ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

প্রতিবারই ঈদের ছুটিতে কমপক্ষে একটি করে ভিন্নধর্মী বই পড়ার চেষ্টা করি। এবারের ঈদের ছুটি ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। ১২ অক্টোবর ২০১৩ রাতে বাসে উঠে ১৩ অক্টোবর রংপুরে পৌঁছি। আর ১৮ অক্টোবর রাতে বাসে চড়ে ১৯ অক্টোবর ঢাকায় পৌঁছি। এই পাঁচ দিনের মধ্যে ঈদ পার্বণে আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব সৎকারের বাইরেও ‘মিশ্র কথন’ নামের একটি বই পড়ে শেষ করেছি। বইটির লেখক মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, বীর প্রতীক। মোট ৪৯৫ পৃষ্ঠার বৃহৎ কলেবরের বইটির প্রকাশকাল ২০১১ সাল এবং প্রকাশক হল ‘অনন্যা’ প্রকাশনী ৩৮/২ বাংলাবাজার, ঢাকা।

বইটি কিনেছিলাম কয়েক মাস আগে। কিন্তু সময়ের অভাবে পড়তে পারিনি। এবার ঈদের ছুটিতে বইটি পড়ে শেষ করলাম। ‘মিশ্র কথন’ বইটি সম্পর্কে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আলমগীর। কারণ হল, এই বইটির ২০ নং পৃষ্ঠার দ্বিতীয় প্যারাতে লেখক আলমগীর ও তার কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আলমগীর বহুবার আমাকে বইটি পড়তে বলেছেন। এ জন্য তার খরচে বইটির একটি কপি কিনে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও তিনি করেছিলেন। কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি। কেননা, আমার জানা পুলিশ ইন্সপেক্টরদের মধ্যে যারা থানায় অফিসার-ইন-চার্জের দায়িত্ব পালন করেন তাদের মধ্যে আলমগীর অন্যতম সৎ পুলিশ ইন্সপেক্টর।

কয়েক মাস আগে পুরাতন বিমান বন্দর তেজগাঁয় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কমিশনের পাশে ‘বুক ওয়ার্ম’ নামে বইয়ের দোকান থেকে বইটি ৩০০ টাকায় কিনেছিলাম। বইটিতে ২০ পৃষ্ঠায় আলমগীর সম্পর্কে লিখা হয়েছেঃ

” হাটহাজারী থানার সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), জনাব আলমগীর এ বিষয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও পরিশ্রমী ভূমিকা পালন করেন। আলমগীর পরিশ্রম ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনকারী একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। আলমগীরের দাওয়াতে আমি ৮ই ফেব্রুয়ারী ২০০৮ তারিখে অনুষ্ঠিত বুড়িশ্চর ইউনিয়নের কমিউনিটি পুলিশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাই এবং এক মাস পর ৮ই মার্চ ২০০৮ তারিখ দিনগত রাত্রি এগারটা থেকে ভোর রাত্র চারটা পর্যন্ত সময় আলমগীরসহ হেঁটে হেঁটে সমগ্র ইউনিয়নের কমিউনিটি পুলিশের কর্তব্য সম্পাদন পর্যবেক্ষন করি”।

মোহাম্দ আলমগীরের সাথে আমার চাকরি করার সুযোগ হয়েছিল ২০০৯-১০ সালে নোয়াখালীতে। সেই সময় আমি ছিলাম নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, আলমগীর ছিলেন অফিসার-ইন-চার্জ সেনবাগ থানা। সেনবাগ থানায় তিনি এমনসব কার্যক্রম করেছিলেন যা যে কোন ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারকে খুশি করতে বাধ্য।

নোয়াখালী জেলায় যোগদানের পর আমি স্বভাবসিদ্ধ কায়দায় কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারে লেগে যাই। আমার এসপি ছিলেন প্রথম দিকে জনাব লুৎফুল করীর। তার অধীনে আমি তিন মাসেরও কম সময় কাজ করেছি। তবে আলমগীর সম্পর্কে তিনি বলতেন, এই লোকটির একটি বিপিএম (সেবা) পদক পাওয়া দরকার। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ভাই, তার জন্য একটি প্রস্তাব পাঠিও। কিন্তু আমি পারিনি।

এরপর আমার পুলিশ সুপার ছিলেন, জনাব হারুন-উর-রশীদ হাযারী। তার অধীনে আমি প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করি। তিনি আমাকে কর্মে প্রভূত স্বাধীনতা দিতেন। আমার কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে তিনি যথেষ্ঠ উৎসাহ দিতেন। এই সময় আমি আমার কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ে প্রথম বইটি বাজারে নিয়ে আসি। স্যার আমার বইটি বিক্রয়ের ব্যাপারে বেশ সহযোগিতা করেছেন।

যাএহাক, আলমগীরের কথায় আসি।আলমগীর কোন থানায় যোগ দেওয়ার পরপরই থানা এলাকায বসবাসকারী সকল গণ্যমান্য ব্যক্তি যেমন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, রাজনৈতিক দলের নেতা, মসজিদের ইমাম, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি প্রমূখের কাছে চিলি লিখেন। চিঠিতে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে থানা এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সবার সহযোগিতা কামনা করতেন। তিনি চিঠিতে অবৈধ মাদক দ্রব্য, জুয়াসহ অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এক প্রকার জিহাদ ঘোষণা করতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি জুয়ার বোর্ড থেকে ক্যারোম বোর্ড পর্যন্ত জব্দ করা শুরু করতেন। এই সবই হল সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বিষয়। তাই প্রত্যেকেই আলমগীরের কাজের প্রশংসা করত।

আলমগীরের জনসম্পৃক্তার ক্ষমতা প্রশংসনীয়। হাটে-বাজারে, রাস্তার মোড়ে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব স্থানেই তিনি গণসংযোগ করতেন। দিনের বেলায় তিনি সারা থানা চষে বেড়ান। কোন থানায় যোগদান করার অল্প দিনের মধ্যেই তাই আলমগীর জনগণের কাছে ব্যাপক পরিচিত হয়ে ওঠেন।

থানায় নিয়মিত মামলা রুজু না করেই বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে মানুষকে সেবা দেওয়া আলমগীরের একটি বড় গুণ। তিনি মানুষের পাওনা টাকা আদায় করে দেওয়া থেকে শুরু করে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা জমাজমি সংক্রান্ত বিরোধেরও মীমাংসা করে দিতেন। তাই তার থানা এলাকায় ফৌজদারি মামলা রুজুর হার বেশ কম হয়।

আলমগীরের অফিসে/ কিংবা গোল ঘরে যেখানে তিনি বিরোধ মীমাংসার কাজ করেন সেখানে প্রবেশ পথে একটি বিশেষ সতর্কতা বাণী সেঁটে দেওয়া থাকে. ‘আপনি কি ঘুস খেয়ে বিরোধ মীমাংসার জন্য এখানে এসেছেন? তাহলে আপনার এখানে প্রয়োজন নেই’।- তার বিরোধ মীমাংসার সাফল্য ছিল ঈর্ষনীয়। থানা এলাকার টাউট রাজনীতিবিদ, গ্রামের ধাউড় মাতব্বর কিংবা দুই পয়সা কামানো জনপ্রতিনিধিগণ আলমগীরের মীমাংসা কর্মে ঈর্ষান্বিত ছিল। তবে ভাল মানুষ ও সাধারণ মানুষগণ ছিল বেশ খুশি।

এমনও ঘটনা ঘটেছে যে আদম ব্যাপারী কর্তৃক সাধারণ মানুষের মেরে দেওয়া টাকা উদ্ধারের জন্য তিনি আদম ব্যবসায়ীকে কয়েক দিন থানায় আটক করে রেখেছেন। তবে উপরওয়ালাদের কানে বিষয়টি দিয়েই তা করেছেন। এটা ছিল আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। কিন্তু আইনে সমর্থন না থাকলে এই কাজ ছিল জনস্বার্থের পক্ষে। তাই আমি বলব, আলমগীর আইন মেনে কাজ না করলেও ভাল কাজ করেন। কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বলে, শুধু আইনকে রক্ষা করার দিকে বেশি নজর দিলে ভাল কাজ নাও হতে পারে। সনাতনী পুলিশিং বলে আইন মেনে কাজ কর; কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং বলে ভাল কাজ কর, জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ কর। যে কাজ জনগণের বা পুলিশি সেবা প্রার্থীদের মঙ্গল করে না, তা যতই আইনী কাজ হোক, ভাল কাজ হেত পারে না। আইনকে আনত করে পুলিশ যদি ভাল কাজ করে তবে তা সমর্থনীয়। আলমগীর অহরহ তাই করতেন।

আলমগীর সেনবাগ উপজেলা পরিষদের এক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের ৩০ বছরের একটি জমিজমা সংক্রান্ত পারিবারিক সমস্যার সমাধান করে দেন। এই সমাধান এতই ন্যায়ানুগ হয়েছিল এবং উভয় পক্ষ এতটাই খুশি হয়েছিল যে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আলমগীরে পা ছুঁয়ে সালাম করেছিলেন। আলমগীরের বিরোধ মীমাংসায় টাউট বাটপাড়ি করতে না পেরে একদল আওয়ামী নেতা-কর্মী আলমগীরকে সেনবাগ থানা থেকে সরানোর লক্ষ্যে ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে তদবির করাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই সংবাদ জানতে পেরে থানার আওয়ামী নেতৃত্বের ভাল মানুষের অংশটি ঢাকায় তড়িঘড়ি করে ছুটে গিয়েছিল পাল্টা তদবির করার জন্য যাতে আলমগীরকে সেনবাগ থানা থেকে সরানো না হয়। এই রূপকথার গল্পটি আমি জেনেছিলাম নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি প্রফেসার হানিফের মুখ থেকে।

মাদক ব্যাবসায়ীদের জীবনকে অতিষ্ট করে তোলা আলমগীরের একটি সাধারণ মাদক নির্মূল কৌশল। সেনবাগ থানার কয়েকটি স্থানে মাদক বিক্রয় হতো। আলমগীর প্রায় সবগুলো স্থানেই নিয়মিত হানা দিতেন, মাদক ব্যবসায়ীদের আইনগতভাবে তো বটেই, এমনকি আইনে অসমর্থিত উপায়েও জব্দ করতেন।

একবার এক মাদক ব্যবসায়ীর বাসা থেকে অনেক দূরে এক ধান ক্ষেতের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় ২০/২৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। কিন্তু আলমগীর চাইলেন পরিচিত এই মাদক ব্যবসায়ীকে হেনস্তা করতে। তিনি এই পরিত্যক্ত ফেনসিডিলকে সেই পরিচিত মাদক ব্যবসায়ীর সাথে একটা যেগসূত্র স্থাপন করে একটা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে দিলেন। তিনি জানতেন যে, এই মামলা শেষ পর্যন্ত টিকবে না। কিন্তু এই মামলায় অন্তত কিছুদিন একজন মাদক ব্যবসায়ী হাজতখানায় থাকবেন। বিষয়টির সূচনা কালে তিনি অবশ্য আমাকে জানিয়ে রেখেছিলেন এবং আমি বিষয়টিকে ‘করাপশন ফর নোবেল কজ মানে ‘সৎ উদ্দেশ্যো অসৎ কাজ’ মনে করে সায় দিয়েছিলাম। মাদক উপদ্রুত এলাকায় আলমগীর অবৈধ মাদক ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে প্রচুর সময় ব্যয় করতেন। হাটে বাজারে তিনি মানুষকে নিয়ে মাদক বিরোধী মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করতেন।

সাতার পাইয়া নামের একটি বাজারে তিনজন মুদির দোকানী ব্যাবসার অন্তরালে মূলত মাদক ব্যবসা করতো। ঘটনাটি জনসাধারণের অনেকই জানত। তাদের মাদক ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়ে আলমগীর একদিন তিনটি দোকানই বন্ধ করে দেন। এক দিকে মাদক ব্যবসা বন্ধ, অন্যদিকে মুদির দোকানও বন্ধ। এই সৌখিন মাদক ব্যবসায়ীগণের না খেয়ে থাকার অবস্থা হল। তারা একদিন ওসির কাছে এসে আত্ম সমর্পণ করল। আলমগীর এই তিন মাদক ব্যবসায়ীকে ধর্মীয় হেদায়েত দেওয়ার জন্য তার থানার মসজিতে ৪০ দিনের ‘দীনি কাজে’ নিয়োগ করলেন। তারা ওসির মেস থেকে খাবার খেলেন, মসজিতে ঘুমালেন। অবশেষে ৪০ দিন শেষ হলে উপজেলা মিলনায়তনে একটি সূধী সমাবেশে এই সব মাদক ব্যবসায়ী তওবা করলেন। ভবিষ্যতে আর অবৈধ কাজে নিয়োজিত না হয়ে তারা সৎ জীবন যাপন করবেন বলে ৫০০ শতাধিক ব্যক্তির সামনে ওয়াদা করেন। আমি নিজেও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।

কোন পুলিশ অফিসার তার অধীক্ষেত্রে বসবাসকারী মানুষের প্রাত্যহিক উদ্বেগগুলো দূর করার জন্য কাজ করলে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এলাকায় মদ, জুয়া, তাস খেলা বখাটেপনা ইত্যাদি দূর হলে পুলিশ অফিসারের সুনাম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আলমগীর ঠিক এই কাজটিই করতেন। আলমগীরের সুনাম এতটাই ছিল যে যারা তাকে কোন দিন দেখেননি কিংবা তার এলাকায় বসবাসও করেন না তারাও তার সুনাম শুরু করে।

আমি একটি চোরের চোখ উঠিয়ে নেয়া মামলার তদন্ত তদারকির জন্য একটি দূরবর্তী গ্রামে যাই। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্থানীয় লোক জনের সাথে মতবিনিময়কালীন একজন ব্যক্তি সেনবাগ থানার ওসির প্রশংসা করছিলেন। আমি তাকে বললাম, আপনি ওসিকে দেখেছেন? তাকে কি চিনেন? তিনি বললেন, না। অথচ ওসি আলমগীর আমার সাথেই ছিলেন। আমার সামনেই ওসিকে না চিনেও ওসির প্রশংসা শুনে গর্বে আমার বুকটা ভরে এসেছিল। না, এই লোকটা কোন রাজনৈতিক নেতা বা পাতি নেতা ছিলনা। তিনি কোন মাতাবব্বর বা ইউপি সদস্যও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ পল্লী চিকিৎসক ও প্রভাব প্রতিপত্তিহীন ব্যক্তি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিশুদের অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আলমগীর প্রতিনিয়তই স্কুল পরিদর্শন করতেন। তিনি স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিসহ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মাদক বিরোধী চেতনা তৈরি করতেন। তার কাছে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীগণ দৃঢ় শপথ নিত মাদকের নেশায় জাড়িয়ে না পড়ারা জন্য, শপথ নিত আইন মেনে চলার জন্য। এই জাতীয় কর্মকাণ্ডের ছবিগুলো স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকেও প্রকাশিত হত।

অপরাধ প্রতিরোধে মানুষকে সাথে নিয়ে কাজ করা আলমগীরের একটি বড় গুণ। সেনবাগের একটি ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা তুলে এক ব্যাক্তি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি ছিনতাই কারীর কবলে পড়েন। স্থানীয় লোকজন দ্রুত পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশের আশ্বাসে মানুষ দ্রুত ছিনতাইকারীদের খুঁজে বের করে। স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ সহায়তায় মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে ছিনতাইকারীসহ ছিনতাইয়ের টাকা উদ্ধার হয়। বিষয়টি আইজিপি মহোদয়ের কানে গেলে তিনি তাৎক্ষণিক আলমগীর ও তার অফিসারদের জন্য ২০ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন। এই পুরস্কারের টাকা দিয়ে আলমগীর থানায় একটি ভোজের আেয়াজন করেন, যেখানে পুলিশকে সহায়তাকারী ব্যক্তিদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়।

থানায় আগুন্তকদের জন্য আলমগীর খুব একটা আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন না। তিনি হিসেব করে দেখেছেন প্রতি জনকে এক কাপ করে চা খাওয়ালে প্রতিদিন যতটাকার চা লাগবে তার মূল্য পরিশোধ করার ক্ষমতা তার নেই। আবার চা এর সাথে যদি অন্য আপ্যায়ন দেওয়া হয়, তার খরচ পড়বে আরো বেশি। তাই কেউ যদি একটি ভাল আপ্যায়নের জন্য আলমগীরের থানায় যায় তাহলে তিনি আশাহত হবেন। কিন্তু যে সেবার জন্য জনগণ আলমগীরের কাছে যায়, তিনি তাকে সেই সেবাটি দ্রুততার সাথে ও আন্তরিকতার সাথে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার কথা হল, মানুষ থানায় চা খেতে যায় না, বিপদে পড়ে যায়। থানার ওসির কাজ হবে তাকে বিপদ-মুক্ত করা, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া ও অন্যান্য সেবা দেওয়া।

বর্তমানে আলমগীর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি থানায় কর্মরত আছেন। সেখানেও তিনি একই ভাবে কাজ করেন। স্থানীয় এলাকায় স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ থেকে শুরু করে পাহাড়ী বাঙালি বিরোধও তিনি মীমাংসা করেন।

আলমগীর দাবী করেন, তিনি যে থানায় কাজ করেন, সেই থানাথেকে বদলী হয়ে আসলে নতুনযে ওসি সেই থানায় যাবেন, তিনি যদি আলমগীরের স্টাইলে কাজ না করেন (এবং অন্যরা সাধারণত করেন না) তাহলে নতুন ওসি তার প্রাক্তন থানায় ছয় মাসের বেশি টিকতে পারবে না। বাংলাদেশ পুলিশের থানা পর্যায়ের কর্মকর্তারা বর্তমানে যে স্টাইলে কাজ করেন,তাতে আলমগীরের দাবী বহুলাংশেই সঠিক।

আমার মনে হয়, বাংলাদেশে ইন্সপেক্টর আলমগীরের মতো যদি অন্তত ১০০টি থানার ওসি হত তাহলে বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি মানুষের প্রত্যাশার অনুরূপ হতে পারত। জেনারেল ইব্রাহীমের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে রাতের বেলা যে ওসি পায়ে হেঁটে পুলিশি কার্যক্রম দেখানোর জন্য গ্রামে গ্রামে ঘোরাতেপারে,সেই ওসিসাধারণ নয়,অসাধারণ। আলমগীর আমার কাছে একজন অসাধারণ পুলিশ অফিসারই মনে হয়েছে।

November 14, 2013