ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। রেল পথের দূরত্ব ৩৪০ কিমি এর মতো। কমলাপুর স্টেশন থেকে মহানগর প্রভাতি ট্রেনে উঠলাম সকাল ০৮ ঘটিকায়। চট্টগ্রামে এসে পৌঁছিলাম সন্ধ্যা ০৬ টায়। (১৭ মার্চ, ২০১৪) সর্বমোট সময় লাগল ১০ ঘন্টা। শুনলাম, এ ভ্রমণ নাকি সাধারণভাবে ৬ ঘন্টার। কিন্তু আজ অনেক বেশি সময় লেগেছে। ফেনী পার হয়ে একবার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেল।এখানে আটকা পড়ে থাকল প্রায় ঘন্টা দেড়েক। আর এক বার যদি লাইনে একটি ট্রেন আটকা পড়ে তাহলে এই লাইন ব্যবহারকারী সকল ট্রেনের সিডিউলেই তার প্রভাব পড়ে। তাই আজ নিশ্চয়ই অন্যান্য ট্রেনগুলোও নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিয়ে গন্তব্যে পৌঁচেছে।

সময় বেশি লাগলেও রেল ভ্রমণ অত্যন্ত আরামদায়ক। আমি যে কেবিনে উঠেছিলাম, পরবর্তীর্তে বিমান বন্দর স্টেশন থেকে এক মহিলা তার একটি কোলের শিশু ও একটি ছয়/সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে উঠলেন। আমার মেয়ের সমবয়সী সেই মেয়েটি। তাই আমার মেয়ে ভ্রমণকালে একজন বান্ধবী পেয়ে গেলে। তার ১০ ঘন্টা তাই ভালই কেটেছিল।

ট্রেনের ভ্রমণ নানা কারণে খুব বেশি ক্লান্তিকর হয় না। এখানে ঝাঁকি নেই। ঝিক ঝিক শব্দে ভাল ঘুম আসে। এখানে পর্যাপ্ত স্থান পাওয়া যায়। বাচ্চাকাচ্চারা চলাফেরা করে এদিক ওদিক, দৌড়াদৌড়ি করে সময় কাটাতে পারে। সৌচাগারের ব্যবস্থা থাকে। আবার খাবার দাবারের ব্যবস্থাও থাকে। সব চেয়ে বড় কথা হল, ট্রেনের ভ্রমণ অত্যন্ত নিরাপদ। এখানে দুর্ঘটনার সঙ্কা অত্যন্ত কম।
আমাদের দেশে নানা কারণে রেলপথ অবহেলিত। এখানে যেমন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর সরকারি উদ্যোগের অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যবস্থাপকদের অদক্ষতা। প্রতি বছর রেল ব্যবস্থা অনেক টাকার লোকশান দেয়। অথচ এই পথের সম্ভাবনা অপার। আমি ছাত্র জীবন থেকেই দেখছি, আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে সব সময় আসন সংখ্যার চেয়ে যাত্রী থাকত বেশি। একটু দেরি করলে টিকিট পাওয়া যেত না। যাত্রীর অভাব নেই, হরতাল, অবরোধে বন্ধ থাকে না। অথচ প্রতি বছরই দিচ্ছে লোকশান।এটা কেমন অবস্থা!

আমাদের রেলকে নিয়ে সম্ভবত দেশি বিদেশী রাজনীতি ও অর্থনীতির ষড়যন্ত্র রয়েছে। আমরা কোন গাড়ি উৎপাদন করিনা। যারা গাড়ি রপ্তানি করেন, তারা রেলের উন্নয়নে নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এমনও তো হতে পারে, গাড়ি বিক্রয় করার লোভেই বিদেশীরা আমাদের রেলকে লাভবান হতে দেয়নি। একটি ট্রেনের ইঞ্জিনের জীবনকাল একটি মোটর গাড়ির জীবনকালের চেয়ে অনেক বেশি। একটি গাড়ি যেভাবে কারণে অকারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একটি রেলগাড়ি তেমনটি হয় না। সড়ক পথ রক্ষণাবেক্ষণে যে খরচ হয়, রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়। তাই রেলকে দুর্বল করা সাধারণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

তবে রেলকে নিয়ে সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রটি হয় দেশের অভ্যন্তরে। দেশের রেলপথ পুরোটাই সরকার নিয়ন্ত্রিত। এখানে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দৃশ্যত নেই। অন্যদিকে, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগই সিংহভাগ। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকারিগণ নিশ্চয় রেলকে শক্তিশালি হতে দিয়ে নিজেদের দুর্বল করতে পারেন না। পরিবহন মালিক শ্রমিকগণ আমাদের বিআরটিসিকে ধ্বংস করার নিরন্তর চেষ্টায় নিয়োজিত। পরিবহন সমিতির অনুমতি বা নেতাদের তুষ্ট না করে সরকার সব স্থানে বিআরটিসি গাড়িও পাঠাতে হিমসিম খায়। ঢাকার বাইরে বেশ কিছু স্থানীয় রুটে দোতলা বিআরটিসি বাস চালু করা হয়েছিল। এরকম একটি বাস রংপুর-দিনাজপুর রুটে চলত। সেই সময় আমি দিনাজপুর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। আমি প্রায়ই এই দোতলা বাসটিতে ভ্রমণ করতাম। কিন্তু একদিন দেখলাম তা বন্ধ হয়ে গেল। শুনলাম, পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের বিরোধিতার জন্য সরকার এটা বন্ধ করেছে। আরো জানলাম, এই বিরোধিতার সাথে খোদ বিআরটিসির কর্মচারিরাই জড়িত। আমার সেই সময় উপলব্ধি হয়েছিল যে দেশের পরিবহন খাতে যাত্রী সেবার চেয়ে শ্রমিক-মালিক সেবাই মূখ্য। এখানে সরকার দুর্বল, সরকারের নীতি দুর্বল। আর অসীম ক্ষমতার মালিক হল বেসরকারি খাতের পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও তাদের নিয়ে রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র।

কোন এক সময় সড়ক পথে যোগাযোগ দ্রততর হত। কিন্তু ক্রমবর্ধমান যানযট ও রাস্তার স্বল্পতা দেশের সড়কপথগুলোকে বিলম্বিত ভ্রমণের প্রতীকরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথ ৫ ঘন্টার কম সময়ে অতিক্রম করা যেত। কিন্তু বর্তমানে তা ১০ ঘন্টার কমে হয় না। পূর্বে ঢাকা রংপুর রুটে রাস্তা সরু ছিল। মাঝখানে ছিল একটি নদীর ফারাক। এই নদী পার হতেই লাগত ৩/৪ ঘন্টা। তারপরও সকালে রংপুর থেকে রওয়ানা দিয়ে ঢাকা সন্ধ্যায় পৌঁছানো যেত। এমনকি বঙ্গবন্ধু পদ্মা সেতু তৈরির পরেও ৫/৬ ঘন্টার মধ্যেই সেই দূরত্ব অতিক্রম করা যেত। কিন্তু বর্তমানে ৯/১০ ঘন্টার কম সময়ে রংপুর-ঢাকা যাতায়াত স্বপ্নের মতো।

আমার মনে হয়, দেশের রেলপথ যদি শক্তিশালী হয় দেশের পরিবহণ ব্যবস্থায় একটি বিপস্নব আসবে। এই মুহূর্তে যদি রংপুর থেকে সোজাসুজি বগুড়া হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত একটি নতুন রেলপথ নির্মাণ করা যায় এবং এই পথে যদি দ্রুতগামী ট্রেন চালু করা যায়, তাহলে, দেশের বাসগুলো যাত্রী সংকটে ভুগবে। অন্য দিকে মানুষ ৪/৫ ঘন্টার মধ্যেই ঢাকা রংপুর যাতায়াত করতে পারবে। রংপুর থেকে ঢাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক সব্জিসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি নেয়ে আসে। এই বিচ্ছিন্ন পরিবহনে যেমন খরচ বেশি পড়ে, তেমনি পরিবেশ দূষণও ঘটে। অথচ একটি ট্রেনের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার ট্রাকের সমান মালামাল পরিবহন সম্ভব। পরিবহন ব্যবস্থায় রেলপথ মূখ্য ভূমিকা পালন করলে আমাদের দেশের পণ্যদ্রব্য আরো অনেক সসত্মাদামে পাওয়া যাবে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের কৃষকগণও তাদের উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের ন্যায্যমূল্য পাবে। ঢাকা-চট্টগ্রামের পরিবহন ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই সড়ক পথের বিপরীতে জলপথের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এখন যদি রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, দেশের পণ্য ও সেবা খাতের চেহারাই পাল্টে যাবে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! এই দেশে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থই বড়। এখানে সবাই বিচ্ছিন্নভাবে বাঁচতে চায়। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘এটোমিজম’। বাঙালিরা এখনো একটি ‘এটমিক’ জাতি। জাতীয় সংহতির ক্ষেত্রে আমরা এখনও একটি জায়মান অবস্থা বসবাস করছি। তরল পদার্থের অনুগুলোর মতো বাঙালি জাতীয়তার অনুগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন অত্যন্ত দুর্বল। এই দেশ এখনও জগৎশেঠ, মীরজাফর আর রাজাকার আলবদরদের লীলাক্ষেত্র। এখানে একজন ভিক্ষুক থেকে শুরু করে শিল্পপতি; একজন স্কুল শিক্ষক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, তৃণমূলের পাতি নেতা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের ঘাঘু নেতারা পর্যন্ত নিজেদেরকে অন্য সবার চেয়ে ভিন্নভাবে ও পৃথক ভাবে দেখেন। আপন স্বার্থের ঊর্ধ্বে আমরা এখনও কেউ উঠতে পারিনি। এদেশে এককভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের আকাঙ্খা ও বিত্তশালী হওয়ার প্রচেষ্টা গোটা জাতিকেই একটি শূন্য ফলাফলের নিরবিচ্ছিন্ন জুয়া খেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একজনকে বঞ্চিত করে অন্যজনের প্রতিষ্ঠা তথা বিত্তবৈভব লাভই আমাদের প্রধান কৌশলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সব কিছু যোগ করলে আমাদের জাতীয় ফলাফল শূন্য না হলেও শূন্যের কাছাকাছি যায়।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশে তার বর্তমান সফরের সময় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাঙালিরা এক হলেই উন্নতী লাভ করতে পারবে। আমি তার সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, বাঙালিরা নিজেদের বিচ্ছিন্নভাবে (এটমিক) চিন্তা না করে সম্মিলিতিভাবে উন্নতির চিন্তা করলেই প্রকৃতপক্ষো উন্নত হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে/ তবে একলা চলরে। আমার উপলব্ধিতে এখানে, আসলে, কেউ  ডাকই দেয় না। সবাই একলা চলে। এখানে কেউ সম্মিলিত হবার মন্ত্রে বিশ্বাসী নয়।এখানে সবাই বিচ্ছিন্নভাবে চলে।বিচ্ছিন্নতাই যেন বাঙালির অন্যন্যতা।

(১৭/০৩/২০১৪)