ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য পাচার প্রতিরোধ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্সের সদস্য হয়ে গত ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার গিয়েছিলাম। ৮ সেপ্টেম্বর মিটিং এ নির্ধারিত হয়েছিল যে এ মাসের  সেমেপ্টম্বরের ১৫ তারিখ থেকে মাসব্যাপী বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় ইয়াবা উদ্ধারে যৌথ অভিযান শুরু করা হবে। এই অভিযানে অংশগ্রহণ করবে জেলা পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্যরা। আঞ্চলিক টাস্কফোর্সের সভাপতি হলেন জেলা প্রশাসক সাহেব। সেই যৌথ অভিযানের তদারক করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর মাদ্রক দ্রব্যের চোরাচালান রোধ সংক্রান্ত টাস্কফোর্বের অন্যতম সদস্য হিসেবে গত ১৪-১৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার ভ্রমণ করে ইয়াবা চোরাচালন সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ের অভিযান পর্যবেক্ষণ করি।

ইয়াবা বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত দেশের বাইরে থেকে পাচার হয়ে আসা কৃত্রিম মাদকদ্রব্য। এটা বাংলাদেশে টেবলেট আকারে বিক্রি হয়। ৩০ গ্রামের লাল লাল টেবলেটের প্রতিটির খুচরো মূল্য নাকি ৩০০ টাকা। ইয়াবা সাধারণত মায়ানমার থেকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মায়ানমার সীমান্তের বিদ্রোহীরা এ মাদকের প্রধান উৎপাদক ও পাচারকারী বলে অনেকে মনে করেন। তবে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করা প্রায় লাখ খানেক রোহিঙ্গার অনেকেই বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের সাথে জড়িত। স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী নেতারাও ইয়াবা পাচারের সাথে জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ইয়াবার ভয়াবহতা রোধ করতে কিছুদিন আগে সরকার কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেছে। জনপ্রিয় ভাষায় এটাকে বলে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতার নীতি। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পুলিশসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী বাহিনী অসম্ভব তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যেই কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ী আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এনকাউন্টারের শিকারে পরিণত হয়েছে। অনেকে এলাকা ছাড়াও হয়েছে। টেকনাফের সীমান্তে নজরদারী বৃদ্ধি পাওয়ায় পাচারকারীগণ এখন অপ্রচলিত ও দুর্গম রাস্তায় বান্দরবানের গহীন অবন্য দিয়ে পথ তৈরি করেছে। সমুদ্র পথ স্থল পথের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বর্তমানে কক্সবাজার সীমান্তের চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি স্থানে অনেক বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট ধরা পড়ার ঘটনা ঘটছে।

ইয়াবা বাংলাদেশে ২০০০ সালের পূর্বে প্রবেশ করলেও ২০০৯ সালের পূর্বে তার অস্তিত্ব বড় বেশি টের পাওয়া যায়নি । বস্তুত ২০০৮/০৯ সালের দিকে ঢাকার অভিজাত এলাকায় ইয়াবার প্রচলন শুরু হয়। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ সময় ইয়াবা ও শিশা পানের হিড়িক পড়ে যায়। বাংলাদেশ পুলিশের ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৩/১৪ সালে ইয়াবা উদ্ধার ও অপরাধী গ্রেফতারের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এদেশে ইয়াবা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এটাকে ইয়াবা আগ্রসন বললেও ভুল হবে না ২০০৯ সালে সারা বাংলাদেশে ইয়াবা উদ্ধারের জন্য ৬৭৩টি মামলায় ৯০২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এ সময় রুজুকৃত মামলাগুলোর বিপরীতে ইয়াবা উদ্ধার ছিল মাত্র ১,০৫,৬৮৬ টি টেবলেট। কিন্তু পাঁচ বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা হাজার গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে মোট ৭,৪৭২ টি মামলার বিপরীতে অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯,৭৮০ জন এবং উদ্ধারকৃত ইয়াবা ট্যাবলেটের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯,৪৮,০১১। শতকরা হিসেবে মামলার সংখ্যা ১,০১০% অপরাধীর সংখ্যা ৯৮৪% এবং ইয়াবা উদ্ধারের সংখ্যা ২,৭২৩% বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এ সংখ্যা হল মামলার ভিত্তিতে। অর্থাৎ গ্রেফতার ও উদ্ধারের ভিত্তিতে দায়েরকৃত মামলার এজাহারে ইয়াবা ট্যাবলেট ও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের হিসেবেই এখানে এসেছে। কিন্তু সাধারণভা অপরাধের এক পঞ্চমাংশ মাত্র উদ্ঘাটিত হয়। তাই হয়তো এর আরো সহস্রগুণ অপরাধী ও ইয়াবা ট্যাবলেট পাচার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এবং আসামী ছাড়াও পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে এর চেয়ে আরো বেশি।

উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুবিধার জন্য সারা বিশ্বে ইয়াবার মতো কৃত্রিম মাদকদ্রব্যের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র ৪০/৫০ হাজার টাকার মেশিন হলে নাকি একটি ইয়াবা তৈরির কারখানা চালু করা যায়। মিষ্টি কুমড়ার বিচির সমান ছোট ছোট বলে ইয়াবা ট্যাবলেটকে শরীরের গোপন অঙ্গে রেখেও পরিবহন করা যায়। অধিকন্তু কৃত্রিম উপাদান হওয়ায় এর কাঁচামাল বিভিন্নভাবে আমদানি করা যায়। দেশের ভিতর দিন দিন ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে বলে বিদেশ থেকে আমদানী করার পরিবর্তে দেশেই এটা তৈরির প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত ২৪ আগস্ট, ২০১৪ ঢাকা মহনগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ জোবায়ের নামে এমনি এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে ইয়াবা তৈরির যন্ত্রসহ গ্রেফতার করেছিল। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইয়াবার কোন কারখানা আবিষ্কৃৃত হয়নি। কিন্তু ইয়াবা তৈরির মেশিনপত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনা প্রমাণ দেয় যে দেশের কোথাও এর কারখানা থাকতে পারে।

ইয়াবাসহ অন্যান্য অবৈধ ও ক্ষতিকর মাদক দ্রব্যের পাচার ও ব্যবহার বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলেও আমাদের এ সমস্যা সমাধানের নৈতিক ও দার্শনিক অবস্থান সঠিক নয় বলে আমি মনে করি। প্রথমত, বিষয়টিকে এখন পর্যন্ত শুধু আইন-শৃঙ্খলা বা চোরাচালানগত সমস্যা বলে মনে করা হয়। এক শ্রেণির নীতিনির্ধারক মনে করেন, সীমান্তরক্ষী ও আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী বাহিনীর ব্যর্থতা, পেশাগত দুর্বলতা, অদক্ষতা ও অসততার জন্যই ইয়াবার এতটা প্রসার ঘটছে। তাই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা অসততা দূরীকরণের কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতি। যেমন, সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সংখ্যা বাড়ানো, পুলিশ ও বিজিবির কক্সবাজার এলাকায় রদবদল ইত্যাদি হয়েছে। এতে যে সাময়িক সুবিধা পাওয়া যায়নি, তা নয়। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে অন্যান্য উপাদানগুলো অভিন্ন ও সমান সক্রিয় থাকলে শিঘ্রই অবস্থা আগের মতো হবে। অধিকন্তু দেশের অভ্যন্তরে ইয়াবার চাহিদা তথা ব্যবহার অভিন্ন থাকলে ইয়াবা ভিন্ন পথে দেশে ঢুকবে। ভিন্ন দেশ দিয়ে ঢুকবে এবং ভিন্ন নাম দিয়ে ঢুকবে।

ইয়াবাসহ ক্ষতিকর মাদকের অপব্যবহার রোধ করতে হলে সমস্যাটিকে শুধু আইন-শৃঙ্খলাজনিত নয়, সামাজিক বলে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই এর সমাধানও সামাজিক প্রক্রিয়ায় হতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে অপরাধীদের কিছুটা সংযত করা যাবে। কিন্তু অপরাধী ও ব্যবহারকারীদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা, সর্বোপরি সুস্থ জীবনের প্রেষণা সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমেই দিতে হবে। আর এজন্য সরকাররের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চেয়ে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো, তা সরকারি হোক আর বেসরকারি হোক, অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। এক্ষেত্রে পুলিশ বা বিজিবির চেয়ে সমাজ সেবা অধিদপ্তর, হাসপাতাল তথা স্বাস্থ বিভাগ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমস্যা সমাধানে অন্যান্য বিভাগগুলোকে সহায়তা করতে পারে মাত্র। সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আইন প্রয়োগের চেয়ে অনেক বেশি রেগুলেটরি, প্রচার ও শিক্ষামূলক প্রচার ও শিক্ষামূলক কার্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। শিক্ষা বিভাগ হতে পারে উত্তম প্রচারের ক্ষেত্র। (মূল ১৬ সেপ্টেম্বর, পরিমার্জন ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৪)