ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

Kobutor

যোগাযোগ, গোয়েন্দাকর্ম, বস্তু ও ব্যক্তি শনাক্তকরণ ইত্যাদি কাজে পশুপাখিদের ব্যবহার অতি প্রাচীন। এ সম্পর্কে নানা ধরনের রূপকথা, উপকথা ও ঐতিহাসিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। পশু-পাখিদের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে কবুতর। এ সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাচীন রূপকথাটি হযরত নূহ (আ:) এর সময়কালে। লিখিত তথ্যে পাওয়া যায়, পৃথিবীতে যখন প্রবল বন্যা শুরু হয়, তখন হযরত নুহ (আ:) একটি নৌকায় করে তার অনুসারীদের নিয়ে একটি পর্বতে আশ্রয় নেন। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেলে স্থলে বা সমতলে বন্যার পানি নেমে গেছে কিনা তা জানার প্রয়োজন পড়ে। তখন সমতলে একটি কবুতর প্রেরণ করা হয়। কিছু দিন সমতলে উড়ে উড়ে পর্যবেক্ষণ করে কবুতরটি আবার নুহের কাছে ফিরে আসে। তবে বন্যার পানি যে সরে গেছে এবং সমতলে ফেরা নিরাপদ তা বোঝানোর জন্য সংবাদবাহক কবুতর তার ঠোঁটে করে একটি জলপাই ডাল নিয়ে আসে।

একাদশ শতকে বাগদাদে কবুতরকে খবর আদান প্রদানের মাধ্য হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। মঙ্গোলিয়ান বীর বিজেতা চেংগিস খাঁ তার বিশাল রাজ্যের খবর আদান প্রদানের জন্য কবুতর ব্যবহার করতেন। প্রত্যেক নতুন দেশ বিজিত হওয়ার সাথে সাথেই একটি করে কবুতর মঙ্গোলিয়ায় বিজয়ের খবর নিয়ে আসত।

কবুতরকে সংবাদ বাহক বাহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার করা হয় যুদ্ধকালীন সময়ে। ১৮৭০-৭১ সালে প্রাসিয়ার যুদ্ধে প্যারিসের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যাপকভাবে কবুতর ব্যবহার করা হত। এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কবুতরের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। সাধারণত যে সব স্থানে মানুষ কর্তৃক সংবাদ পরিবহন সম্ভব হয় না, প্রচ- গোলাগুলি, পথের দুর্গমতা ও সময়ের স্বল্পতার জন্য যেসব স্থানে মানুষ প্রেরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেসব ক্ষেত্রে কবুতর দিয়ে সংবাদ আদান প্রদান করা হত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি গোটা আমেরিকান ব্যাটালিয়ান মিত্রবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। জার্মান বাহিনী তাদের প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিল। ‘চার আমি’ নামের একটি সংবাদবাহক কবুতের দ্বারা মিত্র বাহিনী এই ব্যাটালিয়ানের সন্ধান পাওয়া যায়। এ কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘চার আমি’ এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করে যে সেই কবুতর এখন রূপকথার নায়কে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের সময় সংবাদ আদান প্রদানের বীরত্বপূর্ণকাজের জন্য সৈন্যদের পাশাপাশি তাই কবুতরদেরও সম্মানসূচক ব্যাজ বা উপাধীও দেয়া হত।

যুদ্ধক্ষেত্রে কবুতের ব্যবহার এত বেশি হয়েছিল যে ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ-ভারত সরকার এক পুসিত্মকায় প্রকাশ করেছিলেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর পক্ষে শুধু কবুতর পরিচালনার জন্য প্রায় ৯০ হাজার লোক নিয়োজিত থাকত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও কবুতর পরিচালনাকারীর সংখ্যাও ছিল অনুরূপ।

পুলিশের কাজে কবুতরের ব্যবহার করার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্য পুলিশের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উড়িষ্যা পুলিশ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে কিছু কবুতর ও প্রশিক্ষক সংগ্রহ করে। ১৯৪৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে পাবর্ত্য জেলা কোরাপুতে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কবুতর সার্ভিস চালু করা হয়। এই পরীক্ষা সফল হলে উড়িষ্যার ১২ টি জেলাতেই তা চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্থ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বেতার ব্যবস্থার অনুপস্থিতির জন্য উড়িষ্যা পুলিশের অধঃস্তন অফিস, থানা, ফাঁড়ি, সার্কেল ইত্যাদির সাথে কবুতর যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়। ধীরে ধীরে ওয়ার্লেস যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও উড়িষ্যা পুলিশ কবুতর যোগাযোগ ব্যবস্থা তখনও চালু থাকে।

১৯৫৫, ১৯৬০ও ১৯৯৯ সালের প্রলংকারী বন্যা ও ঘুর্ণিঝড়ের সময় কবুতর সার্ভিস আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দারুণভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। চার দশকের ব্যবধানে ১৯৯৯ সালে, যখন যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম বিকাশ ঘটে তখনও ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের কবুতর সার্ভিসে প্রায় ১২০০ সংবাদবাহী কবুতর কর্মক্ষম ছিল। সারা রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৮ কবুতর সার্ভিসের কেন্দ্র ছিল এবং প্রতি বছর কবুতরের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ সংবাদ আদান-প্রদান করা হত। তবে বর্তমানে মাত্র ১৫০টি কবুতর ও দুইটি কতুতর কেন্দ্র চালু রয়েছে। এগুলো মূলত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্যই টিকে আছে। এগুলো রাজ্য পুলিশের সদর দফতর ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

কবুতর সার্ভিসে সাধারণত তিন ধরনের সংবাদ কার্যাক্রম চালু ছিল। এদের একটি হল স্থির (Static) একটি চলমান (Mobile) এবং তৃতীয়টি হল প্রত্যাবর্তন (Boomerang) । স্থির মাধ্যমের ক্ষেত্রে একটি কবুতর এক স্থান থেকে অন্যস্থানে একবারই মাত্র সংবাদ বহন করে। অন্যদিকে চলমান ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পুলিশদল কবুতর সাথে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে। যেমন কোন স্থানে অভিযান গেলে একটি খাঁচার মধ্যে কিছু সংবাদ বাহক কবুতর সাথে নিয়ে যাওয়া হয়। কোন খবর অন্য কোন কেন্দ্রে পাঠাতে হলে একটি লিখিত খবর কবুতরের পায়ে বিশেষ উপায়ে বেঁধে দিয়ে কবুতর উড়ে দেয়া হয়। কবুতর নির্দিষ্ট স্থানে গেলে সেই স্থানের কবুতর পরিচালক উক্ত কবুতরের পা থেকে তা সংগ্রহ করে। প্রত্যাবর্তন বা Boomerang কৌশলে একই কবুতর এক স্থান থেকে সংবাদ নিয়ে কোন দূরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে পুনরায় পূর্বের স্থানে ফিরে আসে।

পৃথিবীতে কবুতরের সহস্র প্রকার জাত রয়েছে। সকল প্রকারের কবুতর পুলিশি কাজে ব্যবহারের উপযোগী নয়। সাধারণত হোমার জাতীয় কবুতর তথ্য আদান প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব কবুতরের ডানা মাংসল ও শক্ত। এরা ঘন্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে এবং তার বাসস্থল থেকে ১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ফেরত আসতে পারে।

কবুতরকে তথ্য আদান প্রদানে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কবুতরের বাচ্চার বয়স ৪২ দিন হলেই তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়। প্রথমে কবুতর পরিচালনাকারীর সাথে বাচ্চা কবুতরের একটা ভালবাসা সম্পর্ক তৈরি করা হয়।

প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় পর্যায়ে এদের বিশেষভাবে তৈরি বাসস্থান থেকে নির্দিষ্ট সময়ে বের করে আকাশে উড়ানো হয়। আকাশে উড়তে উড়তে তারা এক সময় মাটিতে নেমে আসে এবং তাদের বাসস্থান বা নিজ নিজ খোপে প্রবেশ করে। বারংবার উড়ানোর পর যেসব কবুতর তাদের নিজ নিজ খোপ দক্ষতার সাথে চিনে নিতে পারবে সেসব কবুতরকে তৃতীয় স্তরের প্রশিক্ষণের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

তৃতীয় স্তরে কবুতরগুলোকে তাদের বাসস্থান বা খোপ থেকে বের করে প্রথমে এক কিঃ মিঃ দূরে, পরে দুই কিঃ মিঃ এবং ক্রমান্বয়ে ১০০/২০০ কিঃ মিঃ দূরে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রতিবারই কবুতরগুলো নির্ভুলভাবে তাদের গন্তব্যে বা খোপে নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। এভাবে বারংবার ক্রমাগত দূরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিলেও যখন প্রশিক্ষণার্থী কবুতল নির্ভুলভাবে নিজ খোপে ফিরে আসার দক্ষতা অর্জন করে তখন তাদের দূরপাল্লার তথ্য পরিবহনের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হয়।

বাস্তব ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর জন্য, বিশেষ করে দূর পাল্লার গন্তব্য প্রেরণের জন্য, কবুতরগুলোর পায়ে বিশেষভাবে তৈরি প্লাস্টিকের কৌটায় সংক্ষিপ্ত আকারে পত্র লিখে কাগজ ভাজ করে পুরে দেয়া হয়।

সাধারণত সফলভাবে তথ্য আদান প্রদানের জন্য একই তথ্য দুইটি কৌটায় পুরে দুইটি কবুতরের পায়ে বেঁধে দেয়া হয়। এই কবুতর দুটো একটি যুগোল হয়ে থাকে-অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী কবুতর যারা বাচ্চা উৎপাদনের জন্য জোড়া তৈরি করে এমন যুগোলকে একই সাথে একই তথ্যসহ গন্তব্যে প্রেরণ করা হয়। যুগোল কবুতর প্রেরণের উদ্দেশ্যে হলে এতে বিপরীত লিঙ্গের অপরিচিত কবুতর সংবাদ বাহককে প্রলব্ধ করতে পারবে না; একটি কবুতর পথ ভুল করলে অন্য কবুতর পথ চিনিয়ে দিতে পারবে; পথে কোন বাধা এলে যৌথভাবে তা অতিক্রম করতে পারবে এবং কোন কারণে একটি কবুতর নিরুদ্দেশ হলেও অন্যটি সংবাদ পরিবহনের কাজটি শেষ করতে পারবে।

প্রত্যাবর্তন বা Boomerang পদ্ধতিতে একজোড়া কবুতরকে কোন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেয়া হলে তারা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে। গন্তব্য সাধারণত বিশেষভাবে তৈরি খোপ হয়ে থাকে। যেমন উড়িষ্যার ক্ষেত্রে কোন থানা থেকে কোন কবুতর জেলা সদরে সংবাদ নিয়ে এলে তারা জেলা সদরে স্থাপিত খোপে এসে প্রবেশ করে। খোপের দুইটি কুঠরি থাকে। উপরের কুঠরিতে প্রবেশ করার পর তারা দ্রুত নিচের কুঠরিতে প্রবেশ করে। নিচের কুঠরিতে পর্যাপ্ত খাবার দেয়া থাকে। তিন/চার ঘন্টা ক্রমাগত উড়তে থাকা সংবাদ বাহক কবুতর প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হয়। এরা গন্তব্যের খোপে এসেই খাবার খেতে শুরু করে। এরই ফাঁকে কবুতর পরিচালনাকারী পুলিশ কনস্টবল কবুতরের পায়ে বাঁধা কৌটা থেকে খবর সংগ্রহ করে। প্রয়োজনে নতুন খবর সম্বলিত কৌটা পুনরায় কবুতরের পায়ে বেঁধে দেয়। এর পর তাদের পানি খেতে না দিয়েই আকাশে উড়িয়ে দেয়া হয়।

তৃষ্ণার্ত কবুতর তখন প্রচণ্ড গতিতে পূর্বের গন্তব্যে ফিরে যায়। কয়েক ঘন্টা আকাশে থেকে তারা ক্লান্ত ও তৃঞ্চার্ত হয়ে নিজ খোপে ফিরে আসে। এখানে তাদের পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত পানি খেতে দেয়া হয়।

এখন পর্যন্ত ভারতের উড়িষ্যা রাজ্য পুলিশেই কবুতরকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। তবে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে কবুতরকে সংবাদ বাহক হিসেবে ব্যবহার দ্রুত অলাভজনক ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। তথাপিও উড়িষ্যা পুলিশে আজো ঐতিহ্য হিসেবে কবুতল সার্ভিস টিকে আছে। (১৮/১০/২০১৪)
সূত্রাবলীঃ
১. Encyclopaedia of Crime, Police and Judicial System Vol-1 By Giriraj Shah IPS, FRGS Anmol Publications PVT.LTD, New Delhi(1999)
২. http://www.odishapolice.gov.in/?q=node/169#PIGEON_SERVICE as on 21 October, 2014 at 17:20 hours
৩. http://www.historyworld.net/wrldhis/plaintexthistories.asp?historyid=aa93,as on 21 October, 2014 at 17:20 hours