ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কয়েক দিন থেকে জনাব ‘সত্য, সময় এবং পরিবর্তন!!!’ এর লেখাগুলো বেশ মনযোগ সহকারে পড়ছি। হাল আমলে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ব্লগার। তার লেখা আইন-শৃঙ্খলা বর্গের মধ্যেই বেশি পড়ে। আর যেহেতু আইন-শৃঙ্খলা বর্গের আমিও একজন ব্লগার, তাই তার লেখা আমার সাধারণত নজর এড়ায় না।

জনাব, ‘সত্য, সময় এবং পরিবর্তন!!’ এর সর্বশেষ পোস্টটি সম্ভবত আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে। তবে এখনো বলছি, তার লেখার সঠিক মর্ম আমি বুঝতে পারিনি। তার সর্বশেষ দুটো লেখায় দুটো ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম লেখায় বনানী থানার দারোগা সম্পর্কে। দ্বিতীয়টিতে গুলশান থানার একজন এএসআই সম্পর্কে। উভয় ঘটনা আবর্তিত হয়েছে লেখককে ঘিরেই। বুঝতে পারছিনা, কেন শুধু তার পিছনেই পুলিশ পড়ল। যদি এ বিষয়ে আরো খোলামেলা লিখতেন তিনি, আমার বুঝতে সুবিধা হত।

পুলিশের অসদাচরণ নতুন কিছু নয়। প্রতিষ্ঠার শুরুতেই এখানে অসদাচরণ আছে। আর বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরো বেশি প্রকট। এখানে পুলিশকে নিয়ে যেভাবে মাতামাতি হয়, অন্যান্য দেশে অবশ্য সেরূপ হয়না। তবে এও ঠিক যে সমাজের কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান করায় এবং বল প্রয়োগের সরকারি ছাড়পত্র পাওয়ায় পুলিশ সম্পর্কে মানুষ অনেক বেশি উৎসাহী হবে। আর পুলিশ যেহেতু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং সমাজেরই উত্তম প্রতিচ্ছবি, তাই পুলিশের অসদাচরণ আমাদের সর্বাগ্রেই চোখে পড়ে।

অতীতের চেয়ে বাংলাদেশ পুলিশে একটি বিষয় লক্ষণীয়। আর তা হল, সাংঘটনিকভাবে ব্যক্তি পুলিশের অপকর্কে প্রশ্রয় দেয়ার নজির প্রায় বিরল। ঢাকা মহানগরসহ দেশের বেশ কিছু স্থানে ব্যক্তি পুলিশের অপকর্র জন্য শুধু বিভাগীয় মামলাই নয়, ফৌজদারি মামলাও রুজু করা হয়েছে। এটা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে আইনের বাড়াবাড়ি করা হোক কিংবা কোন ব্যক্তি পুলিশ অফিসারের ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের জন্য আইন বিরোধী কাজের জন্যই হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হয়নি।

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোন পুলিশ সদস্য যদি বাড়াবাড়ি করে কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের চেষ্টা করে, তাকে ছাড় দেয়া হয় না। সম্প্রতি প্রকাশিত চট্টগ্রাম মেট্রেপালিটন পুলিশ কিংবা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঘটনাগুলোকে আমাদের ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিৎ। স্বর্ণ চোরাচালান বলেন আর ইয়াবারূপী মাদকদ্রব্য হেফাজতে রাখা বলেন, এসব পুলিশেরই উদ্ঘাটন। পুলিশ সদস্য অপরাধে জড়িত বলে তার সহকর্মীরা তাকে ছাড় দিয়েছে, বিষয়টি তো তেমন নয়।

হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ করতে সরকার নতুন আইনও পাশ করেছে। তবে হেফাজতের সব মৃত্যুই পুলিশের বাড়াবাড়ির ফসল নয়। নানা কারণে সন্দেহভাজন বা আসামী থানায় মৃত্যুবরণ করতে পারে। হেফাজতে মারা গেলেই যে তার জন্য পুলিশ দায়ি হবে এমন ভাবনা অতি সারল্য দোষে দুষ্ট। কারণ মানুষের মৃত্যুর দিন ক্ষণ কেউ আমরা জানি না। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই পুলিশি হেফাজতে আসামীর মৃত্যু একটি আলোচিত ঘটনা। এ নিয়ে সরকার ও পুলিশকে প্রায়শই বেকায়দায় পড়তে হয়।

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য নতুন কোন ঘটনা নয়। আবার বাংলাদেমের জন্য জন্য তা অনন্য কোন ঘটনাও নয়। ইতোপূর্বেও পুলিশ হেফাজতে মানুষ মারা গেছে, বর্তমানেও যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও যাবে। কারণ, পুলিশ হেফাজত আজরাইলের আওতা বহির্ভূত নয়। ইবাদতখানা, হাজতখানা, জেলখানা সব স্থানেই আজরাইল প্রবশে করতে পারে।

আমেরিকা যুক্ত রাষ্ট্রের ডিপার্মেন্ট অব জাস্টিসের হিসেব মতে ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালেরমধ্যে সে দেশে পুলিশ হেফাজতে সর্বমোট মোট ২,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটেছিল। এদের প্রায় ৫৪% পুলিশের হাতে, ১২%ঔষধ বা মদের অতিরিক্ত মাত্রাজনিত কারণে এবং ১১% আত্মহত্যা করেছিল ।

সম্প্রতি মাদারীপুর জেরার ডাসার থানার এক দারোগার বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যুর জন্য আদালতে মামলা করা হয়েছে। ঘটনাটি ছিল এমন। গত ৭ জুন পাশ্র্ববর্তী গৌরনদী থানার অধিবাসী শাহীন মোল্লাকে মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়। ৮ জুন তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন তারিখে সে জেলখানায় অসুস্থ বোধ করে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে।

পুলিশ গ্রেফতারের এক সপ্তাহ পরে একটি মানুষ হটাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। এর জন্য পুলিশকে দায়ী করা কতটা যৌক্তিক? যদি পুলিশ তাকে আহত করত, তাহলে চিকিৎসা দেয়া ছাড়া আদালত কিংবা জেলখানায় তাকে গ্রহণই করা হত না। অন্যদিকে পুলিশের হেফাজত থেকে কোন ব্যক্তি স্বাভাবিক স্বাস্থ নিয়ে জেলখানায় গেল এবং তার এক সপ্তাহ পরে অসুস্থ হল। এই এক সপ্তাহ পরের অসুস্থাকে পুলিশি কর্মকাণ্ডের ফল বলাটা কতটা বাস্তব সম্মত? আর যদি সে মারপিটের জন্য নিহত হয়, এই এক সপ্তাহে সে তো ছিল জেল কর্তৃপক্ষের হেফাজতে। তাহলে তার মৃত্যু কোন হেফাজতের কারণে হয়েছে?

তার পরেও কিন্তু পুলিশ সন্দেহের বাইরে থাকল না। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সে মামলা আদালত অনুসন্ধানের জন্য পুলিশের অন্য একটি ইউনিটকে দায়িত্ব দিয়েছে। অনুসন্ধানে যদি কেউ দোষি হয়, তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়ার মতো কোন প্রচেষ্টা কি পুলিশ গ্রহণ করবে, না করেছে?

যদি অভিযোগ উঠলেই পুলিশকে হাজতে ঢোকানো হয়, তাহলে পুলিশের বিরুদ্ধে যেভাবে ঢালাও অভিযোগ করা হয়, তাতে দেশের জেলখানাগুলো পুলিশকে দিয়েই ভর্তি করতে হবে। আর এ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবে অপরাধীগণ। আমি পুলিশের বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো মনিটর করি। প্রায় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিটে খবর নেই। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এ গুলো অতিরঞ্জিত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাই যাচাই বাচাই ছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলোর প্রতিক্রিয়ায় যদি পুলিশকে শাস্তি দেয়া শুরু হয়, তাহলে সেটা আর যাই হোক ন্যায় বিচার হবে না।

পুলিশকে ফিরিস্তা না ভেবে যদি আমরা এ সমাজেরই একজন বা এক শ্রেণির মানুষ বলে মনে করি, তবে অনেক বিষয় বুঝতে সুবিধা হবে। বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ লোকে, গত ২০১৩ সালের হিসেবে ১১৬টি মামলা বা অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ লোকের মধ্যে অন্তত ১১৬ জন কোন না কোন অপরাধ সংঘটন করে বলে ধরে নেয়া যায়। যদিও এই হিসাবটি একেবারেই প্রাথমিক স্তরের (কেননা এর মধ্যে শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত) তবুও বলতে পারি পুলিশ জনসংখ্যার মধ্যেও এটা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান সদস্য সংখ্যা দেড় লাখের উপরে। তাই অপরিশোধিত হিসেবেও প্রতি বছর বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা অন্তত ১৭৪ টি ফৌজদারি মামলার আসামী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তেমনটি তো ঘটেনি। এ থেকে প্রমাণিত হয়, পুলিশ সদস্যরা সাধারণ মানুষের চেয়ে কম অপরাধ প্রবণ কিংবা তারা পেশাগত উৎকর্ষ কিছুটা হলেও বজায় রাখে।

সূত্রাবলীঃ
১. http://www.nbcnews.com/id/21255937/ns/us_news-crime_and_courts/t/study-died-police-custody-over-years/#.U8o9GEDS9co
২. নিউ এজ ১২অক্টোবর, ২০০৭
৩. http://www.police.gov.bd/Crime-Statistics-yearly.php?id=317