ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কমিউনিটি পুলিশিং এর মূলনীতি হল অপরাধ সমস্যার সমাধান করা। এই সমস্যা দূর করতে যেহেতু পুলিশি বা জনগণ কেউই এককভাবে সমর্থ নয়, তাই প্রয়োজন হয় পুলিশ ও জনগণের যৌথ অংশীদারিত্ব। কোন অপরাধের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমজাতীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের অন্তর্নিহিত কারণ উদ্ঘাটন করে সেই সব কারণ দূর করার জন্য পুলিশ ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টাই কমিউনিটি পুলিশিং।

 

  সনাতনী পুলিশিং এ পুলিশ অপরাধ ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করে প্রতিটি ঘটনার জন্য পৃথক পৃথক সাড়াদানের কৌশল হাতে নেয়। সেই কৌশল বাস্তবায়নও করে পুলিশ এককভাবে। কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং মনে করে কোন অপরাধ ঘটনাকে এককভাবে মোকাবেলা করা যেমন শুধু সাময়িক ফল দেয়, তেমনি তার সঠিক মোকাবেলাও সম্ভব নয়। তাই পুলিশ কমিউনিটির সদস্যদের সাহায্য, সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব কামনা করে।

 

উল্লেখ্য, অপরাধ প্রতিরোধের প্রাথমিক দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। নাগরিকগণ তাদের সামর্থ্য অনুশারে তা নিরবিচ্ছিন্নভাবে পালন করে। নিজেদের জান-মাল-সম্পদের সুরক্ষার জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থাটুকু গ্রহণ করতে নাগরিকরা কখনোই পুলিশ বা কোন সরকারি সংস্থার উপর নির্ভরশীল থাকে না। নিজেদের বাড়ির চারিদিকে প্রাচীর বা বেড়া দেওয়া, সম্পদ সুরক্ষার জন্য সিন্দুক, আলমারি বা বাক্স কেনা, সেই সব আলামারী, বা সিন্দুকে তালা দেওয়া, নিজেদের বাসাবাড়ির ফটকগুলো শক্ত করে তৈরি করা, প্রয়োজনবোধে নিজেদের সম্পদ রক্ষার জন্য দিনে বা রাত্রিতে পাহারা দেওয়া—এ সবের কোনকিছুই জনগণ সাধারণত পুলিশের উপর সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে স্বস্তিবোধ করে না।

  

কিন্তু জনগণের এই সব প্রচেষ্টার একটি ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে। একক ভাবে কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যৌথভাবে গ্রহণ করা নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে অবশ্যই কম শক্তিশালী। তাই অনেক সময় জনগণ যৌথভাবেও অনেক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আমরা প্রায় ক্ষেত্রে পত্রিকায় খবর দেখতে পাই অনেক এলাকার মানুষ নিজেরা পালাক্রমে রাত্রি জেগে ডাকাত তাড়াচ্ছেন কিংবা বাজারে চাঁদাবাজি ঠেকাতে দোকানদারগণ নিজেরাই লাঠি-বাঁশি দল গঠন করেছে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামের হাট-বাজার গুলোতেও বাজার কমিটি বাজারে পাহারাদার নিয়োগ করে। এ সবই হচ্ছে জনগণের নিজ উদ্যোগে অপরাধ নিবারণের প্রচেষ্টা। কিন্তু এই সব প্রচেষ্টার একটি সীমারেখা রয়েছে। সেই সীমারেখা যখনই অতিক্রম করার দরকার হয়, তখনই পুলিশের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

কমিউনিটি পুলিশিং হল এই অপরিহার্য সময়ে পুলিশ ও জনগণের যৌথ উদ্যোগ বা অংশীদারিত্বের একটি বিশেষ রূপ। তবে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের মূল কথাটি হল অপরাধের কারণ দূর করা। কেননা, রোগের মূল কারণগুলো দূর করতে না পারলে যেমন শরীর থেকে রোগ দূর হয় না, তেমনি অপরাধের কারণগুলো দূর করতে না পারলেও সমাজ থেকে অপরাধ দূর হবে না। অপরাধ নিবারণের কতিপয় কৌশল যেমন, টহলদান, লক্ষ্য দৃঢ করণ, প্রবেশ-নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ব্যবস্থা শুধু সাময়িক সময়ের জন্য অপরাধ নিবারণ করে। কিন্তু এই সব ব্যবস্থা তুলে নিলে বা কিছুটা শিথিল করা হলে অপরাধটি আবার পূর্বেই মতোই স্বরূপে আবির্ভূত হয়।

 অপরাধ সংগঠনের জন্য অপরাধীগণ কিছু কিছু অজুহাতের আশ্রয় নেয়। যেমন, সুরক্ষিত স্থানে অপরাধীগণ বৈধ প্রবেশকারীদের মতো ঝাড়ুদারের কাজের অজুহাতে ঢুকে পড়তেপারে। কোন বাসায় ডাকাতির পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ডাকাতদল তার পাশের নির্মাণাধীন ভবনে দিন মজুর হিসেবে কাজ গ্রহণ করতে পারে। এখন এই সব অজুহাত যদি দূর করা যায়, তাহলে অপরাধীদের অপরাধটি সংগঠন করা দূরুহ হয়ে পড়ে। এখানে আমরা একটি গবেষণালব্ধ উদাহরণ দিবে।

 ১৯৮০এর দশকে জার্মানীতে মোটর সাইকেল চুরির ঘটনা বেড়ে গেলে অপরাধের অজুহাত কমানোর জন্য কর্তৃপক্ষ বিনা হেলমেটে রাস্তায় মোটর সাইকেল চালানো নিষিদ্ধ করে। কেননা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চোরগণ মোটর সাইকেল চুরি করলেও হেলমেট চুরি করতে পারত না কিংবা মোটর সাইকেল সঙ্গে না নিয়ে শুধু হেলমেট হাতে নিয়ে ঘোরাও ছিল সন্দেহ জনক। এমতাবস্থায়, হেলমেটবিহীন মোটর সাইকেল যাত্রীগণ পুলিশের টার্গেটে পরিণত হয়। মোটর সাইকেল ও হেলমেটের সমন্বয় ঘটাতে না পেরে সম্ভাব্য অপরাধীরা ধরা পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে যায়।ফলস্বরূপ, জার্মানীতে ১৯৮০ সালে যেখানে মোটর সাইকেল চুরির মোট সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার, সেখানে এই সংখ্যা ১৯৮৬ সালে মাত্র ৫০ হাজারে নেমে আসে।

 কিন্তু ঘটনার উল্টো দিকে একই সময় জার্মানীতে মোটরগাড়ি বা প্রাইভেট কার ও বাইসাইকেল চুরির ঘটনা বেড়ে যায়। ১৯৮০ সালে জার্মানীতে প্রাইভেট কার চুরির সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার। কিন্তু ১৯৮৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজারে। অন্যদিকে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সেখানে বাইসাইকেল চুরির ঘটনাও বেড়ে যায়এই সব ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে জার্মানীতে মোটর সাইকেল চুরি করে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধির ফলে চোরগণ মোটর সাইকেল চুরির পরিবর্তে মোটরগাড়ি ও বাইসাইকেল চুরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। অর্থাৎ চুরি সমস্যার প্রকৃত কারণ দূর নাকরে শুধু অবস্থাগত পরিবর্তন করে চুরি দূর করা সম্ভব নয়।

 

এখন একটি সাম্প্রতিক কালের দেশী উদাহরণে আসি। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে গাইবান্ধা জেলায় একটি কমিউনিটি পুলিশিং কর্মশালায় ফুলছড়ি থানার যমুনার তীর সংলগ্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা তাদের এলাকায় সম্প্রতি জুয়া খেলার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে। নদীর তীরে এবং তীর সংলগ্ন চরগুলোতে প্যান্ডেল করেবা ছামিয়ানা টাঙ্গিয়ে দিবারাত্র চলছে এই জুয়া খেলা। জুয়া খেলায় নদীর অপর পাড়ে জামালপুর জেলার জুয়াড়ুরাই মূল হোতা। পুলিশ ও এলাকাবাসীর যৌথ প্রচেষ্টাতেও তারা এটা বন্ধ করতে পারছেন না।

 

ঘটনাটির গভীরে গিয়ে জানা গেল, সম্প্রতি জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার জনাব মোঃ আব্দুর রাজ্জাক তার অধীক্ষেত্রে তাস, জুয়া, মদসহ অন্যান্য সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছেন। থানা পুলিশ কর্তৃক জুয়াডুদের প্রশ্রয় পাবার আর কোন জো নেই। তাই জামালপুরের পুলিশের তাড়া খেয়ে জুয়াডুরা যমুনা নদী পার হয়ে পশ্চিমের জেলা গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার বিভিন্ন স্থানে আড্ডা পেতেছে। জুয়ার হোতারা তাদের পুরো ব্যবসা এখন জামালপুর থেকে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি থানা এলাকায় স্থানান্তর করেছে। অভ্যাসগত জুয়াডুরা নদী পার হয়ে ফুলছড়িতে এসে বাজিমাৎ করছে। সেই সাথে ফুলছড়ি এলাকায় নতুন নতুন জুয়াড়ু তৈরি হচ্ছে।

 কঠোর অভিযান চালিয়ে জামালপুর জেলা আপতত জুয়ার দাপট থেকে বেঁচে গেলে রেহাই পায়নি পাশের জেলা গাইবান্ধা। বহাল তবিয়তে রয়েছে জুয়াড়ুরা। তারা এখন পার্শ্ববর্তীজেলায় তাদের সাগরেদ ও ভিকটিম তৈরি করছে। প্রচলিত পুলিশ-ব্যবস্থার এটা প্রত্যক্ষ ফল। অপরাধ নির্মুল নয়, বরং তা স্থানান্তরিত হয়। গাইবান্ধার পুলিশ কঠোর অভিযানে নামলে হয়তো এরা টাঙ্গাইল জেলায় স্থানান্তরিত হবে। তাদের পিছু পিছু যাবে অভ্যাসগত জুয়াড়ুগণ এবং সেই সাথেনতুন স্থানে তৈরি হবে নতুন নতুন জুয়াড়ু। যে কোন অপরাধের ক্ষেত্রেই বিষয়টি সঠিক।

  

কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের মূল কথাই হল, অপরাধ সমস্যার কারণগুলো খুঁজে বের করে সেসব দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।অবস্থাগত অপরাধ প্রতিরোধ দর্শনে যেহেতু অপরাধের মূল কারণগুলো অবিকৃত রেখে শুধু অপরাধের বাহ্যিক অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়, তাই এর ফলে সামগ্রিক অপরাধ হ্রাস পায় না। এক্ষেত্রে অপরাধ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে; এক সময় থেকে অন্য সময়ে; একলক্ষ্য বস্তু থেকে অন্য লক্ষ্য বস্তুতে এবং এক জাতীয় অপরাধ থেকে অন্য জাতীয় অপরাধে স্থানান্তরিত হয়। আলোচ্য ঘটনায় অপরাধীরা তাদের লক্ষ্য বস্তু ও অপরাধের ধরণে পরিবর্তন এনেছে যার ফলে সামগ্রিক অপরাধের উপর তেমন কোন প্রভাব পড়ে নাই।

 

এমতাবস্থায়, অপরাধের লক্ষণগুলোর দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের আপরাধের কারণগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। এ জন্য অপরাধ ঘটনাগুলো চিহ্নিত করণ, এ গুলো বিশ্লেষণ, এ গুলোর কারণ নির্ণয় করে তার পর প্রয়োজনীয় সাড়াদান কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

 

কোন এক সময় ডাক্তারগণ শুধু রোগের উপসর্গ দেখেই রোগীর চিকিৎসাপত্র দিতেন। কিন্তু বর্তমানে এক গাদা পরীক্ষার ফলাফল না দেখে ডাক্তারগণ কোন চিকিৎসাপত্রই দেন না। রোগের চিকিৎসার বড় অংশ হল বিভিন্ন প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয় বা ডায়াগোনাস্টিক।

 অপরাধপ্রতিরোধের ক্ষেত্রেও তাই অপরাধের কারণ নির্ণয় করাই হল আসল পদক্ষেপ।কিন্তু সনাতনী পুলিশিং এ অরপাধের কারণ অনুসন্ধানের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করাহয় না। সনাতনী পুলিশিং দর্শনে অপরাধ দূরীকরণে পুলিশ অফিসারগণ হাতুড়েডাক্তারের সাথে তুলনীয়। এই দর্শনে অপরাধের কারণগুলো দূর করার কোন পদক্ষেপগ্রহণ করা হয় না। এমনকি অপরাধের কারণগুলো খুঁজে বের করার কোন পেশাগতপ্রশিক্ষণও পুলিশ অফিসারগণ পায় না।

  হাতুড়ে ডাক্তার যেমন রোগের লক্ষণগুলো দেখে একটা ঔষধ প্রয়োগ করে রোগের সাময়িক উপসমের চেষ্টা করেন, সনাতনী পুলিশিং দর্শনে ঠিক তেমনি অপরাধ দূরীকরণ নয়, অপরাধনিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসারগণঅপরাধের কারণ দূর করার কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । কিন্তু এই সবপ্রচেষ্টার পিছনে তাদের সাংগঠনিক সমর্থন, সহযোগিতা বাপ্রচেষ্টা থাকে না। অধিকন্তু হাতুড়ে ডাক্তারদের মতো মাঠ পর্যায়ের কিছু কিছুঅফিসার কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই অপরাধের কারণ দূর করারপ্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। কিন্তু তারা সাময়িকভাবে সফল হলেও চূড়ান্ত বিচাররেবিফল হন।

 চিকিৎসা পেশার মতোই পুলিশিং একটি বিশেষজ্ঞের পেশা। হিপোক্রিটাস থেকে গ্যালেন হয়ে চিকিৎসা সাস্ত্র যেমন বর্তমান উত্তরাধুনিক পর্যায়ে পৌচেঁছে এবং এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নানা প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দার্শনিক মতবাদের গ্রহণ বর্জন চলেছে তেমনি সভ্যতার শুরুথেকে অপরাধ প্রতিরোধ তথা পুলিশিং বিষয়েও অনেক পরিবর্তন এসেছে। একজন দক্ষ চিকিৎসক আধুনিক দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে রোগ নিরাময়ে উদ্যোগী হন।

  ঠিকপুলিশিং জগতেও আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে হবে। উনবিংশ শতাব্দির তথাকথিত জনসংযোগহীন পেশাদারিত্বের পুলিশিং দর্শন বর্তমানে আর কার্যকরি নয়। কিন্তু সনাতনী পুলিশিং দর্শন সেই বিগত দশকের কৌশল আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে সনাতনী ব্যবস্থার হাতুড়ে পুলিশিং অপরাধ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও অপরাধ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে না। এ জন্য আমাদের গ্রহন করতে হবে অপরাধ সমস্যার সমাধানে ব্রতী আধুনিক কালের কমিউনিটি পুলিশিং। ১৭ জুলাই, ২০১৩