ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

নবাব সিরাজ উদ্দৌলাকে পরাজিত করে বাংলার মসনদে জেঁকে বসেছিল ইংরেজ বেনিয়ারা। ২০০ বছরের পরাধীনতায় আমরা ইংরেজদের কাছে আমাদের স্বকীয়তা, সংস্কৃতি, প্রশাসন ব্যবস্থার অনেক কিছুই হারিয়েছি। কিন্তু অনেক কিছু হারালেও আমরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে অনেক কিছু পেয়েছিলামও তা অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখাবে কে?

ইংরেজদের কাছ থেকে আমরা যা পেয়েছিলাম তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল একটি শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থ।। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করে পুলিশ। আর আইন ও বিধি পুলিশকে আইনানুগ কর্মে নিয়োজিত করে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে গতিশীল করে। ১৮৬১ সালে একটি বিধিবদ্ধ পুলিশ ব্যবস্থা আমরা ইংরেজদের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। লন্ডন তথা ইংরেজদের মূল-ভুখণ্ডের পুলিশিং ব্যবস্থার সাথে ভারত-বাংলা কিংবা অন্যান্য উপনিবেশগুলোর পুলিশ ব্যবস্থার আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকলেও ব্রিটিশ কলোনির পুলিশ ব্যবস্থা অন্যান্য যে কোন দেশের/জাতির ঔপনিবেশিক পুলিশ ব্যবস্থা থেকে অনেক বেশি কার্যকারী, দক্ষ ও অনেক ক্ষেত্রেই মানবিক বলে শোনা যায়।

এখন পর্যন্ত ১৮৬১ সালের পুলিশ ব্যবস্থা থেকে ভারত উপমহাদেশের কোন দেশই পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এর কারণ শুধু এই নয় যে এসব দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অগণতান্ত্রিক কিংবা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ার ফলে পুলিশকে ঔপনিবেশিক মোড়কে রাখতেই বেশি পছন্দ করেছেন। বরং সেই সাথে এটাও সত্য যে এ উপমহাদেশে ইংরেজদের প্রবর্তিত পুলিশ-ব্যবস্থা এতটাই সু-প্রতিষ্ঠিত, সেসময়ের তুলনায় এতটাই আধুনিক ও এতটাই বিধিবদ্ধ ছিল যে পুরাতন ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন কোন ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন অনেকটাই গৌণ বিবেচিত হয়েছিল।

যাহোক ইংরেজ আমলের ঔপনিবেশিক পুলিশ-ব্যবস্থার এ প্রসসিত্মর গাওয়ার পিছনে আমার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, পুলিশের বাইবেল বলে পরিচিত ‘পুলিশ প্রবিধান, বেঙ্গল’ সংক্ষেপে ‘পিআরবি’ এর আধুনিকতা ও বিধান হিসেবে এর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করা । পুলিশ ও পুলিশের পেশা বা চর্চার সাথে সম্পর্কযুক্ত যে কেউ স্বীকার করবেন, পুলিশ আইন -১৮৬১ এর ১২ নম্বর ধারা অনুসারে পুলিশের আইজিপি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সেই ১৯৪৩ সালের পিআরবি পুলিশের কর্মপদ্ধতি, সংরক্ষণ প্রশাসন ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিবারণ সম্পর্কে যথেষ্ঠ পরিমাণে ও মাত্রায় আধুনিক ও সহজে অনুসরণীয় নিদের্শাবলী একত্রিত করেছে ।

পিআরবিতে পুলিশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, নিবারণ, তদন্ত ইত্যাদি সম্পর্কে নির্দেশাবলীর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, village Crime Note Book বা ভিসিএনবি সংরক্ষণের তাগিদ । ভিসিএনবি হল অপরাধ, অপরাধী, অপরাধস্থল এবং অপরাধ সংঘঠনের উপায়গুলোর ধারাবাহিক বর্ণনার একটি স্থায়ী দলিল যা প্রত্যেক থানায় সংরক্ষণ করা হয়। পিআরবি এর ৩৯১ থেকে ৩৯৪ নম্বর প্রবিধান পর্যন্ত এ ভিসিএনবি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে । ভিসিএনবি হল অপরাধসমূহ কার্যকরভাবে দমন করার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহ ও ব্যক্তিগণের অপরাধ সংক্রান্ত ইতিবৃত্তের একটি স্থায়ী ও ধারাবাহিক দলিল(প্রবিধান ৩৯১(ক) )। এ নোটবুক মোট ছয়টি খন্ডে রাখার নিদের্শনা রয়েছে(৯৩১ (খ))। কোন খণ্ডে কি জাতীয় তথ্য থাকবে এবং সেসব তথ্য কিভাবে সংরক্ষণ করা হবে তারও বিস্তারিত বিবরণ এখানে রয়েছে। এমন কি এই নোটবুক কিভাবে ব্যবহার করা হবে, এর আইনগত ও সাক্ষ্যগত মূল্য কি, এটা কোন ধরনের দলিল,কে কে এই দলিলে প্রবেশ করতে পারবেন আদালত এই নোটবুক তলব করলে তা কোন উপায়ে আদালতে উপস্থান করতে হবে পিআরবিতে তাও প্রাঞ্জল ভাষায় বিস্তারিতভাবে বণর্না করা হযেছে।

ভিসিএনবি কোন থানা এলাকাতে অপরাধ, অপরাধী, অপরাধস্থল, অপরাধের ধরন, অপরাধ সংগঠনের উপায় ইত্যাদি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা হয়। এক কথায়, সঠিকভাবে সংরক্ষিত একটি ভিসিএনবি উক্ত থানার একটি মসৃন-সমতল দর্পন স্বরূপ, যেখানে থানার অপরাধ, অপরাধী, অপরাধস্থল ও অপরাধ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিষয় প্রতিফলিত হয়।

ইংরেজ আমল তো বটেই পাকিস্তান আমলেও প্রত্যেক থানায় ভিসিএনবি নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করা হতো । কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অতিদ্রুত ভিসিএনবি পুলিশ অফিসারদের কাছে অপ্রাসাঙ্গিক হয়ে পড়ে । থানায় অপরাধ ও অপরাধীদের স্থায়ী রেকর্ড রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। এই সময় থানার অফিসারগণ থানায় স্থায়ী রেকর্ড রাখার পরিবর্তে সব কিছুকে ব্যক্তিগতভাবে বিবেচনা করতে শুরু করে। তারা বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অতীত তাদের কছে যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে এলাকায় অপরাধ ও অপরাধীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানলেও তাদের উত্তরসুরীদের জন্য কোন লিখিত দলিল রেখে যাওয়াকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করে । তাই ধীরে ধীরে ভিসিএনবির মতো স্থায়ী দলিল হালনাগাদ করা তো দূরের কথা, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান অমলে সংরক্ষিত ভিসিএনবি বাংলাদেশ আমলে থানার রেজিস্টারসমূহের তালিকা থেকে এক প্রকার বিদায় নিয়েছে। থানার অফিসার-ইন-চার্জগণ এটাকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করতে থাকেন আর সিনিয়র অফিসারগণ তাদের দূরদর্শিতার অভাবহেতু ভিলেজ ক্রাইম নোট বুক রাখার জন্য থানাকে রাধ্য করতেও অপারগ হয়ে পড়ে ।

থানার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকের প্রথম ঊর্ধ্বতন পদটি হল সার্কেল এএসপির। ১৯৮৮ সালের পূর্বেও এই পদটি ছিল পুলিশ ইন্সপেক্টরদের জন্য। পুলিশ ইন্সপেক্টরগণ সাধারণভাবে বিভাগীয় কর্মকর্তা হতেন। তারা মূলত সাব-ইন্সপেক্টর থেকে পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হতেন। ইন্সপেক্টর হলে তারা হয় কোর্টে নয়তো সার্কেলে পোস্টিং পেতেন। সার্কেলে বসে তারা তাদের অধীন থানার তদন্তসহ অন্যান্য কাজকর্ম তদারক করতেন। যে কাজটি তারা ইতোমধ্যে বছরের পর বছর ধরে থানায় করে এসেছেন, থানার উপরে সার্কেলে বসেই তা তারা তদারক করতেন । তদারক হল অধীন অফিসারদের কাজে কর্মে ও দায়িত্ব পালনকালে উদ্ভূত অসম্পূর্ণতা দূর করা। কিন্তু তদারককারীরা নিজেরাই যদি অসম্পূর্ণ হন, তাহলে তদারকের কি দুরবস্থা হয় তা সহজেই অনুমেয়।

১৯৮৮ সালের পরে পুলিশ সার্কেলের পদটিকে ইন্সপেক্টরের পরিবর্তে এএসপিতে উন্নীত করা হয় । এমনিভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদটিকে সাব-ইন্সপেক্টর থেকে ইন্সপেক্টরে উন্নীত করা হয় । পুলিশের পদক্রমে এই যে উন্নতি তা অফিসাদের লাভবান করলেও সংগঠন হিসেবে পুলিশকে কতটুকু লাভবান করেছে তা গবেষণার বিষয় বটে । কেননা, সার্কেল একজন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তার পরিবর্তে একজন অতি নবীন পুলিশ কর্মকর্তাকে পদায়ন শুরু হতে থাকে । অন্যদিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অতি অভিজ্ঞ হয়েও তার সুপারভাইজারের অনভিজ্ঞতায় নিজেকেও অনভিজ্ঞ করে তোলেন । বস্তুত থানার কাজ অত্যন্ত জটিল, সময় সাপেক্ষ, স্ট্রেসফুল ও ব্যাপক। তাই উপরের তদারকের মাধ্যমে বাধ্য করা না হলে থানার কাজে বিশেষ করে স্থায়ীরূপে সংরক্ষণের কাজগুলোর গতি দ্রুত মন্থর হয়ে পড়ে। এসবের সম্ভবত, প্রথম শিকার ছিল ভিসিএনবি। ভিসিএনবি বর্তমানের অফিসারদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটা একটি বড় সহায়ক অন্ত্র বা দলিল। তাই থানার একজন সাব- ইন্সপেক্টর ভিসিএনবিকে যত তুচ্ছ মনে করতে পারেন, একজন পুলিশ ম্যানেজার বা ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে সার্কেল এএসপিগণ তেমনটি মনে করতে পারেন না । কিন্তু ভিসিএনবি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় সার্কেল এএসপিগণ তা মনে করতে পারেন না।

আমার এ পর্যবেক্ষণে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এএসপিগণ যারপর সেই বিরক্ত হবেন । আর একই সাথে পুলকিত হবেন বিভাগীয় পদোন্নিত প্রাপ্ত এএসপি ও ইন্সপেক্টর কিংবা সাব-ইন্সপেক্টরগণ। কিন্তু আমাদের এই বর্তমান অবস্থার জন্য সকল পর্যয়ের অফিসারগণ কোন না কোন ভাবে দায়ী।

সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এএসপিগণ শিক্ষানবিশ অবস্থায় থানায় দীর্ঘ দুই মাস অবস্থান করেন । এসময় তারা থানার অফিসার-ইন-চার্জগণের তত্ত্বাবধানে থেকে থানার সকল প্রকার কাজকর্ম সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এখানে থানার অফিসারগণ শিক্ষানবিশদের অপরাধ দমন, নিয়ন্ত্রণ ও নিবারণের ব্যবহারিক কৌশল ও পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে যেমন জ্ঞান দিবেন তেমনি থানায় রক্ষিত রেজিস্টার ও রেকর্ডপত্র সম্পর্কেও বাস্তব ধারণা দিবেন বলে মনে করা হয় । কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল থানার অফিসারগণ প্রবেশনারদের এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও শিক্ষা দিতে অক্ষম। এর কারণ মুলত থানার কাজকর্ম সস্পর্কে তাদের নিজেদেরই অক্ষমতা। আমি নিজে প্রবেশনায় থাকা অবস্থায় এটা উপলব্ধি করেছি। থানার প্রত্যেক অফিসার তাদের প্রাত্যহিক কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কোন অফিসারই প্রবেশনারকে সময় দিতে রাজি নন । এ ব্যাপারে বিভাগীয় পদোন্নতি প্রাপ্ত অফিসারদের চেয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টরগণ অনেক বেশি স্মার্ট ও উদাসীন। তারা বেশি জানার ভান করলেও তাদের ভিতর বিদ্যার পূঁজি থাকত সামান্যই। তবে পদোন্নতি পেয়ে যারা সাব-ইন্সপেক্টর হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ ভাল জানেন এবং প্রবেশনারদের শিক্ষাদেবার জন্য তাদের আগ্রহও দেখান বেশি।

থানার বিভিন্ন রেজিস্টার সম্পর্কে জানতে গিয়ে দেখলাম সংশ্লিষ্ট অফিসারগণ রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে হল্লা ডিউটিতে বেশি ব্যস্তও থাকেন, মজাও পান। অনেক তোয়াজ করে যখন কোন রেজিস্টার নিয়ে বসা হল, দেখা গেল সে রেজিস্টারের কলামগুলোর একটা বড় অংশ ফাঁকা কিংবা হালনাগাদ নয় । ভিসিএনবি রক্ষণাবেক্ষণকারী অফিসারকে দিয়ে একটি বহু পুরাতন ভলিউম উদ্ধার করা হল। সংশ্লিষ্ট অফিসার বললেন স্যার, একটা নমুনা আছে। অন্য ভলিউমগুলো কোথায় আছে আমার জানা নেই। তিনি আরো জানালেন ভিসিএনবিতে তিনি এখন পর্যন্ত কোন এন্ট্রি দেননি। আর এন্ট্রি কিভাবে দিতে হয় তারও বাস্তব ধারণা তার নেই। এ ব্যাপারে পুস্তকের জ্ঞানের বাইরে তার ভাণ্ডারে ব্যবহারিক কোন জ্ঞান নেই।

বলাবাহুল্য, কোন মামলা তদন্তের জন্য, বিশেষ করে সম্পত্তির বিরুদ্ধেকৃত অপরাধ যেমন-ডাকাতি, দস্যূতা, সিঁধেল চুরি ইত্যাদির তদন্ত শুরুই হয় থানায় রক্ষিত ভিসিএনবি পর্যালোচনার মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তা তার প্রথম সিডিতে নোট দেন যে তিনি থানায় রক্ষিত ভিসিএনবি এর সংশ্লিষ্ট গ্রামের অংশটুকু কিংবা যে বক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ভিসিএনবি থেকে জানার চেষ্টা করেছেন। তবে ভিসিএনবিতে এসম্পর্কে কোন তথ্য নেই। অর্থাৎ যদি একজন চিহ্নিত ডকাতদল একটি ডাকাতিপ্রবণ এলাকায় বারংবার ডাকাতি সংগঠন করে, তদন্তকারী কর্মকর্তা সে সম্পর্কেও ভিসিএনবিতে কোন এন্ট্রি পাবেন না। কেননা, বাংলাদেশের কোন থানায় ভিসিএনবি আর রক্ষিত হয় না, হালনাদ হয় না। তাই তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে এখন সকল অপরাধই নতুন অপরাধ।

আমাদের পেনালকোডে বেশ কিছু অপরাধ দ্বিতীয়বার সংগঠনের জন্য অপরাধীর বর্ধিত সাজার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কোন আসামী বারংবার দণ্ডিত হলেও থানায় ভিসিএনবিতে কোন এন্ট্রি না থাকায় প্রত্যেকবারই সে নতুন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। গ্রেফতারের পর জামিন না দেয়া, আসামীকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনা কিংবা কোন গ্রেফতারকৃত আসামীকে চলমান মামলায় গ্রেফতার দেখানো প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আসামীর পূর্ব চরিত্র ও ইতোপূর্বের দণ্ডের নজির উল্লেখ করতে হয়। কিস্তু কোন ক্ষেত্রেই থানার অফিসারগণ আসামীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য সন্নিবেশ করতে পারেন না। তাই তারা কিছু গদবাঁধা কথা আন্দাজে লিখে বসেন যা আদালতের বিশ্বাস করার কোন কারণ থাকে না। তখন দারোগা থেকে শুরু করে জেলার এসপি পর্যন্ত আসামীকে জামিন, রিমান্ড না দেয়া ইত্যাদির জন্য অদালতের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। যেখানে কাগজই কথা বলার কথা, সেখানে সিনিয়র অফিসারা আদালতের বিচারকের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলে জামিন আটকান, রিমান্ড বাড়ানো ইত্যাদির চেষ্টা করেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশে Crime Data Management System সিডিএমএস নামে ওয়েব বেইজ সফটওয়ার চালু করা হয়েছে। এখানে যে কোন থানায় মামলা কিংবা জিডি হলেই এখানে এন্ট্রি দিতে হয়। এতে অপরাধ ও অপরাধীদের একটি ডিজিটাল ও ভার্সুয়াল রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। এই সফটওয়ার নিয়ন্ত্রণ, নিবারণ ও তদন্তের ক্ষেত্রে প্রভূত সহায়তা করতে পারে। এমতাবস্থায়, অনেকে বলেন, সিডিএমএস প্রতিনিয়ত আপডেইট করা হলে এবং এ থেকে অফিসারগণ তথ্য আহরণ করতে অভ্যস্ত হলে ভিসিএনবির আর দরকার হবে না। কিন্তু আমি মনে করি সিডিএমএস ভিসিএনবির বিকল্প হতে পারে না। সিডিএমএস এ বিস্তারিত তথ্য থাকে না। এখানে সারাদেশের মামলার তথ্য পাওয়া গেলেও কোন নির্দিষ্ট থানার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে স্থানীয় জ্ঞান বা তথ্যের প্রয়োজন পড়ে তা কোন ভার্সুয়াল রেকর্ডই তার অনুপুঙ্খ বিবরণ থাকে না। সিডিএমএস তাই সহায়ক টুল; এটা ভিসিএনবির বিকল্প কিছু নয়।

তবে এটাও ঠিক যে ভিসিএনবিকে আধুনিকায়ন করা দরকার। এটার হার্ড কপির বাহিরেও সফট কপি করা যেতে পারে এবং সে সফটকপি ওয়েব বেইজ কিংবা স্থানীয় হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে থানায় রক্ষিত সকল প্রকার রেজিস্টার সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপর নিচ দুদিক থেকেই জোর তাগিদ আসতে হবে। শুধু তাগিদই নয়, রেকর্ড ম্যানেজমেন্টের উপর থানায় অফিসারদের নিয়মিত বিরতিতে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দেশের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহ ছাড়াও ৩০টির মত ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। এসব ট্রেনিং সেন্টারে সার্বক্ষণিক ইন-চার্জ হিসেবে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ অন্যান্য জনবল ও ভাল অবকাঠামোও রয়েছে। আমরা এসব ট্রেনিং সেন্টারের সদ্ব্যবহার করতে পারি। প্রশিক্ষণ হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত অফিসারগণ সহায়তা নিতে পারি। তাছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর কেন্দ্রীয়ভাবে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে যাতে অবসরপ্রাপ্ত ও বর্তমানে কর্মরত কিছু অভিজ্ঞ অফিসার থানায় থানায় ভ্রমণ করে সেই থানার ভিসিএনবি রক্ষণারেক্ষণের জন্য নিজেরাই কিছু দিন কাজ করতে পারেন। মোদ্দ কথা, যেভাবেই হোক থানার অপরাধ তথ্যের স্থায়ী ভাণ্ডার ভিসিএনবিকে দ্রুতই পূর্বের অবস্থায় শুধু নয়, উন্নত ও আধুনিক অবস্থায় আনতে হবে(২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)