ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ভারতে ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের সূচনা হয় ১৭৫৭ সালে সিরাজ উদৌলার সাথে লর্ড ক্লাইভের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে। আমরা মূলত এ সময়ের পর থেকে ইতিহাসই বেশি চর্চা করি। এর পূর্বের ইতিহাসের মধ্যে বাংলার স্বাধীন সুলতানগণের যুগ বেশি করে পড়া হয়। কিন্তু ইংরেজদের ক্ষমতাগ্রহণের পূর্ব ও মুসলিম ক্ষমতাচ্যূতির শেষ দিকের ইতিহাস খুব একটা বেশি পড়া হয় না।

বাংলার ইতিহাস চর্চাকারী মাত্রই স্বীকার করবেন যে, ইংরেজরা এ উপমহাদেশে তাদের আসন পাকাপোক্ত করার জন্য উপঢৌকন, ঘুস ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলার শেষ দিকের সুবাদারগণ ইংরেজদের কাছ থেকে ভাল অংকের উপঢৌকন বা ঘুস নিয়েছিলেন। ১৭০৩ সালে ইংরেজরা যখন কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর নামে তিনটি গ্রাম ক্রয় করে তখন জমির প্রকৃত মালিকদের দিয়েছিলেন ১,৩০০ টাকা। কিন্তু এই অনুমতি ক্রয় করতে  সুবেদার যুবরাজ আজিম-উস-সানকে দিতে হয়েছিল ১৬,০০০/-টাকা। তবে একথাও সঠিক যে ইংরেজদের এ দেশে সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হওয়ার কাজটি অনেক বেশি কষ্টকর ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় প্রশাসকদের দ্বারা বিতাড়িত হয়েছেন, বন্দি হয়েছেন, তাদের মালামাল হারিয়েছেন ও অনেক ক্ষেত্রে নিহত ও আহতও হয়েছেন। এর বাইরেও তাদের অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানি যেমন ওলন্দাজ, ফরাসি ও পর্তুগিজদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হত। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাজটিও সহজ ছিল না। এ জন্য তাদের অহিংস কূটনীতি থেকে শুরু করে ঐসব প্রতিদ্বন্দ্বি কোম্পানিগুলোর সাথে বাস্তবের যুদ্ধও করতে হয়েছিল।

কিন্তু এ উপমহাদেশে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার একটি বিচিত্র পন্থার কথা হয়তো অনেকেই জানে না। সেটা হল এক ইংরেজ ডাক্তাতের জাতীয়তাবোধ। ইংরেজদের এদেশের ক্ষমতা দলখ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল সম্রাট সাজাহানের আমলে।  স্টুয়াট সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহান আরার রোগ নিরাময়ের ব্যাপারে ইংরেজ সার্জন জিব্রাইল বউটনের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। যুবরাজ্ঞী একদা ভীষণভাবে অগ্নিদগ্ধ হন এবং তাঁর আরোগ্যলাভের আশা ত্যাগ করা হয়। সম্রাট একজন ইউরোপীয় সার্জনের সহায়তা চেয়ে পাঠান। সুরাটের ইংরেজ কাউন্সিল হোপওয়েল নামক জাহাজের শল্যচিকিৎসক জিব্রাইল বউটনকে প্রেরণ করে এবং তিনি সৌভাগ্যবশত যুবতী যুবরাজ্ঞীকে এই দুর্ঘটনার কবল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলেন। বাউটন অতঃপর দরবারে সবার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেন। এই কাজের জন্য পুরস্কার দিতে চাইলে তিনি বলেন, ইংরেজদেরকে বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্য করা তৎসহ কুঠি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হোক। ফলে সম্রাট ইংরেজদেরকে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি সংবলিত একটি ফরমান জারি করেন।

 

তবে সম্রাট যে এক দম বিনা শুল্কে তাদের ভাতে ঢুকতে দিয়েছিলেন, তা নয়। তাদের সুরাট ও বোম্বে বন্দরে প্রবেশের জন্য ট্যাক্স দিতে হত। কিন্তু ভারতে অভ্যন্তরীণ বানিজ্য করতে শুল্ক দিতে হবে না বলে উল্লেখ ছিল। ফরমানে আরো ‍উল্লেখ ছিল যে ইংরেজদের এ সুবিধা স্থানীয় প্রদেশ বা সুবার শাসনকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে কার্যকর হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ইংরেজরা প্রতারণার মাধ্যমে এ ফরমানকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে সারা বাংলায় বিনা শুল্কে ব্যবসা করতে শুরু করে।

 

ইংরেজ জাতি নিজেদের ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার চেয়ে যে তাদের জাতিগত চাওয়া পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেন তার উজ্জ্বল প্রমাণ হল ড. গ্রেব্রিয়েল বাউটের সম্রাট সাজাহান থেকে পুরস্কার গ্রহণের ধরন। প্রিয় কন্যার রোগমুক্তির আনন্দে সম্রাট সাজাহান ড. বাউটকে অনেক কিছুই দিতে পারতেন। এটা হতে পারত নগদ অর্থ, হতে পারতে অন্যকোন মূল্যবান উপকরণ যা ড. বাউট নিজের জন্য ব্যবহার করতে পারতেন বা নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু ড. বাউট তার পুরস্কার নিজের জন্য নয়, সমগ্র ইংরেজ জাতির জন্য দাবি করেছিলেন। যে উদ্দেশ্য হাসিলে ইংরেজদের বহু কাঠখড়ি পোড়াতে হত, বহু যুদ্ধ বিগ্রহ করে বহু জীবন বলী দিতে হত, ড. বাউট তা শুধু তার চিকিৎসা সেবার মাধ্যমেই আদায় করতে পেরেছিলেন। তাই ভারত বর্ষে ইংরেজদের কলোনি স্থাপনের পথিকৃত লর্ড ক্লাইভ নয়, ড. গেব্রিয়েল বাউটই।

 

সূত্রঃ  মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক (২০০৯): বাংলার ইতিহাসঃ ভারতের ইংরেজ রাজত্বের সূচনাপর্ব (১৬৮৯-১৭২০)। বাংলা একাডেমি