ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
111

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরোজ্জ্বল ভূমিকার গৌরবগাথা বেশ কিছুদিন প্রচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল৷ স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরু ও শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথম গুলি ছোঁড়া ও প্রথম গুলিটি বুক পেতে নেয়ার কৃতিত্ব সেই সময়ের বাঙালি পুলিশ সদস্যদের ৷ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সকে কব্জা করতে পাকিস্তানিদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল ৷ অন্যদিকে সামরিক শক্তির কাছে পুলিশ শক্তির অনিবার্য পরাজয় জেনেও রাজারবাগের বাঙালি অফিসার-ফোর্সগণ যুদ্ধ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছেন কিংবা আত্মরক্ষা ও বৃহত্তর যুদ্ধের অংশ হওয়ার জন্য অনেকে পশ্চাদাপসারণ করেছেন ৷

 

কিন্তু এতো গেল ঢাকার কথা ৷ ঢাকার বাইরে কি ঘটেছিল সে সময়? সেই সময় বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বৈধ অস্ত্রধারী শৃঙ্খলাবদ্ধ গোষ্ঠী ছিল পুলিশ, ইপিআর ও আনসার ৷ ইপিআর সরাসরি পুলিশ কমান্ডেই চলত ৷ আনসার বাহিনীর অস্ত্র-গোলাবারুদ মূলত পুলিশের হেফাজতেই থাকত ৷ অধিকন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক বাহিনী হিসাবে মাঠ পর্যায়ের আনসার সদস্যগণ মূলত পুলিশ কমান্ডেই চলত ৷ এমতাবস্থায়, মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্র, গোলা-বারুদ, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয় মূলত পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকেই এসেছিল ৷ দেশের প্রায় সব স্থানেই মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের প্রাথমিক উত্‍স ছিল পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রাগারগুলো ৷ স্থানীয় পুলিশ কমান্ডারগণ প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষভাবে হোক, তাদের অধীন রক্ষিত অস্ত্রভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৷

 

যে সব জেলা বা থানা-ফাঁড়িতে বাঙালি অফিসার নেতৃত্ব পর্যায়ে ছিলেন, সেখানে এই প্রক্রিয়া ছিল অনেকটাই সহজতর ৷ কিন্তু অবাঙালির হাতে কমান্ড থাকা পুলিশ ইউনিটগুলোকে বাঙালি অফিসারদের সহায়তায় দখল করতে হয়েছিল এবং অবাঙালি পুলিশ সদস্যদের বন্দী করতে হয়েছিল ৷ সে সময় বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তা তাদের অধীন পুলিশ ফোর্স ও মওজুদ অস্ত্র নিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ৷ তারা শুধু পুলিশের অস্ত্র গোলাবারুদই বিতরণ করে জাতির ক্রান্তিকালে পবিত্র দায়িত্ব পালন শেষ করেননি, স্থানীয় স্বাধীনতাকামী তরুণ-যুবকদের যুদ্ধকৌশল ও অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা তাদের অধীক্ষেত্রকে হানাদার মুক্ত রাখার প্রচেষ্টাও গ্রহণ করেছিলেন ৷

 

এমনি একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন তত্‍কালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার পুলিশ প্রশাসক (এসডিপিও) জনাব মাহবুব উদ্দিন ৷ সেই সময় তিনি প্রাণবন্ত এক তরুণ  অফিসার ৷ তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বনে যান ৷ অবশ্য তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন একই মহকুমার মহকুমা প্রশাসক জনাব তৌফিক এলাহী ৷ এই দুই পাবলিক সার্ভেন্ট মিলে মেহেরপুরকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর মেহেরপুরের ভৌগোলিক অবস্থানও এমনই ছিল যে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এই মেহেরপুরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের গৌরব অর্জন করেছিলে ৷

 

১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যার বর্তমান নাম মুজিবনগর, সেখানে যে সরকার গঠিত হয়েছিল তার শপথ অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরি, তার নিরাপত্তা ও সর্বশেষ শপথ নেয়া নতুন সরকারের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদানের বিরল কৃতিত্ব ও সম্মানের অধিকারী ছিলেন এসডিপিও জনাব মাহবুব উদ্দিন৷ এসডিপিও মাহবুব উদ্দীনের দেশ প্রেমের সাথে যুক্ত হয়েছিল তার যুদ্ধ কৌশল ও সাংগঠনিক ক্ষমতা ৷ তার নেতৃত্বে মেহেরপুর, চুয়াডাংগা ও যশোরে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানী বাহিনী ছিল বড় অসহায় ৷ যুদ্ধ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহরে মাথায় কুষ্টিয়ার বিষয়খালীর সম্মুখ সমরের তিনি অকুতভয় সেনাপতি । তার ব্যতীক্রমী যুদ্ধকৌশলে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা পাকবাহিনীর নিয়মিত যোদ্ধারা পরাজিত হয়ে মেহেরপুর ছেড়ে পাততাড়ি গুটিয়েছিল।

 

এসডিপিও মাহবুবু বাহিনীর বীরত্বের কাহিনী সেই সময় প্রকাশিত হয়েছিল বিবিসিসহ বিশ্বের নামিদামি প্রচার মাধ্যগুলোতে। তার এই বিজয় বাঙালি জাতিকে প্রভূত আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছিল। সেই সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সব অফিসারই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহের সুযোগ যে পেয়েছিলনে তা কিন্তু নয় ৷ আবার সুযোগ থাকলেই যে সবাই তার সদ্ব্যবহার করেছিলেন তাও নয় ৷ যারা সদ্ব্যবহার করেছিলেন এবং সীমান্তের ওপারে গিয়ে যুদ্ধ না করে দেশের ভিতর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ধারায় নিজেদের যুক্ত রেখেছিলেন তাদের অনেকেই পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছিলেন ৷ এই শহীদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজশাহী রেঞ্জ এর ডিআইজি মামুন মাহমুদ, রাজশাহী জেলার এসপি আব্দুল মজিদ, রাজশাহী গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক নাজমুল হক, কুমিল্লা জেলার এসপি মুন্সী কবীরুদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলার এসপি সামসুল হক ও তত্‍কালীন বরিশাল জেলার পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও ফয়জুর রহমান ৷

 

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ তথা তত্‍কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণ একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত হয়েছিলেন ৷ একদিকে স্বাধীনতার চেতনা, অন্যদিকে তাদের সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় আনুগত্য; এক দিকে স্ত্রীপুত্র-পরিজন নিয়ে একটি আটপৌরে স্বাভাবিক জীবনের লোভ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণের জন্য দেশত্যাগ করা; একদিকে দেশের অভ্যন্তরে থেকে সরব বা নীরব প্রতিবাদ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সশস্ত্র সংগ্রামে তথ্য, উপাত্ত ও মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের নিরাপদ আশ্রয় দেবার বাসনা, অন্যদিকে পাকিস্তানী সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের এই তত্‍পরতা উদ্ঘাটিত হবার ভয়- -সবকিছু মিলে তারা এক বিভীষিকার মধ্যে বসবাস করতেন ৷

 

এর মাঝে দুই শ্রেণীর অফিসার-কর্মচারী তাদের সিদ্ধান্ত সরাসরি জনসমুখে ঘোষণা করে সেই অনুপাতে কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন ৷ এরা ছিলেন হয় মুক্তিযোদ্ধা, নয়তো রাজাকার বা স্বাধীনতার প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী৷ স্বাধীনতার সপক্ষের চূড়ান্ত ফায়সালাকারীদের জ্বলন্ত উদাহরণ এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন ৷ এখানে স্বাধীনতা বিরোধীদের নাম উল্লেখ করা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করি ৷ কিন্তু এই যে স্বাধীনাতার সপক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান ঘোষণা করা এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া, এটা কোন চাট্টিখানি কথা ছিলনা ৷ একজন মানুষ স্বাধীনতার মন্ত্রে প্রকৃতই বিহব্বল না হলে তার নিজ ও পরিবারের জীবনকে বিপন্ন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননা ৷ সে সময় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অনেক জেলা বা মহকুমার পুলিশ ও সাধারণ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা বেতন-ভাতা আর নিশ্চয়তা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের চাকুরি করেছেন ৷ আবার তাদেরই সহকর্মীগণ গভীররাতে তাদের পরিবার-পরিজনের কঠিন দুরবস্থার কথা জেনেও মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছেন৷ সে সময়ের পুলিশ একাডেমি সারদার প্রিন্সিপাল জনাব আব্দুল খালেক তার বেশ কিছু সহকর্মী ও ক্যাডেট নিয়ে পদ্মা নদী পায় হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন ৷ কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে সারদা একদম খালী হয়ে যায়নি ৷

 

অবস্থাটি পরিষ্কার করার জন্য আমরা ডিএসপি মাহবুব উদ্দীনসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ অফিসারদের সাথে আমরা কয়েকজন অমুক্তিযোদ্ধা পুলিশ অফিসারের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন ভূমিকা বিশ্লেষণ করব৷ জনাব আব্দুর রকিব খন্দকার৷ স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন তিনি প্রথমে খুলনা জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন৷ স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানে পাদায়িত ছিলেন৷ কোন রকমে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে (মানে বন্দি শিবিরে না গিয়ে) তিনি আফগানিস্থান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন ৷ পরে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদ আইজিপি পর্যন্ত হয়েছিলেন৷

 

জনাব আব্দুর রবিক খন্দকারের আত্মজীবী[1] থেকে জানা যায়- স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তিনি খুলনার পুলিশ সুপার ছিলেন ৷ তিনি ও খুলনার জেলা প্রশাসক জনাব নুরুল ইসলাম খুলনায় পাক সেনা কমান্ডারের (বন্দীত্বে হোক আর সুরক্ষায় হোক) এর অধীন ছিলেন ৷ ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তারা বরিশাল হয়ে ঢাকায় ছুটি কাটাতে এসেছিলেন ৷ পথে বরিশালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মেজর জিয়া উদ্দিনের হাতে পাকিস্তানের পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের অপরাধে অভিযুক্তও হয়েছিলেন ৷ সে সময় বরিশাল এলাকা এক প্রকার হানাদার মুক্তই ছিল ৷ পরে নানা চড়াই উত্‍রাই পেরিয়ে ঢাকায় ছুটি কাটিয়ে খুলনায় প্রত্যাবর্তন করেন তারা ৷ সেখানে পাক সেনা কমান্ডারের সন্দেহের কবলে পড়েন ৷ তাদের সেখানে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ দিতে হয় যে, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী নন ৷ জনাব রকিব সেই পরীক্ষায় ‘ধূসর র‌্যাংকিং’এ পড়েন ৷ মানে তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে কিছুটা সন্দেহ করা হয়েছিল ৷ তাই তাকে খুলনা থেকে সরিয়ে করাচিতে পাঠানো হয় ৷ তিনি তার করাচি পোস্টিং বাতিলের জন্য টিক্কা খানের শরণপন্নও হয়েছিলেন৷ কিন্তু ঠেকাতে পারেননি ৷

 

জনাব রকিব মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিলেন ৷ এমনকি একজন কমান্ডারে অধীনে একটি মুক্ত অঞ্চলে আশ্রয়ও পেয়েছিলেন ৷ কিন্তু তার পরেও তিনি সরকারের চাকুরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে অনিশ্চিত জীবনে প্রবেশ করতে চাননি ৷ তার দীর্ঘ জীবনীতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দেয়ার পিছনে কোন কারণ তিনি উল্লেখ না করলেও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পোস্টিং-এ যেতে না চাওয়ায় একটি কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন-

My younger brother Abdus Salam Boby had joined the Mukti Bahini across the border in Meghalaya. In my absence, that whole family including my minor children would go uncared.[2]

এমন ধরনের মানসিক অবস্থা ও বাস্তব যুক্তি ছিল অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের৷ তবে মজার বিষয় হল, তিনি চাইলেও শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশে থাকতে পারেনি ৷ তার স্ত্রী-পরিজন শেষ পর্যন্ত থেকে গিয়েছিল৷ তবে বিপদগ্রস্ত হয়নি ৷ কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলে তা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল ৷ জনাব জাকির হোসাইন খান ৷ মুক্তিযুদ্ধ শুরু যখন হয়, তখন তিনি রেলওয়ে পুলিশের সৈয়দপুর অঞ্চলের এসপি ছিলেন ৷ প্রথম দিকে পাকসেনারা তাকে পরিবারসহ তার সৈয়দপুরের সরকারি বাংলোতে এক প্রকার নজরবন্দি করে রাখে ৷ কিন্তু ধীরে ধীরে তাকে পাক কর্তৃপক্ষের অনেকটাই প্রয়োজন পড়ে ৷ তাছাড়া তিনি পাককর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যাবেন না এমন বিশ্বাসও সৃষ্টি করতে সক্ষম হন ৷

 

সন্দেহ তিরোহিত হলে তাকে সৈয়দপুর রেলওয়ে পুলিশ থেকে যশোর জেলার এসপি হিসেবে বদলী করা হয় ৷ সে সময় যশোর জেলার অধিকাংশ পুলিশ অফিসার চলে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে৷ তৎলীন এসপি সাহেব ঢাকায় ছুটিতে গিয়ে আর যশোর ফেরত আসতে চাননি ৷ এমতাবস্থায়, জনাব জনাব জাকির হোসেন যশোরে পোস্টিং পান ৷ তিনি তার পরিবারকে সৈয়দপুর রেখে ট্রেনযোগে যশোর আসেন ও দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ৷ তার আত্মজীবনী ‘পুলিশের রোজনামচায়'[3]   মুক্তযুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেক ঘটনার সমাবেশ ঘটেছে ৷ যশোর সেনানিবাসের পাক জেনারেলগণ এসডিপিও মাহবুব সাহেব ও তার মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের ভয়ে কতটা ভিতু ছিল তার লিখনীতে তারও বর্ণনা আছে ৷ তার এলাকার নড়াইল মহকুমায় এক দারোগা মুক্তিযোদ্ধাদের নিধন করে কিভাবে রাতারাতি ইন্সপেক্টর হলেন ও স্বাধীনতার পরে সে পদোন্নতিপ্রাপ্ত দারোগার কি ভয়ানক মৃত্যু হয়েছিল তারও বর্ণনা রয়েছে ৷ বিজয়ের কয়েকদিন পূর্বে পাকসেনাদের গণহত্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য যশোরের ডিসি এসপি মিলে পালিয়ে কিভাবে খুলনায় যান এবং স্বাধীনতার পরে কিভাবে যশোরে এসে আবার বহাল তবিয়তে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব পালন শুরু করেন ইত্যাদি নানা ঘটনায় পরিপূর্ণ জনাব জাকির হোসাইনের আত্মজীবনী ৷

 

তবে তিনি এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি তার কোন বিবরণ বা ব্যাখ্যা তিনি তার বইতে দেননি ৷ অবশ্য এটা দেবারও প্রয়োজন নেই৷ কারণ একটি অপেক্ষাকৃত সুস্থ্য, স্বাভাবিক ও নিশ্চিত জীবন ছেড়ে সাধারণ মনের, নৈতিকতার বা সাধারণ মাত্রার দেশ প্রেমের মানুষ যে প্রচলিত বা বর্তমান শাসনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করবে না এটাইতো স্বাভাবিক ৷ আমাদের মহান হিরো এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন যে কোন সাধারণ নৈতিকতা বা সাধারণ মাত্রার দেশ প্রেমের কেউ ছিলেন না তা জনাব আব্দুর রকিব খন্দকার ও জনাব জাকির হোসাইনের জীবনীতে বিবৃত ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, আমরা যারা পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালি বা বাংলাদেশি অথবা যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় নাবালক বা শিশু ছিলাম কিংবা যারা জন্মেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের বাতাস দিয়ে ফুসফুস ভরিয়েছিলাম এবং পরবর্তীতে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ করেছি নিজেদের ও পরিবারের জন্য রুটিরুজির সংস্থান করছি, তাদেরকে এসডিপিও মাহবুব উদ্দিনের মতো দেশ প্রেমিক ও মহান মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার মতো অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে গেছেন ৷

 

পুলিশ বা সাধারণ প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে দেশের ও জাতির কিছু মুহূর্তে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় ৷ এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সময় ছিল ১৯৭১ সাল৷ সেই সময় বাঙালি পুলিশ অফিসারগণ কি অবস্থায় ছিলেন তার খন্ড চিত্র এঁকেছেন অন্য একজন অমুক্তিযোদ্ধা পুলিশ অফিসার জনাব সিকান্দার আলী ৷ তিনি সেই সময় পুলিশের ইন্সপেক্টর ছিলেন ৷ তার বয়স হয়েছিল বেশ ৷ তিনি ঢাকার এসবিতে চাকুরি করতেন ৷ যুদ্ধের প্রথম দিকেই তিনি পরিবারকে গ্রামের বাড়ি রেখে আসেন ৷ কিন্তু এই সময় সরকারী কর্মচারী তথা পুলিশ কর্মকর্তাদের দুঃসহ চাকুরি জীবনের চমত্‍কার বিবরণ দিয়েছেন তার আত্মজীবনীতে-

আমি বাঙ্গালি পুলিশ হয়ে মুক্তিবাহিনীর পিছনে কিছুতেই লাগতে পারব না৷ রাজাকার দল গঠন করতে সহায়তা করতে পারব না৷ ঐ সময় দেশে এমন অবস্থা বিরাজমান ছিল যে পাক আর্মিদের কথা না শুনলে নিজের প্রাণ যায়, শুনলে দেশের চরম ক্ষতি হয়৷ ইউনিফর্মধারী পুলিশের এসব বিপদ এড়ানো কঠিন ছিল[4] ৷

আমরা অতি ভাগ্যবান যে এই মুহূর্ত আমাদের জাতীয় জীবনে আর কোন দিন সেই দুঃসহ ক্ষণ উপস্থিত হবে না৷ আমাদের দুলতে হবে না মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা হবার মাপনি পাল্লায় ৷ আমাদের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিনের মতো মুক্তিযুদ্ধে যাবরা, ডিআইজি মামুন মাহমুদ প্রমুখদের মতো শহীদ হবার কিংবা এসপি রকিব খন্দকার বা জাকির হোসাইনের মতো মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দেবার মতো কোন চরম সিদ্ধান্ত নিতে হবে না ৷ আমাদের কেউ মুক্তিযোদ্ধা না বলুক, অন্তত রাজাকার বা পাক বাহিনীর দোসর বলে দোষারোপ করবে না ৷ আমি আমার সহকর্মীদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করব না কিংবা আমার দেশ প্রেম নিয়ে কেউই প্রশ্ন তুলবেন না ৷ সেলুট এসডিপিও মাহবুবসহ লাখো মুক্তিযোদ্ধাদের ৷ তোমরা আমাদের শুধু একটি স্বাধীন দেশই যুদ্ধ করে এনে দাওনি, আমাদেরকে একটি বিতর্কহীন পরিচয়ও উপহার দিয়েছ ৷ (১৯/০৪/২০১৪)

 

সূত্রাবলী:

[1]  Society, Politics and Public Order: Memoirs of a Police Chief (UPL:1998)

[2]Rakib Abdur(1998);Society, Politics and Public Order: Memoirs of a Police Chief :UPL:pp-149)

[3]  এস. জাকির হোসেইন, পুলিশের রোজনামচা, বিদ্যাসাগর সোসাইটি,ঢাকা

[4] আমার পুলিশ জীবন,সেকান্দার আলী, পিপিএম, গ্লোব লাইব্রেরি লিমিটেড;  পৃষ্ঠা-২৫৯

 

 

 

(১৯/০৪/২০১৪)