ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সরকারের যে সব কর্মচারি পোষাকের অংশ হিসেবে অস্ত্র বহন করে, তাদের অস্ত্র চালনা ও অস্ত্র ব্যবহারের জন্য বিস্তারিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। এই ক্ষেত্রে সরকারের অস্ত্রধারী কর্মচারিদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়- সামরিক ও বেসামরিক। অবশ্য আধাসামরিক বাহিনী নামেও এক শ্রেণির বাহিনী রয়েছে যারা এই দুইয়ের মাঝ খানে পড়ে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আধা সামরিক বাহিনীগুলোর শেকড়ের বিস্তার বেসামরিকের থেকে সমরিক পরিমণ্ডলের দিকেই বেশি। আধুনিক রাষ্ট্রের বেসামরিক বাহিনী বলতে মূলত পুলিশকেই বোঝায়। তবে পুলিশ ছাড়াও অর্ধপুলিশ ধরনের কিছু বাহিনীও আছে যারা সাধারণ পুলিশিং নয়, বিশেষ ধরনের সীমীত পরিসরের পুলিশিং দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেমন, আমাদের দেশের কারা রক্ষী, রেলওয়ে নিরাপ্তা বাহিনী ইত্যাদি। পুলিশ ছাড়াও আনসার, ফরেস্টগার্ড প্রতৃতি বেসামরিক বাহিনীগুলোও অস্ত্র বহন করে। প্রয়োজনমত এরা অস্ত্র প্রয়োগও করে।

সামরিক কর্মচারি ও বেসামরিক কর্মচারিদের প্রশিক্ষণের নীতিতে একটি বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে দৃশ্যমান। এ পার্থক্যটুকু খুবই সূক্ষ্ন এবং তা কেবলমাত্র একটি বুলেট ও একটি জীবনের আবর্তে ঘূর্নমান। কারো কাছে জীবন বড়, কারো কাছে আবার জীবনের চেয়ে একটা বুলেটের দাম ও কদর উভয়ই বেশি। একজনের অস্ত্রের উদ্দেশ্য শত্রুকে মোকাবেলা করা। এর সরল অর্থ হল যুদ্ধ করা। এই উদ্দেশ্যে আমরা সামরিক বাহিনী গড়ে তুলি, তাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়-সুযোগ দেই। তারা যখন শত্রুর মুখোমুখি হবে তখন তাদের এক শত্রুর জন্য এক বুলেটের বেশি যাওয়া ব্যয় বহুল। এই ব্যয় শুধু আর্থিক নয়, এই ব্যয় বাঁচামরার, এই ব্যয় একটি দেশ ও জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের। এক বুলেটে এক শত্রু নিহত না হলে, শত্রুর বুলেটে শুধু যোদ্ধারই জীবন যাবার আসঙ্কা নয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বও নিহত হয়। একটি মাত্র বুলেট, একটি মাত্র জাতির অস্তিত্বের নির্ধারক হতে পারে।

অন্যদিকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে অহেতুক ফায়ারে গোলাবারুদ নষ্ট হলে তার প্রতিস্থাপন হয়ে পড়ে দূরুহ । গোলা বারুদ ফুরিয়ে গেলে একজন সৈনিক ভীমের শক্তি আর অর্জুনের মতো রণকৌশল নিয়েও নিজের জীবন ও সহকর্মীদের জীবন রক্ষা করতে পারবে না। তাই নিজের বা দেশের এক বুলেটের বিপরীতে ন্যূনতম পক্ষে শত্রুর একটি জান তো চা-ই। যে সৈনিক একাধিক বুলেটের বিনিময়ে একজন মাত্র শত্রু হত্যা করে, সেইৃ সৈনিক একজন আগাগোড়াই অদক্ষ । সে দেশের জন্য বোঝা।

কিন্তু বেসামরিক অস্ত্রধারী পুলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে অস্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রথম নীতি হল, পুলিশের সামনে কোন শত্রু নেই। যাদের বিরুদ্ধে পুলিশ অস্ত্র ধরবে, তারা সবাই দেশের বৈধ নাগরিক কিংবা রাষ্ট্র কর্তৃক আশ্রিত মানব সন্তান। পুলিশ প্রতিরক্ষা করে না। একটি রক্ষিত দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ তথা আইন প্রয়োগ করেন। কোন একক ব্যক্তির জন্য নয়, সমাজের অদৃশ্য বা সামষ্টিক কারণে কোন দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে। এই ক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি নয়, একটি নীতি বা নীতি বাস্তবায়নকারী সকল মানুষ চলে যেতে পারে। পুলিশ তাৎক্ষণিক ভাবে ঘোরের মধ্যে পড়তে পারে। সে বুঝতে পারবে না, যে আইন ভঙ্গ করছে সে সঠিক না বেঠিক কাজটি করছে।

কোন ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষা করার জন্য অন্যকে খুন বা মারাত্মক জখম করতে পারে। পুলিশ আপাতত দেখবে সে আইন ভঙ্গ করে মারাত্মক অপরাধ করেছে। কিন্তু আইন বলবে, তার আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার আছে। সেই অধিকারের ফলে সে আক্রমণকারীকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। আবার এই আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতিপাদন আদালত কর্তৃক না হলেও অন্তত পুলিশের তদন্ত দিয়ে করতে হবে। তাই এই ক্ষেত্রে এক জন পুলিশ অফিসার একজন মানুষকে অপরাধীও বলতে পারেন না, নিরপরাধও বলতে পারে না; সে আইন ভঙ্গ হয়েছে তাও যেমন বলতে পারে না, তেমনি বলতে পারে না আইন রক্ষিত হয়েছে কি না। আইনের অস্পষ্টতার এই হেঁয়ালী পুলিশের কর্মকে হাজারগুণে দূরুহ করে তোলে।

যারা আইন ভঙ্গ করেন, তারা দেশের বা পুলিশের শত্রু নয়। তারা অপরাধী বা সমাজের বিচ্যূত চরিত্রের অধিকারী মানুষ মাত্র। আইন হল মানুষের আচরকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি বৈধ নীতি। সংসদ কর্তৃক পাশ হওয়া সকল আইন যে সকল নাগরিকের মতামতের ভিত্তিতে বা সকলে মঙ্গলের জন্য তৈরি হয়, তা নাও হতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সংখ্যা লঘুরা মেনে নেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব সময় এই স্বাভাবিক ঘটনাটি ঘটে না। তাই কেউ কেউ আইন ভঙ্গ করে। কেউ কেউ আবার পেটের দায়ে, সম্পদের সীমাবদ্ধতা দূর করতে, সম্পদের প্রাচুর্য বৃদ্ধি করতে এমনকি কেউ কেউ শারীরিক প্রয়োজনে আইন ভঙ্গ করে। আইন ভঙ্গকারীদের মধ্যে অনেকেই আছে মানসিকভাবে অসুস্থ্। কেউ কেউ বয়সের দিক দিয়ে কোমল। না বুঝে না শুনেই আবেগের বসে কেউ কেউ অপরাধ করে বসে। আইন ভঙ্গকারী বা বিচ্যূত আচরণের অধিকারী ব্যক্তিদের এই বৈচিত্র্য রাষ্ট্রকে বিবেচনা করতে হয়।

আইনে বলা আছে, কোন জনসমাবেশ আইন বিরোধী কার্যক্রম করার প্রবণতা দেখালেই তা বেআইনী হতে পারে। আবার কোন কোন জনসমাবেশ থানার অফিসার-ইন-চার্জ বা ম্যাজিস্ট্রেট বিচ্ছিন্ন হবার আদেশ দিলেই তা বেআইনী হয়ে যায়। তখন এই জনসমাবেশে যারা থাকবেন তারা সকলেই আইন ভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হবেন। এই জনসমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ অস্ত্র চালনা করতে পারে। কিন্তু এই খানে পুলিশের কাছে অস্ত্র আর বুলেটের মূল্য অত্যন্ত অল্প। প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের লিনিয়াডের মাথায় ঝুলানো বাঁশিটি তার লাঠির চেয়ে মূল্যবান, তার পরে তার লাঠি হল কাঁদানে গ্যাসের চেয়ে মূল্যবান, এরপর তার কাঁদানে গ্যাস হবে রাবার বুলেটের চেয়ে মূল্যবান; তার পর রাবার বুলেট বারুদের বুলেটের চেয়ে মূল্যবান হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ গুরুত্বের বিবেচনায় আগ্নেয়াস্ত্র পুলিশের কাছে সব চেয়ে কম দামী ও কম প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়।

ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও অস্ত্র পুলিশের জন্য বিড়ম্বনা মাত্র। লাঠি, কাঁদানে গ্রাস, গ্যাস গ্রেনেড বা রাবার বুলেট প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের বিপদ নেই। কিন্তু একবার বারুদের বুলেট ছুড়লে তার পাই পাই হিসেবে দিতে হয়। হিসেব দিতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে, হিসেব দিতে হয় নির্বাহী বিভাগের কাছে। পুলিশের গুলি চালানোর যৌক্তিকতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। মুহূর্তের সিদ্ধান্তের গুলি চালানোর ঘটনাটি দিনের পর দিন ঊর্ধ্বতনা বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষ ঠাণ্ডা মাথায় আরামদায়ক চেয়ারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রি অফিসে বসে বিশ্লেষণ করেন; এর আগের দিক পরের দিকে বিবেচনা করেন, আইনের বই আর আদালতের রুলিং খোঁজেন ।গরম মাথার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ঠান্ডা মাথা দিয়ে বিচার করার নীতি পুলিশের জন্য যে কত ভয়ানক খড়্গ তা হয়তো অন্যরা অনুভব করতে পারবেন না।

এই সবই বিচার বিশ্লেষণ করা হয়, নাগরিকদের একটি জীবন রক্ষার জন্য। একটি জীবন রক্ষার জন্য কোন পুলিশ সদস্য যে একাধিক পন্থা অবলম্বন করেছেন, যেমন, লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ইত্যাদির সকল মওজুদ শেষ করেছেন, ইজি চেয়ারে বসে সরকারের নীতি নির্ধারক গণ তাই দেখতে চান। সরকারের এই সব সম্পদ অক্ষত রেখে কোন পুলিশ সদস্য যদি বারুদের বুলেট ব্যবহার করেন, তবে তাকে সম্পদ রক্ষার জন্য বাহাবা দেওয়া হবে না, মানুষের জীবন নষ্ট করার চেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করা হবে। সাধারণ অস্ত্র, অল্প মারাত্মক অস্ত্র ও শেষে মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করেও যদি পুলিশ তার কার্য হাসিলের ক্ষেত্রে কোন নাগরিককে হত্যা না করে, তবে সেই পুলিশই নাগরিকদের কাঙ্খিত পুলিশ; মানবিক ও আধুনিক পুলিশ। তাই পুলিশের অস্ত্র প্রশিক্ষণের নীতি হল, চরমতম পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পূর্বে অস্ত্র ব্যবহার না করা। আবার ব্যবার করতে বাধ্য হলে হাজার বুলেট নষ্ট করে হলেও এক একটি জীবনকে রক্ষা করা। যে পুলিশ অফিসার অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ পেয়ে তার সমগ্র চাকরি জীবনে মানুষের জান ও মাল রক্ষা পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন অথচ একটি বুলেটও ব্যবহার করবেন না, সেই পুলিশ অফিসারই হল শ্রেষ্ঠ পুলিশ অফিসার। ( ১২ আগস্ট, ২০১৩)