ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বিশ্বজগতের সৃষ্টিকুলে মানুষের অনন্য ও উচ্চতর স্থানের পিছনে সবচেয়ে বড় কথা হল মানুষ কলপনা প্রবণ। বাস্তবতার চেয়ে মানুষের কল্পনার জগৎ অনেক বেশি ব্যাপক। কল্পনা প্রবণ মানুষ তৈরি করে সাহিত্য । এ সাহিত্যই কালক্রমে বিজ্ঞানে রূপ নেয়, বিজ্ঞান আবার রূপ নেয় প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তি হল বৈজ্ঞানিক সূত্রকে ব্যবহার করে মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান দেয়ার কৌশল।

খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে পণ্ডিত ব্যাসদেব তার কল্পনায় এঁকেছিলেন মহাভারতের মতো মহাকাব্য। হস্তিনাপুর রাজ্যের সম্রাট পাণ্ডুর পাঁচপুত্র আর পাণ্ডুর অবর্তমানে তারই অন্ধ ভ্রাতা রাজ্যের তত্ত্বাবধায়ক ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের মধ্যে রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিবাদ সৃষ্টি হয় তারই পরিণাম কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। কিন্তু মহাভারতের কাহিনীমালা এখানেই সিমাবদ্ধ নয়। মানুষ্য জীবনের হাজারো বিষয়, শত শত বৈজ্ঞানিক কল্পনা মহাভারতে স্থান পেয়েছে। এসবের মধ্যে অন্যতম হল ধৃত রাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারীর শত পুত্রের জন্মের উপাখ্যান।

দীর্ঘ দুই বছর গর্ভ ধারণ করে ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারী একটি মাংস পিণ্ড প্রসব করে। এ মাংস পিণ্ডকে তপোবলে মুনি ব্যাসদেব এক শত এক ভাগ করে প্রত্যেক ভাগ এক একটি কলসিতে রেখে গান্ধারীর এক শত এক পুত্রের জন্ম নিশ্চিত করে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের খলনায়ক দুর্যোধন ও তার ১০০ ভাইয়ের জন্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আধুনিক কালের টেস্টটিউব বেবিদের কথা মনে হবে। পুরুষের শুক্রানু আর নারীর ডিম্বানুকে একটি টেস্টটিউবের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে জাইগোটে পরিণত করা হয়। এ জাইগোট পরবর্তীতে স্থাপন করা কোন সক্ষম নারীর গর্ভে /জঠরে। এ নারী হতে পারে সে একই নারী যার ডিম্বানুকে টেস্টটিউবের মধ্যে কার্টিলাইজড করা হয়েছে কিংবা অন্য কোন নারী যার সাথে এ জাইগোটের কোনই সম্পর্ক নেই।

ঠিক দশ মাস দশ দিন পর টেস্ট কিউবে প্রাণ পাওয়া আদম সন্তানটি এমন এক নারীর গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হতে পারে যার সাথে সে সন্তানের কোনই সম্পর্ক নেই। এ নারী শুধু এ সন্তানের অভিবাভাবকের জন্য তার জঠরটি ভাড়া দিয়েছেন। বিজ্ঞানের বর্তমান পর্যায়ে টেস্ট টিউব বেবি মানুষের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হচেছ। কিন্তু ভবিষ্যতে এমনও দিন আসতে পারে যখন নারী-পুরুষের শুক্রানু-ডিম্বানুর মিলনে মানব সন্দান শুধু টেস্ট টিউবের মধ্যে প্রাণই পাবে না, টেস্ট টিউব থেকে সময় মতো জন্মও নিবে।শুধু শুক্রানু ও ডিম্বানু ধারণ ভিন্ন সন্তান জন্মদানে নারী-পুরুষের আর কোন ভূমিকাই থাকবে না। তখন অফিসিয়াল কাগজ পত্র ভিন্ন শিহুর পরিচয় নির্ধারণ প্রাথমিক অবস্থায় সম্ভব হবে না। সে সময় মানুষ বলতে পারবে খ্রিষ্ট জন্মের ৪০০ বছর পূর্বে একজন মহাকবি মানব শিশু জন্মের যে পদ্ধতি কল্পনা করেছিলেন তারই বাস্তবায়ন করেছে অত্যাধুনিক যুগের বিজ্ঞানীরা। উত্তরাধুনিক কালের টেস্ট টিউব বেবিগণ সে অনুযায়ী মহাভারতে কথিত দুর্যোধনাদীর উত্তর পুরুষ হবেন।

ফৌজদারী মামলার তদদেন্তর জগতে এমনি একজন কল্পনাকারী ছিলেন। তিনি একজন কল্প লেখব; একজন ডিটেকটিভ রাইটার। তার পুরো নাম আর্থার কোনান ডোয়েল হলেও তাকে মানুষ সালর্ক হোমস বলে চিনেন। অর্থাৎ কোনান ডোয়েল তার গোয়েন্দা কাহিনীগুলোতে অপরাধ তদন্তের যে কল্প-জগৎ তৈরি করেছিলেন তার জীবদ্দশাতেই তা বাস্তব রূপ পাচ্ছিল।

সালর্ক হোমসের কাহিনীগুলোতে অনেক ঘটনার তদন্তের একটি প্রধানতম উপায় ছিল, কোন অপরাধস্থলে অপরাধীদের ফেলে যাওয়া বস্তু বা আলামত থেকে কিংবা ঘটনাস্থলে প্রকৃত অবস্থা বিশ্লেষণ করে অপরাধীকে সনাক্ত করা। অপরাধীকে না দেখেই ঘটনাস্থলে তার রেখে যাওয়া বস্তু, অপরাধ সংগঠনের উপায়, ঘটনাস্থলের বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে অপরাধীদের ব্যাক্তিত্ব, আচার-আচরণ প্রত্যাহিক অভ্যাস, ভালো লাগা-ভালোবাসা, এমনকি তার বংশ পরিচয় পর্যন্ত উদঘাটন করা।

‘দি হাইন্ড অফ দি বাস্কভিলমস’ গল্পের কাহিনীর শুরুতেই দেখা যাবে, শার্লকের বন্ধু ড. ওয়াটসন শার্লকের ড্রয়িং রুমে একটি ওয়াকিং স্টিক পড়ে থাকতে দেখেন। এ ছড়িকে শার্লকের মতো তিনি বিশ্লেষণ করে ছড়ির মালিকের পরিচয় উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন। ছড়িটি তার মালিকে কাছে ছিল একটি উপহার যা তাকে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায়কালে দেওয়া হয়েছিল। ছড়িতে তার নাম লেখা আছে ‘ডঃ মটিয়ার’। ছড়ি দেখে ওয়াটসন সার্লক স্টাইলে কিছু মন্তব্য করলেও তা ছিল ভুল।

ড. ওয়াটসনের ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণের পর সার্লক ছড়িটি পর্যবেক্ষণ করে উদঘাটন করেন যে ছড়ির মালিক একজন প্রায় যুবক বয়সী ডাক্তার। কোন হাসপাতালের চাকরি থেকে নিজ ইচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। তিনি হাসপাতালের স্থায়ী ডাক্তারও ছিলেন না। স্বাধীনভাবে প্রাকটিস করার জন্য তিনি বিদায় নেন। তিনি অভিজাত বংশীয় না হলেও গেঁয়ো চাষাদের ডাক্তার নন। তার জীবণ পরিপাটি নয়। তিনি আত্মভোলা। তিনি উচ্চাকাঙ্খীও নন। তার সাথে সবসময় একটি কুকুর থাকে। কুকুরটি কোকড়া লোমওয়ালা স্পেনিয়াল। মানুষ হিসেবে তিনি অমায়িক কিন্তু অন্য মনস্ক। ছড়ির মালিকের শারিরীক গঠন, ভিতরের ব্যক্তিত্ব, তার সাথে থাকা কুকুর– সব কিছু পরিচয় উদ্ঘাটনের পিছনে শার্লক তার যুক্তিসমূহ তুলে ধরেন। পরে যখন ছড়ির খোঁজে ডাক্তার মর্টিয়ায় শালকের ড্রয়িং রূমে প্রবেশ করেন, তখন শার্লকের কল্পিত ব্যক্তির সাথে বাস্তবের ড. মাটিয়ার মিলে যায়।

আর্থ্যার কোননে ডোয়েলের এ যে তদন্ত পদ্ধতি তা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কল্পনাতে থাকল না। পাশ্চাত্যের পুলিশিং জগতে ১৯৭০ দশকের শুরু থেকেই তা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর চেষ্ট চলল। সালর্ক হোমসের তদন্ত পদ্ধতি অবশেষে রূপ নিল ‘অপরাধী প্রোফাইলিং’ বা ‘অনুসন্ধানী মনোবৈজ্ঞানিক তদন্ত কৌশল’।

হ্যাঁ আমরা ক্রমশঃ ফৌজদারি মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে তৃতীয় একটি যুগে প্রবেশ করছি। যুগটি হল অপরাধীর মন বা ব্যক্তিত্ব অনুসন্ধানের যুগ। তদন্তের ক্ষেত্রে প্রথম যুগ ছিল উনবিংশ শতাব্দীর লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড কর্তৃক আবিষ্কৃত ও বিশ্বব্যাপী অনুসৃত অপরাধে যোগসূত্র (Clue) অনুসন্ধান করার যুগ। বাহ্যিক, ও মৌখিক সাক্ষ্য এবং অপরাধ স্থল থেকে নেয়া ঘটনাগুলোর পাষ্পরিক যোগসূত্র আবিষ্কার করলেই সে যুগের তদন্ত শেষ হতো অর্থাৎ অপরাধটি উদঘাটিত হতো।

এর পূর্ববর্তী যুগ ছিল অপরাধ বিশ্লেষণ। অর্থাৎ বারংবার সংঘটিত অপরাধগুলো বিভিন্ন আঙ্গীকে পর্যালোচনা করে ইতোপূর্বে একই জাতীয় অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা। এ ক্ষেত্রে হস্তরেখা, পদরেখা, ফটোগ্রাফি এবং হাল আমলের ডিএনএ টেস্টও প্রয়োগ করা হতো। কিন্তু সর্বশেষ যুগে অপরাধ তদন্তকারীগণ উল্লিখিত ব্যবস্থা বা কৌশলগুলোর বিইরেও অপরাধীদের মনের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাও কোন জানা অপরাধী নয়। অপরাধস্থলের অবস্থা, অপরাধীর মোডাস আপারেন্ডি, সিগনেচার আসপেকট এবং অপরাধ স্থলের বাস্তুব অবস্থা থেকে অপরাধ সংগঠনকারী অজানা অপরাধীর ব্যক্তিত্বের ধারণা করিই হল তৃতীয় প্রজন্মের অপরাধ-তদন্ত কৌশল যাকে বলা হয় অপরাধ প্রোফাইলিং। কোন কোন ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী এটাকে বলেন, অনুসন্ধানী মনোবিজ্ঞান।

অপরাধ-প্রফাইলিং সম্পর্কে কিছু কিছু ভুল ধারণাও বাজারে প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, অপরাধ প্রোফাইলিং দ্বারা কোন ঘটনা সংঘটনকারী ব্যক্তির নাম পরিচয় নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব। তবে অপরাধ প্রোফাইলিং তেমন কোন সুনির্দিষ্ট অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারে না। এটা অপরাধ মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তায় পুলিশের আসল তদন্তের ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান গাইড লাইন যা পুলিশকে অজানা অপরাধীদের ব্যক্তিত্ব, অভ্যাস, শারীরিক বর্ণনা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ইত্যাদি দিয়ে তাদের সম্ভাব্য অভিযুক্তের তালিকাকে সংক্ষিপ্ত করার প্রয়াস পায়। যখন যোগসূত্রহীন কোন অপরাধ তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ অফিসারগণ দিশেহারা হয়ে পড়েন, অপরাধী সম্পর্কে কোন ধারণাই করতে পারেন না, অপরাধ প্রোফাইলিং সেই সময় তদন্তকারীদের কিছু সম্ভাব্য অভিযুক্তের ধারণা তুলে ধরে।

 

—————————————————————–
অপরাধ প্রোফাইলিং ও সিরিয়াল কিলিং এর গল্প (চতুর্থ পর্ব)
অপরাধ প্রোফাইলিং ও সিরিয়াল কিলিং এর গল্প (তৃতীয় পর্ব)
অপরাধ প্রোফাইলিং ও সিরিয়াল কিলিং এর গল্প (দ্বিতীয় পর্ব)
অপরাধ প্রোফাইলিং ও সিরিয়াল কিলিং এর গল্প (প্রথম পর্ব)