ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দুর্নীতির কথা উঠলেই আমরা ছোট ছোট কেরানিদের দিকে আঙ্গুল তুলি। পুলিশের কনস্টেবল-দারোগা-ওসি, সচিবালয়ের কেরানি আর ডিসি অফিসের দফতরির উপরে আমাদের নজর যায় না। এর কারণ হল, আমরা আসলে এর উপর আর কিছু জানি না। আমাদের জানার পরিধি এর বাইরে যেতে পারে না। আমাদের অভিজ্ঞতায় যা দেখি তার বেশি কোন কর্ম-অপকর্ম আছে বলে আমরা জানি না। জানতেও চাই না। বোঝা বা উপলব্ধি হল আরো উপরের বিষয়। সব জানলেই যে সব বুঝব বা উপলব্ধি করব– এমনটি নয়।

আমাদের আমজনতা আবার অন্যদের চেয়ে পুলিশকেই বেশি চিনেন। কারণ, যারা কোন দিন কাস্টমস বিভাগের নামটি পর্যন্ত শোনেননি, তারা শুধু পুলিশ দেখেন নাই, বরং পুলিশের লঠির বাড়িও খেয়ে থাকতে পারেন। তাই তাদের কাছে আমদানী-রপ্তানীর শুল্ক ফাঁকির হাজার কোটি টাকার পরিবর্তে ট্রাফিক পুলিশের ১০ টাকার বখরা নেওয়ার দৃশ্য অনেক বেশি আলোচিত, ঘৃণ্য ও পীড়াদায়ক ।

পত্রিকায় পড়লাম, কোন এক সাদা কলারের বড় কর্তা নাকি ১৮শ’ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। টাকার অংকের কথা শুনলেই কলিজাটা ফাঁক হয়ে যায়! মারে মা! এত্ত টাকা! নিজে সরকারি কর্মচারি। তাই ভালভাবেই জানি, মাস শেষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ যা বেতন পান তা কেউ এক সাথে গোনার সুযোগই পান না। কারণ, বেতনের চেক ব্যাংকে জমা হওয়ার আগেই তার শ্রাদ্ধ হয়ে যায়। কেউ যদি এই অর্থ বিজ্ঞতার সাথে বিনিয়োগ করেন, তবে তা বেড়ে যত বেশিই হোক, সে টাকা গুনতে আঙ্গুলের ডগায় জলীয় বাষ্প লাগাতে হবে না। এ বাড়তি অর্থ দিয়ে নুন আনতে যাতে পান্তা না ফুরায়, তার ব্যবস্থা করা সম্ভব; বিত্তবান কোটিপতি হওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের আলোচিত সাদা কলারের কর্তার যদি অবৈধ সম্পদই ১৮শ’ কোটি টাকার সমান হয়, তবে তার বৈধ সম্পত্তিও নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি না হলেও এর সমান রয়েছে। আর যে অবৈধ সম্পদের কথা পত্রিকায় পাওয়া যায়, এর চেয়ে বেশি অবৈধ সম্পদ যে তার নেই তাই বা কে বলবে?

পত্রিকার পাতায় যত দুর্নীতির খবর পড়ি তাদের অধিকাংশগুলোই চুনোপুটিদের দুর্নীতি। দুর্নীতির প্রতিরোধ আর প্রতিকারের প্রসঙ্গ এলেও শুধু চুনোপুটিদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেয়ার কথাই শুনি। কিন্তু সাদা কলারের কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থার কথা শুনিনা। এর কারণ কি?

কারণটি খুবই সামান্য। অর্থের সাথে কর্তৃত্বের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অর্থ আর কর্তৃত্বের লব্ধি বল হল ক্ষমতা। যারা একবার অর্থ কামিছেন, তারা দ্রুতই অর্থপূর্ণ কর্তৃত্ব অর্জন করেন। আবার যাদের হাতে একবার কর্তৃত্ব চলে যায়, তারা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে ওঠেন ক্ষমতাবান। যারা ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যান, তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কিংবা প্রতিকারমূলক শাস্তিও কাজ করে না। কেননা, একবার যিনি ক্ষমতা অর্জন করেন, কিংবা ক্ষমতায় যান, তিনি চিরকালের জন্যই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন।
অর্থবান আর ক্ষমতাবানরা দ্রুত সমাজে প্রভাবশালী ও সম্নানিত হয়ে ওঠেন। প্রথম প্রজন্মের ক্রিমিনালগণ সমাজের সম্নানজনক অবস্থান তৈরি করতে না পারলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলো তা স্বাভাবিকভাবেই পেয়ে যায়।

বিষয়টি সমাজ বিজ্ঞানী ডেনিয়েল বেল তার Queer Ladder of Social Mobility অর্থাৎ সামাজিক চলমানতার অদ্ভূত সিঁড়ি তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। অপরাধী বা দুর্নীতিবাজ চক্রের প্রথম প্রজন্ম সমাজে সম্মানজনক অবস্থান না পেলেও পরবর্তী প্রজন্মের তা পেতে অসুবিধা হয় না। এভাবে এক প্রজন্মের অবৈধ অর্থে পরবর্তী প্রজন্ম সামাজিক বৈধতা পেয়ে যায়। আমেরিকান উদাহরণে দেখা যায় প্রথম দিকে ইটালিয়ান অভিবাসিগণ সংঘবদ্ধ অপরাধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিপত্তি অর্জন করে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তারা মই বেয়ে উপরে উঠে যাওয়ার পর মইয়ের ফাঁকা স্থান পূরণ করে হিসপেনিকগণ। হিসপানিকদের পরে এ মইয়ের সিঁড়িতে বর্তমানে অবস্থান করছে এশীয়গণ।

অর্থই নাকি সব অনর্থের মূল। কিন্তু অর্থই যে সব ক্ষমতার মূল, তা কি কেউ মুখ ফুটে বলবেন? যিনি ১৮শ’ কোটি টাকার মালিক, তিনি বাজারের বড় বোয়াল মাছটি থেকে রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কিনতে পারবেন না, এমন কথা অজ্ঞরাই বলবেন।

বিজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর সব কিছুই নাকি ক্রয়যোগ্য। প্রত্যেক মানুষেরই নাকি একটি ক্রয়মূল্য আছে। প্রত্যেক মানুষকেই কেনা যায়। তবে কারো কারো দাম অন্য কারো চেয়ে বেশি– এই যা। ক্ষমতাবানরা সমাজ, দেশ আর দেশের মানুষ সবাইকে কিনতে পারেন।(২৭/০৫/২০১৪)

সূত্র:
১. http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/05/27/89129
২. http://law.jrank.org/pages/1626/Organized-Crime-Ethnic-succession-organized-crime.html