ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রেম করে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে উঠতি বয়সী দুই যুবক-যুবতী আমার স্থানীয় থানায় উপহার দিয়েছে একটি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা। মেয়েটিকে অপহরণ করার দায়ে ছেলের পরিবারের সকল প্রাপ্ত বয়স্ক সদস্যের অপহরণের মামলার আসামী করা হয়েছে। কিন্তু এই মামলায় কোন প্রকার সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও এজাহার নামীয় আসামী হয়েছে সুমন নামের এক কিশোর। সুমন একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। ওর বাবা কামারের কাজ করে। আমাদের এলাকায় মাত্র একটিই কামার পাড়া রয়েছে। সুমন সেই কামার পাড়ার বেঞ্জা কামারের ছেলে।

 

আমি সুমনকে ভালভাবে চিনি না। তবে ওর মুক্তিযোদ্ধা চাচা মনোরঞ্জনকে চিনি। মনোরঞ্জনের সাথে আমার কোন কাজের বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। একজন দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার এলাকায় গেলে আমিও মনোরঞ্জন দাদার খোঁজ করি, তিনিও আমার খোঁজ করেন। গ্রামের হোটেলে বসে আমাদের মধ্যে দু এক কাপ চা-ও চলে। আমি মনোরঞ্জনকে নায়ক বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি কবিতাও লিখেছি। এরই সুবাদে বেঞ্জা কামারের ছেলে সুমন আমার প্রাক্তন ইউপি সদস্য বোনের মাধ্যমে আমার শরণাপন্ন হয়েছে। তাকে মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচাতে হবে।

 

খোঁজ নিয়ে জানলাম, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার বাদী অর্থাৎ পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা মেয়েটির বাবা কোন প্রকারে জানতে পেরেছেন, সুমন নামের এক ‘ভটভটি’ চালকের ভটভটিতে চড়ে তার মেয়ে প্রেমিকের সাথে লাপাত্তা হয়েছে। ভটভটি চালক সুমনকে আসামী করতে গিয়ে মেয়ের বাবা আসামী করেছেন বেঞ্জা কামারের ছেলে সুমনকে। বাদীর বাড়ি ও মামলার ঘটনাস্থল সুমনের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। আর সুমন কোন দিনই ভটভটির চালক বা হেলপার ছিল না। এমতাবস্থায়, তার এই মামলার আসামী হওয়াটা নিতান্তই একটি তথ্যের ভুল। কিন্তু তথ্যের বিভ্রাট যাই ঘটুক এই মামলার ফলে সুমনের জীবনে বড়ই দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে। কামারের কাজ রেখে সে এখন পলাতক জীবন যাপন করছে।

 

আমি স্থানীয় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সার্কেল এএসপিকে বিষয়টি জানালাম। সার্কেল এএসপি তন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। আর তদন্তকারী কর্মকর্তাও একমত যে মামলার অপরাধের সাথে এই বেঞ্জা কামারের ছেলে সুমনের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। বাদী যা করেছেন তা নিতান্তই তথ্যগত ভুল, আইনের ভাষায় যাকে বলে mistake of fact ।কিন্তু বাদী তথ্যের হিসেবে ভুল করলেও মামলাকে কচলিয়ে যাদা টুপাইস কামান, তাকার কি প্রচলিত নিকেষের ভুল করতে পারেন না। কারো নামে থানায় এজাহার হয়েছে আর কোন প্রকার খরচপাতি ছাড়াই সেই আসামী চার্জসিট থেকে বাদ পড়ে যাবেন, এমনটা কদাচিৎ ঘটে। থানা পুলিশ যদি শতভাব নিষ্কলুষও থাকে, থানার আসেপাশে ঘুরঘুর করা দালালরা কি আসামীদের বিনা খরচে পার পেতে দিবেন?

 

সর্বশেষ সংবাদ পেলাম, থানার সাথে সম্পর্কিত বাবুরা প্রত্যহ ক্ষুদ্র তরঙ্গের দৌড় পাড়ছেন সেই কামার পাড়ায়। বেঞ্জা কামারের স্ত্রীর ভাষ্যমতে, দারোগা সাহেব বলছেন, ঊর্ধ্বতনরা কি বললেই সব হয়? তারা তো তোমাকে চার্জসিট থেকে বাদ দিতে বলেই খালাস। কিন্তু এই চার্জসিট থেকে নাম কাটতে যে খরচ পড়ে, সে সম্পর্কে তোমার কি কোন ধারণা আছে? সার্কেল এএসপিকে দিয়ে তদ্বির করেই তো তুমি খালাস। তোমার নাম খানা কাটতে যে কাঠখড়ি পেড়াতে হবে, তার খরচ কি সার্কেল এএসপি সাহেব দিবেন? আর আমারই বা কিসের ঠ্যাকা পড়েছে যে নিজের টাকা খরচ করে এজাহার থেকে তোমার নামটা কাটিয়ে আনব? হয় নাম কাটার খরচের টাকা নিয়ে থানায় আসবে, নইলে তোমার নামসহ আদালতে চার্জসিট যাবে। তখন আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না।

 

পাঠক, আমার এই গল্পটিতে দুর্নীতির একটি বড় তাত্ত্বিক দিক আলোচিত হয়েছে। আর এই দিকটি হল, দুর্নীতির রহস্যায়ন বা mystification। এই বাস্তব ঘটনার আলোকে আমি এই নিবন্ধে দুর্নীতির রসহ্যায়ন সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করব।

 

বলাবাহুল্য, দুর্নীতি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে এখন দুর্নীতির সাথে বসবাস করছি। এই ব্রহ্ম্বাণ্ডে আমরা হয় দুর্নীতির ‘কারক’ নয়তো ‘কর্ম’ হয়ে শ্বাস-প্রাশ্বাস চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের হৃৎপিণ্ডের নিরবিচ্ছিন্ন স্পন্দনের মতোই দুর্নীতি আমাদের জীবনে নিরবিচ্ছিন্নভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। মাতৃগর্ভে যেমন জীবশিশু জৈবিক তরলে নিমজ্জিত থেকে দিনকে দিন বেড়ে ওঠে, এই বঙ্গ দেশে আমরাও তেমন। আমাদের অবস্থা এমন যে এই মাতৃজঠরের অকৃতিম রস থেকে আমরা নিজেদের কখনোই আলাদা করতে চাই না।

 

দুর্নীতি করে যারা জীবীকা নির্বাহ করে কিংবা সম্পদের পাহাড় গড়ান, তারা তাদের দুর্নীতিকর্মকে নির্বিঘ্ন করতে বা অপেক্ষাকৃত বেশি লাভজনক করতে অবিরাম নানা প্রকার বৈচিত্র্যময় প্রচেষ্টা অব্যহত রাখেন। এই সব প্রচেষ্টার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘মিস্টিফিকেশন’ বা ‘রহস্যায়ন’। দুর্নীতির রহস্যায়ন হল, কোন প্রতিষ্ঠানের সেবাপ্রার্থীদের কাছে সেই সেবা প্রার্থীর প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে উপস্থাপন করা। যদি কোন বিষয়ে কার্যসম্পাদন সজহতর হয়, দুর্নীতিবাজরা সেই বিষয়টিকে যতদূর পারেন জটিল করে তোলার চেষ্টা করেন। আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনের ভাষায় এটাকে বলা হয় লালফিতার দৌরাত্ম বা রেডটেপিজম। কিন্তু অনেক বিভাগে বা স্থানে আমলাতান্ত্রিকতা নেই। সেখানে ফাইলকে ঘাটে ঘাটে ঘুরতে হয় না। তাই ফাইল ঠেকিয়ে ঘুস খাওয়া বা দুর্নীতি করার সুযোগ সেখানে  নেই।

 

এসব ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থী বা ভূক্তভোগীদের কাছে সেবা পাবার পথটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা নেই। তাই তারা সঠিক সেবা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। যে সেবাটি সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় রাষ্ট্রের বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাবার কথা কিংবা যে সেবাটি মানুষের হাতের কাছে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে, সেই সেবাটিও তাদের অর্থের বিনিময়ে বা তদ্বিরের মাধ্যমে আদায় করতে হয়।

 

দুর্নীতির রহস্যায়নের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল, দলিল লেখার কাজ। আধুনিক বিশ্বে সব কিছুই যখন সহজতর হয়েছে, যখন ইলেক্ট্রনিক ফর্মের মাধ্যমে শত বছরের গৎ বাঁধা নিয়ম বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের ফর্ম পূরণ করেই একটি দলিলের কাজ হবার কথা, তখন এই কাজটি করার জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয়, কতিপয় দলিল লেখকের উপর। এই সব দলিল লেখকের আবার নিজস্ব সংগঠন রয়েছে। সরকার একবার দলিল লেখার প্রাচীন পদ্ধতির পরিবর্তে সহজসাধ্য ফর্ম তৈরি করতে চাইলে এই সব দলিল লেখক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সরকারও রহস্যাজনক কারণে এই দলিল লেখার সেবাটিকে রহস্যায়ন করার পথটিকেও আগের মতোই অক্ষুন্ন রাখেন।

 

জনসাধারণের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখা দুর্নীতির রহস্যায়নের আর একটি পরিচিত কৌশল। সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত কিংবা সম্পূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে আমলাতান্ত্রিকতার সামান্যতম কার্যও রয়েছে, সেখানে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজরা প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখবেন। কোন সেবা যদি যথাযথ পথে পাওয়ার কাজটি সময় সাপেক্ষ হয়, তাহলে দুর্নীতিবাজরা এটাকে সহজসাধ্য করার একটি মূল্যবান পথ আপনাকে বাতলিয়ে দিবেন, সহজ উপায়কে আরো সহজ করারও প্রস্তাবও তারা দিবেন। আর আপনি যদি তাদের প্রস্তাবে রাজি না হন, আপনার কাজটিকে তারা সত্যিই সত্যিই দুর্লভ করে তুলবে।

 

পুলিশ বিভাগের সেবা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে হাজারও রহস্যায়নের ঘটনা রয়েছে। ‘বাঘে ছুলে আঠার ঘা আর পুলিশে ছুলে ছত্রিশ ঘায়ের’ মতোই দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসারদের কাছে ছত্রিশ প্রকার রহস্যায়ন রয়েছে। অবশ্য অনেকে বিষয়টিকে আরো বেশি রহস্যাবৃত করার জন্য বলে থাকেন, ‘আকাশের যত তারা, পুলিশের ততো ধারা’। কিন্তু এই সব ধারার বাইরেও ভিন্ন কিছু ধারা রয়েছে।

 

মুখরোচক গল্পে বলে, কালে কোন এক গেঁয়ো মাতব্বর তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য থানায় গিয়েছিলেন। গ্রামের প্রেক্ষাপটে ভদ্র লোক বেশ টাকা পয়সা ওয়ালা। তিনি চাইলেন, তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলাটি যেন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। থানার দারোগা তার মামলাকে শক্তিশালী করার জন্য যত বেশি পারা যায় ধারা সংযুক্ত করার প্রস্তাব করলেন। সামান্য মারামারির অপরাধকে রীতিমত দাঙ্গা, সিঁধেল চুরিকে বড় ধরনের চুরি, এমনকি, দস্যুতা পর্যন্ত বানানো যায়। কিন্তু চুরি বা মামামারির ঘটনায় ডাকাতির মতো ধারা সংযোজন করা প্রায়শই অসম্ভব।

 

ভদ্রলোকের মামলার এজাহারে ধারা সংযোজন খান্ত হলে ভদ্রলোক দারোগাকে জিজ্ঞাসা করলেন:

‘বাবু, আমার মামলা কি শক্তিশালী হল’?

দারোগা বললেন, ‘হাঁ, তবে আরো দুই একটি ধারা দিতে পারলে ভাল হতো।’

মামলাকারী ভদ্রলোক বললেন, ‘তাহলে দেন বাবু, সব ধারা দিয়ে দেন। যত টাকা লাগুক, দিব।’

দারোগা ভাবলেন, একে তো ভালই খসানো যাবে। তখন তিনি মামলাকে আরো সহস্যাবৃত করতে চাইলেন।

বললেন, সব ধারা কি আমার কাছে আছে? এখন যে ধারাগুলো দেওয়ার কথা ভাবছি, সেগুলো রয়েছে এসপি সাহেবের কাছে। এই ধারা এসপি সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে আসতে হলে যে আরো অনেক টাকার দরকার।

গেঁয়ো মাতব্বর ভাবলেন, যত টাকাই লাগুক তার মামলাকে শক্তিশালী করতেই হবে। আর এজন্য যদি এসপি সাহেবের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে কিছুেআইনের ধারা কিনে আনতেও হয়, সে খরচ তিনি বহন করবেন।

 

পুলিশি সেবার আর একটি রহস্যায়ন হল, অভিযোগ পত্র নিয়ে। দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসারগণ আসামী পক্ষের কাছে বলে থাকেন, বেশি ঘুস দিলে আপনার বিরুদ্ধে দেয়া চার্জসিটকে দুর্বল করে দিব। এতে আপনি সুবিধা পাবেন। এমনকি আপনি মামলার প্রথম শুনানীতেই ছাড়া পেয়ে যাবেন। তাই মালপাতি একটু বেশি ছাড়েন।

 

অন্যদিকে, বাদী পক্ষের কাছে বলে বেড়ান, কোন আসামীকে তো বাদ দিবই না বরং একটু বেশি শক্তিশালী চার্জসিট দিব। আর এ জন্য কিছু মাল পাতি ছাড়তে হবে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সততা ও অসততা উভয়েই নিম্ন পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের রহস্যায়ন কাজে সমান ভূমিকা রাখে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি সত্যিই সত্যিই অসৎ হন এবং তিনি নিম্ন পর্যায় থেকে দুর্নীতির বখরা সংগ্রহ করেন, তাহলে ঊর্ধ্বতনের পকেট ভর্তির জন্য অধঃস্তন কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে থেকে বেশি পরিমাণে উৎকোচ সংগ্রহ করতে হয়।এই সুযোগে নিচের স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুসের হারটি ঊর্ধ্বতনের চেয়ে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেন। আর যেহেতু ঊর্ধ্বনত কর্মকর্তারা নিজেই দুর্নীতির সাথে জড়িত এবং তারা যে কোন উপায়ে নিজেদের রোজগার বৃদ্ধি করতে চান, তাই, নিচের তলার লোকজন কাকে জিম্মী করছে, কিংবা কে কত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটা দেখার সুযোগ তাদের কই?

 

অন্যদিকে, উপর তলার কর্মকর্তাগণ যদি আবার বেশি মাত্রায় সৎ হয়ে পড়েন, তার সততার মাত্রাও নিম্ন পর্যায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন আমার এক দুলাভাইসহ আমি শিক্ষাভবনে আমাদের গ্রামের নব প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলের এমপিও ভুক্তির তদবির করতে যাই। এই সময় শিক্ষা ভবনে মহাপরিচালক হিসেবে একজন মহিলা অফিসার যোগদান করেন। যে ভদ্রলোক আমাদের স্কুলের এমপিও ভুক্তির দরখাস্তটির ঠিকাদারী নিয়েছিলেন, তিনি মন্তব্য করলেন, বর্তমানে এখানে এক মহিলা ডিজি এসেছেন। তিনি অত্যন্ত সৎ। কাজটাতে অনেক ঝুঁকি আছে। ডিজির কাছে ধরা পড়লে চাকরিও চলে যেতে পারে। তাই, আগের মতো অল্প টাকায় এই কাজটি হবে না। টাকা আরো বেশি দিতে হবে।

পুলিশ বিভাগের ক্ষেত্রে উপরে সৎ অফিসার থাকলে নিম্নতম দর্নিীতিবাজাদের ঝুঁকিটা আরো বেশি বেড়ে যায়। শিক্ষা ভবনের ডিজিকে একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনেক বেশি বেগ পেতে হয়। দুর্নীতির ঘটনা প্রমাণ করার যেমন কঠিন, তার চেয়েও বেশি কঠিন হচ্ছে কর্মচারিদের সিবিএকে মোকাবেলা করা। কিন্তু পুলিশ বিভাগে কোন সিবিএ নেই। পুলিশ কর্মচারীদের কোন কালেক্টটিভ বারগেইনিং বডি নেই। অন্যদিকে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও স্থানীয় পুলিশ কমান্ডারদের হাতে। এমতাবস্থায়, ইউনিট কমান্ডার বেশি মাত্রায় সৎ হলে নিম্ন পর্যায়ে দুর্নীতি আর্থিক অংকে বেশি বৃদ্ধি পায়।

 

রহস্যায়ন হল, দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখার একটি সনাতনী উপায়। আমাদের এই বঙ্গদেশে আধুনিক প্রশাসন ব্যবস্থার সূত্রপাত ও বিকাশ ঘটায় বৃটিশ শাসকগণ। লর্ড ওয়ারেন্ট হিস্টিং এর দুর্নীতি বিরোধী অভিযান থেকে শুরু করে হাল আমলের প্রলম্বিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরি আইনের শাসনকালীন পর্যন্ত যতবারই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ততোবারই দুর্নীতির রহস্যায়ন বেড়ে গেছে। টিআইবির প্রতিবেদনে প্রকাশ ২০০৭ সালে সারা দেশে বিচার বিভাগে যে দুর্নীতি হয়েছিল তার ৭% ভাগ সংঘটিত হয়েছিল দুর্নীতির দায়ে কতিপয় আমলা ও রাজনীতিবিদের বিচার করার জন্য সংসদ ভবনে স্থাপিত বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশেষ আদালতগুলোকে ঘিরে।

 

দুর্নীতির রহস্যায়ন দুর্নীতির মতোই একটি সনাতনি কৌশল। বড় কর্তাদের নামে অফিস পিওনের ঘুষ নেওয়া কিংবা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে সেবা প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা অতি প্রাচীন। তাই দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাঙ্গ হওয়া উচিত দুর্নীতির রহস্যায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ করা। অন্যদিকে, যে সব কর্মকর্তা নিজেদের সৎ মনে করে তাদের অধীনস্ত সবাই সৎ ভাবেন তারাও এর দায় এড়াতে পারেন না। অধিক সততা যে অধিক ঘুসের কারণ হতে পারে, তা সৎ কর্মকর্তাদের উপলব্ধি করতে হবে।(অক্টোবর,১২, ২০১৩; পরিমার্জন ২৭ আগস্ট, ২০১৫)