ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

শঠিবাড়ি হাটের পশ্চিম প্রান্তে খয়রা মিয়ার ধানের চাতাল। চাতালের ম্যানেজার প্রায় ৬০ বছর বয়সী মনোরঞ্জন। ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ রাতের প্রথম প্রহরে চাতালে নৃংশভাবে খুন হয় ম্যানেজার মনোরঞ্জন। তাকে মাথায় আঘাত করে ও গলা কেটে  হত্যা করা হয়। এ সংক্রান্তে  মিঠাপুকুর থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয়। কিন্তু পুলিশ প্রায় দুই/আড়াই মাস ঘটনার কোন কুল কিনারা করতে পারে না। অবশেষে তারা ভিকটিমের মোবাইলের কলসিট(সিডিআর) পর্যালোচনা করে দেখতে পায় ভিকটিমের মোবাইল থেকে একটি মোবাইল নম্বরে ঘটনার রাত্রে কয়েকবার ফোন দেয়া হয়েছে। এ মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মিঠাপুকুর থানা পুলিশ রাসেলকে গ্রেফতার করে।

 

রাসেলের বয়স খুব বেশি হলে ১৪ বছর। এবার অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠবে সে। ছোট ছেলে, বুদ্ধিসুদ্ধি কম। পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর, তাই তাকে মহাসড়কের উপর অবস্থিত নামকরা স্কুলটিতে ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি না করিয়ে বাড়ির কাছে একটি অখ্যাত স্কুলেই ভর্তি করা হয়। তবে গত তিন বছরে রাসেল অনেকটাই বড় হয়েছে। তাই তাকে বাড়ি থেকে একটু দূরে শঠিবাড়িতে কোচিং করতে  পাঠানো হয়। তবে ছাত্র হিসেবে রাসেল মোটামুটি অঘা। কোন পরীক্ষায় পাশ করতে পারে না। মেজাজও চড়া। ব্যবহারও একটু অমার্জিত। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে সে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু বন্ধু জুটিয়েছে যারা তার চেয়ে বয়সে বড়, পড়াশোনাতেও উপরের ক্লাসে। কিন্তু তারা যত বড়ই হোক তারাও কিশোর। বাংলাদেশের  আইন অনুসারে তারা এখনও শিশু। সকলের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

 

মোবালই ফোনের কল লিস্টের সূত্র ধরে শিশু রাসেলকে গ্রেফতার করা হয় গত ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪। রাসেলের অভিভাকগণ জানে, সে একটা কুড়ে পাওয় মোবাইল সিম ব্যবহার করে। সেই সিমটি নাকি ছিল অপরাধীদের। তাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু রাসেলের পরিবার যা জানে পুলিশের জানা শোনা তার চেয়ে পৃথক। যেহেতু ঘটনার পূর্বে তার মোবাইলে ভিকটিমের মোবাইল থেকে ফোন এসেছিল, তাই এ বিষয়ে সে হয়তো কিছু জানে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলেই ছেড়ে দেয়া হবে– পুলিশের ধারণা ছিল এটাই।

রাসেলকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে তারা গোটা ঘটনাটিই উদ্ঘাটন করে এবং রাসেল কোন না কোন ভাবে এ হত্যা কাণ্ডের সাথে জড়িত। রাসেলের স্বীকারোক্তি মতে তারা ২০ তারিখ রাতে জুবায়ের ও মৃদুলকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রত্যেকেই ঘটনার কাথা স্বীকার করে। তবে তাদের এ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পিছনে বড় যুক্তি ছিল।

 

চাতাল ম্যানেজার মনোরঞ্জন ছিল একজন সমকামী। সে রাসেলসহ তার কয়েকজন বন্ধুকে নির্যাতন করত। রাসেলের সাথে ছিল জোবায়ের, মৃদুল ও রুস্তম। একদিন জোবায়েরকে মনোরঞ্জন যৌন হয়রানি করেছে। অন্যদেরও বিভিন্ন সময় প্রস্তাব দিত। তাই তারা চারজন মিলে পরিকল্পনা করে যে মনোরঞ্জনকে তারা হত্যা করবে। হত্যার পরিকল্পনা হয় প্রায় ঘটনার এক মাসে আগে।

 

ঘটনার দিন রাত আটটার দিকে জুবায়ের ও মৃতুল ভিকটিমকে ফোন করে বলে যে, তারা ভিকটিমের চাতালে আসতে চায়। ভিকটিম বলে এখন তো তার কাছে মানুষ জন আছে, তাই তারা যেন রাত এগারটায় আসে। এ সময় মৃদুল ও জুবায়ের ভিকটিমের মোবাইল থেকে রাসেল ও রুস্তমতে ফোন দেয়। কিন্তু রুস্তমের ফোন বন্ধ ছিল। তাই তার সাথে যোগাযোগ হয়নি। রাসেলের সাথে ফোনে কথা হয়। তারা রাসেলকে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার জন্য শঠিবাড়িতে ডাকে। কিন্তু রাসেল তখন বাড়িতে ছিল।  সকল বালকের বাড়িই শঠিবাড়ি থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে। রাসেল বলে, সে বাড়িতে ঢুকে গেছে। তার বাবা বাড়িতে আছে তাই তার পক্ষে বাড়ির বাইরে বের হয়ে তাদের সাথে যোগ দেয়া সম্ভব হবে না। তারা পারলে একাই কাজটি করুক।

 

এরপর জুবায়ের ও মৃদুল ভিকটিমের  চাতালে যায়। তারা গভীর রাত পর্যন্ত টিভি দেখে। বাইরে নাস্তাও করে। এর পর শেষ রাতের দিকে জুবায়ের ভিকটিমের মাথায় ইঁট দিয়ে আঘাত করে। এ ইঁটটি তারাই পূর্ব পরিকল্পনামতো ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে রেখেছিল। ইঁটের আঘাতে ভিকটিম অজ্ঞান হয়ে পড়লে মৃদুল ভিকটিমের গলায় চাকু দিয়ে পোজ দেয়। এ চাকুটি ঘটনাস্থলেই ছিল। চাতালে চালের বস্তা সেলাই করার পর সেলাইয়ের রসি এ চাকু দিয়ে কাটা হত। এর পর নাকি জুবায়েরও কয়েকবার পোজ দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যাকাণ্ডের সময় জুবায়েরের প্যান্টে ভিকটিমের কিছু রক্ত লাগে। সেটা সে তড়িঘড়ি করে ধুয়ে ফেলে চাতালে দরোজা খুলে বাইরে চলে আসে। আসার আগে ভিকটিমের টেবিলের ড্রয়ারে থাকা পাঁচ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে আসে। এ টাকা সবাই ভাগ করে নেয়। তবে রাসেলকে মাত্র ছয় শত টাকা দেয়।

 

জুবায়েরের কথা হল, যেহেতু সে শিশুদের সাথে অনৈতিক কাজ করত তাই তারা তাকে খুন করেছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমরা যে খুন করলে ধরা পড়বা, এটা কখনও মনে হয়নি। সে বলল, না, এমন কথা তাদের কখনও মনে হয়নি। তাদের কাছ থেকে আরও জানতে চাওয়া হল, আসলে তোরা তাকে খুন করতেই গিয়েছিলি না, টাকা লুট করতে গিয়েছিলি, কিন্তু পরে ভিকটিম তোমাদের চিনে ফেলল তখন খুন করলি? ওরা বলল, না, আমরা তাকে খুন করতেই গিয়েছিলাম। পরে ড্রয়ারে টাকা দেখে সেটা নিয়ে এসেছি।

 

রাসেলকে প্রশ্ন করা হল, তুমি যখন খুনের সাথে ছিলে না, তখন টাকার ভাগ নিলে কেন? সে বলল, আমি নিতে চাইনি। ওরা বলল, যদি টাকা না নিস, আমরা তোর কথা ফাঁস করে দিব।

রাসেল, জুবায়ের, মৃদুল ও রুস্তম–এসব বালকের  প্রত্যেকেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। কিন্তু তারা যতই অপ্রাপ্ত বয়স্ক হোক, তাদের মধ্যে প্রতিশোধ স্প্রীহা প্রবল। তারা দীর্ঘ পরিকল্পনা করে একজন বয়স্ক মানুষকে খুন করেছে। খুনের পরে অতি স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করেছে। এমনকি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করা জুবায়ের পরদিন ঘটনাস্থল উপস্থিত শতশত উৎসুক জনতা ও পুলিশ সদস্যদের পাশ কাটিয়ে স্কুলে গিয়ে নিয়মিত ক্লাসও করেছে।

 

অন্যদিকে তাদের এ হত্যা কাণ্ড শুধুই প্রতিহিংসামূলক ছিল না। তারা হত্যাকাণ্ডের পর ভিকটিমের ড্রয়ারে থাকা পাঁচ হাজার টাকাও লুট করেছে। আবার শুধু লুট করেই খান্ত দেয়নি। যারা তাদের মিশনে ছিল ঘটনাস্থলে না থাকলেও তাদের লুটের টাকার ভাগ দিয়েছে। অন্যদিকে যারা ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে ছিল না তারাও লুটের টাকার ভাগ নিয়েছে। সব দিক বিবেচনায় এ খুন একটি অপরাধী দলের অপকর্ম। এ দল ছিল কিশোরদের দল।

অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালনার জন্য গ্রামাঞ্চলেও এমন একটি শিশুদের দল তৈরি হওয়া আমাদের সমাজের অপরাধ জগতে সম্পূর্ণ নতুন উপাদান। এ ধরনের অনেক ঘটনাই হয়তো সারা বাংলাদেশে ঘটছে। ধীরে ধীরে পরিস্ফুটিত হচ্ছে আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকগুলো। কিন্তু এ অন্ধকার দিকগুলো আলোকিত করার মতো কোন পরিকল্পনাই আমাদের নেই। শিশু কিশোরগণ দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সঠিক বিকাশের উপরই নির্ভর করবে জাতির আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু আমাদের শিশুরা বিকশিত হচ্ছে কিভাবে? ঘটনায় উল্লেখিত কিশোরদের পরিবার ধনী নয়। কিন্তু তাই বলে, এ সব কিশোরের কেউই উপোস থাকার মতো অবস্থায় নেই। তারা শিক্ষার আলো বঞ্চিত নয়। কিন্তু তারপরও এরা কেন হল এমন অপরাধী? এর কারণ খুঁজতে হবে আমাদের সমাজ বিজ্ঞানীদের; কারণ দূর করতে হবে আমাদের সমাজপতি ও রাষ্ট্রনায়কদের।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ঘটনা সত্য হলেও বালকদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।