ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমাদের সমাজে অনেক প্রথা বা রীতি আছে যেগুলো ভঙ্গ করা বিধিবদ্ধ আইনে শাস্তির বিধান নেই। তবে আমাদের গ্রামেগঞ্জে এসব প্রথা ভঙ্গের জন্য বিশেষ কিছু শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। শাস্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে নাকে খত দেয়া, জুতোর মামলা গলায় দেয়া, তওবা পড়ানো, কিছু উত্তম মধ্যম দেয়া, কিছু ক্ষতিপূরণ আদায় করা, প্রথা ভঙ্গকারীকে এক ঘরে করে রাখা ইত্যাদি। অনেক স্থানে কিছু ব্যতিক্রমী শাস্তির বিধানও লক্ষ করা যায় যেগুলো সেই নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে অন্যকোথাও স্বীকৃত নয়। যেমন, দোররা মারা। আমাদের বাল্যকালে দোররা মারার ঘটনা দেখেছি। তবে সে দোররা শরিয়া আইনে বর্ণিত দোররার অনুরূপ নয়; বরং প্রতীকী। যেমন, রায় হল তাকে ১০০ বেত মারতে হবে। তখন ১০০ খানা কঞ্চিকে দশটি গোছা বেঁধে দশটি বাড়ি মারলেই ১০০ বাড়ির সমান হল। যদিও এক যুগ আগেও দোররা মামার মতো শাস্তি সমাজ অনুমোদন করত, এখন ব্যতিক্রম ক্ষেত্র ছাড়া কোন সমাজেই এটা অনুমোদিত নয়।

এসব সামাজিক শাস্তি যতটা না আর্থিক বা দৈহিক তার চেয়েও বেশি মানুষের মর্যাদাগত। আমি এগুলোকে সামাজিক শাস্তিই বলব। কেননা, বিধিবদ্ধ আইনের বাইরে কোন শাস্তির প্রচলন, প্রসার বা প্রয়োগকে দেশের আইনের শাস্তির মতো মনে করা চলে না।

আমি মনে করি, সমাজে সংঘটিত সকল অপরাধ আইনে সংজ্ঞায়িত থাকে না। কারণ বিধিবদ্ধ অপরাধ প্রথমে নর্ম বা প্রথা ভঙ্গ দিয়ে শুরু হয়। প্রথমে হয়তো এ প্রথা বা রীতি ভঙ্গ সমাজের ক্ষুদ্র অংশকে বিক্ষুব্ধ করে। ক্রমে এটা সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে অনুমোদনের অযোগ্য মনে হয়। প্রথা ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে গোটা সমাজ না হলেও সমাজের একটি বড় অংশ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তা গোটা রাষ্ট্রের কাছে বাস্তব ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দেয় এবং সংসদ একে সংজ্ঞায়িত করে এর বিপরীতে শাস্তির বিধান রেখে আইন পাশ করে।

কিন্তু সমাজে অনেক অপরাধই আছে যে গুলো আইনের চোখে আসলে অপরাধ নয়। কিন্তু সমাজ এটাকে ঘৃণা করে, যারা সে আচরণটি করে তাদের কোন না কোন ভাবে শাস্তিও দিতে চায়। আইনের বাইরে গিয়ে তারা নর্মস বা প্রথা ভঙ্গকারীকে শাস্তিও দিয়ে থাকে।

শুধু আমাদের সমাজেই নয়, পাশ্চাত্য সমাজেও কিছু কিছু সামাজিক বিচার ও শাস্তি রয়েছে। নাকে খত দেয়া, জুতার মালা পরানো, এক ঘরে করা– এসব হল সামাজিক বিচারের শাস্তি। পাশ্চাত্যে এগুলোকে Scarlet Letter Punishment বলা হয়। এটা অনেক সমাজে প্রচলিত ও কার্যকারি। আমাদের সমাজেও রয়েছে। এগুলো সমাজকে সৃঙ্খলায় রাখতে সহায়তা করে।

যেমন, এক ঘরে করা। এটা কোন আইনে স্বীকৃত শাস্তি নয়। আমাদের দেশের কোন আদালত কাউকে এক ঘরে করে রাখার শাস্তি দিতে পারে না। কিন্তু যে শাস্তি আদালত দিতে পারে না, আমাদের সমাজ কিন্তু তার সদস্যদের সে শাস্তি দিতে পারে, দিয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, আদালত কাউকে এক ঘরে করার শাস্তি দিতে না পারলেও কাউকে এক ঘরে করার সামাজিক বিচারকে আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধও করা হয়নি। যদি সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কোন সমাজের লোক কোন ব্যক্তিকে এক ঘরে করে এবং সেটা যদি সেই শৃঙ্খলা ভঙ্গকারি ব্যক্তিকে পুনরায় শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে সহায়ক হয়, আমি মনে করি এটা ভাল।

আমাদের এলাকাতেও এমন ধরনের অনানুষ্ঠানিক বিচার-আচার বা বিরোধ মীমাংসার প্রচলন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এবার এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশির বাসায় ঢোকার রাস্তাটি বন্ধ করে দিল। বেচারী প্রতিবেশি তার বাসায় ঢোকার পথ পেল না। সে এখন মাঠের মধ্য দিয়ে তার বাড়িতে ঢোকে। এটা একটা বাস্তব সমস্যা। এ জন্য ভদ্রলোক থানা পুলিশ পর্যন্ত দৌড়াদৌাড়ি করে কোন সুরাহা পায়নি। কারণ, থানা পুলিশ ফৌজদারি বিষয়ে মামলা মোকদ্দমা করে আদালতে তা বিচারের জন্য প্রেরণ করতে পারে। কিন্তু দেওয়ানী বা অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের করণীয় সামান্যই। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে যেতে হয় আদালতে। যদি আদালতে যান, তো বাজনার চেয়ে খাজনা বেশি হবে। তাই গ্রামের লোক রাস্তা বন্ধকারী ব্যক্তিকে বুঝিয়ে বললেন, তাকে রাস্তা দিতে হবে। প্রয়োজনে সে ক্ষতিপূরণ নিবে। কিন্তু নাছোড়বান্দা সে। গ্রামের লোকের কথা সে মানল না।

এখন এই সমস্যার সমাধান কি? কিভাবে এই রাস্তা বন্ধকারী নাছোড়বান্দাকে নিবৃত করবেন? সিদ্ধান্ত হল, তাকে এক ঘরে করা হবে। সে যেমন দশের কথা মানছে না, তেমনি দশও তাকে আর সহযোগিতা করবে না। সমাজ তাকে পরিত্যাগ করল। স্থানীয় মুদির দোকান তার কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু বিক্রয় করতে অস্বীকার করল, তার বাসায় কোন অনুষ্ঠান হলে গ্রামের লোক তার দাওয়াৎ নিতে অস্বীকার করল, তাকে গ্রামের কোন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া থেকে বিরত থাকা হল। গ্রামের কোন ব্যক্তি এখন আর তার বাসায় যায় না। গ্রামের মানুষ তার সাথে আর কথা বলে না। মসজিদে গেলে তাকে প্রথম সারিতে বসতে দেয়া হয় না। এভাকে গ্রামবাসী তার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করতে থাকল।

উল্লেখ্য, বর্তমানের জিডিটাল সমাজে একজন ব্যক্তি তার প্রতিবেশি বা সমাজের মানুষের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়। কিন্তু তারপরও মানুষ তার আপন সমাজকে উপেক্ষা করে চলতে পারে না। তাই একঘরে করার সামাজিক শাস্তির কাছে অধিকাংশ মানুষই আত্মসমর্পণ করে। আমাদের এলাকার উল্লিখিত ব্যক্তিও একদিন তাই করল। অবশেষে তিনি তার প্রতিবেশির জন্য রাস্তা ছেড়ে দিলেন। এই যে সামাজিক শাস্তি, তা কিন্তু সমাজের একটি বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ঠ সহায়ক হল। তাই আইনে স্বীকৃত না হলেও, সমাজ কিন্তু তার নিজস্ব নিয়ম-নীতি-প্রথাগুলোকে কখনই পরিত্যাগ করে না। কারণ এগুলো পরিত্যাগ করলে সমাজ শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে না।

আমাদের পাশ্চাত্য মনোভাবাপন্ন কিছু মানুষের মনে একটা পূর্ব সংস্কার জন্ম নিয়েছে যে আমাদের নিজস্ব যা কিছু আছে তার সবই খারাপ, অমানবিক ও মানবাধিকার পরিপন্থি। কিন্তু এই যে সব কিছু খারাপের বোধ সেটি তাদের কে দিল? আমার প্রথা, আমার বিচার, আমার আচার সবই খারাপ এটা তাদের অন্তরে কে প্রবেশ করাল। এটা করাল পাশ্চাত্যের সমরবিদ, সমাজবিদ, রাজনীতিবিদ বা মনীষীগণ।

একটা উদাহরণ দেই। কয়েক বছর আগে সিংগাপুরে উচ্ছৃঙ্খলতার দায়ে আমেরিকান বংশোদ্ভূত এক তরুণের বিচার হয়। বিচারে তার জেল-জরিমানার পাশাপাশি বেত্রাঘাতের দণ্ডও দেয়া হয়। কিন্তু আমেরিকা বাধ সাধল। তাকে জেল দেয়া গেলেও বেত্রাঘাত করা যাবে না। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সিংগাপুরের কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র লিখল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হল।

কিন্তু সিংগাপুরে শাস্তি হিসেবে এখনও বেত্রাঘাত প্রচলিত। তারা এটা তাদের নাগরিকদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করে। যে শাস্তি তাদের সমাজ অনুমোদন করে, যে শাস্তি তারা নিজ দেশের বিশৃঙ্খল নাগরিকদের দিয়ে সমাজকে শৃঙ্খলে রাখে, সেই শাস্তি দেশের ভিতরে কোন আমেরিকানকে দেয়া যাবে না। সেটা কি হয়? সিংগাপুর কর্তৃপক্ষ সরাসরি বলে দিল, না আমাদের দেশের প্রচলিত আইনের শাস্তি তাকে পেতেই হবে। সিংগাপুর আমেরিকার চাপের কাছে তারা নথি স্বীকার করল না। তরুণকে বেত্রাঘাত করেই ছাড়ল।

অপরদিকে, প্রায় সমসাময়িককালে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের এক রেড ইন্ডিয়ান মেয়েকে সমাজপতিরা একটি সামান্য প্রথা ভঙ্গের দায়ে শারীরিক শাস্তি প্রদান করে। বেত্রাঘাতের ফলে মেয়েটি মারাত্মকভাবে আহতও হয়। কিন্তু এ ঘটনায় আমেরিকার কর্তাব্যক্তিগণ তো কোন আপত্তি করেননি, পৃথিবীর কোন মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন বিবৃতি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। বিষয়টি এমন যে শারীরিক শাস্তি বা বেত্রাঘাত যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত হলে তা মানবাধিকার ক্ষুন্ন করে না, কিন্তু সিংগাপুর বা বাংলাদেশে হলে তা হয় অমানবিক।

আরো একটি উদাহরণ দেই। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে মাদক পাচারের অভিযোগ তোলে মধ্য আমেরিকান দেশ পানামার প্রেসিডেন্ট জেনারেল নরিয়েগার বিরুদ্ধে। এ জন্য তারা ১৯৮৯ সালে পানামাতে সামরিক অভিযান চালিয়ে জেনারেল নরিয়েগাকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে। যুক্ত রাষ্ট্রের আদালত তাকে ১৯৯২ সালে ৪০ বছরের কারাদণ্ডের হুকুম দেয়।

এর বিপরীত অন্য এক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের এক তরুণী প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশের ঢাকায় প্রায় কেজি পরিমাণ হিরোইনসহ ধরা পড়ে। বিচারে তারও যাবজ্জীবন সাজা হয়। কিন্তু সে তরুণী তো আমেরিকান। সে মাদক পাচারকারী হলেও তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এক সিনেটর একদিন বাংলাদেশে এসে সেই মাদক পাচারকারী তরুণীকে বগলদাবা করে বিমানে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেলেন। যে যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের দায়ে একটি দেশের রাষ্ট্রপতিকে অপমানজনকভাবে ধরে নিয়ে নিজ দেশে এনে বিচার করে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়, সেই যুক্তরাষ্ট্রই আবার একজন তরুণ মাদক পাচারকারীকে অন্যদেশের জেল থেকে মুক্ত করে নিজ দেশে নিয়ে যায়।

এই যে বৈপরিত্য, সেটাকে কি বলব? মানবাধিকার রক্ষা না নিজেদের কর্তৃত্ববাদের প্রসারণ? পাশ্চাত্য যা খারাপ বলবে, আমিও তাই খারাপ বলব। তাহলে আমার নিজস্ব বলতে কোন কিছুই নেই?

অন্য দেশের একটি উদাহরণ দেই। জাপানের ফৌজদারি মামলায় সাজার হার ৯৯.৯%। এর মূল কারণ সেখানে পুলিশের কাছে দোষ স্বীকারোক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য। আর যারা অপরাধ করে পুলিশের কাছে গ্রেফতার হন তাদের প্রায় শতভাগই দোষস্বীকার করেন। কিন্তু কই এ নিয়ে তো বিশ্বের কোথাও কেউ উচ্চবাচ্য করে না। কই জাপানে অপরাধীদের মানবাধিকার নিয়ে কাউকে তো মরে যেতে দেখি না। তাহলে জাপানের পুলিশের মাইর কি মিঠা লাগে? ওদের মাইরে কি ভাইটামিন আছে?

মোদ্দ কথা, প্রত্যেক সমাজেরই কিছু কিছু নিজস্ব ও স্বকীয় শৃঙ্খলা ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থা অনাদিকাল থেকে সেই সমাজের সদস্যগণ অনুসরণ করে আসছেন। এসব প্রথা বা শৃঙ্খলা ব্যবস্থা অন্য সমাজের তুলনায় নিম্নস্তরের হতে পারে। কিন্তু সেই সমাজের নিরিখে সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন সমাজ কোন রীতি বা বিচার ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হবে সেটা তাদের উপর ছেড়ে দেয়াই ভাল। যদি কোন প্রথা বা শৃঙ্খলা ব্যবস্থা আদীম সমাজের মত মাৎস্য ন্যায়, বা কাপালিক চরিত্রের অনুরূপ না হয় তাহলে সেটা পরিত্যাগ করার কারণ নেই। প্রচলিত ও বহুল অনুসৃত প্রথার বিরুদ্ধে কোন আইন কেউ মান্য করবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক মদ্যপান করে। এটা তাদের সামাজিক প্রথা বা রীতি। কিন্তু ১৯৩০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র মদ্যপানকে নিরুৎসাহিক করার জন্য মাদকদ্রব্য উৎপাদান, বাজারজাত, গুদামজাত ও কেনাবেচার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল যা ইতিহাসে প্রহিবিশন প্রিয়ড বলে বলে খ্যাত। দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সংক্রান্ত অপরাধ বেড়ে গেল। মাদক নিষিদ্ধ হলেও মাদক দ্রব্যের চাহিদা কমল না। নিষিদ্ধ মাদক দ্রব্যের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা জন্য সেদেশে বড় বড় মাস্তান, ডন বা মাফিয়া তৈরি হল। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক বছর পর আবার মাদক দ্রব্যের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল । অথচ বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যকে নিষিদ্ধ করে আইন পাশের দাবি ওঠে। প্রচলিত আইন সবাই মেনে চলে এবং মাদকের প্রতি আমাদের সমাজের তেমন কোন আসক্তি নেই। তাহলে পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করে আমরা কি সমাজে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার উন্মুক্ত করে দিব?