ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সারা বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি বিরোধী ধারণার প্রচার, প্রসার ও গবেষণার জন্য আমার জানা মতে একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হল ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’। বার্লিন ভিত্তিক এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির একশরও বেশি দেশে শাখা অফিস বা চেপ্টার রয়েছে। প্রত্যেক দেশের খ্যাতনামা নিষ্কুলষ চরিত্রের নাগরিকগণ সাধারণত এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। কিন্তু যেহেতু তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপনা করেন, তাই এসব খ্যাতনামা ব্যক্তিগণ অনেক সময় বিতর্কিত হয়ে পড়েন। এ বিতর্কের সূচনা করেন সাধারণত ক্ষমতাসীনরাই। কেননা, দুর্নীতির প্রতিবেদন বা জরিপগুলো মূলত ক্ষমতাসীনদেরই ঘাড়ে তুলে নিতে হয়। বিষয়টি সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও মোটামুটি একই রকম।

ইতোপূর্বে আমার একটি লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম, টিআইবি’র পাবলিক পারসেপশন জরিপে ঘোড়া আর গাধার দর সমান ধরা হয়। যেমন, পুলিশ কনস্টেবল কর্তৃক ১০ টাকার উৎকোচ গ্রহণ আর হল মার্কের ১০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির মধ্যে টিআইবি’র পারসেপশন আলাদা করতে পারে না। কিন্তু তাই বলে পারসেপশন জরিপকে অমূলক বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলার ঘোর বিরোধী আমি। বর্তমান নিবন্ধে আমি দুর্নীতির তিনটি মাত্রায় পুলিশকে স্থাপনকরে টিআইবির পারসেপশন জরিপকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।

দুর্নীতির তিনটি মাত্রা বা ডাইমেনশন রয়েছে। এগুলো হল বিস্তৃতি, গভীরতা ও স্থায়ীত্ব। দুর্নীতির সঠিক চিত্রটি তুলে ধরতে গেলে তাই তিনটি মাত্রাই আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। কিন্তু তিনটি মাত্রার সমাহার যেমন জটিল, তেমনি ব্যয় বহুলও বটে। অন্যদিকে, এ ত্রিমাত্রিক গবেষণার জন্য যে ধরনের মেধা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, সারা পৃথিবীতেই তার দারুণ ঘাটতি রয়েছে। বলাবাহুল্য, বিশেষজ্ঞ তৈরিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরুণ দরকার। পারমাণবিক গবেষণার ক্ষেত্রে পৃথিবীতে যে তড়িৎ উন্নতি হয়েছে কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরির যে বিস্ময়কর সাফল্য, তা যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজ থেকে অর্থ বরাদ্দ না করত সেটা এই পর্যায়ে আসতে পারত না। ঠিক একই ভাবে অন্যান্য গবেষণার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া একক ব্যক্তি বা শুধু কোন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারে না।

দুর্নীতি বিরোধী গবেষণার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার দারুণ অভাব রয়েছে। এর কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত, দুর্নীতি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। যদিও ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘ একটি দুর্নীতি বিরোধী ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেছিল, কিন্তু তা মূলত কার্যকরী হয় ২০০৩ সালে। মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গুলোর তুলনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত উদ্যোগ যে অতি হাল আমলের এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগে অনেকটাই অবহেলা রয়েছে, তা এ থেকে অনুমান করা যায়।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয় ও অনুশীলন হয় মূলত ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠীত ব্যক্তিগণ ও তাদের সহযোগীগণ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ মূলত ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের নামান্তর হয়ে যায়। যারা ক্ষমতা প্রয়োগ করেন বা ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেরা লাভবান হন, তারা এমন কোন পদক্ষেপ নিতে সহজে উৎসাহী হবেন না যা তাদের বিপক্ষে যায়। এমতাবস্থায়, দুর্নীতির কারণ, বিস্তৃতি, প্রকৃতি কিংবা এর তাত্ত্বিক দিক নিয়ে গবেষণার জন্য কোন রাষ্ট্রের সরকারগণই অর্থ ছাড় করতে উৎসাহীত নয়। বরং ঘটনা ঘটে উল্টো। দুর্নীতি দমনের জন্য গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা নিজেদের বলয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। পৃথিবীর কম সংখ্যক দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান নিজেদের কার্যকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। ক্ষমতাসীন সরকারগণ কেবল তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করতেই দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে।

দুর্নীতির তিনটি মাত্রার মধ্যে টিআইবি সাধারণত একটি মাত্রার জরিপ পরিচালনা করে। সেটা হল বিস্তৃতি। অনেক সময় তাদের জরিপে স্থায়ীত্ব বিষয়টি আসে। কিন্তু অপর মাত্রা গভীরতাটি তাদের গবেষণার অতীতই রয়েযায়। পারসেপশন জরিপে মানুষ সামনে যা দেখে বা যা শোনে তার বাইরে কিছু অনুমান করতে পারে না। এখানে বিস্তৃতি ও স্থায়ীত্বের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়।

বাংলাদেশের মানুষ নানা কারণে পুলিশের দ্বারস্থ হতে হয়। এক্ষেত্রে তারা পুলিশ কর্তৃক সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট দুটোই হতে পারেন। সন্তুষ্ট হলে তাদের পুলিশ সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা হতে পারে। কিন্তু অসন্তুষ্ট হলে সে পুলিশকে খারাপ ভাবেই চিত্রায়িত করবে। অন্যদিকে, পুলিশ সম্পর্কে যুগযুগান্তর ধরে যে নেতিবাচক ধারণা মানুষের মনে রয়েছে, উপকথা, রূপকথা, গান-গল্প, উপন্যাস-চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ পুলিশের দুর্নীতির যে খণ্ড চিত্রগুলো অবলোকন করে, সেগুলোও পুলিশ সম্পর্কে তাদের একটি নেতিবাচক মত তৈরিতে সহায়তা করে। এখানে দুর্নীতির বিস্তৃতি ও স্থায়ীত্ব –দুটোই মানুষের মনে রেখাপাত করে। তাই দুর্নীতির প্রসংগ এলে মানুষ কাকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিবাজ বলে সিদ্ধান্ত নিবে তা তার স্মৃতির গভীরে অনুসন্ধান করে। আর তার স্মৃতিতে সহজলভ্য বস্তুটি হচ্ছে পুলিশ।

পত্রপত্রিকা বা অন্য কোন মারফতে মানুষের স্মৃতিতে শিক্ষা বিভাগ, কাস্টমস, প্রকৌশল বিভাগ ইত্যাদি আসতে পারে। কিন্তু বিস্তৃতি ও স্থায়ীত্বের প্রশ্নেএগুলো মানুষের মনে তেমন গুরুত্ব পায় না। অন্যদিকে, গভীরতার দিক থেকে পুলিশের চেয়ে অন্যান্য বিভাগগুলো অনেক বেশি দুর্নীতি করলেও বিস্তৃতি ও স্থায়ীত্বের মাত্রায় তারা ম্লান হয়ে যায়।

তাই টিআইবি এর জরীপ থেকে এটা ভেবে নেওয়ার কোনই কারণ নেই যে বাংলাদেশে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পুলিশ বা বিচার বিভাগই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। এই সব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিস্তৃতি বেশি হলেও এদের মধ্যে দুর্নীতির গভীরতা কতটুকু তা টিআইবি বলতে পারে না। অন্যদিকে, গভীরতার মতো একটি বিমূর্ত ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। কাস্টমস অফিসের ঘুষ বা পার্সেন্টেজ লেনদেন শুধু সেই বিভাগের কর্মচারী ও ডিউটি ফাঁকি দেওয়া ব্যবসায়ীগণই জানেন। প্রকৌশল অফিসের দুর্নীতির বিস্তৃতি প্রকল্প প্রাক্কলন থেকে শুরু করে ঠিকাদারকে সর্বশেষ জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়া পর্যন্ত। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় সাধারণ মানুষের অগোচরে। এই ক্ষেত্রে দুর্নীতির মাধ্যমে যে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় তা যদিও জনগণের অর্থ, কিন্তু যে অর্থ জনগণের পকেট থেকে সরাসরি ব্যয় হয় না সেই অর্থের কুষ্ঠি গণনা করে জনগণ অনর্থক সময় ব্যয় করতে চায় না।

অন্যদিকে, শুধু সাধারণ মানুষই নয়, জনগোষ্ঠীর বোদ্ধা অংশটিও দুর্নীতিকে শুধু ঘুষের অংকে পরিমাপ করতে অভ্যস্ত।যারা জনগণের কাছ থেকে সরাসরি ঘুষ নেন, অধিকাংশ মানুষ দুর্নীতিবাজ বলতে সেইসব কর্মচারিকেই জানেন বা বোঝেন। সেক্ষেত্রে কোন অফিসের পিওন বা কেরানিই তাদের কাছে দুর্নীতিবাজ; অফিসের বস বা কর্তাব্যক্তিরা নন। কারণ, এই ঘুষের ভাগ যে কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছে কিংবা পোস্টিং, পদায়ন, পদোন্নতি ইত্যাদির মাধ্যমে কর্তাব্যক্তিরা যে নিম্ন শ্রেণির কর্মচারিদের কাছ থেকে আগেই ঘুষের বখরা আদায় করেন, সাধারণ মানুষ তার কোন খবরই রাখেন না।

দুর্নীতির বিস্তৃতিতে ঘুষ একটি বড় নিয়ামক হলেও দুর্নীতির গভীরতায় ঘুষ সামান্য বস্তুমাত্র। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাতের ২০০৪ সালের একটি গবেষণা থেকেজানা যায় বাংলাদেশে সেই সময় মোট ৭০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছিল যার মধ্যে ঘুষ ছিল মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ আবগারী শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।( দৈনিক ইত্তেফাক ১৩মে, ২০০৪)। অথচ সাধারণ মানুষের উপলব্ধিতে ৬৬ হাজার কোটি টাকাকে পিছনে ফেলে ঘুষের ৪ হাজার কোটি টাকাই দুর্নীতি বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০১৩ সালের দুর্নীতির ব্যারোমিটারে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে আছে। আবার বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য হল রাজনৈতিক দল, পুলিশ ও বিচার বিভাগ। যদিও টিআইবি’র জরিপটি একমাত্রিক তবুও এর যথেষ্ঠ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। জরীপের উপর দিকে উঠে আসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী মানুষের আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই সব প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। রাজনৈতিক দল, পুলিশ কিংবা বিচার বিভাগ বর্তমান পৃথিবীতে যত বেশি মানুষকে যত বেশি বার নাড়া দেয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো তা দেয় না। অন্যদিকে, এই সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। অপূর্ণ প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রচার মাধ্যমের প্রপ্যাগান্ডা আর জ্ঞানের স্থূলতা সাধারণ মানুষকে এই সব প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রতি সহজেই বিতৃঞ্চ করে তোলে। আর বিতৃঞ্চ মানুষের বিবেচনায় এই সব প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে পুলিশ যে দুর্নীতির শীর্ষে চলে আসবে এতে অবাক হবার কিছু নেই।(১৮/০৭/২০১৩)