ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মাগুরা জেলার সদর থানার একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা সুপারভাইজ করার জন্য ঘটনা স্থলে গিয়ে দেখলাম, স্বামীর সাথে স্ত্রীর মনোমালিন্য। স্বামী চাইলেও স্ত্রী স্বামীর সংসার করবেন না। বিষয়টি দুই পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়। স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে ছেলে পক্ষ মেয়ে পক্ষ থেকে মোহরানার টাকা থেকে শুরু করে বিছানা-বালিশ, খাট-পালঙ্ক যা যা নিয়েছিল তার সব কিছুই ফেরত দিয়েছেন। এমনকি তালাকের পর স্বামীর বাড়ি থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর স্ত্রীর মনে হল, কিছুদিন আগে তার স্বামীকে তার বাবা একটি নতুন লুঙ্গি দিয়েছিলেন। স্ত্রী অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এসে সে লুঙ্গিটিও নিয়ে গেছেন।

কিন্তু কয়েক দিন পর স্ত্রীটি কার যেন বুদ্ধিতে আদালতে গিয়ে যৌতুকের জন্য মারপিটের মামলা করলেন। আসামী বরাবরের মতোই স্বামীর চৌদ্দ গোষ্ঠী এমনকি বিষের ঘটকও।। ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বললাম। সবাই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। আমি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরামর্শ দিলাম। নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমার পরামর্শ প্রতিপালিত হল। মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন ‘ভুল বুঝাবুঝি’ অর্থাৎ ‘মিসটেক অব ফ্যাক্ট’ দাখিল করা হল।

ঘটনার কয়েক মাস পর আমি অন্য একটি মামলা সুপারভাইজ করতে ঐ গ্রামে গেলাম। অনেক কিছুর মধ্যে সেই মামলারও খবর নিলাম। জানতে পারলাম, সেই মামলাটির বিরুদ্ধে নারাজি হয়েছে। থানা পুলিশ তদন্ত শেষে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।

আমি অনেকটাই আকাশ থেকে পড়লাম। যে মামলার তদারককারী অফিসার আমি নিজে, যে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হল, সেই মামলাতেই আবার নারাজির ফলে দারোগা অভিযোগপত্র দাখিল করলেন। এত কিছু হয়ে গেল। আমি ঘটনার কিছুই জানলাম না?

থানায় খোঁজ নিলাম। অফিসার-ইন-চার্জ বললেন, হ্যাঁ, স্যার। অধিকতর তদন্তে আসা মামলাগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ কোন ঝুঁকি নিতে চান না। তারা বাদীকে সন্তুষ্ট করার জন্য দ্রুত একটা অভিযোগপত্র দিয়ে বসেন। তাদের ভয়, একবার এ মামলার তদন্তের বিরুদ্ধে বাদী নারাজি দিয়েছেন। আমি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে আবার নারাজি দিবেন। এতে আমার তদন্তের কোন ত্রুটি থাকলে তা আদালত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে আমার বিরুদ্ধে অর্ডারসীট জারি করতে পারেন। কিন্তু অভিযোগপত্র দিলে সে ঝুঁকি থাকে না। তাই অধিকতর তদন্তে আসা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের প্রায় সব মামলাতেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

আমি জানতে চাইলাম, মূল তদন্তের সময় যেমন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের জন্য এমই দাখিল করা হয়, অধিকতর তদন্তে আসা মামলার ক্ষেত্রে তা করা হয় কিনা। অফিসার-ইন-চার্জ বললেন, না, সেটা করা হয় না।

বিষয়টি আমার কাছে বেশ বেখাপ্পা ঠেকল। কোন মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে তদারককারী কর্মকর্তাগণ একটা সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু আদালতের সিন্ধান্তের অধিকতর তদন্ত করার পর সেই মামলটির প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে সুপারভাইজিং অফিসারদের আর কোন ভূমিকাই নেই? আদালত কোন কোন ক্ষেত্রে মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সেই সব ক্ষেত্রে তদন্ত সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে কিনা কিংবা পূর্বের তদন্তের ত্রুটি কোথায় ছিল তা জানার কোন সুযোগ তাহলে সুপারভাইজিং অফিসারদের নেই?

আমি শুনেছি অনেক জেলা/পুলিশ ইউনিটে মামলার অধিকতর তদন্তের ক্ষেত্রে সিনিয়র অফিসারদের পূর্ণ সুপারভিশনের সুযোগ রয়েছে। ডাকাতি, হত্যা ইত্যাদির ক্ষেত্রে সিনিয়র অফিসারদের পরামর্শ ও সুপারভিশনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রায় ক্ষেত্রেই সিনিয়র অফিসারদের অগোচরে রয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে আমার নিম্নলিখিত পরামর্শ রইল:

১. আদালত থেকে কোন মামলার অধিকতর তদন্তের আদেশ দেয়া হলে আদালত স্পষ্ট করে বলবেন, কোন কোন ক্ষেত্রে বা বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করতে হবে। তবে আমি জানি, আদালতে থেকে অধিকতর তদন্তের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয় না। যদি স্পষ্ট নির্দেশ না থাকে তাবে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রথম সিডিতেই নোট দিবেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অধিকতর তদন্ত করতে হবে তা স্পষ্ট করার জন্য আদালতে আবেদন করবেন। আদালতের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি অধিকতর তদন্ত শুরু করবে না।

২. অধিকতর তদন্তের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী তদারককারী কর্মকর্তাকে পূর্ণভাবে অবহিত করতে হবে। পূর্ববর্তী তদারককারী কর্মকর্তাও অধিকতর তদন্তের তদারককারী কর্মকর্তা হবেন।

৩. অধিকতর তদন্তের মামলার প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে মূল তদন্তের অনুরূপ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ এমইর মাধ্যমে সুপারভাইজিং অফিসাররের অনুমতি বা মন্তব্য গ্রহণ করতে হবে।

৪. পুলিশ সুপার তার অধীক্ষেত্রের যে সব মামলার অধিকতর তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো পর্যালোচনার জন্য অতিক্তি পুলিশ সুপারকে আলাদাভাবে দায়িত্ব দিতে পারেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অধিকতর তদন্ত সংক্রান্ত কোর্টের আদেশ সমূহ পর্যালোচনা করে দেখবেন এগুলোতে কোন কোন পয়েন্টে অধিকতর তদন্ত করতে হবে তা স্পষ্ট করা হয়েছে কি না। স্পষ্ট না করার বিষয়টি সাধারণ অনুশীলন হয়ে থাকলে অর্থাৎ প্রায় সবগুলো আদেশেই যদি বিষয়টি স্পষ্ট করা না হয, তাহলে বিষয়টি পুলিশ সুপারের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে আদালতের নজরে আনতে হবে।

৫. পুলিশ সুপার সুনির্দিষ্টভাবে অধিকতর তদন্তের ক্ষেত্রে বাড়তি তথ্য প্রমাণ না পেলে এমনকি পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ না পেলে তার পূর্বের সিদ্ধান্তেই অটল থাকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

আমাদের মনে রাখা দরকার ফৌজদারি মামলার তদন্ত শুধু বাদীকে সন্তুষ্ট করা নয়। তদন্তের উদ্দেশ্য হল পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করা। পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটিত হলে কার সংসার টিকল আর কার টিকল না কিংবা কে অসহায় হয়ে পড়ল আর কাকে সহায়তা করা হল সেটা পুলিশের বিবেচ্য হতে পারে না। কাউকে সুবিধা দিতে গিয়ে যদি অন্যকে সুবিচার থেকে বাঞ্চিত করা হয়, সেটা ন্যায্যতার নীতি হতে পারে না।