ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কোন আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে সে পরোয়ানা যদি কার্যকর করা সম্ভব না হয়, তাহলে পুলিশকে পিআরবির ৩২৩ নম্বর প্রবিধান অনুসারে আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। এখানে লেখা হয়, আসামীকে গ্রেফতারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। পরোয়ানায় উল্লিখিত ঠিকানাসহ তার সম্ভাব্য লুকে থাকার ঠিকানায় হানা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে এমনভাবে আত্মগোপন করেছে যে তাকে অদূর ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।

এমতাবস্থায়, আদালত তার পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে আসামীকে আদালতে হাজির করার জন্য তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করতে পারেন। হুলিয়া জারির পরেও আসামী আদালতে হাজির না হলে আদালত তার স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিতে পারেন। অনেক সময় হুলিয়া ও ক্রোকি পরোয়ানা একই সাথে জারি করা যায়। তবে এ দুটো কাজ একই সাথে করবেন, না একটির পর অন্যটি করবেন, তার সিদ্ধান্ত আদালতের।

গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা না গেলে সংশ্লিষ্ট ওয়ান্টে তামিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করেন ইংরেজিতে তাকে বলা হয় Non Execution Report বা সংক্ষেপে N.E.R । এটাকে বাংলায় বললাম ‘অতামিলের-প্রতিবেদন’।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এসসিএন্ডপি) হিসেবে কাজ শুরুর পর গত দুইটি ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। এগুলোতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে পুলিশের হাতে থাকা মূলতবি গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের বিষয়ে। রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ কমিশনারগণ জানিয়েছেন, আদালত থেকে এত বেশি গ্রেফতারী পরোয়ানা ইসু করা হয় এবং আমাদের থানা পর্যায়ের অফিসারগণ এসব পরোয়ানা গোপন করতে করতে এমন এক অবস্থায় নিয়ে এসেছেনে যে, এ মুহূর্তে যদি থানায় প্রাপ্ত সকল গ্রেফতারি পরোয়ানা রেজিস্ট্রারে তোলা যায়, তা বর্তমান সংখ্যার কয়েকগুণ বেশি হবে এবং এ হিসাব পত্রপত্রিকায় একবার ফাঁস হলে পুলিশের কার্যকারিতা নিয়েই জনমনে সন্দেহ দেখা দিবে।

কিন্তু বিধি অনুসারে গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর যে করতেই হবে, এমন কোন কথা নেই। আমাদের পিআরবি এর সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোর সঠিক ব্যবহার করা হলে পরোয়ানা কার্যকর করা ছাড়াও একজন আসামীর বিরুদ্ধে মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত করা যায়। আর এ প্রক্রিয়াটির প্রাথমিক ধাপই হল, এনইআর বা অতামিলের প্রতিবেদন দাখিল করা।

বিষয়টি যে পিআরবিতে বর্ণিত আছে এবং এটা যে বাস্তবায়নও করা হয় তা অবশ্য সবাই জানে । কিন্তু এ প্রবিধানটি যে পুলিশের গ্রেফতারি পরোয়ানা কমানোর জন্য কত বড় অস্ত্র তা জুনিয়র-সিনিয়র সকল পদবির অনেক পুলিশ অফিসারই উপলব্ধি করতে পারেন না।

তবে বিষয়টি যথাযথভাবে উপস্থাপন করলেন অতিরিক্ত ডিআইজি( ওএন্ডএম) জনাব আতিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, যদি কোন আসামীকে গ্রেফতার করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে যে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না তা যথাযথভাবে কোর্টকে অবহিত করা হলেই কোর্ট তাকে গ্রেফতার করা ছাড়াই মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়র পরবর্তী ধাপগুলো শুরু করতে পারেন। গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে পরবর্তী কার্যক্রম, যেমন, হুলিয়া ও ক্রোকি পরোয়ানা জারি করা হবে। হুলিয়া জারির কাজটি সম্পূর্ণ আদালতের। তবে ক্রোকি পরোয়ানা কার্যকর কবতে হবে পুলিশকেই। হুলিয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য আদালত নিজেই কমপক্ষে তিনটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকায় আসামীকে একটি নির্দিষ্ট কার্যদিবসে নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিবেন। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট আদালতে হাজির না হলে আদালত তার বিরুদ্ধে ক্রোকি পরোয়ানা জারি করবেন। ক্রোকি পরোয়ানার ফলে তাকে আদালতে হাজির হতে বাধ্য করার জন্য আদালত তার সমূদয় সম্পদ জব্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিবেন। পুলিশ তা করবে। তবে ক্রোকি পরোয়ানার সুবিধা হল, সাধারণত আসামীর মালপত্র তেমন থাকে না। থাকলেও সব মাল জব্দ করে থানায় আনার প্রয়োজন নেই। সামান্য কিছু পরিবহনযোগ্য বস্তু হাতে করে নিয়ে এসে বাকীগুলো কারো জিম্মায় দিলেই হয়। কিন্তু এ বিষয়টিতেও এক শ্রেণির পুলিশ অফিসারের অনীহা লক্ষ করা যায়।

তবে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অনীহা বলাও সমীচীন নয়। আসল বিষয় হল, এ পদ্ধতির সুদূরপ্রসারি ফলাফল অধিকাংশ পুলিশ অফিসারই বোঝেন না। কোন আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হলে তিনি যদি আদালতে উপস্থিত না হন, তখন তার বিরুদ্ধে হুলিয়া বা ক্রোকি পরোয়ানা বা দুটোই এক সাথে বা পরপর জারি করা যায়। এটা হতে পারে মামলার তদন্তকালে আসামী যদি গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পালিয়ে থাকে এবং তাকে গ্রেফতার করা জরুরি হয়, কিংবা আসামীর অনুপস্থিতির জন্য মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

যদি অতামিলের প্রতিবেদন দাখিল করার পর নিয়ম অনুযায়ী আসামীর বিরুদ্ধে হুলিয়া ও ক্রোকি পরোয়ানা জারি ও তামিল হয়, তাহলে আসামী গ্রেফতার হোক বা না হোক, কিংবা আদালতে উপস্থিত হোক বা না হোক, মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়। এতে ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রেরণ করতে পারেন কিংবা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলে নিজেই আসামীদের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য শুরু করতে পারেন। বিচারের ফলে আসামীর সাজা হলে তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হবে। কিন্তু খালাস হলে তার বিরুদ্ধে থানায় কোন ওয়ারেন্ট থাকবে না। অর্থাৎ ‘রিকল’ হবে। সেটা আদালতে ফেরত দিয়ে রেজিস্টার থেকে খারিজ দেখানো যাবে।

গত ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ কমিশনারদের এ সম্পর্কে তথ্য আনতে বলা হয়। কিন্তু একদিনে এগুলো পর্যালোচনা করে নির্দেশনা দেয়া যাবে না বলে পরবর্তীতে এগুলো পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

ডিআইজি(ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট)কে সভাপতি করে গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এ পর্যালোচনা। দেখা গেল, থানায় ওয়ারেন্টগুলোর বিপরীতে সন্তোষজনক সংখ্যায় এনইআর দাখিল করা হয়নি। তাছাড়া, আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে সেগুলোতে আসামীর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি বা ক্রোকি পরোয়ানা জারির কোন আবেদনই করা হয়নি। অনেক থানার এনইআর প্রতিবেদনের ফর্মে দেখা গেল তামিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার আদালতকে মামলার পরবর্তী তারিখ জানাতে বলেছেন, কেউ কেউ মামলার বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়েছেন; কেউ কেউ আবার আদালতের কাছ থেকে আসামীর বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়েছেন।

এনইআর দাখিলের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে না পারার ফলেই এসব হয়েছে। অধিকন্তু এসব বিষয়ে আদালতেরও তেমন মাথাব্যথা নেই। আদালত যদি দাখিলকৃত এনইআর দেখতে এবং এগুলোর ভাষা পড়তেন তাহলে সংশ্লিষ্ট অফিসারকে আদালতে তলব করতেন কিংবা এসপি সাহেবদের কাছে অভিযোগও করতেন।

যাহোক, এনইআর দাখিল করে হুলিয়া- ক্রোকি পরওয়ানা শেষে আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন করাই হল আসল কথা। এটা পুরেপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে পুলিশের উপর থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানার চাপ অনেকটাই কমবে। অন্যদিকে বিচার কার্যক্রমও দ্রুততর হবে। আর সারা দেশেব্যপী এ বিষয়টির নব আবিষ্কারের জন্য অতিরিক্ত ডিআইজি আতিক স্যার আসলেই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

এর জন্য বেশ কিছু ধারাবাহিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এনইআর এর আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ শুরু করার পথ পরিষ্কার করা। এনইআর এর পরবর্তী ধাপ হল হুলিয়া ও ক্রোকি পরোয়ানা জারি করা।

হুলিয়া জারি ও ক্রোকি পরোয়ানা কার্যকর করার পর আশা করা যায় যে অনেক আসামী আদালতে হাজির হব। এর ফলে গ্রেফতারি পরোয়ানা রিকল করা হবে। এতে গ্রেফতারি পরোয়ানার একটি অংশ খারিজ হবে।

যদি আসামী আদালতে হাজির না হয়, তাহলে তার অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ শুরু হবে। বিচার শেষে হয় তার সাজা হবে, নয়তো খালাস পাবে। আমাদের অভিজ্ঞতা মতে অধিকাংশ আসামীই খালাস পায়। তাই তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা রিকল করা হবে। এর ফলে একটা বড় অংকের গ্রেফতারি পরোয়ানা খারিজ হবে।

কেউ বলবেন, এতে সাজা পরোয়ানার সংখ্যা বেড়ে যাবে। হ্যাঁ, দ্রুত বিচার কাজ শেষ হলে এবং আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ সম্পন্ন হলে সাজার হার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে আমাদের উদ্দেশ্যই তো হল সাজার হার বৃদ্ধি করা।

কোন পুলিশ ইউনিটি যদি মনে করে এনইআর দাখিল করেই কাজ শেষ করবেন তাহলে এর সুফল পাওয়া দুষ্কর হবে। কারণ আদালতে এনইআর গেলেই যে আদালত তার পরবর্তী কাজ সমূহ দ্রুত শুরু করবেন এমনটি নাও হতে পারে। এ জন্য আমাদের আদালতকে অনুরোধ-উপরোধ করতে হবে পরামর্শ দিতে হবে।

এ কাজটির সিংহভাগ করবেন কোর্ট ইন্সপেক্টর ও সিএসআইগণ। উচ্চপর্যায়ে করবেন পুলিশ সুপারগ/পুলিশ কমিশনারগণ। প্রতিমাসে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে থানার অফিসার-ইন-চার্জদের মিটিং হওয়ার কথা। এখানে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। অনেক জেলায় এই মিটিং হয়তো হয় না। এখানে এ বিষয়গুলো গড়পড়তায় উত্থাপন করা সম্ভব।

তা ছাড়াও এসপিগণ এ বিষয়ে নিজেরাও মিটিং এর আয়োজন করতে পারেন যেখানে জেলাও দায়রা জজ, সিজিএম ও ডিসি সাহেব উপস্থিত থাকতে পারেন। এ ধরনের মিটিং ইতোপূর্বে নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কিছু জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া পুলিশ সুপারগণ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দেখভালের দায়িত্ব দিতে পারেন।

কোট পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রতিটি এনইআরের বিপরীতে হুলিয়া ও ক্রোকি পরোয়ানা জারির জন্য আদালতকে অনুরোধ করবেন। প্রতি পনের দিন পরপর কতগুলো এনইআরের বিপরীতে কতগুলো হুলিয়া বা ক্রোকি পরোয়ানা জারি হল তার হিসেবে এসপি সাহেব কোর্ট ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে নিতে পারেন।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিমাসের ক্রাইম কনফারেন্সে কোর্ট ইন্সপেক্টর এনইআরের বিপরীতে পিএনডএ ইসুর হিসাব তুলে ধরবেন। যদি এনইআরের বিপরীতে পিএন্ডএ ইসুর সংখ্যা সন্তোষজনক না হয়, তাহলে বিষয়টি পুলিশ সুপার উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরবেন। প্রয়োজনে তিনি উপরিনির্দেশিত পন্থায় মিটিং করবেন, নয়তো অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দিয়ে সিজিএম/জেলা জজের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করবেন।

অতামিলের প্রতিবেদন দাখিল ও তার পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করার ব্যাপারে স্থানীয় পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের অবশ্যই তৎপর থাকতে হবে। ইতোমধ্যে পুলিশের সকল স্তরেই জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। অনেক জেলায় একাধীক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপারের অতিরিক্ত পোস্ট সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতি থানায় দুজন ইন্সপেক্টরের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

বাড়তি জনবল পাওয়ায় প্রত্যেকটি ইউনিটেরই কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি হবে বলে আমরা আশা করতে পারি। কিন্তু পুরাতন ও ট্রেডিশনাল মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে কোন পর্যায়েই দক্ষতা বৃদ্ধি পাবেন। প্রত্যেক স্তরেরই সমস্যা চিহ্নিত করণ, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সাড়াদান জরুরি হয়ে পড়েছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের যেমন অফিসের বাইরে অপারেশনাল কাজের দিক নির্দেশনাদান ও মনিটরিং করতে হবে, তেমনি তদন্ত ও প্রসিকিউশন দিকেও সমান নজর দিতে হবে। আর এসব কাজে তার অধীনে থাকা অফিসারদের কাজে লাগাতে হবে। এনইআর দালিখ ও তার পরবর্তী ধাপগুলো সস্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে জোর তৎপরতা থানায় মূলতবী গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি মামলায় সাজার হার বাড়াতেও যথেষ্ঠ অবদান রাখবে।(১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)