ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ কর্তৃক বার্ষিক বা অর্ধ বার্ষিক থানা পরিদর্শন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পরিদর্শন তত্ত্বাবধানের একটি অপরিহার্য উপাঙ্গ। প্রত্যেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার অধীনস্ত অফিসগুলোকে নিয়মিত পরিদর্শন করে সেই সব অফিসের কাজকর্মেও মূল্যায়ন করেন, ভুল-ত্রুটিখুঁজে বের করে সেগুলো সংশোধনের পথ নির্দেশ করেন। পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল থেকে শুরু করে সার্কেল এএসপি পর্যন্ত তার অধীনস্ত অফিসগুলোতে বাৎসরিক বা অর্ধবাৎসরিক পরিদর্শন করেন। এটা পুলিশ সুপারভাইজারদের একটি রুটিন কর্ম।

শিক্ষাণবিশ অবস্থায় আমার গুরু সার্কেল এএসপি জনাব মোঃ ফারুকুজ্জামানকে দেখেছি দিনাজপুর জেলার চিরির বন্দর পুলিশ ফাঁড়ি পরিদর্শনকালে ফাঁড়ির সকল অস্ত্র একটি একটি করে ফাঁড়ির বাইরে নিয়ে এসে গুণে তারপর পরিদর্শন বইতে সই করেছেন।ফাঁড়ির অফিসারদের তৈরি করা খসড়া নোটটি তার কাছে প্রকৃত পক্ষেই খসড়া ছিল।প্রত্যেকটি বিষয় নিজে না দেখে তিনি নিশ্চিত হতে চাননি। হতে পারে আমার মতো একজন প্রবেশনারকে ব্যাকরণমত শিক্ষা দিতে গিয়ে তিনি তা করেছেন। তবে তিনি যে প্রকৃত অর্থেই একজন পেশাদার পুলিশ অফিসার ছিলেন, তা আমি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে উপলব্ধি করেছি।

পরবর্তী সময়ে আমি বাস্তব ক্ষেত্রে থানা-ফাঁড়ি-তদন্ত কেন্দ্র ইত্যাদি পরিবদর্শন করতে গিয়ে আমার গুরুর আচরণ পূনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করেছি। তবে পুলিশিং পেশায় অভিজ্ঞতা একটি বড় নিয়ামক বস্তু। অভিজ্ঞতা এখানে অনেক কিছুই গ্রহণ-বর্জনে সহায়তা করে। প্রতিদিন এখানে অনেক কিছু শিখতে হয়, অনে কিছু ভুলেও যেতে হয়। যেমন, প্রবেশনার অবস্থায় বিখ্যাত ও অধুনালুপ্ত ভিলেজ ক্রাইন নোট বুকের একটি নমুনা মাত্র দেখেছিলাম।কিন্তু এই বুক সম্পর্কে আমাকে হাতে কলমে শিক্ষা দেবার কেউ ছিল না।পরবর্তীতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের খালিশপুর জোনের এসি থাকাকালীন দৌলতপুর থানায় একটি প্রায় হালনাগাদ ভিলেজ ক্রাইম নোট বুক দেখেছিলাম। বইটি হালনাগাদ না হলেও এখনও অক্ষত রয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। আমরা অবশ্য ভিলেজ ক্রামই নোট বুকের কথা একদম ভুলে গেছি। তেমনি ভুলে গিয়েছি ক্রিমিনাল গেজেটের কথাও।

যাহোক, থানা-ফাঁড়ি পরিদর্শনের একটি বড় অংশ থাকে থানার অপরাধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা। এ বিশ্লেষণের আবার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে থানায় রুজুকৃত ধর্তব্য মামলাগুলো পরিসংখ্যান। সাধারণত হাল আমল থেকে শুরু করে বিগত পাঁচ বছরের সকল মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাকে তার একটি মূল্যায়ন দিতে হয়। সে সাথে দিতে হয় অপরধাগুলো নিয়ন্ত্রণে তার মূল্যবান পরামর্শ বা মতামত।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বর্তমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খুব কমই এই কাজটি করে থাকেন। কেউ কেউ করেন নিতান্তই দায়সারা গোছের। তবে অধিকাংশ অফিসার থানার মুনসি (একজন কনস্টেবল) রেকর্ডপত্র ঘেঁটে সাধারণত যে পরিসংখ্যানটি তৈরি করেন তার উপরই শতভাগ নির্ভর করেন। তৈরিকৃত নোটে তিনি নিজে একটি মান্ধাতার আমলের গদ লিখে দেন। অনেক সময় এসপি বা এডিশনাল এসপি সাহেবের স্টেনো সাহেবও তা লিখে দেন। আর অধিকাংশ এসপি বা এডিশনাল এসপিগণ এতে অন্ধের সইয়ের খোঁচা মেরে দেয়ার তালে থাকেন।

এই অন্ধের সইটির সুবিধা হল, এ ইন্সপেকশন নোটটি সাধারণত কেউ পড়েন না। থানার অফিসারগণ অনেক সময় এর পাশে ‘দেখিলাম’, ‘সচেষ্ট থাকিলাম’ ইত্যাদি মুখস্ত করা কিছু কথা লিখে দেন। তবে আমার বিশ্বাস তারাও এগুলোর বিন্দু বিসর্গ পড়েন না।পরবর্তীতে এর উপর একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন হয়তো কেউ কেউ চেয়ে পাঠান। থানার অফিসার-ইন-চার্জ তা আবার ঘটা করে পদির্শনকারী অফিসারের কাছে হয়তো পাঠান।এরপর বিষয়টির সম্পূর্ণ ইতি।

তবে কোন পুলিশ স্থাপনার বার্ষিক বা অর্ধবার্ষিক পরিদর্শন কালে পরবর্তী পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাকে পূর্ববর্তী পরিদর্শনকারী কর্মকর্তার ইন্সপেকশন নোটটি পড়তে হয়। তবে এটাও কিন্তু কাগজে কলমে। এসপির পরিদর্শন নোট এডিশনাল এসপি কদাচিৎপড়েন, আবার এডিশনাল এসপির নোটটিও সার্কেল এএসপি হয়তো বাস্তবে হাতেই নেন না। তবে তারা সবাই নিজ নিজ নোটে লিখেন, মানে স্টেনোগণ লিখে দেন, তিনি পূর্ববর্তী অফিসারের নোটটি পড়েছেন। এভাবেই দিনের পর দিন আমরা কাগজে কলমে মিথ্যে কথা লিখে লিখে পরিদর্শন বই ভাসিয়ে দিচ্ছি।

আমি সম্প্রতি বিশেষ কারণে অনেক থানায় ইন্সপেকশন বইগুলো পড়ে দেখেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল ইন্সপেকশন বই থেকে অপরাধ পরিংসখ্যান বের করা। কিন্তু এই বই পড়তে গিয়ে আমি দুর্লভ কিছু অভিজ্ঞতার সমুখীন হয়েছি। কিছু কিছু থানায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শন নোটে অপরাধ পরিসংখ্যান অতি চমৎকারভাবে তুলে ধরা আছে। এখানে বিশ্লেষণগুলোও চমৎকার। কিন্তু কিছু কিছু থানায় পরিদর্শন নোটে অপরাধ পরিসংখ্যান এক দম অনুপস্থিত। এখানেও সেই একই অবস্থা। অপরাধ পরিসংখ্যান ও তার বিশ্লেষণ থানার মুনসি কিংবা স্টেনোরা তৈরি করে দেন।ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা পড়েও দেখেন না। পরিদর্শন শেষে পরিদর্শন বইতে সইকরেন। পরবর্তীতে পরিদর্শন নোটের অন্ধের মতো সই করেন। কোন অপরাধ বাড়ল, কোন অপরাধ কমল, পূর্ববর্তী বছর গুলোর তুলনায় পরবর্তী বছরগুলোর কি মিল বা অমিল রয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে তারা থোড়াই কেয়ার করেন।

আমি এমন একটি থানার ইন্সপেকশন নোট দেখেছি যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার কোন হিসেব পর্যন্ত নেই। পরিসংখ্যানের একটি কলামে এ আইনের অধীন মামলার কথা লেখা হলেও কলামের ঘরগুলো সম্পূর্ণ ফাঁকা এবং বিশ্লেষণ বা মন্তব্যে কোথাও এই আইনের মামলার কথাটি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি।

থানার পরিদর্শন বই বা পরিদর্শন নোটগুলো সে থানার আয়না স্বরূপ।ইন্সপেকশন বই হাতে নিলেই বোঝা যাবে এই থানা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিন্তা-চেতনা বা পরামর্শ কি? একটি পরিদর্শন নোট সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পেশাগত জ্ঞানেরও বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এ বিষয়ে তারা যদি নিজেরা সচেতন না হন, পরিদর্শন নোট সমূহ যদি মুনসী, কেরানি বা স্টেনোদের মস্তিষ্কের নির্যাস দিয়ে ভরা থাকে তবে সেই ইন্সপেকশনেরই কি দরকার আর ইন্সপেকশন নোটেরই কি দরকার?( ২০ জুলাই, ২০১৩)