ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে স্বল্প বিদ্যার কিছু কিছু পুলিশ অফিসার ব্রিটেনের পুলিশ কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসারের (পিসিএসও) সাথে কমিউনিটি পুলিশিং ভাবধারাকে গুলিয়ে ফেলেন। এদের অনেকেই ব্রিটেনের কোন কোন রাজ্যে পড়াশোনাও করেছেন। কেউ কেউ আবার স্বল্প সময়ের জন্য ব্রিটেনে বেড়াতে গিয়েছেন। কিন্তু ব্রিটেনে পড়াশোনা করলেই বা কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে গিয়েই যে ব্রিটেনের পুলিশ সিস্টেম সম্পর্কে সম্মক জ্ঞানার্জন করতে পারবেন, এমন কোন কথা নেই। বাংলাদেশে বসবাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা জনৈক ব্যাংকার বন্ধু আমার কাছে জানতে চাইলেন, তোরা কি ডিসি সাহেবদের অনুমতি ছাড়া পুলিশ লাইন্সের বাইরে কোন ফোর্স নিয়োগ করতে পারিস? এমনকি মাগুরা জেলায় চাকরি করার সময় একজন আইনজীবী পর্যন্ত আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আচ্ছা, বিচার বিভাগ আলাদা হলে কি পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই গুলি চালাতে পারবে?

 

পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলী, তাদের কর্মবিভাগ, কর্মবন্টন ইত্যাদি অনেক কিছুই আমি পুলিশে প্রবেশের আগে জানতাম না। এমনকি এখনও যে সব কিছুই জানি তা কি করে বলব? পুলিশের যে ইউনিটে কাজ করি নি, সে ইউনিট সম্পর্কে গভীরভাবে আসলেই জানা সম্ভব নয়। একজন পুলিশ কনস্টেবল সারা জীবন থানা ফাঁড়িতে চাকরি করে অবসরে গেলে তাকে যদি সিআইডি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তবে তাকে অন্যান্য সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি জানলেওলা বলে মনে হবে না। পুলিশ পেশার এহেন বৈচিত্র্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডেভিড বেইলী বলেছিলেন, ‘পুশিলে ডান হাত তার বাম হাতকে চেনে না’।

 

একদিন কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম ও পুলিশ অফিসারদের যৌথ কর্মশালায় উদ্বোধনী ভাষণ দিতে গিয়ে জনৈক সিনিয়র পুলিশ অফিসার বললেন, তিনি নাকি লান্ডনে বেড়াতে গিয়ে তার এক আত্মীয়কে কমিউনিটি পুলিশে কাজ করতে দেখেছেন। সে কমিউনিটি পুলিশ কর্মকর্তা প্রতি মাসে বেশ ভাল বেতন পান। এতে তার সংসার বেশ ভালভাবেই চলে। তিনি পুলিশের ইউনিফর্ম পরেন, পুলিশের সব কাজই করেন। তাদের ক্ষমতাও অনেক। তার ধারণা হল, বাংলাদেশ সরকারও নিশ্চয় একদিন ব্রিটেনের ‘কমিউনিটি পুলিশের’ মতো বাংলাদেশের ‘কমিউনিটি পুলিশদের’ বেতন-ভাতা দিবে।

 

আমার এ সহকর্মীটি পুলিশের যত সিনিয়র অফিসারই হোন না কেন, কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন সম্পর্কে তার মৌলিক ধারণায় যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটেনের পুলিশিং বা কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা সম্পর্কে তার জ্ঞান আরো সীমীত। ব্রিটেনের পুলিশ কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসার (পিসিএসও) কর্মসূচিকে তিনি কমিউনিটি পুলিশিং কর্মসূচি বলে ভুল করেছেন। আর তার ভুল জানার বিষয়টি আমাদের দেশের কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাঝে স্থাপন করে আরো বেশি তালগোল পাকিয়ে দিয়েছেন।

 

ব্রিটেন তথা পাশ্চাত্য দেশে কর্মক্ষম শ্রম শক্তির দারুণ অভাব রয়েছে। প্রাচুর্যের সেই জগতে মানুষ অল্প শ্রমে যেমন অধিক মজুরী খোঁজেন, তেমনি আরাম আয়েসে ভরা নিঞ্ঝাট একটি পেশাও তারা বেছে নিতে চান। অন্যদিকে, যে কোন দেশেই পুলিশিং পেশাগুলো অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। দিবারাত্র পরিশ্রম করে পুলিশের চাকরিতে যে বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় তা অন্যান্য পেশার তুলনায় খুব একটা বেশি নয়। তাছাড়া অন্যান্য পেশায় বা কলকারখানায় দেশি-বিদেশি, স্থায়ী-অস্থায়ী যে কোন প্রকার শ্রমশক্তি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু পুলিশ বিভাগের মতো একটি জরুরী ও প্রতিরক্ষার সাথে সম্পর্কিত চাকরিতে কর্তৃপক্ষ চাইলেই যে কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে পারেন না।

 

এমতাবস্থায়, ব্রিটেন বা পাশ্চাত্য দেশগুলোর পুলিশ বিভাগগুলো তাদের কর্মচারিদের যে সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে সেগুলো হয়তো অন্যান্য পেশার সুযোগ-সুবিধার তুলনায় অনেক বেশি না হলেও পুলিশ বাজেটে তার একটি বড় প্রভাব রয়েছে। প্রতি বছরের বাজেটে পুলিশ পরিচালনার জন্য যে বাজেট বরাদ্ধ করা হয় সেটার সিংহভাগ আসে স্থানীয় উৎস থেকে। ব্রিটেনের পুলিশ কিছুটা কেন্দ্রিয় সাংগাঠনিক কাঠামো থাকলেও তা মূলত স্থানীয় সরকারের অধীন। বর্তমানে ব্রিটেনে স্থানীয়, রাজ্য ও জাতীয় মিলে প্রায় ৩৭টি পৃথক পৃথক পুলিশ বিভাগের অস্তিত্ব রয়েছে। এমনতাবস্থায়, পুলিশ বাজেটের ঘাটতি-বাড়তিতে দেশের করদাতারা অনেক বেশি স্পর্শকাতর। তাই তারা অন্যান্য সরকারি খাতের মতো পুলিশ খাতেও সরকারের খরচ কমানোর জন্য বড় বেশি চাপ প্রয়োগ করে।

 

ব্রিটেনের পুলিশ কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসার মূলত পুলিশিং ক্ষেত্রে নাগরিকদের করের বোঝা কমানোর একটি সাময়িক উপায় মাত্র। ২০০২ সালের পুলিশ সংস্কার আইনের ৩৮ নং ধারার বিধান মতে ব্রিটেনের পুলিশ বিভাগের প্রধানগণ ( Chief Constable or Police Commissioner) তাদের প্রদত্ত পুলিশ বাজেট থেকে অর্থ ব্যয় করে পুলিশের কাজে সহায়তা করার জন্য উৎসাহী নাগরিকদের মধ্য থেকে ‘পুলিশ কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসার’ নিয়োগ করতে পারে। এই সব অফিসারের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব, মর্যাদা, পোশাক ইত্যাদি সম্পর্কে পুলিশ সংস্কার আইন-২০০২ এর ৪ নং সিডিউলে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

 

পোশাকের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পুলিশ বিভাগ বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকে। তবে তারা পুলিশের মতো পোশাক পরলেও তাদের পোশাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করা থাকে তারা পুলিশের নিয়মিত সদস্য নয়; বরং সহযোগী সদস্য যারা পুলিশের কিছু কিছু কর্ম সম্পাদন করতে পারলেও বিধিবদ্ধ পুলিশ অফিসারের মতো সকল ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী নয়। ব্রিটেনের পুলিশ সাধারণত কোন অস্ত্র বহন করে না। তাই পিসিএসও দের অস্ত্র বহনের কোন সুযোগ নেই। তবে তারা হ্যান্ডকাফ, এরেস্টিং উপকরণসমূহ, আত্মরক্ষার জন্য অন্যান্য উপরকণ সাথে বহন করতে পারে। পিসিএসওদের নিয়োগের মূল উদ্দেশ্যই হল স্বল্প খরচে জনগণের মাঝে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রে স্থায়ী পুলিশ সদস্য নয়, অথচ পুলিশের মতো জরুরি সেবা প্রদানে সক্ষম কিছু কর্মচারির সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এক দিকে যেমন মানুষের মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে তেমনি তাদের জন্য সরকারের খরচও সীমিত।

 

ব্রিটেনের পুলিশ সংস্কার আইন-২০০২ অনুসারে পুলিশ ‘কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসার’গণ নিম্নলিখিত ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারীঃ

 

১.     নির্দিষ্ট জরিমানার ( যেমন, ফুটপাথ দিয়ে যানবাহন বা ঘোড়া চালনা) অপরাধের জন্য নোটিশ জারি করা,

২.    অবৈধ মাদক দ্রব্য যেমন মদ বা তামাকজাত দ্রব্য জব্দ করা,

৩.    অসামাজিক কাজে নিয়োজিত বলে সন্দেহকৃত ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা জানতে চাওয়া,

৪.    জীবন রক্ষা বা বড় ধরণের ক্ষতি নিবারণের জন্য কোন স্থানে প্রবেশ করা,

৫.    পরিত্যক্ত যানবাহন সরানো

৬.    কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রদত্ব অন্য যে কোন ক্ষমতা।

 

ব্রিটেনের পিএসওদের সাথে আমাদের দেশের অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের তুলনা করা যেতে পারে। তবে সে দেশের পিএসওগণ কোন নিয়মিত বাহিনীর অঙ্গীভূত সদস্য নয়। তারা সাধারণ মানুষ মাত্র যারা অবসর সময়, সাময়িক বেকারত্বের সময় কিংবা নিজেদের জীবনের মধ্যে কিছুটা বৈচিত্র্য নিয়ে আসার জন্য পুলিশের কাজে সহযোগীতা করে। ব্রিটেনের কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে আরো একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হল, সারা বিশ্বে কমিউনিটি পুলিশিং এর সূতিকাগার ব্রিটেন হলেও ব্রিটেনের কোন সরকারি নথিপত্রে কমিউনিটি পুলিশিং শব্দমালা লেখা নেই। ১৮২৯ সালে রবার্ট পীলের লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় দেড়শত বছর ব্রিটেন বিশ্বের পুলিশিং জগতে রোল মডেলের ভূমিকা পালন করছে। তাই তাদের মূল ভূখণ্ডের গোটা পুলিশিং ব্যবস্থাই কমিউনিটি পুলিশিং। এমতাবস্থায়, তারা হয়তো ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ শব্দটি লিখা বাহুল্য মনে করে। তবে একবিশং শতাব্দীতে ব্রিটেনের পুলিশিং জগতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। ২০০২ সালের পুলিশ সংস্কার আইনই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

 

সূত্রাবলীঃ

১.http://www.legislation.gov.uk/ukpga/2002/30/section/38

২. http://www.legislation.gov.uk/ukpga/2002/30/schedule/4।