ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশের অপরাধ দমনের তালিকায় সর্বাগ্রে থাকে সম্পত্তির বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ করা। সম্পত্তির বিরুদ্ধে অপরাধের মধ্যে ডাকাতির অপরাধ পুলিশ নেতৃত্বের কাজে অনেক বেশি এলার্জিক। কোন থানা এলাকায় একই মাসে একটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সে থানার অফিসার-ইন-চার্জকে নিয়ে জেলার পুলিশ সুপার বড়ই অস্বস্তিতে থাকেন। একই মাসে দুটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে ডিআইজি পুলিশ সুপারকে নিয়ে অস্বস্তিবোধ করেন। আর একই থানায় একই মাসে তিনটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সে থানার অফিসার-ইন-চার্জের চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে । ভাগ্য বেশি খারাপ হলে তিনি হয় বরখাস্ত হবেন, নয়তো মন্দের ভাল হিসেবে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত হবেন।

এমতাবস্থায়, কোন থানার অধীক্ষেত্রে যাতে একই মাসে একাধিক ডাকাতির ঘটনা না ঘটে, তাই থানা পুলিশ নানা প্রকারের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ইতিবাচকটি হল পুলিশি টহল বৃদ্ধিসহ দাগী ডাকাতদের বিরুদ্ধে সাঁড়াসী অভিযান পরিচালনা করা। আর নেতিবাচক ব্যবস্থাটি হল, ডাকাতির অপরাধগুলো বেমালুম চেপে যাওয়া। অর্থাৎ ডাকাতি হলেও পুলিশ থানায় মামলা রুজু করবে না। অনেক পিড়াপীড়ি বা বেকায়দায় পড়ে মজলুম পক্ষকে অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে অপেক্ষাকৃত লঘু ধারায় মামলা দিতে অনুরোধ, উপরোধ এমনকি বাধ্যও করা হতে পারে। যেমন, ডাকাতির বদলে দস্যুতা, কিংবা অন্যকোন অপরাধ করার উদ্দেশ্যে রাত্রিবেলায় সঙ্গোপনে অনধিকার গৃহপ্রবেশ ইত্যাকার অপরাধ দেখিয়ে একটা মামলা রুজু করে অফিসার-ইন-চার্জ পুলিশ সুপারকে এবং পুলিশ সুপার ডিআইজিকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু কোন থানা অধীক্ষেত্রে ডাকাতিকালে যদি ডাকাতরা কাউকে খুন করে বসে, তাহলে সে অপরাধের জন্য মামলা না নিয়ে পুলিশের উপায় থাকে না। কারণ, ডাকাতি গোপন করা গেলেও খুনের অপরাধ গোপন করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয় না। মানব দেহের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধগুলোর মধ্যে খুন সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। অন্যদিকে, সম্পত্তির বিরুদ্ধে কৃত অপরাধগুলোর মধ্যে ডাকাতি সবচেয়ে গুরুতর। এখন দুই প্রকারের দুইটি জঘন্যতম অপরাধ যখন একত্র সংঘটিত হয়, মানে খুনসহ ডাকাতি সংঘটিত হয়, তখন পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়।

আমার এখন পর্যন্ত পুলিশি চাকরি জীবনে তদন্ত তদারক করা খুনসহ ডাকাতি অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে চারটি ছিল নোয়াখালী জেলায়। ২০০৯ সালের ২৪ মে নোয়াখালী জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করে সে দিনই যে মামলাটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলাম তা ছিল খুনসহ ডাকাতির ঘটনা। অপরাধটি সংঘটিত হয়েছিল আমার নোয়াখালী জেলায় যোগদানের প্রায় দু মাস আগে। নোয়াখালীতে আমার ১৩ মাসের চাকরিকালে চাটখিল থানায় একটি এবং বেগমগঞ্জ থানায় অন্য একটি খুনসহ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। চতুর্থ মামলাটি ছিল সোনাইমুড়ি থানার। কিন্তু এই মামলাটিও হয়েছিল আমার নোয়াখালীতে যোগদানের চার/পাঁচমাস আগে। দুরুহ প্রকৃতির হওয়ায় তার তদন্তকাজ ধীরলয়ে চলছিল।

২০১০ সালের প্রথম দিকে আমার তদারক করা খুনসহ ডাকাতির চতুর্থ অপরাধটি সংঘটিত হয়। এটা ছিল নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানাধীন। ঘটনার অব্যবহিত পর থেকেই মামলাটির জোর তদন্ত শুরু হল। ঘটনার দুদিন পর একজন সন্দেহভাজন যুবককে তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রেফতার করে আমাকে খবর দিলেন। আমি দ্রুত থানায় পৌঁছে আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলাম। থানায় পৌঁছে অফিসার-ইন-চার্জের কক্ষে বসে আসামীকে আমার সামনে হাজির করার নির্দেশ দিলাম। তদন্তকারী কর্মকর্তা দুইজন সেন্ট্রিসহ হাজতখানা থেকে আসামীকে আমার সামনে হাজির করলেন। আসামী যন্ত্রণায় কাতর ছিল। সে দাঁড়াতে পারছিল না।

গ্রেফতারকৃত ডাকাত কিংবা কথিত ডাকাতদের প্রতি থানার অফিসারগণ সাধারণত রুঢ় ব্যবহার করে থাকেন। থানার অফিসারদের বিশ্বাস, সোজা আঙ্গুলে যেমন ঘি ওঠে না, তেমনি ডাকাতদের বাবা-ছাবা বলে হাজার বছর ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও নবীনতম ডাকাতটিও তার ডাকাতির কথা স্বীকার করে না। তাই অপরাধ উদ্ঘাটন, লুন্ঠিত মালামাল উদ্ধার এবং সহযোগী ডাকাতদের দ্রুত গ্রেফতারের জন্য গ্রেফতারকৃত ডাকাতদের সাথে বৈরি আচরণ করা অপরিহার্য বলে তারা বিশ্বাস করেন এবং উপরওয়ালাদেরও বিশ্বাস করান।

জিজ্ঞাসাবাদের একটি কৌশলের নাম হল ‘পেপার এন্ড সল্ট’ বা ‘নরম-গরম’ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে একজন জিজ্ঞাসাবাদকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাথে অতিশয় রুঢ় আচরণ করবেন। কিন্তু তার পরবর্তী জিজ্ঞাসবাদকারী সন্দেহভাজনের কাছে এমন মধুর আচরণ করবেন যাতে সন্দেহভাজন বিশ্বাস করে যে এ লোকটি তার প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তার কাছে কষ্টের কথা বলা যায়, তাকে বিশ্বাস করা যায়। জিজ্ঞাসবাদকারী ও অভিযুক্তের মধ্যে একটি পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপন করাই হল জিজ্ঞাসবাদের বড় কৌলশ। যদি অভিযুক্ত একবার আপনাকে বিশ্বাস করে, তাহলে সে যতবড় কঠিন অপরাধীই হোক না কেন, তার অপরাধ সে অকপটে আপনার কাছে স্বীকার করবেই। হয়তো সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জনাবনন্দী দিবে না, কিন্তু অপরাধের গোটা রহস্যই সে আপনার কাছে উন্মুক্ত করবে। এর ফলে ডাকাতির মামলার লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি উদ্ধার হবে, তার অন্যান্য সহযোগীরা গ্রেফতার হবে, অপরাধ প্রমাণের জন্য অন্যান্য আলামত যেমন, ব্যবহৃত অস্ত্রপাতি উদ্ধার হবে। এই সব কিছুই পরবর্তীতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

যাহোক, আমার সামনে হাজির করা আলোচিত তরুণ আসামীটি ঠিক মতো দাঁড়াতেই পারছিল না। আমি তাকে আমার চেয়ারের পাশে ডেকে নিলাম। তাকে মেঝেতে বসতে দিলাম। সে স্বস্তিবোধ করল। আসামীর বয়স ২০/২২ বছরের বেশি হবে না। তাকে আসলেই একটা মোটা দাগের তৃতীয় মাত্রার ডোজ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে মুহূর্তে কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।

যন্ত্রণায় কাতর আসামীকে দেখে আমার খারাপই লাগল। আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বললাম, ‘ঠিক মতো সব জিজ্ঞাসা করেছেন তো?’

তদন্তকারী কর্মকর্তা বললেন, ‘স্যার, সে বড় বদমাস। কোন কিছুই বলতে চায় না’।

আমি বললাম, ‘তার নাম কি?’
: স্যার, এর নাম শাহিন।
: এর বাবার নাম কি?
: স্যার, এটা তো জিজ্ঞাসা করি নি। এই তোর বাবার নাম কি?

কোন অপরাধের তদন্তকালে অপরাধী, বাদী, সাক্ষী এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বহুলোকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হতে পারে। যারা সাক্ষী বা অন্য কোন ভাবে তথ্য প্রদানকারী, তাদের জনাবনন্দী গ্রহণ করাকে বলা হয় ‘সাক্ষাৎকার’। কিন্তু অভিযুক্তের জবানবন্দী গ্রহণের প্রক্রিয়াকে বলা হবে ‘জিজ্ঞাসবাদ’। কোন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হোক বা তাকে পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, সে ব্যক্তির সাথে আলাপকালে প্রথমেই তার নাম ঠিকানা জানতে চাওয়া হবে। এসব হল অতিসাধারণ প্রশ্ন যা মূল তদন্তের অংশ না হলেও আসামী বা সাক্ষীর সাথে তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রাথমিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য খুবই জরুরি।

কিন্তু খুনসহ ডাকাতি মামলার গ্রেফতারকৃত এ সন্দেহভাজনকে তদন্তকারী কর্মকর্তা এমন কায়দায় জিজ্ঞাসবাদ শুরু করেছেন যে কয়েক মিনিটের মধ্যে আসামী চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়লেও তদন্তকারী কর্মকর্তা তার বাবার নামটি পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করার গরজ বোধ করেন নি।

এহল আমাদের ফৌজদারি অপরাধ তদনেত্মর কলাকৌশল; আসামীকে জিজ্ঞাসবাদ করার পদ্ধতি। আসামীর কাছ থেকে বিশ্বাস বা নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি না করেই আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ আসামীকে সব অপরাধ স্বীকার করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। তার বাপের নাম জিজ্ঞাসা না করেই তার সহযোগীদের নাম জানতে চান। এর ফলে আসামীগণ পুলিশের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কোন রকম নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে চান। আর এর ফলে দ্রুত জন্ম নেয় জোড়ায় জোড়ায় ‘জজ মিয়া’।

এ ‘ডাইরেক্ট একশন’ স্টাইলের জিজ্ঞাসাবাদ কৌশলের ফলস্বরূপ আরো লক্ষ করা যায়, এ অপরাধের জন্য পুলিশের একাধিক ইউনিট কর্তৃক গ্রেফতারকৃত একাধিক ব্যক্তি একই অপরাধের দায়-দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। নির্যাতনের চোটে বরিশালের কামাল বলছে, ‘আমিই খুন করেছি’; ঠেলার চাপে নোয়াখালীর কুদ্দস বলছে, ‘আমিই খুন করেছি।’ পুলিশ পড়ছে বিপাকে। যে মামলা তদনেত্মর আসল এখতিয়ার ও দায়-দায়িত্ব হচ্ছে সাব-ইন্সপেক্টর বা ইন্সপেক্টরের পদমর্যাদার একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার, সে এখতিয়ারে প্রবেশ করতে হচ্ছে পুলিশের সুপিরিয়র পদবীর কর্মকর্তাদেরও। জিজ্ঞাসবাদের যথোপযুক্ত কৌশল অবলম্বন না করে শর্ট-কার্ট পদ্ধতিতে স্বীকারোক্তি আদায়ের ধূর্ত প্রচেষ্টা অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনের পরিবর্তে পুলিশকে ঠেলে দিচ্ছে অধিকতর সহস্যময়তার চোরাবালিতে।

এ ধরনের অপেশাদার হাতুড়ে জিজ্ঞাসাবাদ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে পুলিশকে উন্নত প্রশিক্ষণদান। জিজ্ঞাসাবাদের অনেক আধুনিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। পুলিশকে সেসব পদ্ধতি আয়ত্ব করতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে হবে। অধিকন্তু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরপর্যাপ্ত সময় ব্যয় করতে হবে, শ্রম বিনিয়োগ করতে হবে। ফৌজদারি মামলার তদন্তের জন্য শর্টকাট কোন পথ নেই। আইন, বিধি, স্বীকৃত পদ্ধতি না মেনে কোন স্বীকারোক্তি আদায় করা হলে তা বিচারকালীন তা পুলিশ তথা সরকার পক্ষের অনুকূলে নয়, প্রায়শই প্রতিকূলে যায়। তাই তৃতীয় মাত্রার জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল অবলম্বন করে মামলার হয়তো অভিযোগপত্র দেয়া যায়, কিন্তু আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। (মূল রচনা ২৯ আগস্ট, ২০১২; পরিমার্জন- ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)