ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

অনেক বছর থেকে ভাবছি পরিবার নিয়ে একবার বিদেশে যাব। আমার বাচ্চারা বিমান ভ্রমণের জন্য অনেকবার বায়না ধরেছে। অভ্যন্তরীণ রুটে অনেকবার ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজার বিমানে ভ্রমণ করেছি। মাঝে মাঝে ভাবি, বাচ্চাদের একবার অভ্যন্তরীণ রুটেই বিমান ভ্রমণ করাই। কিন্তু সেটা নানা কারণে হয়ে ওঠেনি।

ঢাকা-কক্সবাজার রুটে একমুখী বিমান ভাড়া সর্বনিম্ন ৫,৫০০/- টাকা। পরিবার সাথে নিলে প্রায় ২০,০০০/-টাকার মামলা হয়ে দাঁড়াবে। এ মুহূর্তে এটা বিলাসিতাই বটে। তবে পরিবার নিয়ে বিদেশে একটা টুর দেয়ার ইচ্ছাটা কখনই অবদমিত হয়নি।

আজ শেষ রাতে (২২/১০/১৪) স্বপ্ন দেখছি। হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে উঠেছি। বাচ্চারা মহা খুশি। আমরা বিমানের বিসনেস ক্লাস থেকে ধীরে ধীরে ইকোনমি ক্লাসের দিকে গিয়ে জানালার পাশে বসে পড়লাম। বিমানটি রানওয়েতে চলতে শুরু করল। চলতে চলতে এটা এক সময় রানওয়ের মাথায় চলে গেল। কিন্তু রানওয়ের মাথায় আবার অনেক দোকানপাট বসেছে। বেশ বেখাপ্পা চলাচল।

একবার আমি অনুভব করলাম, আমি আর বিমানের ভিতর নেই। হ্যাঁ, তাইতো। দেখি বউবাচ্চাদের নিয়ে রানওয়ের বাইরে এসেছি। বুঝতে পারলাম, একটা কিছু হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, আমাদের আসলে কৌশলে বিমানের জানালা দিয়ে শুধু বিমান থেকেই নয়, রানওয়ের বাইরেও বের করে দেয়া হয়েছে। একটি প্রতারক গ্রুপ সকল প্রকার আনুষ্ঠানিকতার পরে বৈধযাত্রীদের এভাবে বিমান থেকে কৌশলে নামিয়ে দিয়ে অবৈধযাত্রীদের বিমানভ্রমণ ও দেশত্যাগের সুযোগ করে দেয়। আমরাও সেই প্রতারকদের শিকারে পরিণত হয়েছি। কি আর করা! ঘুম ভেঙ্গে স্বপ্নের সমাপ্তী হল।

ছোটকালে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে বেশ কৌতূহলী ছিলাম। ‘সোলেমানি খাব নামা’ নিয়ে অনেক স্বপ্নের ব্যাখ্যাও মুখস্ত করে খেলার সাথী ও সহপাঠিদের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করে অবাক করে দিতাম। পড়তাম, স্বপ্ন অনেক কিছুরই পথ প্রদর্শক। অনেকে বলেন নবী রাসুলদের নবুওত স্বপ্নের মাধ্যমেই প্রাপ্ত। হযরত ইব্রাহিম (আ) তার ছেলে ইসমাইলকে কোরবানি দেয়ার নির্দেশ পেয়েছিলেন স্বপ্নের মাধ্যমেই। কেউ কেউ বলেন, মহানবী (সা) এর মিরাজের ঘটনাবলী স্বপ্নেই সংঘটিত হয়েছি। পবিত্র কুরআনের সুরা ইউসুফের গোটাটাই তৎকালীন বাদশা ও তার স্বপ্ন ব্যাখ্যার বিবরণ।

কিন্তু আরো পরে আরো কিছু জেনেছি। স্বপ্ন সম্পর্কে মনোসমীক্ষণ পদ্ধতির প্রবক্তা প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েডের স্বপ্নের ব্যাখ্যাও পড়েছি। স্বপ্ন হল, আসলে মানুষের বাস্তব জীবনেরই চিন্তা-ভাবনা, চাওয়া-পাওয়া ও আশা-আকাঙ্খারই নিদ্রিত বা অবদমিত রূপ। বাস্তব জীবনে মানুষ যা চিন্তা করে, যা ভাবে, যা পেতে চায়, যা পরিকল্পনা করে ঘুমের মধ্যে তাই স্বপ্নাকারে প্রকাশিত হয়। অনেক স্বপ্ন আছে যে সম্পর্কে আমরা বাস্তব জীবনে হয়তো ভাবি না। কিন্তু ফ্রয়োড বলেন, মানুষের ত্রিস্তর সম্পন্ন মনের চেতন অংশে আমরা যা ভাবি তার চেয়েও অনেক বেশি ভাবি বা কল্পনা করি আমাদের অবচেতন মনে। এর বাইরেও আছে একটি অচেতন মন। এই মনের গভীরতা, বিস্তৃতি ও ধারণক্ষমতা অসীম।

চেতন মনে যা আমরা ভাবিনা কিংবা লুকিয়ে রাখি অবচেন ও অচেতন মনে তা যে ভাবি না তা বলা যায় না। বরং চেতন মনের যাবতীয় চিন্তাভাবনার পশ্চাৎভূমি এ অচেতন মনে আমরা এমন এমন সব বিষয় নিয়ে ভাবি বাস্তব জীবনে তা অত্যন্ত ভয়ংকররূপে দেখা দিতে পারে।

আমাদের বাস্তব জীবনের অসামাজিক, অনৈতিক ও অসম্ভব চিন্তাভাবানা ও চাওয়াগুলো ক্রমান্বয়ে অবচেতন মন হয়ে অচেতন মনে জমা হতে থাকে। স্বপ্নের মাধ্যমে আমরা যে সব অসম্ভব, অসামাকিজ, কুৎসিত বা কদর্য বিষয়গুলো দেখে থাকি তা মূলত অবদমনেরই অংশ।

ফ্রয়োডের স্বপ্ন ব্যাখ্যার পাঠ নেবার পর স্বপ্ন নিয়ে সেই স্বর্গীয় অনুভূতি আর নেই। এখন মনে করি, প্রাচীন পুস্তকাদিতে স্বপ্নকে যতই মহান করে দেখানো হোক না কেন স্বপ্ন আসলে অতিভৌতিক কিছু নয়। স্বপ্ন আমাদের বাস্তব জীবনেরই নিদ্রিত প্রতিফলন।

তবে স্বপ্ন মঙ্গলের কথা গৌড়ানন্দ কবিরাও অনেক আঙ্গিকে ভনেছেন। রবীন্দ্রনাথের হিং টিং ছটের হবুচ্চন্দ্র রাজার স্বপ্ন নিয়ে যা হয়েছিল তা অতি মজাদার। স্বপ্নের ব্যাখ্যা আসলে ‘যবন পণ্ডিতের গুরু মারা চেলা’ ছাড়া কেউ দিতে পারে না।

এ পৃথিবীতে স্বপ্নই সত্যি আর কিছুই সত্য নয়। স্বপ্ন আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি স্বপ্ন আছে বলেই আমরা প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে বেঁচে থাকি ও বেঁচে থাকতে চাই। তাই আরো স্বপ্ন দেখতে চাই, আরো প্রতারিত হতে চাই, বঞ্চিত হতে চাই, প্রতারণা-বঞ্চনার পরে আবার সফল হতেও চাই। তাই পাঠক, ভক্ত আর স্বজনদেরও বলি,

এসো ভাই , তোলো হাই , শুয়ে পড়ো চিত ,
অনিশ্চিত এ সংসারে এ কথা নিশ্চিত —
জগতে সকলি মিথ্যা সব মায়াময় ,
স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয় ।

হ্যাঁ, স্বপ্ন বই অন্য কিছু যদি সত্য হত, বঞ্চিত, প্রতারিত আর আসহায় মানুষ বাঁচতে পারত না। স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, স্বপ্নই মানুষকে বাস্তবতার দিকে ধাবিত করে। স্বপ্নই মানুষকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে, এক সত্তা থেকে অন্য সত্তায় উতীর্ণ করে। আমার এই ২০০তম পোস্টের মাধ্যমে জয় হোক স্বপ্নের।