ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশের মহানুভবতা? বিষয়টি কিছুটা অবিশ্বাস্য! কিছুটা আশ্চর্যজনকও বটে। পুলিশ কখনো মহানুভব হতে পারে? পুলিশ চোর ও বদমাসদের একই সাথে বন্ধু ও শত্রু । পুলিশ পত্রিকার শিরোনাম হলেও মহানুভব হতে পারে না। যদি চোরকে সাহায্য করে, তবে সে গিরস্থের কাছে হবে মহাপাপী, আর যদি সে গিরস্থকে সহায়তা করে, তবে চোরের কাছে যে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পত্র-পত্রিকায় একজন ব্যক্তি পুলিশ অফিসারকেও মহানুভব হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। এমনি ধরনের একটি খবর সম্প্রতি বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাগুলো ফলাও করে প্রকাশ করেছে। যদিও দেশি পুলিশের কোন কাজই দেশি পত্রিকাগুলোর কাছে কোন কালেই প্রশংসনীয় হয় না, তবু বিদেশি পুলিশের কাজটিকে তারা মহানুভবতাই মনে করে। বিদেশী বস্তুর প্রতি আমাদের যেমন একটি সহজাত টান রয়েছে, বিদেশি পুলিশের প্রতিও তেমনি একটা গোপন সহানুভূতি বা শ্রদ্ধা রয়েছে।

দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ২৪ অক্টোবর, ২০১৩ তারিখে পুলিশের মহানুভবতা নিয়ে যে খবরটি বেরিয়েছে তা এই রূপ:
ফ্লোরিডার এক মা জেসিকা রবলস সম্প্রতি একটি সুপার শপে বিল পরিশোধ না করেই খাবার সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার সময় দোকানের কর্মীদের কাছে ধরা পড়েন। এ সময় তাকে গ্রেপ্তারের জন্যই সেখানে পুলিশ ডাকা হয়। ঘটনা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ে পুলিশ অফিসার ভিকি থমাসের ওপর। সেখানে যেয়ে নিয়ম অনুযায়ীই জেসিকাকে কোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন থমাস। কিন্তু এরপর কৌতূহলবশত তার কাছে এভাবে চুরির কারণ জানতে গিয়েই বেরিয়ে আসে গল্পের অন্য দিক। জেসিকা জানান, ঘরে ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য কোনো খাবার কেনার ব্যবস্থা করতে না পারার কারণেই চুরির পথ বেছে নিতে হয় তাকে। বিষয়টি জানার পরই সেটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছিল টমাসের। তবে তারপরও পুলিশ রেকর্ড ঘাটাঘাটি করে আর জেসিকার পরিবারের খোঁজ-খবর নিয়ে ঘটনাটির সত্যতা খুঁজে পান টমাস। আর এটা জানার পর এক মুহূর্ত সময়ও অপচয় না করে জেসিকাকে নিয়ে সুপার শপে ফিরে যান টমাস। আর এরপর নিজের গাঁটের পয়সা দিয়েই তিনি প্রায় ১০০ ডলার সমপরিমাণ খাবার উপকরণ কিনে দেন জেসিকা এবং তার দুই ও পাঁচ বছর বয়সী দুই ছেলের জন্য। এ প্রসঙ্গে পরে এক সাক্ষাত্কারে টমাস জানান, এ খাবার কেনার বিষয়টিতে তার ১০০ ডলার খরচ হলেও এর মূল্য তার কাছে কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমতূল্য। অন্যদিকে টমাস যে এই কাজটি একেবারে বিনা শর্তে করে দিয়েছেন তা নয়। বরং শর্ত হিসেবে তিনি জেসিকাকে জানিয়েছেন যে, জেসিকা যেন তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর একইভাবে তার মতো কাউকে সাহায্য করেন।

চোর জেসিকা রুবলস আর পুলিশ অফিসার ভিকি টমাস মিলে যে পত্রিকার শিরোনামটির জন্ম দিয়েছেন সেই রকম হাজার রকমের ঘটনা বাংলাদেশের পুলিশ অফিসারগণ ঘটাচ্ছেন প্রতিনিয়তই। কিন্তু তারা পত্রিকার শিরোনাম হতে পারেন না। বাংলাদেশের হাইওয়ের পাশে যে সব থানা অবস্থিত, সেই সব থানার অফিসারগণ প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিদের সেবা-যত্ন করছেন। তাদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন, ঔষধ পত্রের ব্যবস্থা করছেন, তাদের অভিভাবকদের খুঁজে বের করে তাদের কাছে নিয়ে আসছেন। অনেক সময় অভিভাবকহীন রোগিদের জন্য ঔষধ-পত্র পর্যন্ত তারা সরবরাহ করছেন। যে ঔষধ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেওয়ার কথা সেই ঔষধও পুলিশকে কিনে এনে দিতে হয়। আমি মাগুরা জেলা কাজ করার সময় এই রকম দুর্ঘটনায় আহত একাধীক ব্যক্তিকে দোকান থেকে ঔষধ সরবরাহ করতে দেখেছি সদর থানার অফিসার-ইন-চার্জ জনাব মোশারফ হোসেনকে। কিন্তু রোগীর কেউ না থাকায় শেষ পর্যন্ত ওসিকেই অনেক রোগীর ঔষধের বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশে থাকার সময় এক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার সময় আমি নিজেই তার স্কুটারের বিল পরিশোধ করেছি।

সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে একটি অভিভাবকহীন কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে স্বয়ং আদালতও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আদালতের নির্দেশে থানা কতিপয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা গ্রহণ করে। মামলাটি ডিবিকে দিয়ে তদন্ত করানো হয়। অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য পুলিশের সাথে তদন্তকালীন নারী সংঘটনের নেত্রীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়। পরে তদন্ত বেরিয়ে আসে আসলে অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। কিন্তু অভিযোগ মিথ্যা হলেও পুলিশের ভোগান্তী মিথ্যা ছিল না।

মেয়েটি পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করলেও সে যে পুলিশ হেফাজতে দুই দিন ছিল, তাকে কে খাইয়েছে, কার অর্থে খাইয়েছে সেটা কি কেউ খতিয়ে দেখেছেন? এই মেয়েটি যথন পুলিশের হেফাজতে ছিল তখন এক স্বামী-পরিত্যাক্তা মেয়েকে নিয়ে খুলনার কয়রা থানার এক বাপও থানায় সারারাত ছিলেন। কর্দপশূন্য এই বাপ-বেটি থানায় উপোস থাকেনি । থানা পুলিশ তাদের অন্ন দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে।

অসুস্থ মেয়ের জামাইকে দেখতে এসে কয়রার সেই বাপ দেখেনে তার মেয়েকেই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ছেলে পক্ষ এই বাবার জিনিস পত্র আটকিয়ে রেখেছে। তার ব্যাগে চার হাজার টাকা ছিল। তাও সরিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপে তারা ছেলের বাড়ি থেকে ছাড়া পায় এবং থানাতেই রাত্রি যাপন করেন। তাদের কাছে খুলনায় ফেরার মতো কোন টাকা পয়সা ছিল না। থানার অফিসার-ইন-চার্জ রাতের বেলা বাবা ও মেয়েকে খারার দিয়েছেন। পরদিন ভোরে তাদের হাতে ১৫০০ টাকা দিয়ে একটি গাড়িতে হ্রাসকৃত মূ্ল্যে টিকিট কিনে দিয়েছেন।

পুলিশের এই সব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের প্রচার মাধ্যমে কোন খবরই নয়, খবরটি হল কিশোরী মেয়েটিকে রাত ১১ টা থেকে শুরু করে ৩/৪ ঘন্টা ধরে ৪/৫ জন পুলিশ সদস্য পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। আমাদের প্রচার মাধ্যমগুলো শুধু খবর ছাপে- তবে সেই খবর সত্য কি মিথ্যা তা ছাপেন না। তাদের কাছে ভার খবর খবর না, খারাপ খবরই খবর। আর পুলিশকে মহানুভব বলার মতো মানসিকতা তাদের নেই। তাদের কাছে পুলিশ মহানুভব হতে পারে, তবে বাংলাদেশের পুলিশ নয়। চোর জেসিকা ও পুলিশ টমাসের গল্পটি বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় উল্টোভাবে প্রচারিত হত। এর শিরোনাম হয়তো হতো, ‘পুলিশের চোর প্রীতি’, কিংবা ‘চোরকে শাস্তি থেকে বাঁচালেন পুলিশ কর্মকর্তা’ অথবা এমন হত, ‘ চোরে-পুলিশে মাস্তুত ভাই।’

[1] http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMTBfMjRfMTNfMV8zNF8xXzgwMjM5