ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ইংরেজি Hyperbole শব্দটির বাংলা পরিভাষা হল ‘অতিকথন’। অতিকথন সাহিত্যের একটি অলংকার। যারা সাহিত্য চর্চা করেন কিংবা কবিতা লেখার কৌশল রপ্ত করতে চান, তারা বাক্যের অলংকার নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। যে শাস্ত্রে কবিতা বা সাহিত্য লেখার কলা শেখান হয়, তাকে বলে Prosody বা কাব্যবিদ্যা। অতিকথন কাব্যবিদ্যার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়।

‘অতিকথন’ হল এমন একটি বাক্যালংকার যেখানে কোন বিষয়কে বাস্তবের চেয়ে বড় করে দেখানো হয়। এটা যেমন সংখ্যা উল্লেখ করে প্রকাশ করা হয়, তেমনি সংখ্যায় প্রকাশ না করেও কোন বিষয়কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করার মাধ্যমেও হতে পারে। যেমন, যখন আমরা বলি ‘ধন্যবাদ’ তখনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু যখন বলা হয়, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ’ তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে আরো বড় করে তোলা হয়। তবে ‘ধন্যবাদ’ আর ‘অসংখ্য’ বা ‘অনেক অনেক ধন্যবাদের’ মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু ‘ধন্যবাদ’ আর ‘অসংখ্য ধনবাদের’ মধ্যে বাক্যালংকারগত পার্থক্য রয়েছে।

ইংরেজ নাট্যকার শেইক্সপিয়র থেকে শুরু করে আমাদের দেশের পুঁথিকারগণ পর্যন্ত অতিকথনে উল্লেখযোগ্য পারদর্শিত অর্জন করেছে। যেমন, শেইক্সপিয়রের ওথেলো যখন কথিত অসততার জন্য ডেসডিমোনাকে গলা টিপে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ওথেলো ভাবতে থাকে ডেসডিমোনা তাকে বঞ্চিত করে অন্যজনের সাথে যে প্রেমলীলা চালিয়েছে তার শাস্তি কি শুধুই তাকে গলাটিপে হত্যার মধ্যে সীমিত রাখা যায়? যে প্রতিশোধের আগুন ওথেলোর অন্তরে জ্বলছে তা কি ডেসডিমোনার একটি মাত্র জীবননাশ করে নিভবে? যদি ডেসডিমোনার একটি নয়, দুইটি নয়, ৪০ হাজার জীবন থাকত! তাই তো ওথেলোর স্বগোক্তি-

O, that the slave had forty thousand lives!
One is too poor, too weak for my revenge.

আমাদের মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যিকগণ ‘জঙ্গনামা’ কিংবা ‘কাসাসুল আম্মিয়া’ লিখতে গিয়েও অথিকথনের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু পুঁথির ভাষাতেই তারা আবার অতিকথনের গোমর ফাঁসও করে দিয়েছেন। লাখ লাখ যোদ্ধাকে হত্যা করার পর গণনা করে দেখা গেল তার সংখ্যা সর্বমোট মাত্র ৪০ হাজার। যেমন,

লাখে লাখে কাটে মর্দ, বলে মার মার,
গুণিয়া সুমার করে চল্লিশ হাজার।

এভাবে সাহিত্যের অতিকথনের হাজার হাজার উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু আমি অতিকথন নিয়ে আর সাহিত্যকথন করব না। আমি এবার যাচ্ছি প্রচার মাধ্যম, বিশেষ করে বিডি নিউজ২৪ ব্লগে পুলিশ কথন নিয়ে।

পুলিশ সম্পর্কে যখন কেউ লিখেন, তখন লেখকদের কাব্যকলার অন্যকোন জ্ঞান থাকুক বা না থাকুক, তারা সবাই অতিকথনে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেন। এটা যেমন কলাম লেখকদের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি ব্লগারদের ক্ষেত্রে সত্য এবং সত্য তেমনি বঙ্গীয় পুলিশ গবেষকদের ক্ষেত্রেও। তারা সাধারণ পুলিশের মধ্যে ভাল বা মহৎ কিছু কখনও দেখতে পান না। ঘুস, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যহার, দায়িত্বে অবহেলা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর যত প্রকারের নেতিবাচক বিশেষণ আছে সবগুলোই পুলিশের উপর প্রয়োগ করতে চান।

যেমন দুর্নীতির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন যে সব সরকারি কর্মকর্তার দুর্নীতি অনুসন্ধান ও তদন্ত করে যে ৮০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন তাদের মধ্যে মাত্র ৬ জন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন যা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের চেয়ে মাত্র ১ জন বেশি। এ নিয়ে পত্রপত্রিকাগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত প্রশ্ন করা শুরু করে দিয়েছিলেন।

বিগত প্রলম্বিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানেও যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন, কিংবা যাদের দুর্নীতিবাজ বলে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, তাদের মধ্যেও পুলিশ অফিসারের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। এমনকি বাংলাদেশ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ এত বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন যে তারা সত্যিকার অর্থে টাকার বালিশে ঘুমাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তথাকথিত ট্রুথ কমিশনে গিয়ে যারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে চামড়া বাঁচিয়েছিলেন সেই ৪৫২ জন আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজের মধ্যে পুলিশ অফিসারগণ ছিলেন দৃশ্যমানভাবে অনুপস্থিত। এভাবে যখনই দুর্নীতি বা চুরি চামারির তালিকা তৈরি করা হয়, সেখানে পুলিশ অফিসারদের প্রথম সারিতে নয়, হয় শেষ সারিতে নয়তো অনুপস্থিত পাওয়া যায়। কিন্তু প্রচার মাধ্যমের কাছে সর্বাগ্রে থাকে পুলিশের নাম। সার্বিক বিচারে দুর্নীতির অভিযোগ যতটা না বাস্তব তার চেয়ে অনেক বেশি কাল্পনিক, পূর্ব সংস্কারজাত ও বলীর পাঁঠার বানানোর স্টাইলের।

তবুও আমাদের অতিকথনকারীগণ লিখতে বসলে পুলিশ নিয়েই চর্বন করেন এবং তারা প্রায় ক্ষেত্রেই ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবলের ১০ টাকার চাঁদাকে নির্মাণ তদারকের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীর ১০ কোটি টাকার পারসেন্টেজের সাথে গুলিয়ে ফেলেন।

পুলিশের দুর্নীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রায়শেই শোনা যায় পুলিশের ৯৮ ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীই দুর্নীতিবাজ। অনেকে অতিকথনের এমন পর্যায়ে চলে যান যে তাদের যুক্তি বা বিশ্বাসকে জোরালো করার জন্য বলেন, এটা ২০০% সত্য।

কিন্তু তারা তলিয়ে দেখেন না, পুলিশ বিভাগের শতকরা ৮০ জন সদস্যই হয় কনস্টেবল নয়তো অফিসারদের নিম্ন পদমর্যাদাভুক্ত। পুলিশের এএসআইগণ ছাড়া নিম্ন পদের অন্যান্য সদস্যরা সাধারণভাবে একক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকনে না। তাই একজন এসআই বা তার চেয়ে ঊর্ধ্বপদের অফিসারকে দুর্নীতিবাজ বা ঘুস ঘোর বলে অপবাদ দিলেও একজন গোবেচারা পুলিশ কনস্টেবলকে ঘুসখোর বলাটা নেহায়তই পূর্ব সংস্কার জাত। যদিও ধরি থানা-ফাঁড়ির পুলিশ অফিসারগণ মানুষের কাছ থেকে ক্ষমতা বা দায়িত্বের অপব্যবহার করে উৎকোচ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু প্রতিটি পুলিশ ইউনিট বিশেষ করে জেলার স্পেশাল রিজার্ভে যে ঐ জেলার মোট পুলিশ সদস্য সংখ্যার প্রায় ৮০ ভাগ মওজুদ থাকে তারা কিভাবে ঘুসের রাজ্যে প্রবেশ করবেন। তাদের তো পাবলিক ফাংশন নেই। তারা তো কর্তৃপক্ষের অনুমতি ভিন্ন পুলিশ লাইন্সের বাইরে রাত্রিযাপনও করতে পারেন না।

তাই পুলিশের দুর্নীতি সম্পর্কে এ সব ‘অতিকথন’ শুধু সাহিত্যের অলংকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; বাস্তবে নয়। তবে আমি এটা বলতে চাচ্ছি না, পুলিশের মধ্যে দুর্নীতি নেই কিংবা পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করে উৎকোচ গ্রহণের নজির নেই। সবই আছে। কিন্তু তা সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে তীব্রতা, গভীরতা ও বিস্তৃতিতে অধিক নয়; হয় সমান নয়েতো কম। যেখানে সমাজের কোন প্রতিষ্ঠানই দুর্নীতিমুক্ত নয়, সেখানে খামোখা পুলিশকে অতিকথনের অলংকার পরানো ইতিবাচক নয়, নেতিবাচক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্পহীন সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সমাজের মানুষের পূর্বসংস্কারমূলক বা পরিকল্পিত অতিকথন বন্ধ না হলে সংগঠন হিসেবে শুধু পুলিশই নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।(২২/১০/২০১৪)