ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশের দুর্নীতি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা ৷ আদিকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত পুলিশ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক মহল এ নিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়ে থাকেন ৷ ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকার যুক্ত রাষ্ট্রের ভ্রষ্ট নীতির মূল ক্ষেত্র ছিল পুলিশ বিভাগে নিয়োগ, পদোন্নতি, উত্‍কোচের ভাগাভাগি ইত্যাদি নিয়েই ৷ মূলত নষ্ট রাজনীতির পুরোধাগণ ক্ষমতায় গিয়ে তাদের দলের নষ্ট ছোকরাদের সরকারি চাকরি দিয়ে দুই পয়সা রোজগার করার সুযোগ করে দিত। এমন কথা ছড়িয়েছিল যে নষ্ট পোলাপানরা বিজয়ীদের কাছে পাত্তা পায় (to the victors go the spoils) । সরকারি চাকরির একটি বড় নিয়োগ হয় পুলিশে। অন্যদিকে পুলিশের চাকরি দিয়ে এই ভ্রষ্টদের যেমন সন্তুষ্ট করা যায়, তেমনি তাদের দিয়ে দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থও উদ্ধার করা যায়। এমতাস্থায়, রাজনীতির ভ্রষ্টতা পুলিশেই ছিল চরম। পুলিশকে নিয়ে যেমন রাজনীতিবিদগণ অর্থ কামাতেন, তেমনি পুলিশ সদস্যরাও সাধারণ মানুষকে জিম্মী করে ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাগণ তাদের অধঃস্তন অফিসারদের আনুগত্য আর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ রোজগার করত ৷

২০১৩ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক চালানো বিশ্বব্যাপী ১০৭ টি দেশের জনগণের উপর চালানো জরীপে দেখা যায় রাজনৈতিক দল ও পুলিশকে মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান বলে মনে করে ৷ একই প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে ৯৫টি দেশের জনগণ সবচেয়ে বেশি মানুষের অভিজ্ঞতা হয়েছে পুলিশকে ঘুষ দেওয়ার ক্ষেত্রে (৩১%)৷ এর পরের অবস্থানটি অবশ্য বিচার বিভাগের (২৪%) ৷ ঊনবিংশ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের গোড়ার দিকেও আমেরিকার পুলিশ বিভাগগুলো অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিভাগীয় দুর্নীতির কেন্দ্রমূলে অবস্থান করত ৷ নিউইয়র্ক সিটি পুলিশের পদোন্নতি উত্‍কোচের অংকের উপর নির্ভর করত ৷ একজন টহল অফিসার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩০০ ডলার, সার্জেন্ট পদের জন্য ১,৬০০ ডলার এবং একজন ক্যাপ্টেন পদের প্রার্থীকে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার দিয়ে পদোন্নতি কিনতে হত ৷ মজার বিষয় হল, সে সময় একজন ক্যাপ্টেনের বার্ষিক বেতন ছিল মাত্র ৩ হাজার ডলার৷ ঘুষ হিসেবে দেয়া এ বিপুল পরিমাণ অর্থ তারা পরে নিয়মিত বখরা ও ঘুষের মাধ্যমে পুষিয়ে নিত ৷

১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিন্স পুলিশের প্রায় ৪০ জন অফিসারকে ব্যাংক ডাকাতি, গাড়ি চুরি ও অন্যান্য অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছিল ৷ তাছাড়াও প্রায় ২০০ অফিসারকে তিরস্কার করা থেকে শুরু করে চাকুরিচ্যূতি বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মতো সাজা দেয়া হয়েছিল ৷

ইংল্যান্ডের লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশকে ফিরিস্তাতুল্য মনে করা হলেও তারাও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে নয় ৷ এমনকি রবার্ট পীলের সময়েও পুলিশে দুর্নীতির অসস্তিত্ব ছিল ৷ ১৮৭৮ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশে প্রথম তদন্তের জন্য সিআইডি গঠিত হয়েছিল ৷ এর পূর্বে একটি বিশেষ টিম দিয়ে ফৌজদারি মামলার তদন্তকার্য চালানো হত ৷ এ টিমের সদস্যরা খুব দ্রুতই রীতিমত দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল ৷ একটি ঘুষগ্রহণ ঘটনার মামলায় এ টিমের চারজন চিফ ইন্সপেক্টরের মধ্যে তিনজনই সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ৷ এর পর অনেক বছর গড়িয়ে গেছে ৷ তারপর ব্রিটিশ পুলিশের দুর্নীতি চলতেই থাকে ৷ যদিও এটা অন্যান্য দেশের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম, কিন্তু ফিরিস্তাতুল্য ব্রিটিশ ববিদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া মুখরোচক খবর বটে৷

পুলিশের অসদাচণ নিম্নতম পর্যায়ে আনার এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুর্নীতির খবর চাউর হতে থাকে ৷ অবৈধ জুয়ার আড্ডা থেকে তারা মাসিক তোলা তুলত ৷ পতিতালয়গুলো থেকে তারা ঘুষ গ্রহণ ও যৌনসেবা গ্রহণ করত ৷ গ্রেফতারের বিনিময়ে পুলিশ পারিতোষিকও পেত ৷ এমনও অভিযোগ ছিল যে চুরি সংঘটিত হলে তা থেকে পুলিশ অফিসারদের যে লাভ হতো চুরি প্রতিরোধ করলে তা হত না বলে তারা চুরির ঘটনা প্রতিরোধ করত না ৷

অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ সংগঠনগুলোতেও দুর্নীতির প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়৷ বিশেষ করে নিউ সাউথ ওয়েলস , ভিক্টোরিয়া ও কুইন্সল্যান্ড পুলিশে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ব্যাপক আলোচিত ছিল ৷ বেশ কিছু সরকারি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে এসব পুলিশ সংগঠনে সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে৷ ১৯৮৯ সালে কুইন্সল্যান্ড ও ১৯৯৭ সালে নিউ সাউথ ওয়েল্স পুলিশের উপর দুইটি কমিশন পুলিশের দুর্নীতিকে আরো বেশি সামনে নিয়ে এসেছিল ৷

নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের উপর বিচারপতি জেমস রোনাল্ড উডের নেতৃত্বে গঠিত রয়েল কমিশন দুই বছরের অনুসন্ধানে জানতে পারেন যে এ পুলিশ সংগঠনে পদ্ধতিগতভাবে দুর্নীতি চলে ৷ তারা ঘুষ, মূদ্রা ধোলাই, মাদক পাচার, সাক্ষ্য বিকৃত বা নষ্টকরণ, প্রতারণা ও মারাত্মক ধরনের আহত করণের মতো দুর্নীতি ও অসদাচরণের শত শত ঘটনা সাক্ষ্য প্রমাণসহ উদ্ঘাটন করেন ৷ এ সব ক্ষেত্রে উত্তোলিত ঘুষ একজন সার্জেন্ট পদমর্যাদার অফিসার সাপ্তাহিক ভিত্তিতে উত্তোলন করে তা অন্যান্য অফিসারদের মধ্যে ভাগ করে দিত ৷ বিষয়টি নিউ সাউথ ওলেস পুলিশে আলোচনার বস্তুতেও পরিণত হয়েছিল ৷ অন্যদিকে একই প্রকারের প্রতিবেদন দিয়েছিল কুইন্সল্যান্ড পুলিশের উপর গঠিত ফিটজেরাল্ড কমিশন৷ কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কুইন্সল্যান্ড পুলিশের সাবেক কমিশনারকে দুর্নীতি মামলায় সাজাও দেয়া হয়েছিল ৷

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশগুলোতে দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁচেছে ৷ টিআই এর প্রতিবেদনে প্রতিবছরই পুলিশ জনউপলব্ধিতে দুর্নীতির সূচকে প্রথম না হলেও প্রথম দশের মধ্যে অবস্থান করে ৷ তবে পুলিশের দুর্নীতি সমাজের কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়৷ যে সমাজে দুর্নীতির প্রকোপ রয়েছে সে সমাজে পুলিশও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হবে এটাই স্বাভাবিক ৷কিন্তু বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অনেকেই অন্যান্য সরকারি বিভাগগুলোর মতো পুলিশের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণেও সাফল্য দেখিয়েছে ৷ কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো দুর্নীতির সমস্যা নিয়ে এখনো হাবুডুবু খাচেছ৷ হাবুডুবু খাচিছ আমরাও।

রচনাসূত্রঃ

– http://www.wingia.com/web/files/news/61/file/61.pdf
– Forces of Deviance – Understanding the Dark Side of Policing Second Edition by Victor D. Kappeler,et al; Waveland Press, Inc
– Criminal Investigation (seventh edition) by Charles R. Swanson et al. McGrw-Hill; ISBN: 0-07-228594-X
– Forces of Deviance – Understanding the Dark Side of Policing Second Edition by Victor D. Kappeler,et al; Waveland Press, Inc
– http://tvernedra.ru/Pretotvkorvpolice.pdf as on 18/01/2014 at 14:00
– http://en.wikipedia.org/wiki/Royal_Commission_into_the_New_South_Wales_Police_Service, as on 18/01/2014 at 14:00
– https://www.cmc.qld.gov.au/about-the-cmc/the-fitzgerald-inquiry, as on 18/01/2014 at 14:00