ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

খবরটি বেশ মজাদার! নেত্রকোনায় পুলিশের সাথে জুয়াড়ীদের সংঘর্ষে গুলি, ৭ পুলিশ আহত’। গত ০৮ নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে আমাদের সময়, বিডিনিউজ২৪.কমসহ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত এ খবরটির সারমর্ম হল, ঐদিন ভোরে নেত্রকোণা সদর উপজেলার খাকিয়াকুড়ি গ্রামের একটি নদীর চরে ষাঁড়ের লড়াইয়ের আয়োজন করা হয়।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নেত্রকোনা মডেল থানার পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে পার্শ্ববর্তী দূর্গাপুর উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়নের তিতাসজান গ্রামের ষাঁড়ের মালিক ফয়জুদ্দিনসহ ৪জনকে আটক করে। আটককৃত ষাঁড়সহ ৪ জুয়ারীকে দুটি হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে আসার পথে তিতাসজান গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জ্বিত হয়ে পুলিশের উপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে গ্রামবাসি পুলিশের হাতে আটককৃত ৪ জনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী চলে এই সংঘর্ষ। নেত্রকোণায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ষাঁড়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে পুলিশের ধর পাকড় ও স্থানীয় গ্রামবাসিদের মধ্যে দাঙ্গাহাঙ্গামার খবর অহরহই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

অনেকের মাথায় ঢুকবে না, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াই হল একটি নির্মল আনন্দের আসর। কিন্তু সে ষাঁড়েরে লড়াইয়ে পুলিশ বাধা দিবে কেন আর ষাঁড়ের মালিককেই বা ষাঁড়সহ গ্রেফতার করতে যাবে কেন? এ ক্ষেত্রে পুলিশ কী সীমা লঙ্ঘণ করে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে না? পুলিশ কি তাহলে বিনোদন বিরোধী; ঐতিহ্যের শত্রু?

আমি ২০১২ সালে পিআরপির একটি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে নেতৃকোণায় যাই। পুলিশ সুপার জনাব জাকির হোসেন আমার ব্যাচমেইট। পুলিশ সুপারের বাসায় রাতের বেলায় খেতে বসেছি এমন সময় মোবাইলে একটি কল পেয়ে এসপি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কঠিনভাষায় জনৈক অফিসার-ইন-চার্জকে নির্দেশ দিলেন, কোন ভাবেই ষাঁড়ের লড়াই হতে দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে ব্যবস্থাপকদের রাতেই গ্রেফতার করেন। ষাঁড়গুলোকে জব্ধ করে থানায় নিয়ে আসুন।

আমি বিষয়টি সেই মুহূর্তে বিষয়টি বুঝতে পারিনি। এসপি সাহেব ষাঁড়ের লড়াই বন্ধ করতে যাবেন কেন? আমি শক্ত করেই এসপিকে বললাম, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহি বিনোদন মোরগের লড়াই, লাঠি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই এসব কী তাহলে বন্ধ হয়ে যাবে? ইতোপূর্বে বোমা হামলার ভয়ে তো যাত্রা-সার্কাস ইত্যাদি উঠেই গেছে। এখন কি ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড়ার দৌড় এসবও বন্ধ করা হবে? তখন এসপি সাহেব ষাঁড়ের লড়াই ও এর সাথে জুয়া খেলার সম্পর্কটি আমাকে বুঝিয়ে বললেন।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, জামালপুর, শেরপুর ইত্যাদি অঞ্চলে জুয়া একটি গা সওয়া বদভ্যাস। কিছু কিছু মানুষ আছে এটা ছাড়া থাকতেই পারেন না। কিছু কিছু মানুষ জুয়ার বোর্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকাও রোজগার করে। এরা জুয়াড়ু। জুয়ার ব্যবস্থাপক; খেলোয়াড় নয়। এরা জুয়া ব্যবসায়ী।

নেত্রকোনা অঞ্চলে বাজি ধরা একটি উত্তম জুয়া খেলা। প্রতি বছরই এ অঞ্চলে প্রাচীন কাল থেকেই ষাঁড়ের লড়াই হত। ষাঁড়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে চলত বাজি ধরা। কোন ষাঁড়টি জিতবে তার উপর বাজি ধরা হত। বাজি ধরার বিষয়টি এমন যে অমুক ষাঁড় বা অমুকের ষাঁড় জিতবে। আমি তার উপর ২০০০ টাকা বাজি ধরলাম। যদি সেই নির্দিষ্ট ষাঁড়টি জিতে যায় তাহলে আমি আমার বাজির দ্বিগুণ অর্থ পেয়ে যাব। আর যদি আমার বাজির ষাঁড় না জেতে আমি দুই হাজার টাকাই হারব।

অতীতে এ বাজির বিষয়টি একটা সাধারণ বিনোদন হিসেবেই দেখা হত। কিন্তু দ্রুত এটা রীতিমত জুয়ায় ‍পরিণত হয়। একটি ষাঁড়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে কয়েক গ্রাম মিলে লক্ষ লক্ষ টাকার জুয়া চলে। এক শ্রেণির মানুষ এর ব্যবস্থাপনায় থাকে। প্রথম দিকে এটা তাৎক্ষণিক আয়োজনে হলেও ক্রমশ তা সংঘবদ্ধ জুয়ায় রূপ নেয়।

প্রত্যেক প্রতিযোগিতামূলক খেলার মতোই ষাঁড়ের খেলা পুলিশের কাছে মাথা ব্যথার কারণ হয়। এ লড়াইকে কেন্দ্র করে এক স্থানে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে। কে হারল, কে জিতল তা নিয়ে শুধু ব্যক্তিগত নয়, দলগত এমন  কিগোষ্ঠীগত দাঙ্গাও ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য ষাঁড়ের খেলাকে/লড়াইকে কেন্দ্র করে পুলিশকে বড় ধরনের ফোর্স মোতায়েন করতে হয়।

ষাঁড়ের লড়াই বড় ধরনের জুয়ায় পরিণত হওয়ায় নেত্রকোণা জেলায় এটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এর পরেও জুয়াড়ুদের ষাঁড়ের লড়াইয়ের আয়োজনে ঘাটতি হয়নি। যারা বাজি ধরেন তারাও থেমে থাকেন নি। এখন ষাঁড়ের লড়াই শুরুর কয়েক দিন পূর্ব থেকে বাজি ধরার কাজটি নির্ধারিত হয়। দিনের বেলায় পুলিশের ভয়ে এখন ষাঁড়ের লড়াই অনুষ্ঠিত হয় অত্যন্ত ভোরে। পুলিশ পৌঁছার আগেই লড়াইয়ের বাজিমাত হয়ে যায়। তাই পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে পুলিশ আয়োজক ও চিহ্নিত জুয়াড়ুদের নির্ধারিত দিনের আগেই নিরাপত্তামূলক গ্রেফতার করে। কিন্তু তারপরও এটা থামে না। কেননা এ সমাজে জুয়া খেলা অনেকটাই সমাজ স্বীকৃত বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যত নিষিদ্ধই হোক, পুলিশের যত গ্রেফতার অভিযানই হোক, ওরা এটা করবেই। লোকালয়ে যদি করতে না পারে তারা বেছে নেবে নির্জন কোন স্থানকে। হয়তো নদীর চর কিংবা কোন জলাভূমির মধ্যভাগের উঁচু স্থানকে।

নেত্রকোণা সরকারি কলেজে শিক্ষক আমার সহপাঠি রতন কুমারের সাথে হোটেলে বসে চা খেতে খেতে আমি নেত্রকোণা জেলার ষাঁড়ের  লড়াইয়ের সাথে বাজি ধরার বিষয়টি উত্থাপন করলাম। যেহেতু রতনের বাড়ি নেতৃকোণাতেই, তাই ওর কাছ থেকে আসল খবরটি জানতে চাইলাম। রতন যা বলল, সেটাও ভয়াবহ। ওর মতে পৃথিবীর জঘন্যতম বাজি ধরার মানুষগুলো নেত্রকোণা জেলাতেই বসবাস করে। এখানে বাজি ধরা এতটাই মানুষের মজ্জাগত যে বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, ভারতের আইপিএলসহ যে কোন ধরনের বড় বড় খেলার আসরকে কেন্দ্র করে বাজি ধরার খেলা চলে। এসব বাজিতে বহু পরিবার পথে বসে। রসিকতা করে রতন আমাদের সামনে শুয়ে থাকা একটা কুকুরকে লক্ষ করে বলল, নেতৃকোণার মানুষ এতটাই বাজির খেলায় অভ্যস্ত যে আমি এ কুকুরটিকে এখান থেকে ঢিল ছুড়ে মারলে সে উঠে পূর্ব দিকে দৌড় দিবে, না পশ্চিম দিকে দৌড় দিবে, নেত্রেকোণায় তারও উপর বাজি ধরা হতে পারে।

একবার গাইবান্ধা জেলায় একটি কমিউনিটি পুলিশিং প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করতে গেলাম। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের কতিপয় সদস্য কর্মশালায় জানালেন, তাদের বাড়ি হচ্ছে ফুলছড়ি থানায়। এ এলাকাটায় তেমন জুয়া চলত না। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে নদীর চর অঞ্চলে ছামিয়ানা টাঙ্গিয়ে জুয়া চলছে। প্রথম প্রথমআমাদের এলাকার কেউ এ জুয়া খেলত না। জুয়ার লোকজন সবাই পার্শ্ববর্তী জামালপুর জেলা থেকে আসত। কিন্তু এখন তাদের এলাকার অনেকেই জুয়া খেলতে যায়। কারণ হিসেবে তারা বললেন, জামালপুর জেলার নতুন এসপি নাকি মদ-জুয়ার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর হয়েছেন। তাই জুয়াড়ুগণ জামালপুর ছেড়ে নদী পার হয়ে গাইবান্ধা জেলায় প্রবেশ করেছে। আমি বুঝতে পারলাম, জুয়া এমনই একটি বদভ্যাস এবং এর সাথে কিছু মানুষের রুটি রুজি এনমভাবে জড়িয়ে গেছে যে তারা এক স্থান থেকে আর এক স্থান এবং এক জেলা থেকে আর এক জেলায় গিয়ে জুয়ার আসর বসায়।

জুয়া হল একটি ভিকটিমলেস বা মজলুমবিহীন অপরাধ। ভিকটিমলেস অপরাধ মানে হল, যে অপরাধের জন্য ভুক্তভোগী থানায় কোন অভিযোগ করে না। এসব অভিযোগে সাধারণত ভিকটিম অপরাধের সহযোগী হয়। তারা স্বেচ্ছায় বা নিজের প্রয়োজনে এ অপরাধের সাথে জড়িত হয়। যারা এ অপরাধ থেকে লাভবান হয়, তারা থাকে বিভিন্ন দিক থেকে শক্তিশালী। যেহেতু থানায় এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে না, তাই থানাও থাকে এ সম্পর্কে নিরব। অধিকন্তু এ অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজের এক বা একাধিক প্রভাবশালী অংশ। এরা প্রভাব, ক্ষমতা, মাস্তানী, উৎকোচ ইত্যাদির বিনিময়ে আইনের হাতকে বেঁধে রাখে। যেহেতু নির্দিষ্ট কেউ এ অপরাধের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করে না এবং এর থেকে ভাল অংকের বখরা মিলতে পারে, অনেক স্থানে জুয়াড়ুগণ স্থানীয় পুলিশ ও রাজনীতিবিদদের সমর্থন পেয়ে থাকে।

জুয়া খেলায় ব্যবস্থাপকগণ চূড়ান্ত বিচারে লাভবান হলেও যারা জুয়া খেলতে যায়, তারাও এ অপরাধের জন্য কম দায়ী নয়। কোন কোন ব্যক্তি অভ্যসগতভাবে জুয়াড়ু। এটা ধূমপান, মদ্যপান, নারী সম্ভোগ ইত্যাদির মতোই কিছু কিছু মানুষের অভ্যসগত। বদঅভ্যস অনেক ক্ষেত্রে কোন কমিউনিটিতে এক সময় গা সওয়া হয়ে যায়। হাতে গোনা কিছু মানুষ এর কুফল উপলব্ধি করে এর বিরোধীতা করলেও অধিকাংশ মানুষই এর সহযোগী হয়ে পড়ে।

জুয়া বা বাজি ধরা একটি সামাজিক অনাচার। এর সাথে যেমন বিনোদনের বিষয়টি জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্বও। জুয়াড়ুদের ছেলে জুয়াড়ু, বাজিগরের ছেলে বাজিগর হওয়ার বিষয়টি মিথ্যা নয়। এই বদভ্যাস জিনগত বা বংশগত নয়। কিন্তু এটা যে পিতা থেকে পুত্রের কাছে স্থানান্তরিত হয় সেটা নানাভাবে পরীক্ষিত। এটা পরিবারের শিক্ষাও বটে। সন্তান যখন তার পিতাকে বাজি ধরতে দেখে আনন্দ পেতে দেখে তখন সেও একই ভাবে আনন্দ পেতে চায়। একদিন তাই পিতার স্থান পুত্র দখল করে।

বিষয়টি ফ্রয়োডের ব্যক্তিত্বের তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। ফ্রয়োডের ব্যক্তিত্বের হাইপোথেসিস অনুসারে পিতা পুত্রের কাচে ক্ষমতার প্রতীক। তার সকল অভ্যাসেই পুত্র ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণকর্তার প্রকাশ খুঁজে পায়। বাজিধরা, জুয়া খেলা, মদ্যপান ইত্যাদির একটি ক্ষমতার দিক রয়েছে। তাই জুয়াড়ুর পুত্র ক্রমান্বয়ে পিতার মতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে চায়। তাছাড়া যারা জুয়ার ব্যবস্থাপকদের সন্তানগণ জুয়ার বোর্ড বসানোকে একটা পেশা হিসেবেও গ্রহণ করতে পারে।

এমতাস্থায়, নেতৃকোণার মত জুয়া ও বাজি প্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশকে প্রচলিত আইন প্রয়োগের বাইরেও মনস্তাত্বিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মানুষকে এর বিরুদ্ধে সচেতন ও সোচ্চার  করে তুলতে হবে। তাৎক্ষণিক সাফল্যের পরিবর্ততে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধানমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। আর এ কাজ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার-ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সবাইকে এজন্য কাজ করে যেতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে জুয়াকে নিষিদ্ধ করে যে আইন রয়েছে তা বর্তমানে অত্যন্ত সেকেলে হয়ে পড়েছে। এ আইনে পুলিশ সুপারকে তল্লাশি পরোয়ানা জারির ক্ষমতা দেয়া হলেও এ আইনে শাস্তির পরিমাণ অতি নগণ্য। এটা জামিনযোগ্য। মাত্র কয়েকশত টাকা খরচ করলে গ্রেফতারকৃত জুয়াড়ুগণ তাৎক্ষণিকভাবে আদালত থেকে ছাড়া পেতে পারে। ব্রিটিশরা জুয়ার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিলেও এটাকে তারা এক প্রকারের বিনোদনই মনে করত। তাই এ আইনকে তার বড়ই হালকাভাবে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে জুয়া বা বাজি ধরার যে ভয়াবহতা তাতে এ আইনকে কঠোর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সূত্র:

http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article878601.bdnews