ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আজকের দিনটি কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ে বেশ আশাবাদী সংবাদের দিন। তিন স্থান থেকে তিন পদের তিন জন পুলিশ অফিসার কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে তিনটি পৃথক তথ্যসহ আমার সাহায্য চেয়ে ফোন করেছিলেন। আমি বর্তমানে কমিউনিটি পুলিশিং ডেস্কে নেই। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবে কোনও কাজও করছি না। কিন্তু এ বিষয়ে আমার আগ্রহ, স্পেশালাইজেশন ও মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের সাহায্য ও পরামর্শদানের বিশেষ ঝোঁক এখনও পুরোমাত্রায় বিদ্যমান।

প্রথমেই ফোন করেছিলেন ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) জনাব সফিকুর রহমান স্যার। তিনি তথ্য দিলেন, তার রেঞ্জের সকল থানা থেকে কমপক্ষে দুইজন করে সাব-ইন্সপেক্টরকে তারা কমিউনিটি পুলিশিং এর উপর প্রশিক্ষণ দিতে চান। এদের অর্ধেক হল দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার বা সিপিও। বাকী অর্ধেক হল বিকল্প সিপিও। অর্থাৎ হটাৎ করে সিপিও অনুপস্থিত থাকলে কিংবা বদলী হয়ে গেলে বিকল্প একজন অফিসারকে তারা প্রস্তুত রাখবেন, যারা সিপিওদের নির্ধারিত কাজ প্রয়োজন মতো বুঝে নিবেন। এ সব অফিসারের সাখ্যা প্রায় ২৫০ জনের কাছাকাছি।

তারা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অডিটরিয়ামে তাদের প্রশিক্ষণ দিবেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তাদের প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে। আমি যেহেতু কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে কাজ করেছি, তাই তিনি আমার পরামর্শ চান। একই সাথে পিআরপি কোন সহায়তা দিতে পারে কিনা তাও তিনি আমাকে খোঁজ নিতে বললেন। আমি পিআরপির রতনের সাথে যোগাযোগ করে জানলাম, পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি চলতি ও আগামী বছরে দেশের সকল থানার সিপিওদের পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ দিবে। এদের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু হবে আগামী ১৯ অক্টোবর যেখানে আমাকে তারা প্রথম সেসনটি পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে তারা ঢাকা রেঞ্জের সকল সিপিও ও বিকল্প সিপিওদের প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হবে।

দ্বিতীয় ফোনটি করেছিলেন মাগুরা জেলার এসপি, আমার ব্যাচমেইট জনাব জিহাদুল কবীর। তিনি জানালেন, তার শ্রীপুর থানার অফিসার-ইন-চার্জ আওলাদ হোসেন কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী। ইতোমধ্যেই তিনি শ্রীপুর থানায় এ ব্যাপারে একটি উৎসব উৎসব আমেজ তৈরি করে ফেলেছেন। সামনে থানায় ১০ হাজার লোকের একটি সমাবেশ ডাকবেন। এ উপলক্ষে তারা একটা প্রকাশনা বের করতে চান। এ প্রকাশনায় আমাকে একটি লেখা দিতে হবে। আমি আনন্দের সাথে সম্মত হলাম।

তৃতীয় ফোনটি করেছিলেন, সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার অফিসার-ইন-চার্জ জনাব মাসুদ মিয়া। মাসুদ আমাদের বন্ধু ব্যারিস্টার মাহমুদের বড় ভাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই আমি তাকে চিনতাম। সাতক্ষীরা এসপি সাহেবও নাকি কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নে বেশ জোর দিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে তার থানাতেও একটা বড় সমাবেশ হবে। তিনি সেখানে একটা বক্তব্য দিবেন। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ইতিহাস তুলে ধরতে চান। তাই কিভাবে তিনি তা করবেন, কি কি তথ্য, কোথায় পাবেন এ সব আমার কাছ থেকে জানতে চান। আমি তাকে বললাম, বাজারে আমার বই রয়েছে। আপনার সাতক্ষীরা জেলাতেও আমার বই বিক্রয় হয়েছে। একটি বই সংগ্রহ করতে পারেন।অধিকন্ত বিডিনিউজ২৪ এর ব্লগে গিয়ে আমার লেখা ডাউনলোড করে পড়তে পারেন।

কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একই দিনে এমন তিনটি ফোন ও পরামর্শ কামনা আমার কাছে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এদেশে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলেন, দলীয় সরকারের আমলে জনগণের সাথে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন কেবলই দিবাস্বপ্ন। এদেশের রাজনীতির ব্ল্যাকহোলে পুলিশের আমজনতা তোষণের সকল প্রচেষ্টাই নিমেষেই শোষিত হয়ে শূন্যতায় পর্যবসিত হয়।

কিন্তু এরই মাঝে দেশে পুলিশ অফিসারদের মধ্যে অনেকেই কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উপরিউক্ত তিনটি ঘটনাই তার প্রমাণ। তিনটি ফোন তিনটি পৃথক স্থান, তিনটি পৃথক উদ্দেশ্য ও তিনটি পৃথক পদের অফিসারদের হওয়াই প্রমাণ করে বাংলাদেশে সকল স্থানে ও সকল স্তরের পুলিশ অফিসারগণ প্রতিকূল পরিবেশেও কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কমিউনিটি পুলিশিং নিছক একটি পুলিশিং কৌশল নয়। এটি একটি পুলিশিং দর্শন। এ দর্শনের পিছনে যেমন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে, তেমনি এর একটি ব্যবহারিক মূল্যও রয়েছে। পুলিশ ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টা, যৌথ অংশীদারিত্ব ও সম্পদের যৌথ বিনিয়োগ যে কোন সমাজে সামাকিজ সম্পদকে বর্ধিত করে। ধীরে ধীরে এ দর্শনের মূলভাব যখন কমিউনিটি সদস্যদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে; সকল স্তরের পুলিশ অফিসারগণ যখন উপলব্ধি করতে শিখবেন জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব ছাড়া পুলিশ তার কর্তব্য পালনে কখনই সফল হতে পারে না এবং সর্বোপরি আমাদের নীতিনির্ধারকগণ যখন পুলিশিং খাতে অর্থ বিনিয়োগের জন্য সর্বোত্তম পথ ও পন্থাটি খুঁজে বের করতে তৎপর হবেন, তখন সত্যিই প্রমাণিত হবে যে কার্যকরভাবে অপরাধ প্রতিরোধের সর্বোত্তম বিকল্প হল কমিউনিটি পুলিশিং।