ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মাঝে মাঝে দেশবাসির কাছে মনে হতে থাকে সমাজে অপরাধের মাত্রা অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অপরাধ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে পুলিশের খাতায় নিবন্ধিত অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি তো পায়ইনি বরং কমেছে। প্রচার মাধ্যমের চটকদার খবর, দেশিয় বা আন্তর্জাতিক কোন বিশেষ দিবস বা অনুষ্ঠান উপলক্ষে কোন বিশেষ শ্রেণির অপরাধকে গুরুত্ব দেয়া কিংবা সরকারি নীতির প্রতি জনগণের বিতৃঞ্চা ইত্যাদি কারণে এমনটি হতে পারে।

 

তবে সমাজে যত অপরাধ সংঘটিত হয় তার সবগুলো পুলিশের খাতায় আসে না। এটা আসাটা বাস্তব সম্মতও নয়। তাই পুলিশের খাতার অপরাধ পরিসংখ্যান সমাজের প্রকৃত অপরাধ চিত্র তুলে ধরে না। এটা আমাদের একটি ধারণা দেয় মাত্র।

 

প্রতিটি সমাজে ও দেশে সমাজে সংঘটিত অপরাধগুলোর কোন কোনগুলো গোপন করার সাধারণ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আবার অনেক অপরাধ আছে যেগুলো সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই পুলিশের খাতায় চলে আসে। অপরাধ গোপন করা কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে  তা পুলিশের খাতায় রেজিস্ট্রি করার এ হেঁয়ালীপূর্ণ বৈপরিত্যের পিছনে  নানাবিধ কারণ কারণ ক্রিয়াশীল।

 

অনেকে মনে করেন পুলিশ বিভাগের দুর্নীতির কারণেই এমনটি হয়। কিন্তু বিষয়টি পুলিশের দুর্নীতি বা অদক্ষতার উপরই কেবল নির্ভরশীল নয়। এর পিছনে প্রাকৃতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক,  ও রাজনৈতিক ইত্যাদি বহুবিধ সমীকরণ জড়িত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মুসলিম সমাজে ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশের কাছে না যাবার প্রবণতা বিদ্যমান। আবার পাশ্চাত্য দেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলো মুসলিম দেশগুলোর চেয়ে বেশি সংখ্যায় সরকারি নথিপত্রে রেকর্ড হয়। আবার ব্রিটেনে কোন মোটযান চুরি, ছিনতাই কিংবা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই তা থানায় রিপোর্ট হয়ে যায়। ধর্ষণের ক্ষেত্রে সামাজিক ও ধর্মীয় কলঙ্কজনিত ভয় এবং ব্রিটেনে মোটর যানের ব্যাপারে বীমার কঠিন শর্ত ও একই ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য গাড়ির মালিকে কঠিন জবাবদিহিতা তাদের থানায় মামলা রুজু করতে বাধ্য করে।

 

কোন সমাজে যত অপরাধ সংঘটিত হয় তার সবগুলোই পুলিশ বা আদালতের রেজিস্ট্রারে নিবন্ধিত হয় না। সরকারি রেকর্ড পত্রে নিবন্ধিত হওয়া, না হওয়ার  উপর ভিত্তি করে সমাজে সংঘটিত অপরাধগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।

 

প্রথম শ্রেণির অপরাধ সহিংস এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রচারিত। এসব অপরাধের ঘটনা অপরাধী বা ভিমটিম পক্ষ চাইলেও গোপন রাখতে পারে না। কতিপয় ব্যতীক্রম ছাড়া, ডাকাতি, হত্যা, অপহরণ ইত্যাদি অপরাধ সাধারণভাবে পাবলিক বিষয়। এসব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই তা মিডিয়ায় চলে আসে। শুধু পুলিশ নয়, আটপৌরে জীবনের গৃহ বধুরাও এটা জানতে পারেন। এমতাবস্থায়, এ সংক্রান্তে থানায় বিধিমত মামলা রুজু করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে  ৫,৫৮৯ টি খুনের মামলা হয়। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে হত্যাকে কৌশলগতভাবে আত্মহত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার আড়ালে গোপন করা ছাড়া প্রতিটি হত্যা ঘটনায় মামলা হয় এবং পুলিশের খাতায় রুজুকৃত হত্যা মামলাগুলো অপরাধের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে।

 

দ্বিতীয় শ্রেণির অপরাধের ঘটনা থানার গোচরে আসলেও থানা নিয়মিত মামলা রুজু নাও হতে পারে। যেমন, পুলিশ অফিসারদের ঘুস দাবি, নিবন্ধিত অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাবে বলে থানা অফিসারদের আসঙ্কা,  প্রভাবশালীদের /প্রতিপক্ষের চাপের কাছে পুলিশের নতি স্বীকার করে মামলা  দুর্বল বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা রুজু করতে বিরত থাকা ইত্যাদি।

 

তৃতীয় শ্রেণির  অপরাধের ঘটনা ঘটার পর স্থানীয়ভাবে তা চাউর হয়ে গেলেও নানা কারণে তা থানা পর্যন্ত পোঁছে না। এটা হতে পারে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ, ভিকটিম পক্ষ কর্তৃক মামলা না করার প্রবণতা/অনীহা, স্থানীয়ভাবে শালিসের মাধ্যমে অপরাধের ঘটনা মীমাংসা করে নগদ ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রচেষ্টা ইত্যাদি।

 

চতুর্থ শ্রেণির অপরাধ শুধু পরিবারের অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়। পরিবারের বাইরে এ অপরাধ প্রকাশিত হয় না বা হতে দেয়া হয় না। ভিকটিম ও অপরাধী যখন একই পরিবারের বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের হয়, তখন সাধারণত এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। পরিবারের মান-সম্মান কিংবা পুরুষতান্ত্রিকতা বা ধর্মীয় গোঁড়ামীর কারণে এগুলো পরিবারের বাইরে আসে না।

 

পঞ্চম ও শেষ    শ্রেণির অপরাধগুলো অপরাধী ও অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা ভিকটিম ভিন্ন অন্য কেউ জানে না। এক্ষেত্রে অপরাধী ও ভিকটিম উভয়ে তা গোপন করতে তৎপর হয়। যেমন, ব্যাভিচার, বিবাহ বহির্ভূক্ত দৈহিক সম্পর্ক এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনাও এ শ্রেণিতে পড়তে পারে। সামাজিক সম্মান হানি, ভবিষ্যতে বিবাহ হবে না এমন  ভয়ে ধর্ষিতা তার বিরুদ্ধে কৃত অপরাধের কথা থানায় জানানো তো দূরের কথা, নিজ পরিবারের সদস্যদের কাছেও তা প্রকাশ করেন না।
এমতাবস্থায়, আমরা বলতে পারি থানা বা আদালতে নিবন্ধিত ফৌজদারি অপরাধের সংখ্যার চেয়ে আমাদের সমাজে অন্তত পাঁচগুণ বেশি অপরাধ সংঘটিত হয়। অর্থাৎ পুলিশের খাতার অপরাধ পরিসংখ্যান  প্রকৃত অপরাধ সংখ্যার মাত্র এক পঞ্চমাংশ।