ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সব সময় সুবিধাপ্রাপ্তদের সুবিধা দিয়ে থাকে। বিচার ব্যবস্থায় আইন তৈরি করে সুবিধাপ্রাপ্তগণ। সেই আইন কখনোই সুবিধাপ্রাপ্তদের বিপক্ষে যায় না। রাজার তৈরি আইন রাজার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার নজির সীমীত। কোন আইন যদি রাজার বিরুদ্ধে যায়, তার ব্যাখ্যা অবশ্যই রাজার পক্ষে যায়। সৃষ্টির আদিকাল থেকে এটা চলে আসছে। ‘জোর যার মূল্লুক তার’, কিংবা ‘যোগ্যতরের বেঁচে থাকার’ মতো তত্ত্বগুলো আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

একথা সঠিক যে পুলিশ সৃষ্টির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতাসীনদের গদি রক্ষার নিমিত্তেই। এই গদি রক্ষার লড়াই বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ শত্রু। এই রাজপুরুষদের রক্ষার কাল ছিল শান্তির সময়। যুদ্ধের সময় রাজা ও তার রাজ্য রক্ষার জন্য নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে শান্তিকালীন সময় রাজা ও তার রাজ্যকে রক্ষার জন্য সৈন্যদের ব্যবহার যেমন নিরাপদ ছিল না, তেমনি লাভজনকও ছিলনা। যুদ্ধের বাইরে শান্তিকালীন সময়ে সৈন্যরা প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকবে। নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল ও যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারে তারা তৈরি হবে যেন যুদ্ধের সময় সেই সব কৌশল ও অস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। এখন শান্তিকালীন যদি সৈন্যদের রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তথা রাজা ব সম্রাটের গদি রক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে সৈন্যদের প্রকৃত যুদ্ধের সময় কর্মদক্ষতা কাঙ্খিত মানের হবে না। অন্যদিকে শান্তিকালীন সৈন্যবাহিনী শহরে মোতায়েন থাকলে তা মানুষের মনে এমন একটি ভাবের সৃষ্টি করে যে হয়তো তারা নিরন্তর যুদ্ধের মধ্যেই রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই মূলত রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজারের সময় পুলিশ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। অগাস্টাস সিজারের পুলিশ বাহিনীর নাম ছিল প্রিটোরিয়ান গার্ড। এদের নয়টি এককে (কোহর্ট) বিভক্ত করা হয়েছিল। প্রথম এককটি থাকত রাজধানীতে এবং তাদের কাজই ছিল সম্রাটকে রক্ষা কর। আর রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলার উন্নতী ছিল এই প্রিটোরিয়ান গার্ডের উপস্থিতির সহজাত বা বাই প্রোডাক্ট(১)।

কিন্তু কালের পরিক্রমায় পুলিশ সংগঠন শুধু ক্ষমতাসীনদের গদি রক্ষার কাজেই ব্যস্ত থাকেনি। রাষ্ট্রের চরিত্রের সাথে সাথে পুলিশের চরিত্রও পাল্টিয়েছে। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্তর পার হয়ে বিশ্ব এখন কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এক নায়কতন্ত্র পরিত্যাগ করে শাসন ব্যবস্থা এখন গণতান্ত্রিক হয়েছে। রাষ্ট্র এখন জনগণের অর্থে জনগণের কল্যাণ করে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণকে শাসন করে। শাসন শব্দটিও বর্তমানে বেমানান হয়ে পড়েছে। সরকার আসলে এখন রাষ্ট্রের বিষয় সকল সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি ও আইন-বিধির অনুশাসনে ব্যবস্থাপনা করে। একটি বহু জাতিক কর্পোরেট কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা বোর্ডের মতোই কোন রাষ্ট্রের সরকারও তার রাষ্ট্ররূপী কোম্পানীকে পরিচালনা করে। তবে কোম্পানির উদ্দেশ্য থাকে আর্থিক বা বৈষয়িক লাভ, কিন্তু সরকারের উদ্দেশ্য থাকে জনগণের কল্যাণ।

পুলিশ সংগঠন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করে, জনগণের নিরাপত্তা বিধান করে, জনশৃঙ্খলা রক্ষা করে আর রোমান সম্রাটের প্রিটোরিয়ান ফোর্সের মতো সরকারকেও রক্ষা করে। তবে বর্তমান পুলিশ সংগঠনের সরকার রক্ষার কাজটি অনেকটাই গৌণ। কারণ, এখানে সরকার জনগণের। তাই তাকে রক্ষা করা বা ক্ষমতাচ্যূত করার একমাত্র মালিক জনগণ যারা নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করে বা পূর্ববর্তী সরকারকে পূনঃপ্রতিষ্ঠিত।

পুলিশ আধুনিক রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রবেশ দ্বার। গোটা ফৌজদারি যন্ত্র সাধারণভাবে সচল হয় পুলিশ দ্বারাই। এই সচল করা কাজের একটি হচ্ছে গ্রেফতার, উদ্ধার, মামলা দায়ের, তদন্ত, প্রতিবেদন তৈরি ও আদালতে উপস্থাপন ইত্যাদি। পুলিশের ফৌজদারি কর্মের একটি সুবৃহৎ ও বিশেষজ্ঞ কর্ম হল মামলার তদন্ত করা। যদিও পুলিশের তদন্ত ছাড়াই আদালত কোন অপরাধ আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রসেস জারি করতে পারে এবং তা করেও। কিন্তু সাধারণভাবে পুলিশের তদন্তের উপরই আদালতকে নির্ভর করতে হয়।

থানা পর্যায়ে মামলা তদন্ত করে সাধারণভাবে পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর ও ইন্সপেক্টরগণ। ইন্সপেক্টর থেকে তদোর্ধ্ব কর্মকর্তারা সাধারণত মামলার তদন্ত তদারকের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তদন্ত তদারক হল, প্রাথমিক পর্যায়ে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা ও আদেশ উপদেশ দেওয়া এবং তদন্ত কার্য পূর্বে শুরু হয়ে থাকলে চলমান তদন্তের ত্রুটি-বিচ্যূতি শনাক্ত করে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সেই সব ত্রুটি-বিচ্যূতি দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে তদন্তকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। তদন্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই তদন্তের তদারকও হবে নিরবিচ্ছিন্ন।

থানা পর্যায়ে যে সব মামলা হয়, সেগুলোকে প্রাথমিকভাবে দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়- সাধারণ মামলা ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা। তৃতীয় একটি শ্রেণি রয়েছে যাকে বলা হয় ‘বিশেষ প্রতিবেদন বা ‘স্পেশাল রিপোর্ট কেইস’ বা এসআর মামলা। এসআর মামলা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলারই একটি বিশেষ শ্রেণি। সাধারণত, ডাকাতি, বড় ধরণের খুন, গণধর্ষণ, বড় ধরণের অস্ত্রের চোরাচালান, পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র খোয়া যাওয়া, রাজনৈতিক খুন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি অপরাধে রুজুকৃত মামলাগুলোকে এসআর মামলা হিসেবে ধরা হয়। তবে পুলিশ সুপার যে কোন মামলাকে এসআর হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন। এসআর মামলার তদন্ত তদারককারী অফিসার স্বয়ং পুলিশ সুপার। এসআর মামলাগুলোকে আবার সিআইডি থেকেও পরিবীক্ষণ করা হয়।

এসআর মামলা ছাড়াও বেশ কিছু আইনের অধীন রুজুকৃত মামলাগুলো বিশেষভাবে বিবেচিত হয় ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বা পুলিশ সুপার কর্তৃক তদন্ত তদারক করা হয়। এই সব ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, এসিড অপরাধ দমন আইন, দ্রুত বিচার আইন ইত্যাদি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্ত তদারকের বাইরেও এ সবের তদন্ত তদারকের জন্য জেলা, রেঞ্জ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত মনিটরিং কমিটি থাকে। তাই এই সব মামলার বাদী, ভিকটিম, সাক্ষী, ঘটনাস্থল এমনকি আসামীদের সম্পর্কে তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য থাকে। তারা একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিবদর্শন করেন, সাক্ষী, বাদীদের সাথে কথা বলেন, তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন এবং আসামী গ্রেফতারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনায় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তাগিদ দেন ও সহায়তা করেন।

কিন্তু পুলিশ ইউনিট তথা থানায় এই জাতীয় মামলার সংখ্যা খুবই নগণ্য। বাংলাদেশে ২০০২ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১১ বছরের গড় হিসেবে প্রতিবছর সারা দেশে গড়ে ১,৪৬,৭৬৮ টি মামলা রুজু হয়।এই সব মামলার মধ্যে খুন গড়ে ৩,৮৯৮ ডাকাতি গড়ে ৮১৬, দস্যুতা গড়ে ১,১৬২, চুরি ৯,১৭১, সিঁধেল চুরি- ৩,৫৫১ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা গড়ে হয় ১৬,৪৭৮টি। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি ওয়েব সাইটে প্রদত্ত ১৪ টি হেডের মামলার বাইরে অন্যান্য মামলাগুলোকে বলা হয় আদার হেড বা অন্যান্য ধারায় মামলা। এইসব মামলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে গুরুত্বের দিক দিয়ে নগণ্যই থেকে যায়। কিন্তু সমাজের সব স্থানেই নগণ্যরাই অগণ্য হয়। আর গণ্য বিষয়টি হয় সীমীত। মোট মামলার বিপরীতে উদ্ধারজনিত মামলা ছাড়াও অন্যান্য হেডের মামলার সংখ্যা গড়ে প্রতিবছর হল ৮০,৭৫৬ টি। এই সংখ্যা মোট গড় মামলার সংখ্যার ৫৫%। উ-উদ্ধার জনিত অন্যান্য ধারার মামলা হিসেবে নিলে এই হার হবে ৭৪%। -এমতাবস্থায়, ঊর্ধ্বতন অফিসারদের তদারকের বাইরে রয়ে যায় হাজার হাজার মামলা বা অপরাধের তদন্তযজ্ঞ(২)।

একটি খুন, দাঙ্গাসহ খুন, ডাকাতি, খুনসহ ডাকাতি কিংবা রাজনৈতিক হত্যাকা- সংঘটিত হলে সারা দেশে হৈচৈ পড়ে যায়।পুলিশের নিম্নতম থেকে ঊর্ধ্বতন অফিসারগণ বিশেষভাবে তৎপর হয়ে ওঠেন। মামলা রুজু থেকে শুরু করে, আসামী গ্রেফতার, তদন্ত তল্লাসী সব স্থানেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থাকে বিশেষ নজর ও বিশেষ তদারক। কিন্তু নগণ্য গুরুত্বের অগণ্য মামলাগুলোর খবর রাখে কে?

থানায় প্রতিনিয়ত ছোটখাট মারামারি, চুরি, আত্মসাৎ অনধিকার প্রবেশ, অপরাধ জনক ক্ষতি ইত্যাদি অপরাধে শতশত মামলা রুজু হয়। কোন কৃষকের হালের গরু চুরি, একজন রিকসা চালকের রিকসা চুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবী, ঘাটের মাঝির কাছ থেকে বখরা দাবী ইত্যাদি অনেক অভিযোগে মামলা হয়। কিন্তু এই সব মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা তো দূরের কথা সিনিয়র পুলিশ অফিসারগণ এইসব মামলার রেকর্ডপত্রও মনোযোগ সহকারে পড়েন না। এই সব মামলার এক বড় অংশ অর্ধসত্য বা ডাহা মিথ্যাও হয়ে থাকে। সত্য মামলার ঘটনাস’ল পরিদর্শনের চেয়ে মিথ্যা মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা আরো বেশি জরুরী। কেননা, থানায় দায়ের করা মামলার অভিযোগ যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চিন্তা করেন, তাহলে বাদীর বিচার পাওয়ার পথকে থানায় রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। আবার যদি এই মামলায় অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়, তাহলে নিরপরাধ নাগরিকদের বহু মাত্রার হয়রানির পথটি থানাতেই খুলে দেওয়া হয়। তাই বাদীকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করার সম্ভাবনা কিংবা নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার দ্বার উন্মোচন করার পথ তৈরি– উভয় ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সুবিবেনাপ্রসূত তদন্ত তদারক একান্ত প্রয়োজন।

থানায় রুজুকৃত সব মামলার নিবিড় তদন্ত তদারক করার প্রাথমিক দায়িত্ব সার্কেল এএসপির। তিনি সব ঘটনাস’ল পরিবদর্শন করবেন তাও নয়, তবে মামলার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তার সম্মক ধারণা থাকতে হবে। আমি অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের ব্যাপারে সিনিয়র অফিসারগণ যেমন উৎসাহী নন, তেমনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করাতে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারও উৎসাহী নন। এই ক্ষেত্রে কয়েকটি অপ্রিয় বিষয় জড়িত থাকে। ছোটখাট মামলার তদন্তকাজে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা না থাকার ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তাগণই হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। তারা এই মামলাগুলোর বাদী-আসামী উভয়েরই বাঁচা-মরার মালিক হয়ে ওঠেন। বাদীর কাছ থেকে অভিযোগপত্র দাখিল ও আসামীর কাছ থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল কিংবা অন্তত পক্ষে কতিপয় আসামীকে বাদ দেওয়ার জন্য সহজেই অসৎ তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ বায়নাপত্র করতে পারেন। কিন্তু একজন সৎ, অভিজ্ঞ ও পেশাদার সিনিয়র অফিসার সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে অসৎ তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সেই জারিজুরি ধরা পড়ে যায়।

অন্যদিকে, সিনিয়র অফিসারও যদি অসৎ হয়, তদন্তকারী কর্মকর্তার লাভের উপর আবার তিনিও উচ্চহারে কর বসাতে পারেন। সৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলে অসৎ তদন্তকারী কর্মকর্তার পুরো বায়নার উপার্জনই মাটি হয়ে যেতে পারে আর অসৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলে লাভের অংক কমে যেতে পারে— এই উভয়বিদ বিবেচনায় অসৎ তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ মনেপ্রাণে সিনিয়র অফিসারদেরকে ছোটখাট মামলাগুলোর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে নিরুৎসাহিত করেন।

কিন্তু আমি মনে করি, ছোট ছোট মামলার বাদী আসামী উভয়েই ছোট ছোট লোক হয়ে থাকে। এদের না আছে জনবল, না আছে অর্থবল। সঠিক মামলা হলে বাদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর মিথ্যা মামলা হলে আসামী পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কালক্রমে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, উভযপক্ষই অবৈধ লোকসানের মধ্যে পড়ে। একজন দিন মজুরের জন্য হাজার টাকার অবৈধ লোকসান সামষ্টিক বিচারে অল্প। কিন্তু ব্যাষ্টিক বিচারে একজন দিনমজুরের জন্য তা অনেক বড় ক্ষতি। একজন কৃষকের একটি হালের গরু হারিয়ে গেলে তার পুরো আবাদ মাটি হয়ে যায়। কিন্তু এই হালের গরু হারানোর জন্য মামলা করতে, মামলার তদন্ত কররতে কিংবা হারানো গরু উদ্ধারের আশায় যদি পুলিশকে বিভিন্ন পর্যায়ে উৎকোচ দিতে হয়, তাহলে তার পথে বসা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। এক জন সিনিয়র অফিসার যদি এই সব ছোট ছোট বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তাহলে ছোট ছোট মানুষগুলোর যে ছোট ছোট উপকার হয়, তা বড় বড় মানুষের বড় বড় উপকারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান, অনেক বেশি উপকারের।

মামলার তদন্ত তদারকের ক্ষেত্রে পিআরবি যে সব নির্দেশনা দিয়েছে তার মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তগণ সততার সহিত তদন্ত করছেন কিনা এবং তারা সাধারণ মানুষ তা বাদী হোক, আর বিবাদীই হোক বা সাক্ষীর তালিকায় সাধারণ মানুষ হোক, তাদের সাথে ভাল ও ভদ্রোচিত ব্যবহার করছেন কিনা তার তদারক করাও বোঝায়। সুপারভাইজিং অফিসারগণ যদি ছোটখাট মামলাগুলোর ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেন, বাদী-সাক্ষীদের পরীক্ষা করেন, তাহলে এই বিষয়টিও নিশ্চিত করা যায়।

এটা ঠিক যে সব ধরণের মামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন বা বাদী-সাক্ষীদের পরীক্ষা করা শুরু করলে সিনিয়র অফিসারদের কাজের ভার অনেকটাই বেড়ে যাবে। কিন্তু একটু সচেতনভাবে সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে সহজেই সম্পূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত না হলেও লক্ষ্যের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। আমি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালীন একটি বিশেষ উপায় অবলম্বন করতাম। কোন মামলার ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই আমি ঘটনাস’লের পথে ও আসে পাশের সব রুজুকৃত মামলার খোঁজ খবর নিতাম। যাতায়াতের পথে যে সব মামলার ঘটনাস্থল পড়ে বা গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঘটনাস্থলের আসেপাশে যত অগুরুত্বপূর্ণ মামলা পড়ে সবগুলো সম্পর্কেই খোঁজখবর নিয়ে আসতাম। অনেক সময় ঘটনাস্থলে যেতে না পারলেও বাদী-সাক্ষীদের পথের কোন একস্থানে ডেকে এনে পরীক্ষা করতাম। অনেক সময় ঘটনাস্থলের কাছে বা আসেপাশে কোন গ্রেফতারী পরোয়ানাভূক্ত আসামী আছে কিনা এবং সেই আসামীর খোঁজে সম্ভাব্য লুকিয়ে থাকার স্থানে পুলিশ হানা দিয়েছে কিনা তাও যাচাই করতাম। এক কথায় আমার মফসালের সফরগুলোকে আমি প্রায়শই একটি সমন্বিত সফরে পরিণত করতাম।

বর্তমানে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে সিনিয়র অফিসারের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বড় বড় জেলাগুলোতে একাধিক অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এমতাবস্থায়, আগের চেয়ে মাঠ পর্যায়ে পুলিশি কাজের তদারক আরো বেশি নিবিড় হওয়া বাঞ্ছনীয়। জেলা বা মেট্রোপলিটনের ইউনিট প্রধানগণ যদি তাদের অধীনস্ত সিনিয়র অফিসারদের সঠিকভাবে কাজে লাগান, তাহলে এই ছোট ছোট মানুষগুলোর ছোট ছোট মামলায় ছোট ছোট ভোগান্তীগুলো দূর হবে বলেই আমার বিশ্বাস।November 25, 2013

পাদটীকা:

১.

There prime funtion was to be the impreial guard, to escort and protect Augustus. As the only troopps in Rome—- indeed, the only force in Italy—there mere presence would also help to keep law and order, and they could be used, if necesarry to enforce the peace.(Pioneers in Policing, page-12 McGrow-Hill- 1977)

২. http://www.police.gov.bd/Crime-Statistics-comparative.php?id=208 ২৬ নভেম্বর, ২০১৩;১২:১৬ঘটিকা