ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

হটাৎ করে ফোন দিলেন জনাব কায়সার আলী। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন ক্যাডার অফিসার। সম্ভবত ১৩তম বিসিএস এর কর্মকর্তা। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী তামান্নার স্বামী তিনি। একটা ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে তিনি আমার সাথে কথা বলতে চান। তবে ফোনে নয়, সামনা সামনি। সকাল সাড়ে দশটার দিকে জনাব কায়সার এলেন। তিনি আজ অফিসে আমার প্রথম অতিথি।

 

তামান্নার মেয়ে রিমি গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ও লেভেলের ছাত্রী। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। তাই কোচিং সেন্টারে যায়। কিন্তু এক বখাটে তার পিছনে লেগেছে। তাকে উত্তক্ত করছে। তামান্ন অনেকটাই কনজারভেটিভ। সে তার মেয়ের হাতে মোবাইল দেয় না। কিন্তু সেই বখাটে তামান্নার ফোনেই নানা কথা বলে তার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়।

 

ইতোপূর্বে মীরপুরে থাকতে কোথাও দোকানে এ বখাটে তামান্নার মেয়েকে দেখেছে। এর পর তামান্নাকে বাসা বদল করে গুলশানের কাছে সাহজাদপুরে চলে গেছে। কিন্তু সেই বখাটে তার পিছু ছাড়েনি। তামান্নার মেয়ে যে কোচিং এ পড়ে, বখাটে ভূয়া নাম ঠিকানা ও ক্লাস ব্যবহার করে সেই কোচিং এ ভর্তি হয়েছে। তার উদ্দেশ্য একটাই মেয়েটির সাথে প্রেম করা।

 

ওরা যতটুকু জানতে পেরেছে তাতে দেখা যায় বখাটের বাড়ি বরিশালে। সে মীরপুরের বাঙলা কলেজে পড়ে। কয়েকদিন আগে তামান্নার মেয়ে বখাটেকে কঠিনভাবে না করে দিয়েছে। কিছু অপমানজনক কথা বার্তাও বলেছে।  কিন্তু বখাটে উল্টো হুমকি দিয়েছে মেয়টিকে। যদি সে তার সাথে সম্পর্ক না করে তবে সে একটা ভীষণ কিছু করে বসবে।

 

এখন তামান্ন বড় বিপদে আছে। তার মেয়ের কোচিং যাওয়া বন্ধ। সে দুই স্থানে  কোচিং করত। একটা গুলশান-১ এ অন্যটা বাড্ডাতে। তামান্নার অভিযোগের ভিত্তিতে বখাটেকে গুলশানের কোচিং থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বখাটেকে বহিষ্কার করা হলেও তার প্রতিক্রিয়ায় তামান্নার মেয়েরও কোচিং বন্ধ হয়েছে। সে এখন বড় দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও আতঙ্কের মধ্যে আছে। যদি বখাটে তার মেয়েকে অ্যাসিড মারে, অপহরণ করে কিংবা অন্য কোন প্রকার ক্ষতি করে?

 

তাই স্থানীয় পুলিশকে না জানিয়েই তামান্নার স্বামী আমার কাছে এসেছেন। কিন্তু আমি পুলিশ অফিসার হলেও কোন অপারেশনাল ইউনিটে কাজ করি না। আমার বর্তমান নিযুক্তি আভিযানিক না, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণমূলক। তাই আমার পক্ষে তামান্নাকেকে সরাসরি সেবা দেয়া সম্ভব নয়।

স্থানীয় পুলিশের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা না জানিয়ে তামান্নাকে দম্পতির আমার কাছে আসার পিছনে তিনটি কারণ আছেঃ

  • আমি তামান্নার পরিচিত। তাই কষ্টের কথা মানুষ তার পরিচিতদেরই সর্বপ্রথম জানায়;
  • আমি একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার। কোন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের নির্দেশ বা অনুরোধ জুনিয়রগণ বেশি গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করবে;
  • তারা স্থানীয় পুলিশকে বিষয়টি জানিয়ে তেমন ফল পাবে না বলে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ তৃণমূল পর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের প্রতি তাদের সহজাত অনাস্থা রয়েছে।

 

উপরিউক্ত ঘটনা এদেশে অহরহই ঘটছে। আমাদের উঠতি বয়সের মেয়েরাই শুধু নয়, সব বয়সের মেয়েরাই  নিত্যদিন এ রকম বখাটেদের দ্বারা যৌন হয়রানির স্বীকার হচ্ছে। কিন্তু কয়জন যাচ্ছে পুলিশের কাছে?

 

এ জাতীয় যৌন হয়রানির বিষয়গুলো প্রায় ক্ষেত্রেই ভিকটিমদের প্রতিকূলে মীমাংসিত হয়। যদি ভিকটিম পরিবার সামাজিকভাবে নিম্ন শ্রেণির হয়, তাহলে তারা হয়রানিকারীদের সহজ শিকারে পরিনত হয়। যদি ভিকটিম পক্ষ মধ্যবিত্ত হয়, মেয়েটিকে কালবিলম্ব না করে পড়াশোনা শেষ না করেই নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে দিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়। যদি তারা মধ্যবিত্তের চেয়ে একটু উপরে হয়, তাহলে তারা মেয়েদের পড়াশোনা আপাতত স্থগিত রেখে সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের কাছে কষ্ট নিয়ে ঘোরে।

 

সংশ্লিষ্ট জোনের এসিকে ফোন করে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন, স্যার, কই তিনি তো আমাদের কাছে আসলেন না। যদি আসত আমি সেই বখাটের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা নিয়ে শ্রীঘরে ঢোকাতাম। কিন্তু এসি সাহেব হয়তো জানেন না, এধরনের সমস্যায় হাজারো অভিভাবক রয়েছেন। কিন্তু তারা থানা বা স্থানীয় পুলিশের কাছে গিয়ে ভরসা পায় না। কেলেঙ্কারীর ভয়ে তারা থানা পুলিশ করতে চায় না।

 

বর্তমানে পুলিশের সকল স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় পুলিশেও যোগ হয়েছে উদ্যমী, পরিশ্রমী ও জনসম্পৃক্ত তরুণ পুলিশ অফিসারগণ। কিন্তু আমজনতার সাথে স্থানীয় পুলিশের বোঝাপড়ার দূরত্ব আগের মতোই আছে। এখানে এখনও ব্যক্তি পুলিশকে মানুষ বিশ্বাস করলেও, প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ জনগণ থেকে এখনও অনেক দূরে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার, কিংবা সভা সেমিনারের কোন প্রতিশ্রুতিই কাজ দিবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশ অফিসারগণ সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় শরীরে যাবেন। পাড়ায়, মহল্লায়, লোকালয়ে জনগণের কাছাকাছি গিয়ে তাদের আস্থা অর্জনের জন্য তাই পুলিশকে অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।

 

পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা ব্যক্তি পর্যায় থেকে সাংগঠনিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য পুলিশের আইন-বিধি ও কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সনাতনী পুলিশিং কৌশলকে পরিহার করে নবতর কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে।