রনাথের ভানুসিংহের পদাবলী একে বারে মধ্যযুগীয় ভাষায় লেখা। তাই তার এই লেখা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ; রস আস্বাদনের জন্য নয়। রবীন্দ্রনাথ যদি ক্রমান্বয়ে মধ্যযুগীয় ভাষা থেকে আধুনিক ভাষায় প্রবেশ না করতেন, তাহলে হয়তো বর্তমানের বাঙালিদের কাছে রবীন্দ্রনাথও সেকেলে ঠেকতেন।

কিন্তু লালন তার ভাষার ক্ষেত্রে বরাবরই ছিলেন আধুনিক। আধুনিক এই অর্থে যে তার সব লেখাই চলিত বা কথ্য ভাষায় লেখা। সেই সময়ের কথ্য ভাষা বা চলিত ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনেকের কাছে বেমানান ঠেকতো। মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখতেন না। এই অবস্থা ইউরোপেও ছিল। ইউরোপে এক সময় লেখকরা চলতি ভাষা তো দূরের কথা, মাতৃভাষাতেও সাহিত্য লিখতে সংকোচবোধ করতেন। তাদের সাহিত্যের ভাষা ছিল ল্যাটিন । অনেক বিখ্যাত ইংরেজ লেখককেও ল্যাটিন ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে দেখা গেছে।

লালনের যুগে তাই চলতি ভাষা ছিল অশিক্ষিত, অমার্জিত, অসাংস্কৃতিক মানসিকতাসম্পন্ন মানুষদের ভাষা। পক্ষান্তরে সাধুভাষা ছিল শিক্ষিত ও অভিজাত সমাজের ভাষা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যে কোন বিচারে অভিজাত। তাই তার সাহিত্যের ভাষা ছিল মূলত সাধুভাষা। রবীন্দ্র সাহিত্যের ক্রম বিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মধ্যযুগীয় ভাষা থেকে তিনি ধীরে ধীরে সাধুভাষার স্তর পেরিয়ে চলতি ভাষায় প্রবেশ করেছেন। তার লেখনির প্রথম দিকে যেমন ছিল ভানুসিংহের পদাবলীর ব্রজবুলী ভাষা, তেমনি ছিল খাস সাধুভাষা, তারপর সাধু চলিতের মিশ্রণ এর পর শেষ দিকে নির্ভেজাল চলিতভাষা। তাই রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখাই এখন দুর্বোধ্য, অপাঠ্য ও অপ্রচলিত হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু লেখা অদূর ভবিষ্যতে অপ্রচলিত হবে। আর কিছু কিছু লেখা দূর অতীত পর্যন্ত আধুনিক থাকবে।

কিন্তু লালন আর হাছন আগাগোড়াই আধুনিক। এ ক্ষেত্রে অবশ্য হাছনের চেয়ে লালন অনেক বেশি এগিয়ে। কারণ লালন যে স্থানে জন্মেছিলেন, লালিত-পালিত হয়েছিলেন ও সাহিত্য চর্চা করেছিলেন, সেই নদিয়া অঞ্চলের বাংলা ভাষা গোটা বঙ্গদেশের ভাষার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রমিতরূপ পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার কথ্যবুলি সবচেয়ে বেশি প্রমিত ও গোটা বাংলার মানুষের কাছে শুধু সুবোধ্যইনয়, সুখবোধ্য। আর লালন তো তার গান লিখেছেন সেই নদিয়ার ভাষা বা প্রমিত ভাষাতেই।
index
কালক্রমে আমাদের সমাজের প্রচলিত ভাষা আমজনতা আর অভিজাত সমাজের অবস্থানকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে নিয়ে এসেছে। যে ভাষা আগে অশিক্ষিত গেঁয়োদের ভাষা ছিল, বর্তমানে তা হয়েছে অভিজাতদের ভাষা। আর অভিজাতদের ভাষা এখন হয় হারাতে বসেছে, নয়তো গাঁয়ে-গ্রামে তা অগণ্য মানুষের অপভ্রংশ হিসেবে টিকে আছে। তাই লালনের ভাষা এখন অভিজাতদের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। এর অর্থ হল, লালনের স্থান এখন অভিজাত সমাজে উঠে এসেছে। লালন এখন অভিজাতদেরই কবি, সাংস্কৃতিবানদের অনুকৃতি।

বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বাইরেও অনেক প্রাসঙ্গিক সাহিত্য প্রতিভা আমাদের রয়েছে। কারণ প্রকৃতিতে দিক যেমন শুধু দুইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, সাহিত্য ও সমাজের ক্ষেত্রেও আমরা শুধু রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। আমরা লালন-হাছনসহ অজস্র দিকপালকে নিয়ে বাঁচতে চাই, এগিয়ে যেতে চাই। আমরা সৃষ্টি করতে চাই হাজারো দিক; হাজারো রবীন্দ্রনাথ, হাজারো নজরুল এবং সেই সাথে হাসন-লালন-করিমদের আমরা হারাতে চাইনা।