ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
images

গত রমজানের ঈদ উপলক্ষে প্রচারিত বিখ্যাত উপস্থাপক হানিফ সংকেতের অত্যন্ত জনপ্রিয় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদিতে’ একটি দর্শক পর্বে বেশ কিছু অভিনেতা, একজন পুলিশ অফিসার ও কয়েকজন সাধারণ মানুষ ছিল। অনুষ্ঠানটি গত ৩ সেপেটম্বর, ২০১৪ পুনঃপ্রচারিত হল। অনুষ্ঠানটিতে দেখলাম, অভিনেতা জাহিদ হাসান একজন ট্রাক ড্রাইভারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। আর অন্য একজন সাধারণ মানুষ অভিনয় করছেন ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায়। অভিনয়ের সারমর্ম হল, রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ অতিরিক্ত মাল বোঝাইয়ের দায়ে একটি ট্রাক আটক করলে মাতাল ড্রাইভার ট্রাফিক পুলিশ অফিসারকে ঘুষ দেয়ার প্রস্তাব করে। ট্রাফিক পুলিশ ঘুষের টাকা হাতে নিয়ে তা দ্রুত পকেটে রেখে দেন। মাতাল ড্রাইভার মনের আনন্দে আইন ভঙ্গ করে ট্রাক নিয়ে চলে যায়। অভিনয়ের সময় ঢাকা মেট্রোপলিটনের ট্রাফিক বিভাগের একজন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। অভিনয় শেষে উপস্থাপক হানিফ সংকেত ডিসি ট্রাফিকের কাছ থেকে পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধের উপায়গুলো জানতে চান। ডিসি সাহেব কিছু মুখস্ত করা কথা বলে অনুষ্ঠানের এ পর্ব শেষ করেন।

ট্রাফিক পুলিশ তথা পুলিশের ঘুষগ্রহণ কোন নতুন ঘটনা নয়। আমাদের পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনসহ সকল প্রকার প্রচার মাধ্যম এ নিয়ে রীতিমত খবর, প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় প্রচার করছে। কিন্তু তাই বলে বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠানে, তাও আবার সরকারি প্রচার মাধ্যম বিটিভিতে, ভূমিকার মধ্য দিয়ে পুলিশকে ঘুষখোর রূপে তুলে ধরা কতটা যৌক্তিক?

আমার ছাত্র জীবনে পত্রিকায় পড়েছিলাম, অস্ট্রেলিয়ার একটি শিশুতোষ বইতে একটি কার্টুন ছবিতে এক ইঁদুর বিড়ালকে ঘুষ দিচ্ছে। বিড়াল হল পুলিশ অফিসার। এই নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় রীতিমত হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ কর্তৃপক্ষ বললেন, শিশুতোষ গ্রন্থে এই কার্টুনের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে পুলিশ ঘুষ খায়। এ ধরনের বই বাজারে থাকলে ও শিশুরা তা পড়লে শিশুদের মধ্যে পূর্ব সংস্কার জন্ম নিবে। যে শিশুদের পুলিশ সম্পর্কে কোনই অভিজ্ঞতা নেই, তারা জীবনের শুরুতেই পুলিশকে ঘুষখোর হিসেবে ভাবতে শুরু করবে যা কোন জাতির শিশুদের জন্য কাঙ্খিত শিক্ষা হতে পারে না। পুলিশসহ অভিজ্ঞ মহলের প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই শিশুতোষ গ্রন্থ থেকে পুলিশরূপী বিড়ালকে ঘুষ দেয়ার কার্টুন প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

অনেকে বলবেন, অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ ঘুষ খায় না। তাই এ ধরনের কার্টুন ছবি অপ্রাসঙ্গিক ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশের ঘুষ গ্রহণ ‘ওপেন সিক্রেট’। এটা চাঁদ-সুরুজের মতোই সত্য। তাই এটা প্রচার মাধ্যমে বা পাঠ্য বইতে তুলে ধরতে কোন অসুবিধা নেই। শিশুদের সত্য জানা উচিত। কিন্তু তারা হয়তো জানেন না, পৃথিবীতে কোন জাতিই সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত নয়। অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতেও দুর্নীতি আছে। দুর্নীতি যেখানে আছে সেখানে পুলিশেও দুর্নীতি থাকবে। পুলিশের দায়িত্বের ধরন, ক্ষমতা প্রয়োগ, কর্মঘন্টা সব কিছুর মধ্যেই দুর্নীতির অফুরন্ত সুযোগ ও প্রলোভন রয়ে যায়। তাই পুলিশ তথা পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ করে– এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির আধিক্য লক্ষণীয়।

পৃথিবীতে এমন কোন দেশ নেই, আর এমন কোন দেশের পুলিশ সংগঠনে অস্তিত্বও নেই যেখানে দুর্নীতির সমস্যা নেই। তবে দুর্নীতির তিব্রতার মাত্রাভেদ রয়েছে। কিন্তু যে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানই কমবেশি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত, সেখানে শুধু পুলিশকে পৃথকভাবে দুর্নীতিবাজ বলে প্রচার করা বা উঠতে-বসতে দোষারোপ করাটা শুধু অযোক্তিকই নয়, আত্মঘাতিও বটে। যে সংগঠনের সেবা ছাড়া আমরা চলতে পারি না, সেই সংগঠনটির দুর্নীতির কালিমালিপ্ত শরীরে আরো যদি কাদামাটি তুলে দেয়া হয়, তাহলে এমন একদিন আসবে তাকে জরুরি সেবার জন্য তাকে খুঁজে পাওয়াই ভার হবে।

অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ সংগঠনগুলো দুর্নীতির দায়ে একদম কম অভিযুক্ত। কিন্তু তাই বলে এমনটি নয় যে অস্ট্রেলিয়ার সকল প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিগ্রস্ত। আর শুধু পুলিশই দুর্নীতিমুক্ত। এসব দেশের শুধু পুলিশ নয়, সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানেই শুদ্ধতার চর্চা হয়। অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিবিদগণ ভোটারদের কাছ থেকে বখরা নেয় না, প্রশাসকগণ সার্টিফিকেট জাল করেন না, ক্ষমতাসীনগণ উন্নয়ন-টেন্ডার-কন্ট্রাক্ট-বাণিজ্যতে শতকরার অংক কষেন না। যেহেতু এ দেশের সকল প্রতিষ্ঠানেই শুদ্ধাচার রয়েছে, তাই পুলিশও সবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শুদ্ধ থাকারই চেষ্টা করে। কিন্তু তাই বলে সে দেশের পুলিশ-প্রশাসকগণ কেউ নিষ্কলুষ ফিরিস্তা নন। তারা রীতিমত মর্তের মানুষ। এই তো কিছু দিন আগেও ঘুষ গ্রহণের দায়ে খোদ অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড পুলিশের কমিশনার টেরি লুইসকে শুধু বরখাস্তই করা হয়নি, তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলও খেটেছেন।

ঈদ উপলক্ষে তৈরি করা ইত্যাদির এ পর্বের অনুষ্ঠানে পুলিশের যে কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন তার উচিৎ ছিল এ ধরনের একটি অভিনয়কে প্রতিহত করা। পুলিশকে দুর্নীতির দায়ে দোষ দেওয়া আর কোন বিনোদন অনুষ্ঠানে অভিনয়ের মাধ্যমে পুলিশকে ঘুষখোর প্রমাণিত করা এক জিনিস হতে পারে না। বাংলাদেশের সকল খাতেই দুর্নীতির সমস্যা রয়েছে। আমাদের সামনে এ মুহূর্তে শুদ্ধাচারের অনুসরণীয় আদর্শ নেই। কোন প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছ আর কোনটি অস্বচ্ছ– এ প্রশ্ন বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক। তবে প্রাসঙ্গিক এই যে কোন প্রতিষ্ঠানটি অপেক্ষাকৃত কম অস্বচ্ছ | এমতাবস্থায়, কোন বিনোদন অনুষ্ঠানে পুলিশকে ঘুষ হিসেবে প্রচার না করাটাই যৌক্তিক ছিল। আলোচিত অভিনয় পর্বে পুলিশ কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ না করে ড্রাইভারকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারত। এতে বিনোদনের সামান্যতম ঘাটতিও হতো না। আমি আশা করি, ‘ইত্যাদি’ সকল বিনোদন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ভবিষ্যতে এ বিষয়টি মাথায় রাখবেন।

 

(৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)