ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত ১২ অক্টোবর ‘দৈনিক কালের কণ্ঠে’ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘প্রশাসন ক্যাডার দুর্নীতির শীর্ষে’। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দুদকে ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মোট ৭৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৮০ জন কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ৪৮ জন, স্বাস্থ্য ক্যাডারের ২৩ জন এবং পুলিশ ক্যাডারের রয়েছেন ছয়জন। এছাড়া প্রাণিসম্পদের পাঁচজন, শিক্ষার চারজন, টেলিযোগাযোগ ও গণপূর্ত ক্যাডারের তিনজন করে এবং কর ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন।(১)

অনলাইনে প্রতিবেদনটি পড়ার সাথে সাথে আমি এর উপর পাঠকদের প্রতিক্রিয়াগুলোও পড়লাম। আমার কাছে প্রতিবেদনের চেয়ে এর মন্তব্যগুলো আরো বেশি আকর্ষণীয় মনে হল। কেউ কেউ বলছেন, প্রতিবেদনটি পক্ষপাতমূলক, কেউ কেউ বলছেন, এটা একটিমাত্র ক্যাডারকে হেয় করার জন্য করা হয়েছে, কেউ বা আবার বলছেন, ভিতরের সারবস্তুর সাথে শিরোনামের মিল নেই। এত সব কিছুর মধ্যে আমি যে কি মন্তব্য করর ভেবে পাচ্ছি না।

হ্যাঁ, একটি শরীরের যখন সকল অংশই কমবেশি জরাগ্রস্ত তখন কোন অংশ বেশি আর কোন অংশ কম তা তুলনা করা নিতান্তই অমূলক। তবে শরীরের অংশগুলোর কর্ম, দায়িত্ব, অবস্থান ইত্যাদি ভেদে বিশেষ বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কিছু অংগের অসুখ মানুষের জীবন বিপন্ন করে না। যেমন, হাতের আঙ্গুলে পচন ধরলে তা কেটে ফেলতে অসুবিধা হয়, কিন্তু মানুষ মারা যায় না। মানুষের একটি চোখ নষ্ট হলেও মানুষ বাঁচে। কিন্তু তাই বলে চোখের গুরুত্ব আর হাতের আঙ্গুলের গুরুত্ব এক নয়। মানুষের মস্তিস্কের বিকৃতি হলে সে শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়। তখন তার সাথে পশুর তেমন পার্থক্য থাকে না। অন্যদিকে মানুষের মাথাটা কেটে ফেললে বা এটা পচে গেলে তাকে আর বাঁচানো যায় না।

সরকারের আমলাতন্ত্র সিভিল সার্ভিসের সকল ক্যাডারকে নিয়েই গঠিত। গোটা আমলাতন্ত্র একটি বৃহৎ যন্ত্রের মতো। এ যন্ত্রের একটি পার্ট বা অংশ নষ্ট হয়ে গেলে বা বিকল হয়ে গেলে এর দ্বারা কাঙ্খিত কাজ করানো সম্ভব নয়।

কিন্তু মানুষের শরীর ও যন্ত্রের মতো সব পার্টস সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের আমলাতন্ত্রেও তাই ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে গুরুত্বের পার্থক্য আছে। সে দিক দিয়ে প্রশাসন ক্যাডার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরা আমলাতন্ত্রের শীর্ষে অবস্থান করেন। এরা প্রশাসক হন, পরিচালক হন, মহাপরিচালক হন, সচিব হন ও সচিবদের সচিব হন। কিন্তু এদের মধ্যে যদি দুর্নীতি বাসা বাঁধে তাহলে, বলা চলে, আমলাতন্ত্রের মগজেই পচন ধরে। আর মগজে পচন ধরলে যেমন একটি প্রাণি বাঁচতে পারে না, তেমনি আমলাতন্ত্রও বাঁচতে পারবে না। তাই দুর্নীতির ব্যাপকতা অনুসন্ধানকালে আমাদের মাথার পচন ও আগুলের ফুলন উভয় দিকই বিবেচনা করতে হবে।

আশার কথা যে, এসব দুর্নীতিবাজ অফিসারগণ এখন আইনের আওতায় আসছেন। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারি দায়িত্বে থাকলে যে কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে পারে। কেননা, যার কাছে সরকারি সম্পদ থাকে বা আসে তিনি তা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ বা তসরূপে উৎসাহী হতে পারেন। কৌটিল্যের ভাষায়, জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব, তেমনি অসম্ভব হলো সরকারের তহবিল নিয়ে লেনদেন করে একটুকু্ও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয়, কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারিরা তহবিল তছরূপ করে।(২)

কিন্তু আমাদের দেশের মতো নিওপ্যাট্রিমনিয়াল টাইপের সমাজে সরকারি কর্মকর্তারা যে কেবল জিহ্বার ডগায় মধু আসে বলেই তা চাটতে উৎসাহি হন এমনটি নয়। এখানে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘাড়ে কাঁঠাল রেখে তা অন্যরা ভোগও করেন। কাঁঠালের কোনও কোষই হয়তো সেই সরকারি কর্মচারি পান না। কিন্তু কাঁঠালের আঠা লেগে থাকে মুখে ঠোঁটে কিংবা শরীরের অন্যান্য অংশে। অন্যরা কাঁঠালের স্বাদ আস্বাদন করে দিব্যি সটকে পড়েন। কিন্তু সরকারি কর্মচারীর মাথার উপরে থাকা কাঁঠালের কোষশূন্য ভোতাটা সাক্ষ্য দেয় যে এ সরকারি কর্মচারীই দোষী। তাই, চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিবেদন বা পরিসংখ্যান অনেকটাই বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। এদেশে বলীর পাঁঠা যদি কেউ থাকে, তবে তারা মূলত সরকারি কর্মচারিরাই।

দুদুকের মামলার তালিকায় পুলিশ ক্যাডারের কর্মর্তাদের ব্যাপক মাত্রায় অনুপস্থিতিতে অনেকেই মনক্ষুন্ন হবেন। কেউ কেউ বলবেন, পুলিশ কি তাহলে দুর্নীতি করে না। কেউ কেউ বলবেন, পুলিশ ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায়। আমি মনে করি, এর কোনটাই সঠিক নয়। পুলিশের দেড়লক্ষ সদস্যের মধ্যে দুর্নীতি করার সুযোগ পাঠ অতি সামান্যই। অধিকন্তু সরকারি অর্থের কিয়দংশ পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যয় করলেও আয়ের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। পুলিশ নীতি নির্ধারণ করে না, নীতির বাস্তবায়ন করে। পুলিশ ইউটিনগুলোতে যেসব কেনাকাটা হয়, সেগুলোর আর্থিক মূল্যও বেশি নয়। অধিকন্তু পুলিশের কাজ আর্থিক নয়, সেবামূলক ও প্রতিকারমূলক। তাই পুলিশ কর্তাদের বিশেষ করে ক্যাডার কর্মকর্তাদের বড় ধরনের দুর্নীতিতে যুক্ত হবার সম্ভাবনা অনেক কম।

দুর্নীতি দমনের চেয়ারম্যান মহোদয় ঠিকই বলেছেন, দুর্নীতি আর হয়রানি এক নয়। যা টাকার অংকে মাপা যায় না, তা তাকে প্রয়োগিক অর্থে দুর্নীতি বলা মুসকিল। হয়রানি টাকার অংকে মাপা যায় না। পুলিশের বিরুদ্ধে অহরই হয়রানির অভিযোগ ওঠে। তবে হয়রানি যদি উৎকোচ আদায়ের কারণ কিংবা উপজাত হয়, সেটা অবশ্যই দুর্নীতি। কিন্তু এত অল্পমাত্রার দুর্নীতি নিয়ে কাজ করার মতো সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের আছে কি?

হয়রানি বন্ধ করতে হলে তাই বিশেষ কিছু আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে। এটার জন্য প্রশাসনিক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অধিক ফলপ্রুসূ। পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি দফতরের হয়রানি রোধ করতে হলে আমাদের যথাযথ বাস্তব কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। (১৩ অক্টোবর, ২০১৪)

সূত্রাবলীঃ
১. http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/10/12/138505
২. পরার্থপরতার অর্থনীতি; আকবর আলী খান