ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

ডাক্তারদের সাথে বিশেষ করে ইন্টার্নী ডাক্তারদের সাথে অন্যান্যদের ঠোকা ঠুকি নতুন কিছু নয়। আমাদের ছাত্র জীবনেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নী ডাক্তারদের সাথে কর্মচারী, রোগীদের আত্মীয়-স্বজন, এমন কি , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথেও মারামারিতে জড়াতে দেখেছি।

কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতির যেন বহুলাংশে অবনতি ঘটেছে। সব স্থানেই ইন্টার্নী ডাক্তারগণ যার তার সাথে যখন তখন বচসায় জড়িয়ে পড়ছেন। তারা যেমন পুলিশের সাথে লাগছেন, তেমনি লাগছেন সাংবাদিকদের সাথে, লাগছেন অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের সাথে এমনকি তাদেরই সহকারী নার্সদের সাথেও। অবস্থা দেখে মনে হয় ডাক্তারদের যেন কি একটা হয়েছে। কিংবা তাদের প্রতিই কোন একটা মারাত্মক কিছু করা হয়েছে যার প্রতিক্রিয়া তারা এভাবে সমাজ অস্বীকৃত পন্থায় প্রকাশ করছেন।

ইন্টারনি ডাক্তারদের এ প্রবণতার পিছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যেতিনটি কারণ সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল বলে আমার মনে হয়ঃ
১. তারা ডাক্তার হলেও আসলে এখনও ছাত্র। তাই রক্ত গরম, একতাবদ্ধ, জবাবদিহিতাবিহীন।
২. তারা বর্তমানে না হলেও অদূর ভবিষ্যতে এমন একটি পেশাজীবী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হবেন যে সংগঠন দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর চেয়ে কোন অংশেই কম ইরেশনাল (irrational) নয়। বিএমএ, স্বাচিপ ইত্যাদি ডাক্তার-সংগঠনগুলোর সদস্যরা সরকারের ভিতর থেকেও রাজনীতি করেন। তাই তারা পেশাগত ও রাজনীতি উভয় দিক দিয়েই শক্তিশালী। এই শক্তিশালি সংগঠনের সদস্য হলেও যে কেউ শক্তিশালী হবেন। ইন্টারনি ডাক্তারগণ তাই শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন মাত্র।
৩. তৃতীয় কারণটি হল, দেশের হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক দুর্নীতি। এই দুর্নীতি নিয়োগ থেকে শুরু করে রোগীদের জন্য পথ্য সরবরাহে ঠিকাদার নিয়োগ পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশের লেবার ইউনিয়ন, মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ইত্যাদির স্টাইলে অনেক হাসপাতালে বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা আদায় হয়। কিছু দিন আগে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এই ধরনের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ডাক্তার কর্মচারীদের মধ্যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছিল যার রেস শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিল।

আমি কয়েক বছর আগে রংপুর মেডিকেল কলেজে আমার এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলাম। তখন সময়টা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। আমি প্রবেশের চেষ্টা করলাম। এক স্থানে দেখলাম ২০ টাকা টিকেটের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। এই ফাঁকে আবার কিছু আনসার সদস্য টু পাইস কামিয়ে অন্যভাবেও লোক ঢোকাচেছ। আমার কাছে বিষয়টি বেখাপ্পা ঠেকল।

আমি অসুস্থ লোককে দেখতে হাসপাতালে যাব এর জন্য আবার টিকেট করে ওয়ার্ডে ঢুকতে হবে? তাহলে হাসপাতাল আর সিনেমা হলের মধ্যে পার্থক্য থাকল কি? আমি সেই আত্মীয়কে না দেখেই চলে এসেছিলাম। আমাকে বলা হল, এটা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত।
হায় আমার কর্তৃপক্ষ! সরকারী হাসপাতাল এখন এতিমদের হাসপাতাল। এখানে হত দরিদ্ররাই মূলত চিকিৎসা নেয়। স্বচ্ছল পরিবারের লোকরা সরকারি হাসপাতালে পারতপক্ষে যান না। অথচ এই হত দরিদ্রদের উপর বাড়তি দুর্নীতির ট্যাক্স বসানো হচ্ছে। দরিদ্রদের শোষণ করা কত সহজ!

জানিনা এই নিয়ম সেখানে এখনও আছে কি না। তবে এটা অবৈধ অর্থ কামানোর একটি উত্তম ব্যবস্থা। দূর দূরান্ত থেকে যে সব লোক তাদের অসুস্থ আত্মীয়দের দেখতে আসেন, তারা কষ্ট করে হলেও এই বাড়তি ২০ টাকা ব্যয় করবেন। কারণ তারা দূর থেকে এসে দূরে ফেরত যেতে যত পারে তাড়াতাড়ি করার চেষ্টা করবেন।

আমাদের ইন্টার্নী ডাক্তারগণ বর্তমানে না হলেও ভবিষ্যতে এই জাতীয় দুর্নীতির অংশ হবেন। তাই তারা চাকরিওয়ালা ডাক্তারদের দুর্নীতিতে এখনও সহায়তা করেন। আর সাংবাদিকগণ এ সব বিষয়ে খবর টবর প্রকাশ করে তাদের অযথাই বিরক্ত করেন।

আমাদের সমাজের অসুস্থা থেকে ইন্টার্নী ডাক্তারগণ মুক্ত নন। তারাও আসলে একটি নৈতিক মূল্যবোধহীন বর্তমান সমাজেরই অংশ। তারাও হতে পারেন নীতি-দুর্নীতি-ক্ষমতা-অক্ষমতার রোল মডেল। তাই তারা ক্ষমতার গরমে ক্ষেপে যেতে পারেন, কেউ বা আবার ‘দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া’ যেতে পারেন। পেশা-ক্ষমতা-দুর্নীতি-ইর‌্যাশন্যালিটি বলয়ের প্রত্যেক শ্রেণিই এমন ধরনের উগ্রতা প্রকাশ করে। কিন্তু সবাই পত্রিকার পাতায় স্থান পায় না। যেহেতু তারা ডাক্তার এবং তাদের কাছে আমাদের বাঁচার জন্য না হলেও মরার জন্য যেতে হয়, তাই হয়তো তারা বারবার পত্রিকার শিরোনামে আসছেন।