ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এক কথা স্বীকৃত যে আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক সামাজিক বিচার ব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকারী ও প্রাসঙ্গিক। যে বিষয়টি আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করা সম্ভব নয়, অনানুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ায় তা প্রমাণ করা সম্ভব। আনুষ্ঠানিক আদালতে আইনের কূটকৌশলে ক্ষমতাসীনরা সুবিধা পায়। আইনকে তারা ক্রয় করতে পারে। কিন্তু সামাজিক বিচার ব্যবস্থায় আইনকে ক্রয় করা সহজ নয়। যদিও আমরা বর্তমানে সামাজিক বিচার ব্যবস্থাকে অনেকটাই কলুষিত দেখি, তবুও এটা পরিত্যাগ করার মতো অবস্থায় এসে পৌঁছেনি।

পৃথিবীর কোন সমাজই তার শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ভার রাষ্ট্রের উপর ছেড়ে দেয় না। দিতে পারে না। অনেকে বলে থাকেন, পাশ্চাত্যে নাকি কোন বাচ্চার সাথে তার পিতামাতা দুর্ব্যবহার করলে সেই বাচ্চা পুলিশকে খবর দেয়। বিষয়টির মধ্যে যতটা না রূপকথা আছে ততোটা সত্যতা নেই। পৃথিবীর কোন সমাজেই তার পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর দেখভালের ভার গড় পড়তায় রাষ্ট্রীয় পুলিশ বা আদালতের উপর ছেড়ে দেন না। কেননা, রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা সমাজের সীমাবদ্ধতার মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। রাষ্ট্র যা পারে না সমাজ কিন্তু তা পারে। পৃথিবীর কোন দেশের পুলিশেরই এত বেশি লোকবল নেই বা ফুসরৎ নেই যে গুরুতর প্রকৃতির অপরাধ নিবারণের পরিবর্তে সামাজিক ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে। অধিকন্তু পাশ্চাত্য দেশের সমাজ এতটাই ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে ও অনুশীলন করে যে তাদের একান্ত পারিবারিক বিষয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ তারা কামনা করে না। তারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে অভ্যস্ত।

যেমন কোন ব্যক্তিকে এক ঘরে করে রাখার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র দিতে পারে না। কিন্তু সমাজ এট দিতে পারে। যে আমার সাথে বসবাস করছে সে যদি আমার সমাজের অনুরূপ আচরণ না করে রাষ্ট্রের কোন ক্ষমতাই তাকে আমার সাথে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারে না। যাকে সমাজ গ্রহণ করবে না, রাষ্ট্র তাকে সমাজের সাথে গ্রহণীয় করে তুলতে পারে না। তাই সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও সম্ভাবনা সীমাহীন।

একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার জন্য সমাজের অন্যরা শাস্তি পাবে এটা হতে পারে না। ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় আইনে কোন ব্যক্তিকে মসজিদে নামাজ পড়া থেকে বিরত রাখা যায় না। কিন্তু সমাজের বিচারে কোন ব্যক্তিকে যদি প্রথম সারিতে স্থান দেয়া না হয়, তাহলে সেটাও হবে প্রতীকী। কারণ, এটা তার মর্যাদার সাথে সম্পর্কিত। যে ব্যক্তি সমাজের স্বীকৃত আচরণ করবে না, সমাজ তাকে যে আইন মান্যকারীদের কাতারে স্থান দিবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই কোন ব্যক্তি যদি সমাজের সংখ্যা গরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে সমাজ বিরোধী কর্মে লিপ্ত হয়, তবে সমাজের কর্তাব্যক্তিরা তাকে সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে পারে। কোন অসামাজিক ব্যক্তি যদি তার মেয়ের বিয়েতে গ্রামবাসী তথা সমাজের লোকদের দাওয়ত করে, আর সমাজের সিদ্ধান্ত যদি হয়, তারা দাওয়াত কবুল না করা তাহলে সেই সমাজ বিরোধী ব্যক্তি সমাজের কাছে নতি স্বীকার করবে।

বলা বহুল্য, যারা আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে বর্তমান বিচার ব্যবস্থা উপহার দিয়েছিলেন, সেই ব্রিটেন কিন্তু এ ধরনের বিচার ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে আসার চেষ্টা করছে। যেমন, কোন ব্যক্তির বাড়িতে যদি চুরি হয়, তাহলে আমাদের বিচার ব্যবস্থার নীতি অনুসারে তার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধেই ধরা হয়। এ জন্য রাষ্ট্র এ চুরির ঘটনার তদন্ত করে, দোষীদের বিচারের সম্মুখিন করবে। চোরগণ শাস্তি পাবে। ধরুন এ চুরির বিষয়টি হল ৩ ভরি সোনর গহনা সম্পর্কিত। এ সোনার গহনা দিযে গিরস্থ তার মেয়ের বিয়ে দিবেন। কিন্তু এ গহনাটুকু যদি চুরি হয়ে যায়, তা যদি পুলিশ উদ্ধারও করে তা চলে যাবে আদালতের মালখানায়। যতদিন না পর্যন্ত এ মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হবে, ততোদিন পর্যন্ত এ গহনাটুকু কোর্টের মালখানাতেই থাকবে। এ স্বর্ণটুকু দিয়ে গিরহস্থ তার মেয়ের বিয়ে পার করতে পারবেন না।

আনাকে কেউ আক্রমণ করে আপনার একটা হাত ভেঙ্গে দিল। আপনি চিকিৎসা নিলেন। তার পরও পঙ্গু হলেন। রাষ্ট্র এ মামলার তদন্ত করে বিচারে দোষিদের হয়তো তিন বছর জেল দিল। কিন্তু আপনার চিকিৎসার খরচ থেকে শুরু করে আপনার ভাঙ্গা হাতের কোন ক্ষতিপূরণ কোনটাই আপনি পাবেন না। অর্থাৎ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায়, ব্যক্তির ক্ষতির কোন পূরণ বা উপসম হয় না।

এমতাবস্থায় আমাদের বিচারব্যবস্থা উপরহার দানকারীগণ নিজ দেশে এখন Restorative Justice বা পুনর্ভরণমূলক বিচার ব্যবস্থা চালু করেছে। এ ব্যবস্থা প্রচলিত ব্যবস্থার নীতি থেকে অনেক আলাদা। প্রচলিত ব্যবস্থায় কোন ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে কৃত অপরাধের ফলে যে ক্ষতি হয়, তা পূরণের সুযোগ পান না। কিন্তু পুনর্ভরণমূলক বিচার ব্যবস্থায় ব্যক্তির ক্ষতির প্রতিদান ব্যক্তিকেই দেয়া হয়। এ ব্যাবস্থায় অপরাধী ও যার বিরুদ্ধে অপরাধ করা হয়েছে সেই ভিকটিম একত্র হয়ে একটা সমঝোতার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীয়ত হয়। ভিকটিম রাজি হয় যে একটা ক্ষতিপূরণ দেয়া হলে তিনি সমঝোতা করবেন। আসামী বা দোষী ব্যক্তি তার দোষ স্বীকার করে ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন। এ দোষ এ ক্ষতিপূরণ যে শুধু টাকার অংকেই নির্ধারিত হয়, তা নয়। এটা দুঃখ প্রকাশ থেকে শুরু করে কমিউনিটির জন্য দৈহিক শ্রম দেয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ রিস্টোরেটিভ বিচার ব্যবস্থায় অপরাধী ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের যে ক্ষতি করেছে তা কোন না কোনভাবে পূরণ করে দেয়ার চেষ্টা করবেন। এ ক্ষতিপূরণ চেষ্টা ভিকটিমকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া থেকে শুরু করে শহরের রাস্তায় ঝাড়ু দেয়ার মতো কাজও হতে পারে।

মজার ব্যাপার হল, এ বিচার ব্যবস্থায় অধিকাংশ বিচার সম্পন্ন হয় কমিউনিটি বা সমাজের ভিতর। কিছু কিছু বিষয় আদালতে যায়। কিন্তু সেখানেও আদালত অপরাধীকে অনুৎপাদানশীল প্রকারের শাস্তির পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ প্রদান বা কমিউনিট সার্ভিসের মতো শাস্তি দিয়ে থাকে।

মাঠ পর্যায়ে পুনর্ভরণমূলক বিচার ব্যবস্থার সরকারি পক্ষে মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা পালন করে পুলিশ অফিসারগণ। তার ভিকটিম ও দোষিপক্ষকে একত্র করে সমাজের কর্তাব্যক্তিদের সাথে বসার ব্যবস্থা করে। বিচারটি মূলত করে থাকে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণই । এজন্য প্রত্যেক এলাকায় একটি করে কমিটিও গঠন করা হয়।

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় পুনর্ভরণমূলক উপাদান নেই। এখানে ব্যক্তি গৌণ; মূখ্য হল রাষ্ট্র। কিন্তু রাষ্ট্র কর্তৃক কৃত বিচার ব্যবস্থা এখনও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এখানে ব্যক্তির ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার কোন ব্যবস্থা তো নেই, অধিকন্তু বিচারের প্রক্রিয়া এতাটাই জটিল, ব্যয়বহুল, ও সময় সাপেক্ষ যে অপরাধীদের বিচারে শাস্তি পাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমী ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় সামাজিক বিচার ব্যবস্থার দিকে চলার একটা প্রবণতা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের সংসদ কর্তৃক পাশ করা কিছু আইনে ইতোমধ্যেই অপরাধীর উপর আরোপ করা জরিমানার টাকা ভিকটিম বা তার পরিবার/ওয়ারিশদের দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। যেমন, এসিড অপরাধ দমন আইন-২০০২ এর ৯ ও ১০ ধারার বিধানমতে এসিড সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে অপরাধীকে করা জরিমানার টাকা আদায় করত ভিকটিম বা তার ওয়ারিসদের প্রদানের বিধান করা হয়েছে। একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০( সংশোধনী/২০০৩) এর ১৫ ও ১৬ ধারায় নির্যাতিতা নারীকে আসামীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। বলাবাহুল্য, আমাদের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার নীতি থেকে এসব বিশেষ আইনের বিধান অনেকটাই আলাদা।

সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে গঠিত গ্রাম আদালত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপর প্রচার, কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার প্রচলন– ইত্যাদি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আমাদের পুনর্ভরণমূলক বিচার ব্যবস্থা দিকে ক্রমশ যাত্রার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আর পুনর্ভরণমূলক বিচার ব্যবস্থা মূলত সামাজিক বিচার ব্যবস্থাই। আমাদের প্রচলিত সামাজিক বিচার ব্যবস্থার অনেক কিছুই আছে যেটা হয়তো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ বিচার ব্যবস্থার সিংহভাগ এখনও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক, মানবিক ও অনেক ক্ষেত্রে অকৃত্রিম ও প্রাকৃতিক। তাই এ অকৃত্রিম ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা নয়, একে রক্ষা করে আধুনিক ব্যবস্থার উপযোগী করে গ্রহণ করতে হবে। যে পাশ্চাত্য আমাদের প্রতিশোধ ও প্রতিরোধমূলক বিচার ব্যবস্থার পাঠ দিয়েছিল, সেই পাশ্চাত্যই আজ পুনর্ভরণমূলক সামাজিক বিচার ব্যবস্থার দিকে দ্রুত ঝুঁকছে। তাই, আমাদের প্রচলিত সামাজিক বিচার ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করে স্বকীয়তাশূন্য পাশ্চাত্যমূখীনতা নিতান্তই নিরর্থক।