ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

গত বছর টুঙ্গী পাড়ায় গেলাম কমিউনিটি পুলিশিং এর উপর একটি যৌথ কর্মশালা পরিচালনার জন্য। অনুষ্ঠানটি করা হয়েছিল পর্যটন হোটেল মধুমতিতে। অনুষ্ঠান শেষে সেই দিন পর্যটনের হোটেলেই রাত্রি যাপন করলাম।টুঙ্গী পাড়া থানায় দুইজন প্রবেশনার এএসপি রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের বাড়ি এমন এক জেলায় যেখানে আমি কযেক মাস চাকরি করেছি। আর যে জেলায় চাকরি করি সে জেলার কোন মানুষের প্রতি একটি আলাদা ধরনের সহানুভূতি তৈরি হয়। তাই এ প্রবেশনারের প্রতিও আমি বেশি করে মনোযোগী হলাম।

হোটেলে রাতে আমার সাথে এ প্রবেশনার দেখা করলেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র তিনি। পড়াশোনা করেছেন মেরিন টেকনোলোজিতে। জাহাজে চাকরিও করেছেন বছর খানেক। তার পরে এসেছেন পুলিশে। আমি বললাম, জাহাজের চাকরি তো অনেক বেশি লোভনীয়? কিন্তু তারপরও তিনি সরকারি চাকরি করবেন। তার বাবার ইচ্ছায় তিনি সিভিল সার্ভিসে এসেছেন।

অনেক বিষয়েই কথা হল তার সাথে। কোথায় পোস্টিং নিলে ভাল হয়, পুলিশের ভবিষ্যৎ কি—ইত্যাদি হাজারো বিষয় একজন নবীন পুলিশ অফিসারের মনে উঁকি মারা স্বাভাবিক। তবে নবীন অফিসারগণ সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হল প্রমোশনের সুযোগ নিয়ে। ভবিষ্যতে পুলিশের সম্প্রসারণ না ঘটলে তারা প্রমোশন পেয়ে কতদূর যেতে পারবেন—এ বোধটাই তাদের মধ্যে বার বার নাড়া দেয়।

পোস্টিং এর ব্যাপারে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা তাকে বললাম। আমার প্রথম পোস্টিং ছিল রাজশাহী আরআরএফ-এ। এটা হল রিজার্ভ ফোর্স। এখানে কোন ক্রাইম ওয়ার্ক ছিলনা। কিন্তু পোস্টিং এর ব্যাপারে আমি কোন তদবির করি নাই। আরআরএফ থেকে এলাম অধুনালুপ্ত র‌্যাপিড একশন টিম(র‌্যাট) এ। সে র‌্যাট এর ভয়াভহ অভিজ্ঞতার কথা তাকে বললাম। এখানে আমাদের না ছিল বসার ব্যবস্থা, না ছিল বিশ্রাম করার ব্যবস্থা। আমরা এএসপিগণ একটি করে টিম নিয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজদের খোঁজে প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায়-রাস্তায়, বস্তিতে-বস্তিতে ঘুরতাম। আমরা পোশাক পরতাম ডিএমপি এর। আমাদের ইউনিটটি ছিল ডিএমপি এর। কিন্তু ডিএমপি’র অফিসাররা আমাদের তাদের কেউ মনে করত না। ডিএমপির ইফতার পার্টিতে আমরা দাওয়াত পর্যন্ত পেতাম না। চাকুরির শুরুতে প্রায় দুইটি বছর আমরা নিজ দেশে পরদেশির মতো বসবাস করতাম।

এর পর র‌্যাট হল র‌্যাব। আমরা চলে গেলাম ভিন্ন একটি কমান্ডে। সেখানে রেশন পাওয়া শুরু করলাম। অন্তত পেটের ভাত, তরকারির ডাল আর তেলটা পাওয়া গেল। কিন্তু র‌্যাবেও আগের মতোই উদ্বাস্তু রয়ে গেলাম। এখানেও শুরুতে আমাদের বসার কোন ব্যবস্থা ছিল না। কিছু দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীচ তলায় গাদাগাদি করে থেকে সবাই থাকতাম।

কয়েক মাস পরে পোস্টিং পেলাম র‌্যাব-৩ এ। এর অফিস হল নারায়নগঞ্জে। প্রথম দিকে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আদমজী জুট মিলের পরিত্যাক্ত স্কুলের বারান্দায় অফিস করতাম। আমি আর মরহুম লে. কর্ণেল গুলজার হোসেন একটি রিকুইজিশন করা মাইক্রোবাসে ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জে গিয়ে অফিস করতাম। অবশ্য এর পর র‌্যাব-৪ এ বদলী হয়ে আসলাম। সেখানে কিছুদিন পরে একটা বসার জায়গা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও ছিল কমনরুমের স্টাইলে। এএসপি হিসেবে যেভাবে প্রত্যাশা করেছিলাম চাকুরির অনেক বছর তেমন কোন অফিস বা যানবাহন পাই নাই।

র‌্যাব থেকে ফিরে গেলাম রাজশাহী আরআরএফএ। সেখানে কয়েক মাস থেকে গেলাম খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশে। পুলিশ কমিশনারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি জনাব আব্দুল আজিজ জানতে চাইলেন, আমি কোথায় পোস্টিং চাই। আমি বললাম, সে সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার, স্যার। আপনি আমাকে যেখানেই মনে করেন, সেখানেই পদায়ন করবেন। আমি যে কোন পজিশনে কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি আমাকে পদায়ন করলেন পুলিশ লাইন্সে এসি(ফোর্) হিসেবে।

কেএমপিতে হলাম এসি ফোর্স। এর পর চাকরির চার বছর পর সিনিয়র এএসপি হয়ে একটু ক্রাইম ওয়ার্ক করার সুযোগ পেলাম। সেটা ছিল কেএমপি এর খালিসপুর জোনে। তবে র‌্যাট ও র‌্যাবেও কিছুটা ক্রাইম ওয়ার্ক করেছিলাম। কিন্তু সেগুলো ছিল নিতান্তই অপারেশনাল। এ স্থানে আমরা সুপারভাইজিং এর কোন দায়িত্ব পালন করতে পারি নাই। অন্যদিকে র‌্যাব কোন তদন্তকারী পুলিশ সংগঠন নয়। এটা মূলত একটি পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ইউনিট। এখানে তদন্ত নয়, ধর-পাকড় আর নির্বাচিত অভিযানই গুরুত্ব পায়।

এর পরবর্তী সময়ে আমার পোস্টিং সমূহ কোনটাই তদবির বা সুপারিশে হয় নি। কর্তপক্ষ আমাকে যেখানেই পদায়ন করেছেন, মনক্ষুন্ন হলেও সেখানে চাকরি করেছি। সরকারি চাকরিতে ভাল পোস্টিং, খারাপ পোস্টিং ইত্যাদি ধারণা রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত ধারণাকে আমি সুস্থ ধারণা বলে মনে করি না। আমার মতে, ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ সুবিধাগুলো থাকলেই কোন পুলিশ ইউনিটের পোস্টিং ভাল পোস্টিং হতে পারে। যেমন, বিদ্যূৎ সরবরাহ, ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কিছুটা চিত্তবিনোদনের সুযোগ ইত্যাদি কোন কর্মক্ষেত্রেকে ভাল করে তোলে। তাছাড়া আমরা বাঙালিরা পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ সমাজের বাসিন্দা। তাই পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনদের কাছাকাছি, মানে, নিজ জেলার কাছাকাছি কোন পোস্টিংকে আমি ভাল পোস্টিং বলি। এ ক্ষেত্রে রংপুরের অফিসারকে বগুড়ায় কিংবা ফেনীর অধিবাসী কোন অফিসারকে খাগড়াছড়িতে পোস্টিং দেওয়া হলে আমি সেটাকে ভাল পোস্টিং বলি।

আমি জানিনা, আমার এ চাকরির ইতিহাস শুনে সে নবীন অফিসার কতটা আশ্চর্যান্তিব হয়েছিলেন বা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। পরে অবশ্য আমি জানি না তিনি কোথায় পোস্টিং পেয়েছিলেন বা কোথায় আছেন। কিন্তু সরকারি চাকরিতে পোস্টিং এর ক্ষেত্রে একটি দার্শনিক নির্দেশনা আমি তাকে দিতে পেরেছিলাম, তা তিনি গ্রহণ করুন, বা নাই করুন।

আমি মনে করি সরকারি চাকরি হল সেবার বিনিময়ে বেতন ভাতা পাওয়া চুক্তিপত্র। যেখানে গেলে আমি মানুষকে বেশি সেবা দিতে পারব কিংবা সেবা দেয়ার কাজটা সহজতর করতে পারব, একজন পুলিশ অফিসারের সে জাতীয় মানসিকতা থাকা চাই। তদবির, অনুরোধ, উপরোধ, বাধ্যকরণ ইত্যাকার উপায়ে পোস্টিং নিয়ে নিজেদের সম্মৃদ্ধ করা যায় বটে, কিন্তু সরকার যে কারণে আমাকে নিয়োগ দিয়েছে, সেই উদ্দেশ্য সফল হয় না।