ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

১৯৯৭ সালের মার্চ মাসের ২২ তারিখে দিনাজপুর জেলা স্কুলে গণিতের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলাম। যোগদানের দিনই প্রধান শিক্ষিকা বেগম সামসুন্নাহার বুঝেছিলেন আমি বেশি দিন তার স্কুলে চাকরি করব না। তার পরে অবশ্য আমি প্রায় এক বছরের মত সেই স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলাম।

আমাকে তৃতীয় শ্রেণীর শ্রেণী শিক্ষক বানানো হল। শ্রেণী শিক্ষকের যেসব বিড়ম্বনা ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল প্রতি মাসে ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন সংগ্রহ করা। মাসে একটি বা দুইটি দিনে এই বেতন সংগ্রহ করা হয়। বেতনের দিনে প্রথম ও দ্বিতীয় ক্লাসটি হয় না। কোন কোন এই দিন স্কুলে আদৌ কোন ক্লাসই হয় না। এই বেতনের দিনের বিড়ম্বনামালার অন্যতম হল বেতন কালেকশনের সময় ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহল নিয়ন্ত্রণ করা। কোন কোন ছাত্রের সাথে আসেন অভিভবকগণও। বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণীর মতো নিম্ন শ্রেণীতে অভিভাবকদের আসতেই হয়।

আমি যখন বেতন আদায় করতাম, তখন বাচ্চারা একটু বেশিই কোলাহল করত। এতে অনেকের ধারণা ছিল (অন্যরা যা বলতেন) আমি বাচ্চাদের শাসন করতে পারতাম না। এখানে শাসন হল দুই প্রকার- একটা হল বাচ্চাদের সাথে চোখ রাঙিয়ে তীব্র চিৎকারে ধমক দেওয়া। অন্যটি হল লম্বা বেত দিয়ে বাচ্চাদের প্রচণ্ড শক্তিতে প্রহার করা। আমার ত্রুটি ছিল আমি এর দুটোর কোনটাই করতে পারতাম না। এর ফলে আমার বেতনের ক্লাসে ছাত্ররা তীব্র কোলাহল করত। আমি মাঝে মাঝে টেবিলে বেত মেরে তাদের শান্ত করতাম। তবে কিছুক্ষণ পর অবস্থা পূর্বের মতই হত।

স্কুলের ছাত্রদের গায়ে হাত কিংবা বেত তোলার বিরুদ্ধে আমিও নই। আমি মনে করি, নিম্ন শ্রেণীর বাচ্চাদের একটু আধটু বেতের বাড়ী দিতেই হয়। নইলে এরা শৃংখলার মধ্যে থাকে না। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রদের শাস্তিদান যতই মানবাধিকার বা শিশু অধিকারের পরিপন্থি হোক, আমাদের মতো দেশে ও সমাজে তার প্রয়োজন আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল. আমার তৃতীয় শ্রেণীর বাচ্চাদের শরীর এতই ছোট আর বাচ্চাগুলো এতটাই নিষ্পাপ চেহারার যে ওদের গায়ে হাত তোলার মতো নির্দয় হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই বেত নিয়ে টেবিলে পিটিয়ে একটু আধটু রাগারাগি করেই আমি ক্ষান্ত দিতাম। বাচ্চারা কোলাহলের তীব্রতা কমালেও ক্লাস সম্পূর্ণ শান্ত হতো না। অন্যদিকে, তৃতীয় শ্রেণীর ৮/৯ বছরের বাচ্চারা যদি অনার্স ক্লাসের বাচ্চাদের মতো শ্রেণি কক্ষে চুপচাপ পাঠাভ্যাস করবে বা শিক্ষকের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনবে এমনটি প্রত্যাশা করাও অস্বাভাবিক। বরং আমার কাছে আমার কোমলমতি ছাত্রদের কোলাহল ভাইল লাগত।

একদিন বেতন তোলার সময় একজন অভিভাবক আমাকে দোষারোপ করে বললেন, আপনি ভাল শিক্ষক না। আপনি বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। আমি বললাম, কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে? তিনি বললেন, কেন আচ্ছাতারে পিটন দিবেন? পিটন না দিলে বাচ্চারা কি শান্ত হয়? আমি ভদ্রলোকের কথায় বিরক্ত হয়ে তার হাতে বেতটি দিয়ে বললাম, দয়া করে আপনিই আমার হয়ে কাজটি করে দেন না। ভদ্রলোক বিব্রত হলেন। কোন শিক্ষক এভাবে কোন অভিভাবকের হাতে বেত তুলে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পিটুনি দেওয়ার অনুরোধ করবেন, এটা তার চিন্তার অতীত ছিল।

আমি বললাম, ভদ্রলোক! আমার বেতনের দিনে ছাত্ররা কোলাহল করবে তাতে আমার সমস্যা হয় না। আমি তৃতীয় শ্রেণির শ্রেণি শিক্ষক, দশম শ্রেণীর না। আমার ছাত্ররা বালকও নয়, কিশোর ও নয়-এরা রীতিমত শিশু। অভিভাবক হিসেবে শিশুদের প্রতি আপনি নির্দয় হতে পারেন। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে আমি আমার ছাত্রদের প্রতি নির্দয় হতে পারি না। এই কোমলমতি শিশুদের গায়ে বেত মারলে আপনার হৃদয়ে কোন প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে। কিন্তু আমার কলিজায় টান পড়ে। আমি এরপর, বেশি দিন আর শিক্ষকতা করি নাই।

কিন্তু পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝে খবর প্রকাশিত হয় শিক্ষকের প্রহারে শিক্ষার্থী হাসপাতালে কিংবা শিক্ষক ছাত্রকে মেরে রক্তাক্ত করেছেন। এক দিন পত্রিকায় দেখলাম, এক শিক্ষকের প্রহার খেয়ে কিশোর ছাত্র বধির হয়ে গেছে।

শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা। এখানে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক অতি পবিত্র। ছাত্র যত বয়স্কই হোক না কেন, সে যতো উচ্চ পদেই যাক না কেন, সে শিক্ষককে ছাত্রসূলভ স্বভাবেই সম্মান দিবে। কিন্তু শিক্ষা যখন শ্রেফ পণ্যে পরিণত হয় এবং শিক্ষকরা পরিণত হন শিক্ষার দোকানদারে তখন এই সম্পর্ক আর পবিত্র থাকে না। অন্যদিকে কেবল অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকরা যখন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ছাত্রদের বাসায় গিয়ে বা বাসায় এনে প্রাইভেট পড়ান, তখন অর্থই হয়ে ওঠে মুখ্য। অর্থ দিয়ে কোন বস্তু যখন কিনব, তখন দোকানদারের সাথে আমার আর্থিক লেনদেনের বাইরে অন্য কোন সম্পর্ক থাকে না। বর্তমানের কোচিং বা প্রাইভেট পড়িয়ে বড়লোক হওয়া শিক্ষকরা তাই ছাত্রদের কাছ থেকে সম্মান পান না। কেননা, তারা ছাত্রদের যা দেন তার মূল্য নগদ নিয়ে নেন। আমার শিক্ষকগণ আমাকে শিক্ষা দিয়ে নগদ কিছু নেন নি। তাই তাদের কাছে ঋণ শোধ কখনোই হবে না।

পত্রিকার খবরগুলোতে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে বেদম মারপিটের যে বর্ণনা পাই তা রীতিমত ভয়ংকর। যদি পড়া না পারার জন্য বাচ্চাদের মারতে হয়, তাহলে শিক্ষকের পাঠদানের ক্ষমতাটুকুও দেখতে হবে। শিক্ষা বাণিজ্যের সাথে সাথে শিক্ষকরা অন্যান্য বাণিজ্যের সাথেও এখন জড়িয়ে পড়েন। আর গুরুর মতো শিষ্যদের আদোরে-কৌশলে শিক্ষা না দিয়ে প্রহারে শিক্ষাদান শেষ করতে চান। অধিকন্তু ছাত্র শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে না—এই অজুহাতেও ছাত্রদের মারপিট করার খবর পাওয়া যায়। ছাত্রদের মারপিট করে কঠোর শিক্ষক হওয়া যায়, কিন্তু আদর্শ শিক্ষক হওয়া যায় না।জুলাই, ২৭,২০১৩