ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

মহররম মাসের চাঁদের জন্য কোন দিন অপেক্ষা করতাম না। তবে পাশের পাড়ায় ঢাক-ঢোল বাজানোর  শব্দে বোঝা যেত আজ মহররম মাস। রোজ বিকেলে ‘ভাঙ্গার পাড়’ এ ঢাক-ঢোল বাজার আয়োজন চলত। আকবপুর নয় অানা থেকে আমাদের পাড়ায় আসার রাস্তাটি প্রতি বছরই বর্ষায় ভেঙ্গে যেত। এজন্য ভাঙ্গা অংশটির নাম ছিল ‘ভাঙ্গার পাড়’। উজানের আঁখিরা নদী যখন অতি বৃষ্টিতে ভেসে যেত, তখন নদীর সাথে সংযুক্ত ‘ভাবভালার বিলে’ সথি দিয়ে পানি উল্টো পথে আসত। এটা আমাদের জন্য এক মজার বিষয় ছিল। যে নালা দিয়ে প্রতিদিন পূর্ব দিকে স্রোত যেতে দেখতাম হটাৎ দেখি সেই স্রোত আসছে পশ্চিম দিকে। উল্টো স্রোতে আসা পানির তোড়ো আমাদের ভাঙ্গার পাড় আবার ভেঙ্গে যেত। ভাঙ্গার পাড়ের উত্তর দিকে ছহির চাচাসহ অন্যরা মহররমের ঢাক বাজাত।

 

এটা ছিল অনেক বড় ঢাক। একটা আস্ত কেরোসিনের ড্রামের দুই দিকে শক্ত চামড়া দিয়ে ঢাকটি তৈরি করা হয়েছিল। এটা থাকত ময়েজ চাচাদের বাড়িতে। এটা বাজানোর জন্য বড় বড় হাতুড়ি ছিল। হাতুড়িগুলো ছিল কাঠের তৈরি। এ হাতুড়ি দিয়ে ঢাকের চামড়ায় বাড়ি দিলে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হত। দুই চার গ্রাম দূর থেকেও এই ঢাকের আওয়াজ শোনা যেত। এটাকে সবাই বলত ‘জয় ঢাক’। সম্ভবত আগের দিনে যুদ্ধে জয় লাভের পর যুদ্ধজয়ী রাজা-বাদশাগণ এ ধরনের ঢাকা বাজাত। এর বাইরেও ছিল ছোট ছোট ঢাক, কাঁসি, খোল ও মন্দিরা। কাঁসি ছিল একটি মাটির চাড়ি বা কাসার এক দিকে পাতলা চামড়া মোড়ানো। এটা বেশ হালকা ছিল। তবে মাটিতে রেখে বাঁশের কাঠি দিয়ে এটা বাজাতে হত। মহররমের এই ঢাকা, ঢোল আর কাসি বাজানোতে তেমন কোন সুসন্নিবেশিত মধুর তাল লয় ছিল না। তবে এটা মহররমের আনন্দ ছড়াতো।

 

মহররমের চাঁদ ওঠার পর দিন থেকেই এলাকায় শুরু হত মর্সিয়া গান। গ্রামে গ্রামে তরুণ ও কিছু গায়ক গোছের নেতাদের দিয়ে মর্সিয়া দল তৈরি হত। এরা সুমধুর সুরে নেচে নেচে মর্সিয়া গাইত। মর্সিয়া দলের প্রত্যেক সদস্যের পরনে থাকত বিশেষ ধরনের পোশাক। কপালে ও হাতে থাকত লাল ফিতা। একটি  নির্দিষ্ট স্থানে একটি বিন্দুকে কেন্দ্র  করে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে মর্সিয়া গাওয়া হত। বৃত্তের পরিধি বরাবর চলতে চলতে মর্সিয়া দলম নির্দিষ্ট বিরতিতে কেন্দ্রে গিয়ে হাত তালি দিত। কোন কোন মর্সিয়া দল ছিল বেশ নাম করা। এরা আসেপাশের সব গ্রামে ও হাট-বাজারে মহররমের প্রথম দশ দিন মর্সিয়া গেয়ে বেড়াত। মর্সিয়া দলের রোজগারও ছিল ভাল। প্রতি পালাতেই তারা নজরানা পেত।

 

আসুরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত। এগুলোর মধ্যে পীরগঞ্জের বড় দরগা, মিঠাপুকুরের ফকিরের হাট, পাগলার হাট, চড়ার হাট, সরকারের হাট এসব স্থানের মেলা ছিল বেশ বড়। অনেক সময় মেলাতে যাত্রা গান ও সার্কাসের আসর বসত। মনোহারী দ্রব্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ। বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টান্ন, বিশেষ করে মেলায় জিলাপির দোকানগুলো ছিল জমজমাট। পেশাদার বিক্রেতাগণ ছাড়াও মহররমের মেলায় সৌখিন দোকানদারগণও দোকান দিত।

 

আমার বড় ভাই তালেব একবার মহররমের মেলায় মনোহারী দ্রব্যের দোকান দিলেন। তিনি মালামাল কেনার জন্য গাইবান্ধা শহরে গিয়েছিলেন। আমি তার সাথে গাইবান্ধা গিয়েছিলাম। সৌখিন ব্যবসায়ীগণ মহররমের মনোহারী দোকান দিয়ে বেশ লাভ করত। তবে এসব দোকানে চুড়ি কিনতে গিয়ে দুষ্ট মেয়েরা প্রায়ই দোকানদারদের লোকসানের মধ্যে ফেলত। কোন মেয়ের হাতে চুড়ি পরিয়ে দিয়েই দোকানদারকে দাম নিতে হত। কিন্তু চুড়ি পরানোর কাজটি সহজ ছিল না। প্রায় ক্ষেত্রে কাঁচের চুড়ি ভেঙ্গে যেত। ভাঙ্গা চুড়ির কোন দাম দিতে হত না। অনেক দুষ্ট মেয়ে চুড়ি হাতে ঢোকানোর সময় ইচ্ছে করেই হাত মূঠো করে শক্ত করত। তখন কব্জিতে থাকা চুড়ি মচমচ করে ভেঙ্গে যেত। অনেক সময় চুড়ি পড়াতে গিয়েও অবিবাহিত দোকানদার ও চুড়ি ভাঙ্গা যুবতীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠত। মহররমের মেলায় দেদারচে চলত জুয়া। ফিতের খেলা ও বড় ধরনের সাজসরঞ্জাম নিয়ে চলত জুয়া। অনেক লোক জুয়া খেলে কেউ কেউ ফতুর হয়ে যেত।

 

আমি ফকির হাটের মহররমের মেলায় গিয়ে একবার দেখলাম পট পট শব্দ করে একটা গোলাকার কাঠামো ঘুরছে। একে ঘিরে মানুষের বেশ জটলা। জটলার ফাঁক দিয়ে  ভিতরে ঢুকে দেখি, একটি কাঠামোর উপর বিভিন্ন জীবজন্তু আর বস্তুর ছবি আঁকা। লোকে ঘরের মধ্যে আঁকা ছবির উপর টাকা পয়সা রাখছে। এদিকে কাঁটাওয়ালা কাঠামোটিকে জোরে জোরে ঘোরানো হচ্ছে। কাঠামোর কাটাটি যে ছবির ঘরে এস থেমে যাচ্ছে সেই ঘরে রাখা টাকা ওয়ালারা অন্য ঘরের টাকা গুলো পেয়ে যাচ্ছে। পরে বুঝলাম, এতে লাভ আছে। আমি ২৫ পয়সার একটি মূদ্রা বাঘ কি ঘোড়ার ছবির উপর রাখলাম। কাঁটা ঘুরতে থাকল। কিন্তু এটা আমার প্রার্থীত ছবির ঘরে থামল না। আমার ২৫ পয়সা মারা গেল। সেই ২৫ পয়সাই ছিল আমার জীবনের প্রথম ও শেষ জুয়া। আমি আর কোন দিন জুয়ায় পয়সা দেইনি।

 

মহররম, বৈশাখী ও চৈত্র সংক্রান্তির মেলার সময় জামাইগণ শ্বশুরবাড়ি যেতেন। তার না গেলেও ঐ সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে তাদের দাওয়াত দেয়া হত। ছোট ছোট শালা-শালীগণের ছিল এসময় পোয়াবারো। তারা দুলাভাইয়ের সাথে মেলায় গিয়ে যা খুশী কিনে নিবে।  শালা-শালীদের খুশী করতে অনেক নতুন জামাইকে এ সময়  ধার দেনাও করতে হত। তবে মেলা উপলক্ষে শ্বশুর বাড়িতে গেলে শ্বাশুড়ীগণ তাদের জামাইদের হাতে কিছু নগদ টাকা ধরিয়ে দিতেন।

 

মহররমে আমাদের গ্রামে প্রতিবারই ‘ডাহা’ তৈরি করা হত। ডাহা হল এক ধরনের তাজিয়া। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে একটি বড় ধরনের মিনারের মতো কাঠামো তৈরি করা হত। পরে এ কাঠামোর উপর নানা রঙের কাগজ বা কাপড় দিয়ে তৈরি হত সুদৃশ্য ‘ডাহা’ ।  ডাহা তৈরি করা ছিল একটা মান্নতের অংশ। স্থানীয় ধনী ব্যক্তিগণ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষও রোগ মুক্তি, সন্তান লাভ, কৃষি বা ব্যসাতে উন্নতি ইত্যাদির আশায় ‘ডাহা’ মান্নত করত। ‘ডাহা’ নির্মানের পর তা নির্মাণ- কর্তার বাড়িতে প্রদর্শণের জন্য রাখা হত। আশুরার দিন এই ডাহা ঘাঢ়ে নিয়ে সারা গ্রাম প্রদর্শন করা হত। ডাহা ঘাড়ে নিয়ে চলত বড়রা। আমরা,ছোটরা পিছে পিছে চলতাম। অনেক সময় হৈ দিয়ে উঠতাম। গ্রাম ঘোরানো হলে ঢাহিাটি নির্দিষ্ট স্থানে তা রেখে দেয়া হত। সেখানেই এটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেত। তবে ক্ষতির ভয়ে ডাহার কাগজ বা বাঁশ-কাঠ কেউ স্পর্শ করত না। মনে করা হত যে ডাহা থেকে কোন কিছু গ্রহণ করবে, যে কারণে বা যে রোগের উপসম হিসেবে ডাহা নির্মান করা হয়েছে সেও সে জাতীয় অসুবিধায় পতিত হবে। ঢাকা নির্মান, প্রদর্শন ও বিসর্জন হিন্দুদের মুর্তিপূজার মতোই আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ ছিল।

 

মহররমকে ঘিরে এসব অনুষ্ঠান বা আচার-প্রচার ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফুর্ত। নির্দিষ্ট দিনে শুরু হয়ে নিদিষ্ট দিনে এ অনুষ্ঠান মালার সমাপ্তি ঘটত। হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে মহররমের অনুষ্ঠানে যোগ দিত ও উপভোগ করত। মহররমের মেলাকে ঘিরে আমাদের গ্রামের মিষ্টি বিক্রেতাদের বেশ আয় রোজগার হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ফতোয়া আসতে থাকে যে, মহররমের এসব আয়োজন বেদআত। ডাহা বা তাজিয়া নির্মাণ হিন্দুয়ানী সাংস্কৃতি। তাই এগুলো নাজায়েজ। কিছু কিছু নব্য হুজুর এগুলোর বিরোধিতা করা শুরু করে।

অন্যদিকে গ্রামের মানুষের অবসর সময়ও কমে আসে। আগে মাঠে মাত্র দুইটি ফসল হত। এ দু ফসলের মাঝখানের সময় ছিল বড়ই অলস। তাই গ্রামের মানুষ নিজেদের মধ্যে কিছু বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। এর পর আসল সিনেমাহল, টেলিভিন ইত্যাদি। মাঠের বিনোদন ক্রমান্বয়ে গৃহে বন্দী হয়ে পড়ে। মহররমকে গিরে এখনও মেলা বসে। কিন্তু সেই ডাহা আর নেই।