ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

United-Hospital

 

গত ৩ জুলাই, ২০১৪ তারিখে মহানগরীর মগবাজারের দিলু রোডের বাসিন্দা মোঃ আলাম ৪৫ দিন রোগে ভুগে ১৫ আগস্টে মারা যান। কিন্তু তার চিকিৎসা বাবদ হাসপাতালে বাকি পড়ে ৩১ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৮ টাকা। যার মধ্যে ১১ লাখ ৭৪ হাজার ৪১০ টাকা তার ওয়ারিসগণ পরিশোধ করলেও বাকি ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৭৮ টাকা। তারা পরিশোধ করতে আপাতত অপারগ হয়। এ অপারগতার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়ারিসদের লাশ দিতে অস্বীকার করে। পরে পুলিশের মধ্যস্ততায় কয়েক কিস্তিতে আগামী জানুয়ারির মধ্যে পরিশোধের অঙ্গিকারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশটি ওয়ারিসদের হাতে দিতে সম্মত হয়। এ নিয়ে দেশের সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্বাস্থ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম পর্যন্ত বিষয়টিকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেন।

হয়তো কেউই অস্বীকার করবেন না যে স্বাস্থ খাতে যদি বেসরকারি বিনিয়োগ না হত, তাহলে দেশে এক প্রকারের মহামারি দেখা দিত। হয়তো মানুষের লাশ কুত্তা-শিয়ালে টানাহেঁছড়া করত। কেননা, সরকারি স্বাস্থ খাতের বিনিয়োগহীনতা, অবস্থাপনা, অদক্ষতা ও অনেক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলার প্রভাবে দেশের মানুষের স্বাস্থ সেবা সুদূর পরাহত হত। দেশের আনাচেকানাচে ছোটবড় ভালমন্দ, যাই হোক না কেন, বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলো মানুষকে বাস্তবিকই কোন না কোনভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু স্বাস্থসেবা দিলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলো মূলত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হল মুনাফা করা। কম বিনিয়ো বেশি মুনাফা করাই হল ব্যবসার নীতি। যারা বিনিয়োগ করেছেন, তারা যেমন ফিরিঙ্গি মনোভাবের, তেমনি যারা সেবা দিচ্ছেন অর্থাৎ ডাক্তার, তারাও কখনও কখনও কশাইয়ের চেয়েও বেশি নির্মম, নির্দয় ও বিজাতীয় হয়ে যান। তাদের কাছে স্বাস্থসেবা অর্থের নামান্তর মাত্র। অর্থ দিলে আপনাকে তারা কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। অর্থ না দিলে আপনাকে সকল আয়ুসহ মুহূর্তেই মেরে ফেলতে পারে।বেসরকারি হাসপাতালারে রোগিগণ হয়ে যান পণ্যতুল্য।

২০০৫-০৬ সালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মরত থাকাকালীণ শুনেছিলাম, খুলনার এক গাইনী ডাক্তার, যার পৈত্রিক নিবাস ছিল উত্তরাঞ্চলের কোথাও, সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ ভিন্ন রোগীর শরীরে হাত দিতেন না। অপারেশন টেবিলে রোগি প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। একটু দেরি করলে হয় প্রসূতি, নয়তো তার জঠরের সন্তান কিংবা উভয়েই মারা যাবে। কিন্তু তারপরও হাতে অগ্রিম টাকা না নিয়ে তিনি রোগির শরীরে অস্ত্র চালাবেন না। তার এক হাতে থাকে অপারেশনের ছুরিকাঁচি, অন্যহাতে চাই টাকা। গল্পের মধ্যে অতিরঞ্জন আছে, কিন্তু অসত্য নেই। যদি টাকাই না পাই, তাহলে প্রসূতির সফল প্রসবে আমার কি আসে যায়?

সেই দিক দিয়ে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতাল অনেকটাই ভাল। তারা টাকা ছাড়া রোগিকে তাদের হাসপাতালে অন্তত মরার সুযোগ করে দিয়েছেন। তবে রোগির চিকিৎসা হলেও শুধু তারা লাশটি আটকে রেখে ছিলেন যা পরবর্তীতে ৩১ লাখ টাকা দিয়ে মৃতের ওয়ারিসগণ কিনে নিয়ে গেছেন। ভাগ্যিস তাদের লাশ কেনার সামর্থ্যটুকু ছিল।

আর আমরাও, ভাই, কেমন? যে টমেটো শীতকালের ফসল, সে টমেটো আমাদের সারা বছর চাই। যে কাঁচা মরিচের গাছ অধিক বর্যায় মারা যায় এবং বর্ষাকালে দুষ্প্রাপ্য হয়, সে কাঁচা মরিচ না হলে আমাদের প্রাত্যহিক তরকারি রান্না হয়না। আমরা সবকিছু সব সময় চাই। আর একটু দাম বাড়লে সব চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করি সংশ্লিষ্টদের, মাথায় তুলি পাড়ামহল্লা!। এ রোগির আত্মীয়রা কি জানতেন না, ইউনাইটেড, স্কয়ার, ল্যাব এইড এগুলো হল গলাকাটা হাসপাতাল? এখানে মানুষের জীবনের চেয়ে অর্থের দাম বেশি। অর্থ দিয়ে এখানে মানুষের জীবন কেনা হয়? তাহলে, এত বেশি খরচের হাসপতালে রোগি নেয়া কেন? আর সব রোগের কি চিকিৎসা হয়? টাকা দিলে যদি জীবন পাওয়া যেত, তাহলে তো আর কেউ পৃথিবী থেকে বিদায় নিত না। যে রোগি মরমর হয়েছে, যার চিকিৎসার ভার আপনারা বহন করতে অপারগ তাকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করলেন না কেন?

পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতিকে সব কিছুকেই বেসরকারিকরণের পিছনে এক শ্রেণির অর্থনীতিবিদের উপদেশ রয়েছে। আমাদের আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের অনেকেই আবার ঋণের শর্ত হিসেবে বেসরকারিকরণের মাত্রা বাড়ানো শর্ত জুড়ে দেয়। আমাদের অনেক সরকারই তাদের কাছে মাথা নত করেন।(ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে, যিনি বিশ্বব্যাংককে অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে হলেও কলা দেখিয়েছিলেন)। কোন কোন দেশ বেসরকারিকরণকে কূটনৈতিক সম্পর্কের শর্ত হিসেবেও জুড়ে দেন। কিন্তু সে সব দেশের বেসরকারি খাত আর আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের বেসরকারি খাত তো এক প্রকার নয়। ঐসব দেশের সব প্রতিষ্ঠান উন্নত, বিকশিত। তাদের সব ক্ষেত্রেই সুস্থ্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ রয়েছে। সেখানে মানুষ শতপতি থেকে কোটিপতি হয় নিজ যোগ্যতা বলে, নিয়মানুসারে প্রতিযোগিতা করে। সেখানকার প্রতিযোগিতা ক্রেতার সন্তুষ্টি আদায়ের প্রতিযোগিতা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিযোগিতা ক্রেতাকে কষ্ট দেয়ার ও ক্রমান্বয়ে হত্যা করার প্রতিযোগিতা। এখানে যে যতবেশি মানুষকে ঠকাতে পারে, সে ততোবেশি মুনাফা করতে পারে। আর মানুষকে ঠকানোর প্রতিযোগিতাও চলে এখানে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে ভাল ও উন্নত সেবা দেয়া প্রতিযোগিতা হওয়া উচিৎ। কিন্তু এখানে কি সেবা দিলাম, তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, কত বেশি পয়সা বা ফি নিলাম। যিনি বত বেশি ফি নেন তিন ততো বেশি ভাল ডাক্তার আর যে হাসপাতালে যত বেশি খরবচ হয়, সেই হাসপাতালও ততো বেশি ভাল। এখানে রোগির সুস্থতার বিনিময়ে রোগির গলাকাটার পাঁয়তারা চলে।

আমাদের মানসিকতাও কি? যে ডাক্তাদের ফি কম, সেই ডাক্তার হল অনভিজ্ঞ, মন্দ। যদি এত ভাল ডাক্তারই হবেন, তাহলে কি আর এত কম টাকা নেন? আমাদের এলাকার এক বড়ভাই চক্ষু বিশেষজ্ঞ। এক সময় তার পোস্টিং ছিল গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে। তিনি ভাবলেন, বাড়ির কাছেই যথন, যাই প্রতি সপ্তাহে গিয়ে বাড়ির কাছে কোথাও বসি। তিনি তার ফি নির্ধারণ করলেন মাত্র ১০০টাকা। অনেক মানুষ তার কাছে সেবা নিতে আসলেন। কিন্তু বেশির ভাগই আসলেন না। তারা বললেন, এত বড় ডাক্তার হলে আবার গ্রামে এসে বসেন, এত কম ফি নেন? একবার দেখা গেল, তিনি গ্রামে যাতায়াতের খরচ বহনের জন্য প্রয়োজনীয় ফি টুকুও পাচ্ছেন না। তিনি গ্রামে বসা বন্ধ করে দিলেন।

বাজার অর্থনীতি বলতে সম্পূণরূপে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহই যে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নয়। পৃথিবীর কোথাও আদর্শ অর্থে ‘বাজার অর্থনীতি’ নেই। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সিংগাপুর বা মালয়েশিয়া পর্যন্ত প্রত্যেক দেশই কোন না কোন ভাবে তাদের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের দেশে শক্তিশালী ভোক্তা অধিকার আইন আছে, আইনের প্রয়োগ আছে, বেসরকারি উদ্যোগে ভোক্তাদের অধিকার আদায়ের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে। এসব সংগঠনের পক্ষে সরকারের বড় পৃষ্ঠপোষকতা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এ সবের তেমন কিছুই নেই। অনেক ক্ষেত্রে আইন নেই, আইন থাকলে তার প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বেসরকারি সংগঠন মানেই লাভজনক সংগঠন। স্বেচ্ছাসেবী বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এখানে শুধু ধারণার উপরই নির্ভরশীল।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে অস্বীকার করার উপায় নেই। শুধু সরকারি প্রচেষ্টায় উন্নয়ন, অগ্রগতি আর জীবনমানের উন্নতীসাধন সম্ভব নয়- এটা এখন প্রমাণিত সত্য। কিন্তু তাই বলে বেসরকারিকরণ মানেই সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করা নয়। দেশের জনগণের ভালমন্দ দেখার দায়িত্ব সরকারের আছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো সজনগণকে স্বাস্থ্যসেবা বিতরণের বিনিময়ে জনগণের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকে। তাই জনগণের ভালমন্দের সাথে জড়িত যে কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি নজর দেয়াও সরকারের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। গলাকাটা হারে অর্থ নিবেন কিন্তু নামমাত্রমূল্যে বা কশাই মানসিকতা নিয়ে সেবা দিবেন তা তো হতে পারে না। অন্যদিকে সরকার তথা জনগণের দেয়া ট্যাক্সের খরচে নির্মিত রাস্তাঘাট, সাবসিডিমূল্যে দেয়া বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানী তেল কত কিই না তারা ব্যবহার করছেন। তাই সরকারের জনকল্যাণের জন্য অনুসৃত নীতির মধ্যেও তাদের অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সেবা দেয়া বা হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা দেয়া দরকার। প্রয়োজনে সপ্তাহের অন্তত একটি দিন বিনামূল্যে দরিদ্রদের চিকিৎসা দিতে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোকে বাধ্য করা যেতে পারে। (১৯ আগস্ট, ২০১৪)