ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

একজন ব্লগার যখন তার লেখনিতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলেন, তখন তার অভিজ্ঞতাকে নিরর্থক বা অসত্য বলে মনে করা অন্য ব্লগারদের জন্য কষ্টকরই বটে। কারণ যদি আমি আমার সহব্লগারকে অবিশ্বাস করি, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনিও আমাকে অবিশ্বাস করবেন। আর আমাকে কেউ অবিশ্বাস করুক, এটা কল্পনা করা আমার জন্য আরো বেশি কষ্টকর।

ব্লগার হিসেবে আমি ব্লগার লীনা জাম্বিলের পূর্ণ পরিচয় জানি না। তার পেশাটা জানলেও তার সম্পর্কে আরো কিছু ধারণা করতে পারতাম। তবে এটা পূর্ণভাবে জানতে পেরেছি যে তিনি একজন নারী এবং নারীগণ শুধু বাংলাদেশেই নন, সারা বিশ্বেই অবহেলিত, নির্যাতিত, নিগৃহীত ও বঞ্চিত। যে কোন সরকারি বা বেসরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীগণ পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি যন্ত্রণার শিকার হন। যে সব আচরণ পুরুষদের ক্ষেত্রে করা হয় না, নারীদের ক্ষেত্রে সে সব আচরণ অবলিলায় করা যায়। কারণ ধরেই নেয়া হয় যে নারীগণ অবলা।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানির শিকার হওয়া এখন একটা নির্মম বাস্তবতা। এ হয়রানি যেমন আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক হয়রানি, তেমনি এটা হল যৌন হয়রানি। আর দশটা সেবাদানকারী অফিসের মতো কোন নারী বাংলাদেশ পুলিশের থানায় গিয়ে যে হয়রানির শিকার হতে পারেন, তা অনুমান করার দরকার নেই, এটা প্রামাণ্য।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আমি বেশ কয়েকটি সেল দেখভাল করি। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল সেগুলোর অন্যতম। কয়দিন আগে নারী ও শিশু নির্যাতন সেলে একটি দরখাস্ত পেয়ে জানলাম যে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানা এলাকায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারী এক ডাক্তাদের চেম্বারে গেলেন চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার এ নারীকে একলা পেয়ে চেতনানাশক ইনজেকশান দিয়ে অজ্ঞান করে তাকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে নারীটি আত্মহত্যা করেন। পুলিশ সেই ডাক্তারকে গ্রেফতার করেছে। ডাক্তার আদালতে তার জবানবন্দীতে এ অপরাধ স্বীকারও করেছেন।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে ছাত্রীগণ তাদের পিতৃতুল্য শিক্ষকদের তারা হয়রানি, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। স্কুলের শিক্ষকদের কেউ কেউ নাবালক ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়ানোর নামে ধর্ষণ করে তা ভিডিওতে ধারণ করে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন তাদের অনেককে ধর্ষণ করেই যাচ্ছেন। এমন ঘটনা অহরহই পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।

বিশ্বের চলতি ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখব, অধ্যাপক, সংগীতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, সমাজপতি, রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, মন্ত্রী এমন কোন অবস্থানের ব্যক্তি নেই যাদের বিরুদ্ধে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠেনি। আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিন্টন মনিকা লিউনিস্কি নামে তার এক অফিস সহকারীর সাথে কি করেছিলেন, সেটা তো বিশ্ব ইতিহাসের অংশ। অতএব অফিস, তা ক্লিনটনের প্রশাসনের হোয়াইট হাউজ হোক, আর বাংলাদেশের থানা পুলিশের অফিস হোক, কোন স্থানেই নারীদের যৌন হয়রানি না হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ দিক দিয়ে ব্লগার লীনা জাম্বিল থানায় গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য।

বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো পুলিশের কিছু ত্রুটি রয়েছে। আর দশটা সরকারি অফিসের চেয়ে পুলিশের প্রতি মানুষের অভিযোগ নানা কারণে একটু বেশি। পুলিশ ঘুসখোর, দুর্নীতিবাজ, সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে, নাগরিকদের প্রাপ্য সম্মান দেয় না, ক্ষমতার বড়াই করে, মানুষকে হেস্তনেস্ত ও অপমানিত করে ইত্যাদিকার হাজারো অপবাদ পুলিশের প্রতি সহজেই আরোপ করা যায়। থানার ক্যাম্পাস সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধুভাবাপন্ন নয় কিংবা পুলিশ জনগণের বন্ধু নয় — এসব অভিযোগ প্রতি নিয়তই আমরা শুনছি, পত্রিকায় পড়ছি, নিজেরাও উপলব্ধি করছি।

কিন্তু বাংলাদেশের থানার অফিসারদের নানাবিধ দোষত্রুটি থাকলেও তারা যে নারীদের যৌন হয়রানি করার জন্য উৎসুক হয়ে থাকে, ‘তাদের তাকানোর ভঙ্গিটাই যেন ভয়ংকর, ঠিন যেন পিপাসিত, ক্ষুধিত হিংস্র জানোয়ারের মতোই’ এমন তথ্য এখন পর্যন্ত কোন মাধ্যম থেকে পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের থানাগুলো প্রকৃতপক্ষেই গণ স্থান। রাত নেই, দিন নেই, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের সকল থানা মানুষে সরগম থাকে। কেউ হয়তো মামলা করতে যান, কেউ জিডি করতে যান, কেউ বা আবার তার পারিবারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ কামনা করেও পুলিশের স্মরণাপন্ন হন। থানায় অফিসার-ইন-চার্জ ও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ছাড়া অন্য কোন অফিসারের নিজস্ব অফিস কক্ষ নেই। থানার এসআইদের বসার জন্য আছে কমন রুম। এক রুমে তারা গাদাগাদি করে বসেন। যদি রাজধানী ঢাকার কথা বলি, তাহলে দেখব এ মেট্রোপলিটনের ৫৩ থানার অধিকাংশই ভাড়ার বাসায় অবস্থিত। এসব বাসা নিরিবিলি বা জনবিচ্ছিন্ন স্থানে নয়। এগুলো অন্যান্য আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনের সাথেই লাগা কিংবা এদের অংশমাত্র।

থানা কম্পাউন্ডের এহেন পরিবেশে থানার কোন অফিসার কর্তৃক কোন মহিলাকে থানার কোন রুমে বসিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা বলা কিংবা কোন জিডি প্রার্থী মহিলার ‘পায়ের আঙ্গুলে নিজের আঙ্গুল লাগাবার চেষ্টা’ করাটা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। তারপরও যদি এমনটি ঘটে থাকে, তাহলে বলতে হবে সেই পুলিশ অফিসারের বুকের পাটাটা একটু বেশি চওড়া কিংবা সে অনেকটাই অপ্রকৃতিস্থ।

আমার সহব্লগার জিডি করতে থানায় গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ অফিসারের যৌন হয়রানিমূলক আচরণে বিরক্ত হয়ে আর জিডি করেননি। কোন রকমে ফিরে এসেছেন। আমার জানতে ইচ্ছে করছে, তিনি কি আদৌ জিডি করতে গিয়েছিলেন, না থানার অফিসারদের চরিত্র পরিমাপ করতে গিয়েছিলেন? যদি জিডি করাটা গুরুত্বপূর্ণ হত তাহলে তিনি সেটা যে কোন উপায়েই করতেন। কিন্তু পুলিশের উপর রাগ করে যখন জিডিই করলেন না, তখন আমার মনে হয়, তার জিডি করাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

আরও একটা বিষয় জানতে ইচ্ছে করছে। আমার সহব্লগার তার এ হয়রানির কথা কি ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের জানিয়ে এর প্রতিকারের কোন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, না তিনি এ ব্লগকেই তার অবদমিত বিতৃঞ্চা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন? যিনি ব্লগে লিখার মতো মানসিকতা রাখেন, একজন পুলিশ অফিসারের এহেন অপেশাদার আচরণ ও ও লাম্পট্যের প্রতিকার চাওয়ার মানসিকতা না থাকাটা বেশ বেখাপ্পাই ঠেকছে।

আমি ইতোপূর্বেই বলেছি, পুলিশ অফিসারগণ অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের মতোই ঘুষ, দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারের দোষে দুষ্ট। দেড় লাখ পুলিশ সদস্যের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছু কিছু কুলাঙ্গার রয়েছে। কিন্তু একটি থানায় কোন মহিলাকে ‘ঢোকতে দেখেই কয়েকজন কর্তব্যরত পুলিশ ঠিক তার সামনে পিছনে হাজির হয়ে খুব উৎসুক দৃষ্টি’ দিয়ে তাকে অতিষ্ঠ করে তুলবে এমন ঘটনা কদাচিৎ ঘটতে পারে।

আমার সহব্লগার লীনা জাম্বিলের কাছে অনুরোধ, আপনার প্রতি যে হয়রানিমূলক আচরণ করা হয়েছে তার প্রতিকার চেয়ে শিঘ্রই সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের বরাবর আবেদন করুন। আপনার আবেদন ই-মেইলেও পাঠানো যেতে পারে। আপনি চাইলে একটি মাত্র ক্লিকে দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার-ইন-চার্জের কাছেও সেই দুষ্ট পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারেন। আর যদি মনে করেন, সেই পায়ে আঙ্গুল ছোঁয়ানোর প্রচেষ্টাকারী পুলিশ অফিসাররের মতো বাংলাদেশের তামাম পুলিশ অফিসারই যৌন হয়রানি-প্রবণ তাহলে আমার কিছু বলার নেই।