ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ তথা অপরাধ সমস্যা সমাধানের জন্য নানা প্রকারের ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন বাহিনী বা বিভাগ তৈরির প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। কিন্তু অপরাধের প্রকৃত কারণ না জেনে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আসলেই ভস্মে ঘি ঢালার মতোই মূল্যহীন।

অপরাধের কারণ তথা মানুষ কেন অপরাধ করে সে নিয়ে অনেক তাত্ত্বিক গবেষণা রয়েছে। তবে আমেরিকান সমাজ বিজ্ঞানী রবার্ট কিং মার্টনের এনোমি তত্ত্বটি দ্রুত উন্নয়নশীল সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি। এখানে বলা ভাল, মুক্তবাজার অর্থনীতি, পূঁজিপতি দর্শন, উন্নয়নের প্রচেষ্টা সব কিছু মিলে আমাদের দেশের সাথে পাশ্চাত্য দেশের ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। ঊনবিশং শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পাশ্চাত্যের সমাজগুলোও আমাদের মতোই উন্নয়নশীল ছিল। তারাও শিল্প বিপ্লবের সময় দ্রুত উন্নতি লাভ করছিল, সেখানে বিকশিত হচ্ছিল গণতন্ত্র ও পূঁজিবাজ। বর্তমানে এদের সাথে আমাদের প্রধান পার্থক্য এই টুকুই যে ওরা উন্নত, আর আমরা উন্নয়নশীল।

উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় সমাজেই মূল্যবোধের ঘাটতি থাকে। উন্নয়নের তোড়ে পুরাতন মূল্যবোধ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু নতুন মূল্যবোধ তখনো তৈরি হয় না। এটাকে অপরাধ বিজ্ঞানী মার্টন বলেছেন এনোমি। (যদিও এনোমি শব্দটির স্রষ্টা এমিল দুর্খেইম, কিন্তু আধুনিক সমাজের নিয়ত পরিবর্তনশীল মূল্যবোধহীন অবস্থাকে রবার্ট কে. মার্টন এ নামেই পরিচিত করিয়েছেন)। প্রত্যেক মানুষের সামনে কিছু না কিছু লক্ষ্য থাকে। এসব লক্ষ্য পূরণের জন্য আবার সমাজ স্বীকৃত কিছু পথও থাকে। তবে শুধু যে সমাজসিদ্ধ পথেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, তা নয়। অনেক সময় লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমাজ স্বীকৃত পথ রুদ্ধ হতে পারে, কিংবা কারো কারো কাছে তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তাই মানুষ ভিন্ন পথেও তার লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। প্রার্থীত লক্ষ্য অর্জনকালে সমাজের ব্যক্তিগুলোর মনে যে ভাল-মন্দ; কর্তব্য-অকর্তব্য; ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদি নিয়ে যে টানাপোড়েন চলে, তাই মূলত ব্যক্তির উপর প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে। এ চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মানুষ একটা কিছু করে। মার্টনের মতে মানুষ পাঁচটি উপায়ে তার উপর থেকে সমাজের এই টানাপোড়েনের চাপ দূর করতে সচেষ্ট হয়ঃ

প্রথমত, প্রচলিত মূল্যবোধ বা নীতির প্রতি পূর্ণ সঙ্গতি প্রকাশ। এর ফলে মানুষ তার লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের উপায়কে প্রচলিত বিশ্বাসের সাথে মিলে নেয়। প্রচলিত সমাজ যা চায় মানুষ তা করে, যা চায় না তা করা থেকে বিরত থাকে। যদি তাকে তার প্রার্থিত বস্তু লাভ করতে হয়, তাহলে তাকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে, কষ্ট করতে হবে, ত্যাগ করতে হবে। প্রথম শ্রেণির ব্যাক্তিগণ সেই ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। এ অবস্থা মানুষকে একজন আইন মান্যকারী সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। সমাজ প্রকৃতপক্ষে এটাই প্রত্যাশা করে। কারণ প্রচলিত পন্থায় সমাজ গঠনে এ ধরনের মানুষই সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে।

মানসিক চাপ দূরীকরণের দ্বিতীয় উপায় হল লক্ষ্যকে স্থির রেখে উপায়কে পরিবর্তিত করা। এর অর্থ হবে ভাল হোক আর মন্দ হোক, ন্যায় হোক আর অন্যায় হোক আমার লক্ষ্য অর্জন করতেই হবে। এই মানসিকতার মানুষগুলো সাধারণত নীতিহীন হয়ে থাকে। তারা সফলও হয়। তবে তা ন্যায় ভাবে নয়, অন্যায় ভাবে। এরা মূলত প্রচলিত ধারার অপরাধী।

মানুষের মানসিক চাপ কমানোর তৃতীয় পদ্ধতি হল উপায়কে গ্রহণ করে লক্ষ্য পরিবর্তন। যেমন কেউ যদি মনে করেন, তার একটি মোটর গাড়ি দরকার। তিনি এটার মালিক না হয়ে বন্ধুদের কাছে ধার নিতে পারেন, কিংবা ভাড়া নিতে পারেন। এখানে তার লক্ষ্য হল গাড়ি কেনা। কিন্তু সাধারণ উপায় হল অর্থের মালিক হয়ে তা ক্রয় করা। কিন্তু অর্থ যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন উপায়কে পরিবর্র্তীত করে তা ভাড়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ ধরনের মানুষ আইন মান্যকারী। তবে এরা নিতান্তই ছাপোষা জাতের।

মানসিক চাপ দূর করার চতুর্থ উপায়টি হল, লক্ষ্য ও তা অর্জনের উপায় দুটোই পরিত্যাগ করা। এ জাতীয় মানুষগুলো নিজেদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তারা সমাজের কোন উপকারই করতে পারে না। ব্যক্তিত্বের চাপকে কোন ভাবেই অতিক্রম করতে না পেরে এরা মাদকাশক্ত কিংবা বাউল হয়ে সংসার পরিত্যাগ করে। এরা সমাজের চোখে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী হন। তাদের অপরাধে অন্যরা নয়, বরং নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এরা মূলত সামাকিজ/ ভাইস ক্রাইম করে থাকে।

মানসিক চাপ দূর করার পঞ্চম উপায়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মানুষ তার লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের উপায় দুটোই পরিত্যাগ করে নতুন লক্ষ্য ও উপায় উদ্ভাবন করে। এরাই হল প্রকৃতপক্ষে বিপ্লবী। যেমন, কালো লক্ষ্য হতে পারে ধনী-নির্ধনের পার্থক্য ঘুচিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। কিন্তু প্রচলিত পথে সমাজতন্ত্র কায়েক করা নাও যেতে পারে। তাই তার উপায় হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে সমাজতন্ত্র চালু করা নয়। তিনি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তা করার চেষ্টা করতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত লক্ষ্য(গণতন্ত্র) ও প্রচলিত উপায় (নির্বাচন ব্যবস্থা) দুটোই পরিত্যাগ করে তার স্থলে যথাক্রমে সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবকে প্রতিস্থাপন করেন। পথ ও মত পরিত্যাগ করে নতুন মত প্রতিষ্ঠা ও নতুন পথ তৈরির জন্য এসব মানুষ আপাতত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হলেও পরবর্তীতে এদের মূল্যায়ন ভিন্নভাবে হয়ে থাকে। যদি তারা নতুন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে তারা অনুসরণীয় হয়, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা প্রচলিত ধারার অপরাধিরে মতোই বিচারের সম্মুখিন হন, কিংবা নির্বাসিত হন।

আধুনিক সমাজে প্রতিনিয়তই মানুষ পথ ও মতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু এই সামঞ্জস্য বিধানের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেউ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন কেউ বা ভাল মানুষ। যে সমাজে লক্ষ্য ও লক্ষ্য অর্জনের সুযোগের বৈসম্য যত বেশি হয়, সেই সমাজে ততো বেশি অপরাধ সংঘটিত হয়। এ সমাজ হতে পারে আমেরিকার মতো শিল্পোন্নত, কিংবা আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল; এ সমাজ হতে পারে পাশ্চত্য দেশের মতো পঁজি নির্ভর কিংবা চীনের মতো সমাজতান্ত্রিক। ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আশরাফ-আতরাফ, আর্য-অনার্য, সাদা-কালো ইত্যাদি যত প্রকার বৈসম্য বাড়বে, অপরাধও সে অনুপাতে বৃদ্ধি পাবে। এমতাবস্থায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রধানতম উপায় হবে সমাজের মধ্যে বৈসম্য হ্রাস করা। অন্যদিকে মূল্যবোধের অনুপস্থিতিপূর্ণ সমাজকে যত দ্রুত একটি প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ প্রদান করা যাবে ততো দ্রুতই সমাজ স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করবে। এজন্য এ জাতীয় সমাজে সমাজ সংস্কারক বা ঐশ্যরিক শক্তি সম্পন্ন নেতার প্রয়োজন হয়।