ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমাদের পুলিশি সাফল্য শুধু উদ্ধার, গ্রেফতার, মামলা প্রদান ইত্যাদির মধ্যেই ঘুরপাক খায়। গত ১০ বছরে কতজনকে গ্রেফতার করেছি, কতগুলো ফেন্সিডিল উদ্ধার করেছি কিংবা কত হাজার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছি – আমার সাফল্য এই।

কিন্তু এই উদ্ধার, গ্রেফতার আর মামলা দানের ফলাফল কি? মাদক উদ্ধারের ফলে কি মাদকের ব্যবহার, আদান-প্রদান, পাচার-পরিবহন কমেছে? অস্ত্রের উদ্ধারে কি অস্ত্র কমেছে? কিংবা সন্ত্রাসী গ্রেফতারে সন্ত্রাস কমেছে বা নির্মূল হয়েছে? গত ১০ দশ বছরে যাদের গ্রেফতার করেছি তারা কি তখন থেকেই জেলেই আছেন, না জামিনে বের হয়ে এসেছেন কিংবা সাজা খেটে বের হয়ে এসেছেন তার পরিসংখ্যান কে দিবে? গ্রেফতার মানেই কি সাজা, গ্রেফতার মানেই কি অপরাধ থেকে চিরতরে দূরে রাখা?

জামিনে, বা সাজা খেটে যারা বের হয়ে আসছেন তারা কি ধোয়া তুলসির পাতার মতো পবিত্র হয়ে আসছেন? আমাদের জেল ব্যস্থায় এমন কোন উপাদান আছে কি যাতে অপরাধী জেলে গেলে ভাল মানুষ হয়ে বেরিয়ে আসবে। জেলখানাগুলোর এমন কোন কর্মসূচি আছে কি যাতে অভ্যাসগত অপরাধী তো দূরের কথা দৈবক্রমে অপরাধী হওয়া আদম সন্তানদের শুদ্ধাচারে অন্তর্ভুক্ত করা যায়?

মাদক বাড়ছে, অস্ত্র বাড়ছে, । ছিঁচকে চোরগণ বড় চোর হচ্ছে। ডাকাত দলের সাধারণ সদস্যরা হচ্ছে ডাকাত সরদার। এক জেলার ডাকাত যাচ্ছে অন্য জেলায় ডাকাতি করার জন্য। আঞ্চলিক ডাকাতরা হচ্ছে জাতীয় বা আন্তঃজেলা ডাকাত। গাজা বিক্রেতাগণ পরিণত হচ্ছে ফেন্সিডিলের হোল সেলার এবং কালক্রমে ইয়াব সম্রাট।

শহরের মাদক ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামে। গ্রামের প্রাকৃতিক অভিভাবকত্ব ভেঙ্গে গিয়ে মাদকাসক্ত পাতি নেতারা হচ্ছে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পাড়ার মাস্তান উপযুক্ত হচ্ছে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হওয়ার মতো জাতীয় ফিগারে। রাজনীতি আর চিরাচরিত অপরাধ হয়ে যাচ্ছে বেমালুম একাকার। প্রতি নিয়ত আমাদের সমাজে শিকড় গাঁড়ছে দুর্খেইমের এনোমি।

তাহলে উদ্ধার, গ্রেফতার আর মামলাদানের সাফল্য নিয়ে আমরা করব কি? একজন করদাতা হিসেবে যদি প্রশ্ন করি আমার করের অর্থে যাদের বেতন দেই, ভাতা দেই, যাদের জন্য লজিস্টিক কিনি, এসি-ডিসি গাড়ি কিনি, তারা কি এত কিছুর বিনিময়ে আমার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে না কমাচ্ছে; সমাজের সমস্যা বাড়ছে না, কমছে?

আমাদের উদ্বেগ, আমাদের উৎকণ্ঠা আর গ্রেফতার, উদ্ধার এক জিনিস না। উদ্ধারের দরকার নেই, গ্রেফতারের প্রয়োজনীয়তা নেই। একজন করদাতা হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে আমরা চাইব সমস্যার সমাধান হোক। ১০ বছরে এক কোটি সন্ত্রাসী গ্রেফতার করেও যদি আমাদের উদ্বেগ না কাটে তাহলে গ্রেফতারকৃতদের অযথাই আমাদের করের টাকায় কেনা খাদ্য দিয়ে জেলখানায় পোষা হয়েছে। অস্ত্রের ঝনঝনানি যদি না কমে তাহলে বুঝতে হবে আমাদের অর্থ দিয়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। মাদকের ব্যবহার, উৎপাদন আর পরিবহন যদি না কমে, যদি প্রতি বছরই মাদক উদ্ধারের নতুন নতুন রেকর্ড গড়া হয়, আর সেই রেকর্ড পরের বছর নিশ্চিতভাবেই ভঙ্গ করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে এই উদ্ধার ক্ষতিকর মাদকের কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, নির্মূলে নয়।