ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলো নিয়ে যথেষ্ঠ বিতর্ক রয়েছে। আমজনতা থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রীগণ পর্যন্ত এ আইনে রুজুকৃত মামলাগুলোর অধিকাংশকেই মিথ্যা বলে মনে করেন। অনেকে প্রকাশ্য আসরেও এমন মন্তব্য পেশ করেছেন। পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন নিবন্ধ, সেমিনারে উত্থাপিত গবেষণাপত্র ইত্যাদিতে এ বিষয়ে পাল্টাপাল্টি যুক্তির অবতারণা হয়।

২০০০ সালে প্রণীত এ আইনের অধীন গঠিত একটি বিশেষ ট্রাইবুনালে এ সব মামলার বিচার সম্পন্ন হয়। তবে মামলা করার ক্ষেত্রে বাদীর জন্য যথারীতি থানা ও আদালত দুটি পথই খোলা আছে। কেউ চাইলে সরাসরি থানায় অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। কেউ কেউ আবার সরাসরি ট্রাইবুনালে গিয়ে মামলা করতে পারেন। থানায় মামলা হলে নিয়ম অনুসারে তার তদন্ত হবে। তদন্তে ঘটনা সঠিক প্রমাণিত হলে এবং আসামীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ঠ সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করতে হয়। অন্যথায় মামলায় দিতে হয় চূড়ান্ত প্রতিবেদন। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মানেই ঘটনা অসত্য নয়। অনেক অপরাধ রয়েছে যেখানে পুলিশ অপরাধকর্মটি সংঘটিত হয়েছে তার প্রমাণ পেলেও অপরাধটি কে করেছে তা উদ্ঘাটন করতে পারে না। এজন্যও মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। একে বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য।

কোন কোন মামলার ক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটেছে বটে, তবে তা ধর্তব্য অপরাধ নয়। অর্থাৎ নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইনে প্রদত্ত অপরাধগুলো নয়, এখানে হয়তো কোন নারীকে সামান্য আহত করা হয়েছে যা যৌতুকের জন্য, ধর্ষণ কিংবা শ্লীলতাহানীর জন্য নয়। এক্ষেত্রে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অধর্তব্য ক্যাটাগরিতে দাখিল করা হতে পারে। একই ভাবে ঘটনায় ভুলবোঝাবুঝি থাকতে পারে কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মধ্যে অপরাধটি না পড়ে দণ্ড বিধিতে পড়তে পারে। যেমন হতে পারে কোন নারীকে আহত করা হয়েছে বটে কিন্তু তা যৌতুক বা যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের জন্য নয়। এক্ষেত্রে মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আইনগতভুল হতে পারে।

চতুর্থ যে প্রকার ঘটনা হতে পারে তাহল আসলে নির্যাতনের মতো কোন ঘটনাই ঘটেনি। প্রতিপক্ষকে হয়রানী করার জন্য বাদী বা বাদিনী এ মামলা সাজিয়েছে। একে বলা হয চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিথ্যা। এই প্রকারের চূড়ান্ত প্রতিবেদনকেই আসলে মিথ্যা মামলা বলা হয়। মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১৭ ধারায় সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি ট্রাইবুনালে নালিশ করলে ট্রাইবুনাল বিচার করে মিথ্যা মামলার বাদীকে বা তাদের সহযোগী বা সহায়তাকারীদের সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দিতে পারেন। বলাবাহুল্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে রুজুকৃত মামলাগুলোর অধিকাংশেরই তদন্ত অভিযোগ প্রত্রের মাধ্যমে শেষ হয়। তাই এই আইনের মামলার সিংহভাব মিথ্যা তা বলার সুযোগ নেই।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোর একটা বড় অংশ ট্রাইবুনালে। থানা কিংবা আদালতে মামলা রুজুর স্বাধীনতা জনগণের অত্যন্ত মৌলিক অধিকার। আদালতের চেয়ে থানা মানুষের হাতের কাছে। থানায় মামলা রুজুর জন্য তেমন কোন ঝক্কিঝামেলা আদর্শিকভাবে নেই। এখানে কোন অর্থ লাগে না। উকিল-মোক্তার ধরার বালাই এখানে নেই। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত তথা ভিকটিম না হয়েও ঘটনা সম্পর্কে অবগত যে কেউ থানায় মামলা করতে পারে। এখানে কোন কোর্টফি লাগে না। সবচেয়ে বড় কথা হল, থানায় মামলা করতে বাদী বা সংবাদদাতাকে শপথ গ্রহণ করতে হয় না। কিন্তু আদালত বা ট্রাইবুনালে অভিযোগ করতে হলে আইনজীবীর মাধ্যমে শপথ নিয়ে তা করতে হয়। আদালত পুরোমাত্রায় আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু থানায় এত আনুষ্ঠানিকতা নেই। মামলা দায়ের বা অভিযোগ জানানোর সবচেয়ে সরল উপায় হচ্ছে থানায় অভিযোগ দেয়া।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও যখন মানুষ থানায় মামলা না করে সরাসরি আদালতে কিংবা নারী ও শিশু নির্যতনের ক্ষেত্রে ট্রাইবুনালে যায় তার পিছনে নিশ্চয়ই যুক্তিসংগত ও অনুমানযোগ্য কারণ রয়েছে। আমার জানা মতে নিম্নলিখিত কারণে থানার পরিবর্তে আদালতে গিয়ে মামলা করেঃ
১. থানা পুলিশের প্রতি সাধারণ অবিশ্বাস ও বিতৃঞ্চা,
২.থানায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা,
থানার অফিসারদের ভুক্তভোগীদের প্রতি দুর্ব্যবহার,
৩. থানা পুলিশ কর্তৃক অভিযোগকারীদের কাছ থেকে উৎকোচ দাবি,
৪. থানা পুলিশের প্রকৃত বা সম্ভাব্য পক্ষপাতিত্ব,
৫. প্রতিক্ষগণ প্রভাবশালী হওয়ায় থানা পুলিশ কর্তৃক বাদীর মামলা পরিকল্পিতভাবে রেকর্ড না করা,
৬. প্রতিপক্ষদের প্রতিরোধের ফলে বাদী বা ভুক্তভোগীর থানা পর্যন্ত পৌঁছিতে না পারা,
৭. টাউট-বাটপাড়গণ কর্তৃক বাদীকে ভুল বুঝিয়ে থানার পরিবর্তে আদালত বা ট্রাইবুনালে নিয়ে যাওয়া,
৮. ঘটনাটি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিথ্যা হওয়ায় থানা পুলিশ কর্তৃক মামলা রুজু করতে অস্বীকৃতি,
৯. ঘটনাটি মিথ্যা ও প্রতিপক্ষকে হয়রানিমূলক বিধায় পুলিশ তা রুজু করবে না — এ ভেবে সরাসরি আদালতে যাওয়া।
১০. অভিযোগকারী যদি নিজেই অপরাধী হন কিংবা তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি থাকে ও তিনি গ্রেফতার এড়াতে সচেষ্ট হন।
১১. কোন কোন আদালত কিংবা ব্যক্তি বিচারকের উদার দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মানুষ থানার চেয়ে আদালতে যাওয়ার প্রবণতা।

গত ২০ জুলাই, ২০১৪ তারিখে পুলিশ হেডকোয়ার্টাসের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি তার রেঞ্জের আটটি জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে রুজুকৃত মামলাগুলোর প্রকৃতি ও তদন্তের ফলাফলের উপর একটি বিশ্লেষণধর্মী পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তার পরিসংখ্যানে দেখো যায়, এ আইনে প্রকৃত অপরাধের চেয়ে আরোপিত কিংবা অতিরঞ্জিত অপরাধই বেশি। তাছাড়া এ আইনে শুধু বয়সের শর্ত থাকায় বেশ কিছু মামলা রুজু হয় এবং যেগুলোর রীতিমত অভিযোগপত্রও দাখিল করতে হয়, যেগুলো আসলে নারী-পুরুষের সম্মতির ফসল। কিন্তু ভিকটিম নাবালক হওয়ায় এগুলোর ক্ষেত্রে শুধু মামলায়ই রুজু করা বাধ্যতামূলক নয়, অভিযোগপত্র দাখিল করাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

এ পরিসংখ্যান থেকে থানা ও আদালতে মামলা রুজুর পরিসংখ্যান বিভিন্ন জেলায় বিশেষভাবে হয়ে থাকে। যেমন, রংপুর জেলায় গত তিন মাসে (এপ্রিল-জুন/২০১৪) মোট ২৮৭ টি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা রুজু হয়েছে যার সবগুলোই রুজু হয়েছে থানায়। দিনাজপুর জেলার ঘটনাও এরূপ। কিন্তু ঠাকুরগাঁ ও নীলফামারী জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলোর মধ্যে থানার চেয়ে কোর্টেই বেশি মামলা রুজু হয়েছে। বিষয়টি আমার কাছে বেশ বেখাপ্পা ঠেকায় ঠাকুরগাঁ জেলার গত একবছরের (২০১৩ সালের) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোর রুজু ও তদন্ত সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যান সংগ্রহ করলাম যা নিম্নরূপঃ

Statistics of cases Nari Shshu

 

অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায় ২০১৩ সালে ঠাকুরগাঁ জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সর্বমোট ২৬০টি মামলা রুজু হয়েছিল। এদের মধ্যে ৮৭টি মামলা সরাসরি থানায় এবং ১৭৩টি মামলা ট্রাইবুনালের নির্দেশে রুজু করা হয়েছিল। শতকরা হিসেবে দেখা যায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলো দুই-তৃতীয়াংশেরও (৬৬%) বেশি কোর্টের নির্দেশে থানা কর্তৃক রেকর্ড করা হয়েছিল। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মামলা (৩৩%) সরাসরি থানায় রুজু হয়েছিল।

মামলাগুলোর তদন্তের ফলাফলে দেখা যায়, থানায় সরাসরি রুজু হওয়া মামলাগুলোর ৭৮% এর বেশি তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু আদালতের নির্দেশে রুজুকৃত মামলাগুলোর অর্ধেকেরও কম মামলায় (৪৬.৮%) অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, থানায় রুজু হওয়া মামলাগুলোর নগণ্যসংখ্যক মিথ্যা(৫.৭%)। কিন্তু আদালতের নির্দেশে রুজু হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ২০% এর বেশি মিথ্যা।

অপরাধের প্রথম রিপোর্টের স্থান ও পুলিশের তদন্তের ফলাফল বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হয় যে ঠাকুরগাঁ জেলার থানাগুলোতে প্রকৃত কারণেই নারী শিশু নির্যাতনের মামলা রুজু হয়। থানা পুলিশের তদন্ত পরিসংখ্যান মূলত এটাই প্রমাণ করে। থানার চেয়ে ট্রাইবুনালে ভুক্তভোগীদের সরাসরি যাওয়ার পিছনে পুলিশের কোন ভূমিকা যদি থেকেও থাকে তবে তা অবশ্যই যৌক্তিক। মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার অনুমান করতে পেরে পুলিশের যে প্রতিক্রিয়া তাই মূলত ঠাকুরগাঁও জেলার এক শ্রেণির মানুষকে কোর্টমুখী করছে।

 

কিন্তু তাদের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত থানায় এসে অধিকাংশই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে শেষ হওয়ার ফলে হয়তো তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারছে না। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বিষয়টি আরো বেশি ভাল হত যদি ২০১৩ সালের যে ৪০টি মামলার (থানার ৫টি ও কোর্টের ৩৫টি) প্রত্যেকটিতেই বাদীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনের ১৭ ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করে বাদীদের সাজা দেয়া যেত।(রংপুর, ২ আগস্ট,২০১৪)