ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ভোর চারটা থেকে ফোনের জ্বালায় অস্থীর হয়ে গেলাম। জনৈক আত্মীয়ের একটি ট্রাক আটক করেছে কাঁচপুর ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। আমাকে তা ছাড়াতে হবে। তার গাড়ির কি কি ত্রুটি আছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, কোন ত্রুটি নেই। সব ঠিকঠাক। ঘুষের জন্যই আটক করেছে। ইতোপূর্বে একবার কেইস দিয়েছে ওভার লোডিং এর জন্য, একবার উল্টোদিক দিয়ে চালানোর জন্য আর একবার নাকি গাড়ির রং ঠিক ছিল না । পুলিশের যত প্রকার দোষ থাকতে পারে সবগুলোর একটা ফিরিস্তি দিয়ে আমার আত্মীয় আমাকে একটা কিছু করতে বললেন।

কেউ যখন পুলিশের কাছে কোন তদবির করতে বলেন, তখন তারা পুলিশকে যত প্রকারের ভাবে পারেন জঘন্য করেই চিত্রায়িত করেন । তারা আচ্ছাতারে পুলিশকে গালাগালি করেন। আমার আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবরা মনে করেন, একটু বেশি করে দোষের কথা না বললে হয়তো আমি তদবিরটা করব না। কিন্তু ওরা বোঝে না যে আমি নিজেও একজন পুলিশ সদস্য। তাই কেউ যখন আমার সহকর্মীদের খারাপভাবে চিত্রায়িত করা হয়, তখন আমি খুশী হই না। আমার খারাপ লাগে। তবে সহকর্মীদের দোষত্রুটি, ঘুষ গ্রহণ, মানুষকে হয়রানী ইত্যাদির বিষয় তো আর অস্বীকার করতে পারি না। তাই উল্টো তাদের কিছু বলতে পারি না। তাছাড়া পুলিশ অসন্তুষ্ট হলে কিছু আসে যায় না, জনগণ অসন্তুষ্ট যেন না হয়, তা পুলিশকে দেখতে হয়। সর্বোপরি আমার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা তো পুলিশ নন, তারা পুরোমাত্রায় জনগণ।

শেষ রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে অবশেষে ফোনে কথা বললাম কাঁচপুর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসারদের সাথে। বিনীতভাবে জানতে চাইলাম, কোন কোন ত্রুটির জন্য গাড়িটি আটক করা হয়েছে। অফিসার জানালেন, গাড়ির কোন কাগজপত্র নাই, ড্রাইভারের কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই। আমি চুপ করে শুধু শুনলাম। কেননা, এই জাতীয় উত্তর আমার অপ্রাত্যাশিত ছিল না। আমার বাপও যদি আমার কাছে পুলিশি ব্যপারে তদবির করেন, তিনিও সবটুকু বলেন না। একযুগের পুলিশের চাকরিতে এটা আমার ইস্পাত কঠিন অভিজ্ঞতা।

গাড়ির ড্রাইভারের সাথে কথা বললাম। সে বলল, গাড়ির কাগজপত্র আছে। তবে তা পূর্বের কেইসের জন্য রংপুরে জমা আছে। আমার কাছে পূর্বের কেইস স্লিপ রয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স সম্পর্কে জানাল, একটা দুই নম্বর লাইসেন্স তার আছে। তবে সে পুলিশকে গাড়ির, বা নিজের কোন কাগজপত্র দেখায় নাই। যেহেতু তার সব কাগজপত্রেই ফাঁক-ফোকর রয়েছে, তাই কাগজপত্র পুলিশকে না দেখিয়ে আমার মতো একজন ত্রাতার দারস্থ হয়েছে। আমি আমার ফোনটি বন্ধ করে প্রাতঃকর্মে ফিরে গেলাম।

সকাল ১১ টার দিকে সার্জেন্ট লিটন ফোন করেছে। আমার পরিচয় পেয়ে তিনি গাড়িটি ছাড়তে চান। আমি বললাম, গাড়ির কোন কাগজপত্র আর ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় আমি আপনাদের কাছে কোন তদবির করতে পারি না। আমি আমান নিম্নপস্থ অফিসারদের এমন কোন নির্দেশ দিতে পারি না, বা অনুরোধ করতে পারি না যা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রক্ষা করতে হয়। কিন্তু তারপরও সার্জেন্ট লিটন গাড়িটি ছেড়ে দিয়েছেন।গাড়ি পুলিশ-মুক্ত হওয়ার পর গাড়ির মালিক আত্মীয় আবার আমাকে ফোন দিলেন। না, ধন্যবাদ জানানোর জন্য নয়। সার্জেন্টের দোষত্রুটি আর ঘুষগ্রহণের অভিযোগ নিয়ে। পুলিশের কাজ যে সম্পূর্ণরূপে একটি ধন্যবাদহীন অপ্রশংসিত কাজ আমার আত্মীয় তা আবার প্রমাণ করলেন।
২.
কয়েকদিন আগে ফোন দিয়েছিলেন এক ফুফাত ভাই। আদেশের সুরে বললেন, রাজা, জয়দেবপুর ফাঁড়িতে আমাদের গ্রামের এক ছেলের একটি ট্রাক ধরেছে। ওটা ফোন করে ছাড়িয়ে দাও। বড় ভাই, তার কথা ফেলি কি করে। জয়দেবপুরের সেই ফাঁড়ির অফিসারদের সাথে কথা বলার আগে গ্রামের সেই ড্রাইভার ছেলেটির সাথে কথা বললাম। ড্রাইভার জানাল, গাড়ির কাগজপত্র মালিক তাকে দেয় নাই। তাড়াহুড়োর ফলে তা সাথে নেওয়া হয় নাই। জানতে চাইলাম, তোমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে? সে বলল, নাই।

আমি বললাম, দুই নম্বর লাইসেন্সটাও নাই। সে বলল, না কোন লাইসেন্সই নাই। গাড়ির কাগজপত্র নাই, কোন ড্রাইভিং লাইসেন্সও নাই। অখচ এই ছেলে ঠাকুরগাঁ থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি মিনি ট্রাক চালিয়ে এনেছে। পথে কোথাও সে ধরা খায়নি। ধরা খেয়েছে ঢাকার কাছে গাজিপুরে। ফুফাত ভাইকে বললাম, আমি এখন ফাঁড়ির অফিসারদের বলব গাড়ির চালককে গ্রেফতার করে জেলে পাঠাতে। আমার ফুফাত ভাই বুঝতেই চাইলেন না। উল্টো অনুরোধের মাত্রা বেড়ে গেল। কিন্তু আমি জয়দেবপুর ফাঁড়ির অফিসারদের কোন অনুরোধ তো দূরের কথা তাদের ফোনও করি নাই। নিশ্চয় মনক্ষুন্ন হয়েছে আমার ফুফাত ভাই ও আমার গ্রামের মানুষগুলো।
৩.
মোটর যান আইনের শতভাগ প্রয়োগ হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করেও হাজার জাহার যানবাহন রাস্তায় চলছে। এই সব যানবাহন বিআরটিএ ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই রাস্তায় চলে। এখন প্রশ্ন হল, পুলিশ কেন এদের রাস্তায় চলতে দেয়? কঠিন প্রশ্ন বটে! কিন্তু কোন আইনে কার্যকরিতা তখনই দৃশ্যমান হবে বা পুলিশ যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারবে যথন অধিকাংশ মানুষ আইনটি মেনে চলবে ও সামান্য কয়জন তা ভংগ করবে। পুলিশ অধিকাংশ নয়, সামান্য কিছু আইনভঙ্গকারীকে আইনী প্রক্রিয়ায় আইন মানতে বাধ্য করবে কিংবা আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। কিন্তু মোটর যান আইনের ক্ষেত্রে আমরা কি দেখি? এখানে আইন ভঙ্গ করাই যেন আইন।

যানবাহন চালকদের কাছে যত লাইসেন্স রয়েছে তার অর্ধেকই ভুয়া বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক ও যান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বসু। তিনি বলেন, “এসব ভুয়া লাইসেন্স বিআরটিএ ইস্যু করেনি।” (বিডি নিউজ২৪.কম ২৪ ডিসেম্বর, ২০০৮)

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার জসিম উদ্দিন বলেন, মহানগরীর ৭০ ভাগ ড্রাভিং লাইসেন্স ভূয়া।( দৈনিক মানব জমিন ১৪ সেপ্টম্বর, ২০০৭)

যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, সারা দেশে পাঁচ লাখ লাইসেন্সবিহীন বা অবৈধ লাইসেন্সধারী চালক থাকতে পারেন।( প্রথম আলো ২১ জুন, ২০১৩)

বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরের দুইটি কার্যালয় থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গাড়ির নিবন্ধন দেয়া হয়েছে পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ২৮৫। এগুলোর মধ্যে ফিটনেসবিহীন পুরনো গাড়ির সংখ্যা ৮০ হাজার ৬৮৫টি। অর্থাৎ ঢাকার শহরের রাস্তায় যে গাড়িগুলি দেখা যায় তাদের ১৫% কোন ফিটনেস নাই।( দৈনিক যায়যায় দিন ২৫ জুনন, ২০১০)। এই ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা গত সাড়ে চার বছরে বেড়ছে বই কমেনি।

সরকারী হিসেব মতো অধিকাংশ ভূয়া ড্রাইভার আর আর লক্ষাধিক ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেখানে দেশের রাজধানীতেই চলে, সেখানে দেশের অন্যান্য স্থানের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এমতাবস্থায়, ট্রাফিক পুলিশের আইন প্রয়োগের শতভাগ সক্রীয়তা প্রত্যাশা করা অমূলক। এখানে পুলিশকে দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। আর না দেখার অলিখিত অনিয়মটা ভঙ্গ করে যথাযথ আইন প্রয়োগে উদ্যোগী হলেই যানবাহনের মালিকের কাছে পুলিশ অপ্রিয় হয়ে যায়। শুরু হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তদবির, ক্ষমতাসীনদের কাছে পুলিশের বদনাম কিংবা পুলিশকে হেস্তন্যাস্ত করার সাজানো নাটক।

একটি অবৈধ কাজের সূচনাকারি যেখানে জনগণ সেখানে পুলিশকে ফিরিস্তা ভাবলে চলবে কেন? যৌনকর্মীরা অর্থের বিনিময়ে দেহ বিক্রয় করেন। আর তাই তারা কোন দিন খদ্দেরের বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ আনেন না। কিন্তু মোটরযান মালিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। তারা নিজেরা অবৈধভাবে ব্যবসা করবেন, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিবেন, পুলিশকে আইন প্রয়োগ না করার অনুরোধ-উপরোধ করে নিজেরা অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার জন্য পুলিশকে প্রলুব্ধ করবেন, আবার সাথে সাথে পুলিশকে সেই জন্য দোষারপও করবেন।

উপরোক্ত দুটি ঘটনাই শুধু নয়, এমন শত শত ঘটনা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে আসে। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি ৯৯% ঘটনায় পুলিশের নয়, আমার আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধদেরই দোষ থাকে। বিষয়টি যখন আমার আত্মীয়দের বা বন্ধু-বান্ধবদের ক্ষেত্রে সত্য তখন তা অন্যান্যদের ক্ষেত্রে অসত্য হবার কারণ নেই। কিন্তু তারপরও যানবাহনের মালিক বা ব্যবহারকারীগণ নিজেদের ধোয়া তুলশীর পাতা বা স্বর্গের ফিরিস্তার মতো নির্দোষ বলে দাবী করেন, আর পুলিশদের মনে করেন মর্তের শয়তান।(০৬/০৭/২০১৩)