ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পৃথিবীর প্রথম অপরাধ প্রোফাইলিং

পূর্বকথনঃ এ গল্পের প্রথম পর্বে আমরা সিরিয়াল কিলিং ও অপরাধ প্রোফাইলিং এর মৌল বিষয়গুলো আলোচনা করেছি। যে অপরাধী কোন প্রকার কারণ ছাড়াই মানসিক বিকারগ্রস্ততা নিয়ে একের পর একটি জঘন্য অপরাধ বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকেন তাকে আমরা বলছি সিরিয়াল কিলার বা ধারাবাহিক খুনি। অন্যদিকে অপরাধস্থলে অপরাধীর ফেলে যাওয়া আলামত বা অপরাধস্থলের অবস্থা ও প্রকৃতি পর্যালোচনা করে অজানা অপরাধীর যে মনোবৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্ব তৈরি করা হয় তাকে বলে অপরাধ প্রোফাইলিং। এ পর্বে আমরা অপরাধ প্রোফাইলিং এর মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণের কিছুি ঐতিহাসিক কাহিনী তুলে ধরব।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম অপরাধ প্রোফাইলিং তৈরি করেন ইংল্যান্ডের জনৈক অপরাধ বিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক প্রফেসর ড. টমাস বন্ড ১৮৮৮ সালে। পূর্ব লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় ১৮৮৮ সালের ৩১ আগস্ট থেকে শুরু করে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক খুনের ঘটনার পর পর পাঁচ জন পতিতা নিহত হয়। ৩১ সে আগস্ট খুন হয় মেরি এন নিকোলাস। ৮ সেপ্টেম্বর এলিজাবেদ স্ট্রাইড এবং ক্যাথারিন ইউডোইস এর লাশ পাওয়া যায়। ৯ ডিসেম্বর পাওয়া যায় মেরি লেইন কেলির লাশ। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের একই বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রত্যেক ভিকটিম ছিল নারী ও পেশায় পতিতা। প্রত্যেকটি মৃতদেহ বিভৎসভাবে ছিন্ন ছিন্ন করা হয়েছিল। তাদের শ্বাসরোধ করে হত্য করার পর গলাগুলো কেটে ফেলা হয়েছিল, বুক বরারবর চিরে ফেলা হয়েছিল এবং ভিতরের কোমলাংশ তথা নাড়ি, ভুড়ি, কলজে, যকৃত কেটে বের করা হয়েছিল। প্রত্যেকটি লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল একদম খোলা স্থানে।

প্রচলিত পুলিশ তদন্ত পদ্ধতি এসব সমজাতীয় হত্যাকাণ্ডের কোন কুল কিনারা করতে পারছিল না। একটি লাশের কাছে কাগজে লেখা হয়েছিল Jack the Ripper অর্থাৎ বুক চিরে হত্যাকারী জ্যাক। এই কার্ডের নাম থেকেই এই ধারাবাহিক হত্যাকারীকে পত্রপত্রিকায় ডাকা হতে থাকে ‘জ্যাক দি রিপার’ নামে। প্রচলিত তদন্ত ব্যবস্থায় বিতৃষ্ণ পুলিশ কর্তৃপক্ষ ড. টমাস বন্ডের স্মরণাপন্ন হলেন। ড. বন্ড একজন পুলিশের ময়না তদন্তকারী ডাক্তার ছিলেন। তার অন্য একটি পরিচয়ও ছিল। তিনি সে সময়ের একজন স্বনামধন্য মনোচিকিৎসক ছিলেন। জ্যাক রিপার হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ ভিকটিম মেরি কেলির ময়না তদন্ত তিনিই সম্পন্ন করেছিলেন। ময়না তদন্তকালে তিনি এ ঘটনার অপরাধী তার ভিকটিমদের শরীরের উপর যে উপায়ে নির্যাতন করেছিল, তা প্রত্যক্ষ করে অপরাধীর একটা মানসিক অবস্থা আচঁ করতে পেরেছিলেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের অনুরোধ পেয়ে ড.বন্ড ইতোপূর্বে সংঘটিত সকল ঘটনার স্থির চিত্রসমূহ বিভিন্নভাবে পর্যালোচনা করলেন। কিছু কিছু ঘটনাস্থলে পরবর্তীতে তিনি নিজে পরিদর্শনও করলেন। একই সাথে অন্যান্য মৃত দেহগুলোর ময়না তদন্তের প্রতিবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খুভাবে বিশ্লেষণ করে ড. টমাস বন্ড বুঝতে পারলেন, সকল হত্যাকাণ্ড একজন ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয়েছে । ড. বন্ড তার প্রতিবেদনে মত প্রকাশ করেন, এভাবে হত্যাকান্ডগুলো যে ব্যক্তি ঘটিয়েছেন তিনি অতিশয় ধীরস্থির, সাহসী ও দৈহিক শক্তি সম্পন্ন। তার কোন সহযোগী ছিল বলে প্রমাণ নেই। তার মতে, অপরাধী নিয়মিত বিরতিতে মানুষ্য হত্যা ও অধিযৌন কামনায় ( Homicidal and Erotic Mania) তাড়িত হন। মৃত দেহগুলোর বিকৃতির বৈশিষ্ট্যগুলো নির্দেশ করে তিনি যৌন উগ্রতা জনিত অসুখ (Satyriasis) এ আক্রান্ত বলে ড.বন্ড মত প্রকাশ করেন।

ড. বন্ড বলেন, জ্যাক দি রিপার এর মনুষ্য হত্যা ও যৌনবিকৃতি বাতিক প্রতিশোধ পরায়ন কিংবা অতিরিক্ত ধর্মীয় উত্তেজনার কারণেও দেখা দিতে পারে। হত্যাকারী বাহ্যিক আচরণে সম্পূর্ণ অনাক্রমণাত্মক ও সুস্থির। তিনি মধ্যবয়সী এবং পোষাক পরিচ্ছদে অত্যন্ত কেতাদুরস্ত। তার মনে হয়, অপরাধের চিহ্নগুলো গোপনের উদ্দেশ্যে অপরাধী অবশ্যই লম্বা কোর্তা (Cloak) কিংবা ওভার কোট পরেন। তার অপরাধ কর্মের বর্ণনা থেকে এটাও বলা যায়, তিনি একজন নিঃসঙ্গ এবং উৎকেন্দ্রিক স্বভাবের লোক। তার নির্দিষ্ট কোন পেশা নেই। তবে কোন না কোন দিক থেকে তার যৎসামান্য উপার্জন থাকতে পারে। তিনি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে বসবাস করেন যারা তার সম্পর্কে কিছুটা ধারণাও রাখতে পারে। কিন্তু তারা এমনি ভীতু ব্যক্তিত্বের অধিকারী যে ঝামেলা কিংবা অপরাধীর নৃশংসতার ভয়ে পুলিশের কাছে মুখ খুলবেন না। তবে পুরস্কার ঘোষণা করা হলে তারা পুরস্কারের আশায় অপরাধী সম্পর্কে পুলিশকে খবর দিতেও পারেন।

পৃথিবীর প্রোফাইলিং জগতে ‘জ্যাক দি রিপার’ হত্যাকারী সম্পর্কে ড. টমাস বন্ডের এ প্রোফাইলই ছিল সর্বপ্রথম। কিন্তু যেহেতু পুলিশ তদন্তকারীগণ এ প্রোফাইলের ভিত্তিতে কিংবা অন্য কোনভাবে অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সাক্ষম হননি কিংবা এখন পর্যন্ত কেউ এসব হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকারও করেনি, তাই ড. টমাস বন্ডের এ প্রোফাইল কতটা সঠিক তা নির্ধারিত হয়নি। তবে সত্য হোক আর কল্পনা হোক, ‘জ্যাক দি রিপার’ সম্পর্কে ড. টমাস বন্ডের প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম অপরাধী প্রোফাইল।

সূত্রঃ (Donald Rumbelow, the complete Jack the Ripper, 138(1975